পর্ব ১

ফ্যাক্ট-চেকিং কখন প্রোপাগান্ডা হয়?

ফ্যাক্ট-চেকিং কখন প্রোপাগান্ডা হয়?
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে নির্মিত

ফ্যাক্ট-চেকিং। এই শব্দটা শুনলেই মনে আশা জাগে, সত্য তথ্য যেন একেবারে চোখের সামনে ফুটে উঠবে! কিন্তু আদতে কি সব সময় তাই হয়? না, অনেকদিন ধরেই এমনটা হচ্ছে না। বরং ফ্যাক্ট-চেকিং অনেক সময়ই প্রোপাগান্ডা চালানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে অভিযোগ উঠছে। তাহলে, ফ্যাক্ট-চেকিং কখন প্রোপাগান্ডা হয় আসলে? কখন উদ্দেশ্যমূলক পক্ষপাত প্রদর্শনের অস্ত্র হয়?

সাদামাটা ভাষায় ফ্যাক্ট-চেকিং বলতে বোঝায়, কোনো ঘটনার পেছনের ফ্যাক্টস খুঁজে বের করা। ফ্যাক্টস আদৌ আছে কিনা, বা থাকলে কী কী–এসব বের করা হয় ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়ায়। ঘটনাটি সত্য কিনা, আদৌ সত্য কিনা, সত্য হলে কতটুকু–এই সবই বের করা হয় ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়ায়।

মূলত এই ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়াটি নতুন কোনো বিষয় নয়। সাংবাদিকতার উদ্ভব হওয়ার পর থেকে সাংবাদিকেরা এ প্রক্রিয়া আবশ্যিক হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। এই প্রক্রিয়া ছাড়া সাংবাদিকতাই হয় না। তবে অন্য সব পেশার মতো সাংবাদিকতাতেও এক সময় দল, মত, আদর্শের অযাচিত অনুপ্রবেশ ঘটে, ঘটতে থাকে। এতে সাংবাদিকতাও ধীরে ধীরে নিরপেক্ষতা হারাতে থাকে। আর এই দুনিয়ায় সাংবাদিকতা যত বেশি পুঁজির ভিতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে, তত নিরপেক্ষ অবস্থানের বিচ্যুতি ঘটতে থাকে। সেই সাথে রাজনৈতিক আদর্শও সাংবাদিকতায় অনুপ্রবেশ ঘটায়। এভাবেই সাংবাদিকতা বিশ্বব্যাপী দল-মত নির্বিশেষে সবার হয়ে কথা বলার যোগ্যতা হারাতে থাকে।

এই ক্রমশ হারানোর ঘটনাটি এখনো ঘটে চলেছে। সারা দুনিয়াতেই হচ্ছে। হয়েছে এবং হচ্ছে বাংলাদেশেও। ফলে সারা পৃথিবীর মতো করে বাংলাদেশেও এসেছে স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং। শুরুতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, এরপর প্রতিষ্ঠান বানিয়ে তার মাধ্যমেও ফ্যাক্ট-চেকিং হয়েছে ও হচ্ছে। এবং সারা দুনিয়ার মতো করে বাংলাদেশেও ফ্যাক্ট-চেকিং কখনো কখনো প্রোপাগান্ডা চালানোর মেশিন হয়ে উঠছে কিনা, সেই সংশয়ও উঠছে।

বিশ্বে কী হচ্ছে

আগে আন্তর্জাতিক পরিসরে ওঠা সংশয় নিয়ে আলাপ হোক। মার্কিন মুলুকে পক্ষপাতমূলক ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের অভিযোগ জোরেশোরে ওঠে ২০১৬ সালে। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রিপাবলিকান প্রার্থীরা প্রথম এমন অভিযোগ তোলে। অভিযোগের তির ছিল ডেমোক্র্যাট শিবিরের দিকে। এ নিয়ে হিলারি ক্লিনটনকে সংবাদ সম্মেলনেও প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকার হিসেবে নিজেদের দাবি করা ব্যক্তিত্বরা রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আচরণ করছিলেন। তারা নিজেদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দাবি করলেও, ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ক্ষেত্রে এমন বিষয় বেছে নিচ্ছিলেন ক্রমাগত, যাতে করে সুবিধা যাচ্ছিল ডেমোক্র্যাট শিবিরে। এ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পও বেশ হল্লা করেছিলেন সেসময়।

একটি বিষয় তো আছেই যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতিতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ার পর থেকে নানামাত্রিক মিস ও ডিসইনফরমেশন ছড়িয়েছে বেশি। খোদ ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই এই ধরনের অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ আছে। ফলে রিপাবলিকান শিবিরেও যে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যাবে, তা তো স্বাভাবিকই। সমস্যা হলো, স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকারদের রাজনৈতিক পছন্দের বিষয়টি। অভিযোগ নানা ধরনের উঠতেই পারে, তবে সেসবের প্রমাণ পেলে শুধু ফ্যাক্ট-চেকিং নামক প্রক্রিয়াটির নিন্দা হয় না, বরং সেই সাথে ওই প্রক্রিয়ার অসাড়তা প্রমাণেরও চেষ্টা চলে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খোদ মার্কিন মুলুকেই ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়াটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহারের উদাহরণ আছে ভালোভাবে। সেটি রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট–উভয় শিবিরের বিরুদ্ধেই আছে। আর এর বাইরে বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠন তো আছেই।

শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশেই এই ফ্যাক্ট-চেকিং নিয়ে বিতর্ক জারি আছে। প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমকে জবাবদিহির মুখে আনার ক্ষেত্রে অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে ফ্যাক্ট-চেকিং। তবে সেই সাথে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব করছে কিনা, সেই অভিযোগও উঠছে।

অনেক দেশে সরকারের পক্ষ থেকেও এখন ফ্যাক্ট-চেকিং হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে যদিও ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সাধারণের কাছে তীব্র হয়ে উঠেছিল প্রথম, তবে এর আগ থেকেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে সাংবাদিকতার বাইরে আলাদাভাবে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ ছিল। করোনাভাইরাস মহামারির সময় থেকে এই প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোও ফ্যাক্ট-চেকিং উইংয়ের কাজ জোরদার করে।

এশিয়ার মধ্যেই মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে সরকারি উদ্যোগে ফ্যাক্ট-চেকিং করা হয়। মজার বিষয় হলো, এই তিনটি দেশেই পুরোপুরি গণতান্ত্রিক শাসন আছে বললে নির্ঘাৎ বিতর্ক হবে! এই তিন দেশেই প্রাথমিকভাবে করোনাভাইরাস মহামারির সময় ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের তোড়জোড় বেশি দেখা গেছে। সেসব স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত কাজ প্রশংসিতও হয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে সরকারি ফ্যাক্ট-চেকিং আদতে সরকারকে বাঁচাতেই ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে পক্ষপাতিত্ব করে কিনা, সেই বিতর্ক উঠেছে। ওই তিন দেশে সরকারি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়ার এমন আচরণ দেখাও গেছে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের। যেমন: চীনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ইস্যুতে সিঙ্গাপুরে, বা ওয়ানএমডিবি দুর্নীতির ইস্যুতে মালয়েশিয়ায় এমন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছে। থাইল্যান্ডে আবার যেমন এক ধরনের সামরিক শাসনের মোড়কে সরকার চলে। ফলে সরকারি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রক্রিয়ায় নিশ্চয়ই পুরোপুরি জনবান্ধব ফ্যাক্ট-চেকিং করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, কোনোভাবেই সরকারের বিরুদ্ধে যায়–এমন কোনো ফ্যাক্টস নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের নীতির পক্ষে থেকেই তার ব্যাখ্যা দিতে হয়। আর এই জায়গাতেই ওঠে সরকারের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানের দিনশেষে সরকারের প্রোপাগান্ডা মেশিন হয়ে ওঠার অভিযোগ। নিরপেক্ষতা বিচারের জায়গা থেকে সেই অভিযোগ অস্বীকারের উপায়ও থাকে না।

রাশিয়া অবশ্য অস্বীকারের ধারও ধারে না খুব একটা। ভ্লাদিমির পুতিনের দেশের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান খুল্লামখুল্লা সরকারের প্রোপাগান্ডা মেশিন হিসেবেই কাজ করে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, দ্য রাশিয়ান গ্লোবাল ফ্যাক্ট-চেকিং নেটওয়ার্ক (জিএফসিএন) যদিও ফ্যাক্টসের সত্যাসত্য বিচারের দাবি করে থাকে, কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান আসলে ক্রেমলিনের সরকারি প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজই করে থাকে। রুশ সরকারের বয়ান আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে এই জিএফসিএন-এর বিরুদ্ধে। তবে রুশ সরকারের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেই দাবি করে থাকে জিএফসিএন। যদিও তাদের কার্যকলাপে তা বোধ হয় না কোনোভাবেই।

অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকারদের সবচেয়ে বড় অর্থসংস্থানের ক্ষেত্র ছিল মেটা’র থার্ড পার্টি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রাম। যেহেতু বর্তমান সময়ে ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতেই মিস বা ডিসইনফরমেশন বেশি ছড়ায়, তাই সেগুলোর ফ্যাক্ট-চেক করার জন্য মেটা এই থার্ড পার্টি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রাম চালু করেছিল ২০১৬ সালে। তবে মার্ক জাকারবার্গ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই প্রোগ্রাম বন্ধের ঘোষণা দেন এই বলে যে, স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকারদের মধ্যেও রাজনৈতিক পক্ষপাত আছে এবং এটি মুক্তমত প্রকাশের ধারণার বিরোধী। যদিও নিন্দুকদের মতে, মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের রোষাণল থেকে বাঁচতেই জাকারবার্গ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী টেক মোগলদের একজন স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকারদের রাজনৈতিক বা আদর্শিক পক্ষপাতের যে অভিযোগ তুলেছেন, তা একেবারে হাওয়ায় ভেসে আসেনি।

অর্থাৎ, ‘গুপ্ত’ হিসেবে অনেক ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান বা স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকাররা চাইলে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করতেই পারেন। এবং বর্তমান দুনিয়ায় এমন অনেক উদাহরণ আছেও। বিষয়টি আসলে এমন না যে, ফ্যাক্ট-চেকার বা ফ্যাক্ট-চেকিং করা হলেই সবকিছু সত্যের উত্তম উদাহরণ হবে। বরং এর উল্টোটা হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কাও থাকে। যেভাবে সাংবাদিকতা পক্ষপাতমূলক হয়, ঠিক সেভাবেই ফ্যাক্ট-চেকিংও চরম পক্ষপাতিত্ব দেখাতে পারে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত