শেখ হাসিনার বিচার নিয়ে তাড়াহুড়োর কী ছিল?

এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে খোদ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে ভাষায় সমালোচনা করেছে তাতে শেখ হাসিনা ইস্যুতে আইসিসির কাছ থেকে আইনি, কূটনৈতিক বা নৈতিক কোনো সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

শেখ হাসিনার বিচার নিয়ে তাড়াহুড়োর কী ছিল?
শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে নতুন তৎপরতা চোখে পড়েছে। সরকারি কর্তাদের মুখ থেকে একের পর এক বক্তব্য বিবৃতি শোনা যাচ্ছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির সহযোগিতা চাওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

কিন্তু আইসিসির ক্ষমতার আওতা এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আইনের অধ্যাপক হিসাবে ড. নজরুলের ভালোই জানার কথা। বাংলাদেশের একটি আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ভিত্তিতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আটকাদেশ জারি করে আইসিসি ভারতকে বলবে তাকে যেন বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়– এমন আশা নেহাতই অমূলক। দুই দেশের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি নিয়েও আইসিসি কখনো মাথা ঘামিয়েছে– তাও শোনা যায়নি। ভারতের ওপর অন্তত নৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য আইসিসির কাছে দেন-দরবার করতে পারে সরকার। কিন্তু তাতেও কি কাজ হবে? মনে হয় না। এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে খোদ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে ভাষায় সমালোচনা করেছে তাতে শেখ হাসিনা ইস্যুতে আইসিসির কাছ থেকে আইনি, কূটনৈতিক বা নৈতিক কোনো সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

অথচ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভ দমনে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিল এসব প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা। জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিল– উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা নেতৃত্বের জ্ঞাতসারে এবং তাদের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানেই যে এসব হত্যা-নির্যাতন হয়েছে–তা বিশ্বাস করার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। মানবতা-বিরোধী অপরাধ হয়ে থাকতে পারে বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার। শেখ হাসিনা সরকারের আচরণের বিরুদ্ধে একই ধরণের সমালোচনা শোনা গিয়েছিল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কাছ থেকে। অপরাধের দায় নির্ধারণ এবং উপযুক্ত বিচারের কথা বলেছিল প্রভাবশালী এসব আন্তর্জাতিক সংস্থা।

অথচ শেখ হাসিনার রায়ের পর তাদের দেওয়া বিবৃতিগুলোতে অসন্তুষ্টি স্পষ্ট। এমনিতে নীতিগতভাবে এসব সংস্থা মৃত্যুদণ্ড বিরোধী। কিন্তু একইসাথে বিচার প্রক্রিয়ার মান নিয়ে তারা নাখোশ। তারা বলছে না যে শেখ হাসিনা অপরাধ করেননি। কিন্তু তাকে যে কায়দায় দায়বদ্ধ করা হলো– তা নিয়ে তারা নাখোশ, হতাশ। যে গতিতে আসামীর অনুপস্থিতিতে বিচার কাজ চালানো হয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে: আসামী পক্ষ কি পছন্দমতো আইনজীবী পেয়েছিল? প্রসিকিউশনের হাজির করা তথ্য-প্রমাণ চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ কি যথেষ্ট ছিল আসামি পক্ষের? যথেষ্ট সময় কি তারা পেয়েছে? এসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর দেওয়া সরকারের জন্য সহজ হবে না। রায়ের পর তার প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া বাদী পক্ষের আইনজীবী আমির হোসেন এক পর্যায়ে যেভাবে মুচকি হেসেছেন এবং যে ধরণের সাদামাটা কথা বলেছেন– তাতে যে কেউই বুঝতে পারবেন কতটা পেশাদারি ভূমিকা তার ছিল।

শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স
শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স

২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্টের কয়েক সপ্তাহে রাষ্ট্রের কাছ থেকে মানুষ যে মাত্রায় হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের পর তা আর হয়নি। ১৪০০ মৃত্যু এবং প্রায় ২৫ হাজার পঙ্গুত্বের দায় সনাক্ত এবং শাস্তির বাধ্যবাধকতা নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক হতে পারে না। সে সময় যা ঘটেছে তা নির্জলা নির্মম অপরাধ এবং দেশের আইন অনুযায়ী তার বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু সমস্যা হয়েছে সেখানেই। তাড়াহুড়ো করে গর্হিত সেই অপরাধের বিচার করতে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকেই বিতর্কিত করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে তা হলো? কে বা কারা দায়ী?

ড. ইউনুস ক্ষমতা নেওয়ার পর যে কয়েকটি অঙ্গিকার করেছিলেন। তার অন্যতম ছিল ২০২৪ সালের জুলাই অগাস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার। অক্টোবরে শেখ হাসিনারই তৈরি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত করা হয়। দ্রুত গতিতে বিচারক এবং প্রসিকিউশন টিম নিয়োগ হয়। কিন্তু যেখানে ১৪০০ মানুষের হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রশ্ন, প্রধান আসামি যেখানে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি অনুপস্থিত, পলাতক– সেখানে এক বছরের মধ্যে তদন্ত ও বিচারকাজ শেষ করে রায় দেওয়ার ঘটনা নিয়ে যদি তাড়াহুড়ো করার অভিযোগ ওঠে, দোষ দেওয়া যাবে না।

ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যেই এই বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার তাড়া দেখা গেছে। বর্তমান সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের বিশাল আশা-ভরসা ছিল। যদিও তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু সাফল্য দেখাতে পারেনি। সে কারণেই হয়তো মেয়াদ শেষের আগে হাসিনার বিচার কাজ শেষ করে বাহবা পাওয়ার জন্য তারা তৎপর ছিল। এরকম স্পর্শকাতর মামলার যতটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, যে মানদণ্ড অনুসরণ করা দরকার ছিল– তা নিয়ে স্পষ্টতই যথেষ্ট মাথা ঘামানো হয়নি। জামায়াতে ইসলামির সাথে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের নিয়ে প্রসিকিউশন টিম গঠন করা নিয়ে যে পরে পক্ষপাতিত্বের বিতর্ক হতে পারে তারও তোয়াক্কা করা হয়নি।

বিএনপিও হয়তো চাইছিল এই সরকারের সময়কালেই শেখ হাসিনার বিচার যেন শেষ হয়। তারা ধরেই নিচ্ছে তারা নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসবে। ফলে, সরকারে গিয়ে শেখ হাসিনার বিচারকাজ নিয়ে সম্ভাব্য জটিলতা হয়তো তারা এড়াতে চেয়েছে।

সবচেয়ে তৎপর ছিল সম্ভবত জামায়াত। যুদ্ধাপরাধের মামলায় তাদের শীর্ষ পাঁচ নেতাকে ফাঁসি দেওয়ার ক্ষোভ জামায়াত ভুলে গেছে, এটা কেউ বিশ্বাস করবে না। এই মামলাকে তারা হয়তো প্রতিশোধের সুযোগ হিসাবে দেখেছে। প্রধান প্রসিকিউটার তাজুল ইসলাম সরাসরি জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের মামলায় তিনি জামায়াতের একাধিক নেতার আইনজীবী ছিলেন।

ফলে, ক্ষমতায় বা ক্ষমতার কাছাকাছি যারা এখন রয়েছেন তাদের স্বার্থ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো মতবিরোধ হয়নি এবং তারা একযোগে জ্ঞানে বা অজ্ঞানে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিচার প্রক্রিয়ায় পুরনো পচা রাজনীতির বেনোজল ঢোকানোর রাস্তা করে দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

শেখ হাসিনা সুযোগ নিতে এক মুহূর্ত দেরী করেননি। রায়ের পরপরই তিনি বলেছেন তার বিরুদ্ধে যেভাবে বিচারকাজ চলেছে এবং যে রায় দেওয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এই আদালত কীভাবে, কাদের দিয়ে গঠিত হয়েছে, কীভাবে বিচার কাজ চলেছে–তা নিয়ে আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য এই দল কাজে লাগাবে সন্দেহ নেই।

তবে নিজেকে নিরপরাধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় শেখ হাসিনা সফল হবেন সে সম্ভাবনা খুবই কম। ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে কী হয়েছিল, তার সরকারের এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা কি ছিল– তার অনেক সাক্ষ্য-প্রমাণ, ছবি-ফুটেজ এমনকি সাধারণ মানুষের কাছেও রয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তেও তা প্রমাণিত হয়েছে।

শতভাগ পেশাদারিত্বের সাথে নির্মোহ-ভাবে এই অপরাধের দায় নির্ধারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য, রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের বিতর্কিত ভূমিকার জেরে বিচার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয় তাহলে তা হবে ২০২৪ এর আন্দোলনের নিহত-আহতদের প্রতি চরম অবিচার।

লেখক: পরামর্শক সম্পাদক, চরচা।

সম্পর্কিত