ইগো, ইউরেনিয়াম ও আমাদের ‘লিটল বয়’

ইগো, ইউরেনিয়াম ও আমাদের ‘লিটল বয়’
কাজাখস্তানের একটি প্ল্যান্টের প্রোডাকশন লাইনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি পণ্য ইউরেনিয়াম পেলেট। ছবি: রয়টার্স

ইগো বড্ড খারাপ জিনিস। পার্ল হারবারে হামলা আমেরিকার ইগোতে লেগেছিল। জাপানের আকাশ থেকে নেমে এসেছিল ‘ফ্যাট ম্যান’ আর ‘লিটল বয়’। নিমেষে প্রাণ হারাল অন্তত দেড় লাখ মানুষ। চার মাসের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে মারা যায় আরও এক লাখ মানুষ। হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে দীর্ঘমেয়াদে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাত, মৃত সন্তান জন্ম দেওয়া এবং শিশুদের মধ্যে ক্ষুদ্র মস্তক (Microcephaly) ও বুদ্ধিবৈকল্য দেখা দিয়েছিল। দশকের পর দশক ওই দুই শহরের মানুষ ‘রেডিয়েশন স্টিগমায়’ ভুগেছে।

জাপানে পাঠানো আমেরিকার সাড়ে চার হাজার কেজির পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাটম্যান’ আর ‘লিটল বয়’ বদলে দিয়েছে বিশ্বের যুদ্ধনীতি, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন। এই দুটি বোমা তৈরি করতে আমেরিকা খরচ করেছে তখনকার দুই বিলিয়ন ডলার, যার বর্তমান বাজার মূল্য ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

এরপর মানুষ হামলে পড়ে ধ্বংস বিদ্যা শিখতে। খেতে পারুক কিংবা না পারুক, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে। ১৯৪৫–এ কেবলমাত্র আমেরিকার কাছে ছয়টি বোমা ছিল। ইগোতে আঘাত লেগেছিল হ্যারি এস ট্রুম্যান আর তার পর্ষদের। জাপানের দিকে ছুড়ে দিয়েছিল দুটি। এখন বিশ্বে পারমাণবিক বোমার সংখ্যা (গোপনগুলো বাদ দিলে) ১২ হাজার ২৮১টি।

বর্তমান বিশ্বে ৯টি দেশের কাছে থাকা এসব পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা ১৯৪৫ সালের বোমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি। এখন কোনো বিশ্বনেতার অহংয়ে আঘাত লাগলে পাঠাবে থার্মোনিউক্লিয়ার (হাইড্রোজেন) বোমা। হুকুমের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ দ্রুত গতিতে গিয়ে নিশ্চিহ্ন করে আসবে লক্ষ-কোটি মানুষের কোনো জনপদ।

এই বোমা ভারতের আছে ১৭২টি, পাকিস্তানের ১৭০টি, চীনের ৬৫০টি। আমেরিকা ও রাশিয়া–দুই দেশের কাছেই আছে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি থার্মোনিউক্লিয়ার বা হাইড্রোজেন বোমা। এসব বোমা বানানোর মূল উপাদান ইউরেনিয়াম। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো একে অন্যের সম্পদের ওপর নগ্নভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে ভয়ানক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে কার যে কখন অহংয়ে আঘাত লাগে, সেই আতঙ্ক থেকে বোমার খোঁজ-খবর আর পরিসংখ্যান জেনে রাখছিলাম।

কিছু দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, “বাংলাদেশের পাহাড়ে থাকা ইউরেনিয়াম তুলে ভারতকে অসংখ্যবার ধ্বংস করা সম্ভব।” গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মোসাদ্দেক বলেছেন, “বাংলাদেশের সিলেট, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া পাহাড়ে ইউরেনিয়াম আছে এবং তা তোলা হলে ভারতকে অসংখ্যবার ধ্বংস করা সম্ভব।”

গত ৪৫-৫০ বছর আগে এই ইউরেনিয়ামের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু কোনো সরকার এটি উত্তোলন করেনি। মোসাদ্দেকের দাবি, এখন যেন বাংলাদেশ ইউরেনিয়াম উত্তোলন করে।

মোসাদ্দেকের বক্তব্যকে ট্রল করেছেন তার সতীর্থরা। ইতিহাসে এমন নজির অনেক আছে। যেকোনো ভালো উদ্যোগে নিন্দুকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের ‘লিটল বয়’-এর দাবির বাস্তবতা জেনে বুঝে রাখা দরকার। বাংলাদেশের ইউরেনিয়ামের সম্ভাব্যতা আর পরমাণু অস্ত্র তৈরির বাস্তবতা আছে কি না সেটা জানা দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম এই সম্ভাবনা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। তিনি বললেন, “পারমাণবিক বোমা তৈরি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে যে ইউরেনিয়ামের কথা বলা হয়, তার ব্যবহার উপযোগিতা প্রশ্নসাপেক্ষ। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Enrichment) বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক বিশ্ব সর্বোচ্চ কড়াকড়ি করে রেখেছে। চাইলেই এটি করা সম্ভব নয়। বুঝতে হবে ইউরেনিয়াম যার হাতে, হাইড্রোজেন বোমা বানানোর পথ তার জন্য খোলা। বাংলাদেশ কখনো ওই পথে হাঁটবে না।”

মন ভরল না। কথা বললাম, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান পরমাণু শক্তি প্রকৌশলী মো. আলী জুলকারনাইনের সঙ্গে। প্রশ্ন শুনে অবাক বনে গেলেন এই পরমাণু বিজ্ঞানী। বললেন, “বৈজ্ঞানিকভাবে যদি আমাদের এখানে পাহাড়ের মধ্যে কিছু ইউরেনিয়াম থেকে থাকে, সেটা আসলে নিউক্লিয়ারিং ইউরেনিয়াম হিসেবে পরীক্ষিত না। যা আছে তা প্রসেস করে ‘ইউরেনিয়াম টু থার্টি এইট’ আইসোটোপে রূপান্তর করার চিন্তার চেয়ে বিজ্ঞানীদের হাতে আরো অনেক কাজ আছে। তাছাড়া বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বিষয়টিকে সারাবিশ্বে মনিটর করে।”

বাংলাদেশের ইউরেনিয়ামের সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে প্রতিবেদন ইন্টারনেটে আছে। পড়ার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক জুলকারনাইন বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ওয়েবসাইটেও এই বিষয়ে প্রতিবেদন আছে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

কী বলছে সেসব প্রতিবেদনে?

পরমাণু শক্তি সংস্থার ‘বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম অনুসন্ধান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানে (বেঙ্গল বেসিন) অবস্থিত, যার চারপাশে ভারতের মেঘালয় বা বিহারের মতো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ অঞ্চল রয়েছে। তাই বাংলাদেশেও ইউরেনিয়াম পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে ধরে নিয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৭৬ সাল থেকে আইএইএ এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির সহায়তায় এই অনুসন্ধান কাজ শুরু করে।

হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশ থেকে (airborne survey) এবং সরাসরি হাঁটা পদ্ধতিতে চালানো পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে ৩০০টিরও বেশি তেজস্ক্রিয় অস্বাভাবিকতা (radiometric anomalies) বা এমন এলাকা পাওয়া যায়, যেখানে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সাধারণের চেয়ে ৩ থেকে ৬০ গুণ বেশি। সিলেটের হরিপুর, জৈন্তা, পাথারিয়া এবং চট্টগ্রামের জলদি ও সীতাকুণ্ডের মতো এলাকায় তেজস্ক্রিয় খনিজের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই তেজস্ক্রিয়তা মূলত ‘ডুপটিলা (Dupitila)’ এবং ‘টিপাম (Tipam)’ নামক বেলেপাথরের স্তরে পাওয়া গেছে, যা কয়েক মিলিয়ন বছর পুরোনো।

এই তেজস্ক্রিয়তার একটি বড় কারণ হলো থোরিয়াম; তবে সরাসরি কোনো ইউরেনিয়াম খনিজ এখনো আলাদাভাব শনাক্ত করা যায়নি।

এই সাথে জেনে রাখা ভালো, বিশ্বের মোট পরীক্ষিত ইউরেনিয়াম মজুতের পরিমাণ প্রায় ৬১ থেকে ৬৪ লাখ টন। তবে বিশ্বের মোট মজুতের ৫০ শতাংশের বেশি আছে মাত্র তিনটি দেশের হাতে। বিশ্বের বৃহত্তম ইউরেনিয়ামের মজুত আছে অস্ট্রেলিয়ায় (২৮%)। বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদক কাজাখস্তান। এ ছাড়া, কানাডার হাতে ১০%, রাশিয়ায় ৮%, নামিবিয়ায় ৭% এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫% ইউরেনিয়ামের মজুত আছে।

আইএইএ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইউরেনিয়াম সম্পর্কে প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। বিশ্লেষণ আছে অন্যান্য বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকীতেও। মোটা দাগে পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে বেশ কিছু কঠিন ধাপ পার করতে হয়।

মাটি থেকে ইউরেনিয়াম আকরিক তোলা হয়। সেসব আকরিক গুঁড়ো করে অ্যাসিড দিয়ে ধুয়ে ‘ইয়েলো কেক’ নামক পাউডার তৈরি করা হয়। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটপের পরিমাণ খুব কম থাকে। তাই বিশেষ মেশিনের সাহায্যে এর ঘনত্ব ০.৭% থেকে বাড়িয়ে ৪-৫% করা হয়, যাতে এটি রিয়্যাক্টরে ব্যবহার করা যায়। এতটুকু তৈরি করা গেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার উপযোগী হয়। আর ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপ অনেক অনেকবার রিফাইন বা সমৃদ্ধ করে ৯০% এর ওপরে নেওয়া গেলেই তখন তা বোমা তৈরির যোগ্য হয়। বোমার ধ্বংস ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে কত বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। আর কোনোভাবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই তা ধরা পড়ে যায় বিশ্বের ‘পারমাণবিক পুলিশ’ খ্যাত আইএইএর কাছে।

এ বিষয়ে কয়েক ধাপে সারা বিশ্ব মনিটর করে সংস্থাটি। ধরা পড়লেই উত্তর কোরিয়া কিংবা ইরানের মতো নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত। এ ছাড়া মোসাদ, সিআইএ, র, আইএসআই, এমআই সিক্স এর নজর এড়িয়ে থাকাটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্ত বাংলাদেশের ইউরেনিয়াম দিয়ে বোমা তৈরি নিয়ে আমাদের মোসাদ্দেকের তত্ত্ব উড়িয়ে দিলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছে। বিজ্ঞানী জুলকারনাইন বলছিলেন, বাংলাদেশের ছেলেরা পরমাণু বিজ্ঞানে অনেক আগে থেকেই মুন্সিয়ানার ছাপ রেখে আসছে। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে করাচির নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট অপারেট করেছে। নতুন করে রূপপুর আশা জাগিয়েছে। পরমাণু প্রযুক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও বাংলাদেশ ইউরেনিয়াম এবং পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে ফসলের মান বাড়াতে কৃষিখাতে তেজস্ক্রিয়তা ব্যবহার করছে। রোগ নির্ণয় এবং ক্যান্সারের চিকিৎসার থেরাপিতে বাংলাদেশ পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

দুই অধ্যাপক এবং বিজ্ঞান সাময়িকীর ভাষ্য অনুযায়ী, ধ্বংসের তাণ্ডবলীলার অংশীদার হওয়ার কথা না ভেবে বরং শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তিতে শানিত প্রজন্ম দেশকে যতটা এগিয়ে নিতে পারবে তা প্রতিবেশী দেশকে ধ্বংসের আগুনে না পোড়ালেও অহংয়ের চিতায় আগুন তো জ্বালাতেই পারে। মানব কল্যাণের জন্য সুস্থ বিজ্ঞান চর্চায় পারস্পরিক আদানপ্রদান বিস্ফোরণের আলো ছড়াবে না। তবে আলোর বিচ্ছুরণ অবশ্যই হবে।

তথ্যসূত্র:

BAEC (Bangladesh Atomic Energy Commission)

FAS (Federation of American Scientists)

SIPRI (Stockholm International Peace Research Institute)

ICAN (International Campaign to Abolish Nuclear Weapons)

IAEA (International Atomic Energy Agency)

World Nuclear Association (WNA)

OECD-NEA (Nuclear Energy Agency)

সম্পর্কিত