অর্ণব সান্যাল

গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অন্য ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়েছে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের উদ্দেশে। আবার একইসাথে জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রস্তাব আনা মেনে নেওয়ার ইস্যুতে জনমত যাচাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভোট।
এই গণভোট নিয়ে শুরু থেকেই নানা ধরনের বিতর্ক জারি ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জুলাই সনদের সব ধারা নিয়ে বা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সব প্রস্তাব নিয়ে একমত হতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামী যেমন এতে মোটামুটি রাজিই ছিল। বিএনপি আবার সংস্কারের অনেক প্রস্তাবেও একমত হয়নি। আর বাম ও ডানপন্থী নানা দলের মধ্যেও কেউ রাজি ছিল, কেউ কিছু কিছু প্রস্তাবে রাজি ছিল, আবার কোনো কোনো দল পুরো প্রস্তাবই প্রত্যাখান করেছিল।
ফলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য আদতে হয়নি। সবই আছে নানা ভাগে বিভক্ত অবস্থায়। এমন পরিস্থিতিতে দাবি উঠেছিল যে, রাষ্ট্রীয় সংস্কার বিষয়ে গণভোট যেন সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পরে কোনো সময় নেওয়া হয়। যুক্তি ছিল যে, গণভোট আসলে একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে হওয়া উচিত। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সেই দাবি মেনে নেয়নি। উল্টো গণভোটে যেন ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়, তার প্রচারেও নেমে পড়ে। এ নিয়ে সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞরা নানামাত্রিক সমালোচনাও করেছিলেন এবং এখনও করছেন। ফলে গণভোট নিয়ে বিতর্ক আছে ভালোমতোই।
কারণ, গণভোটে প্রায় ৮৪-এর কাছাকাছি বিষয়ে একমত বা দ্বিমত থাকার বিষয়টি জনতাকে জানাতে হয়েছে একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে। মানে একজন ভোটারকে হয় সবকিছুতে একমত হতেই হয়েছে, নইলে সবকিছুতেই দ্বিমত হতে হয়েছে। আবার গণভোটে অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালিয়েছে কেবল এবং ‘না’ ভোট দেওয়াকে একটা ‘জাতীয় লজ্জা’র পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এক ধরনের ‘ভালো’ পক্ষ বা ‘খারাপ’ পক্ষ যেন তৈরি করা হয়েছে। ফলে এক ধরনের পক্ষপাতমূলক সরকারি আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। গণভোটকে বিতর্কিত রূপ দিতে এসব বিষয়ই যথেষ্ট।
এই বিষয়গুলো বিতর্ক তৈরি করেছে গণভোটের আগে। আবার ভোটের পরও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। চরচা’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফা গণভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, গণভোটের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পাশে আবার টিক চিহ্ন দেওয়া ছিল। আর ‘না’ ভোটের পাশে ছিল ক্রস চিহ্ন। সাবির মুস্তাফার মতে, এভাবে আসলে ভোটারদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে সরকারিভাবে। কারণ, প্রতীকেরও ভাষা আছে। সেই হিসাবে টিক চিহ্ন এক ধরনের ইতিবাচক ও সঠিক মনোভাব প্রকাশ করে। আর ক্রস চিহ্ন প্রকাশ করে নেতিবাচক ও বেঠিক মনোভাব। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ভোটাররা মনে করতেই পারেন যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়াটাই হয়তো সঠিক, ‘না’ দিলে বেঠিক হয়ে যেতে পারে! বিবিসি বাংলার এই সাবেক প্রধান মনে করেন, এটি এক ধরনের জালিয়াতি।
গণভোট নিয়ে সাধারণের মধ্যেও নানা বিভ্রান্তি ছিল এবং এখনো আছে। এমনকি ভোটের দিনও ছিল এই বিভ্রান্তি। সরেজমিনে চরচা’র প্রতিবেদকেরা দেখেছেন, খোদ রাজধানীতেই অনেক স্বল্প শিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর ভোটারেরা প্রায় সবাই গণভোটে সিল দিয়েছেন না বুঝে কিংবা অন্যের কথায়। শিক্ষিত তরুণসহ বিভিন্ন বয়সী ভোটারদের অনুযোগ ছিল, চার প্রশ্নের বিপরীতে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তরের ব্যবস্থা রাখা নিয়ে।
এমন একটি অবস্থার মধ্যেই যে গণভোট হয়েছে, তার ফল নিয়েও উত্থান-পতন দেখা গেছে। যেমন, গত শুক্রবার যখন নির্বাচন কমিশন প্রাথমিকভাবে গণভোটের ‘হ্যাঁ-না’-এর হিসাব জানাল, তখন জানা গেল ‘হ্যাঁ’ পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯। আর ‘না’ পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭। এখন গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ পড়েছে আসলে ৪ কোটি ৮২ লাখের বেশি। আর ‘না’ পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬। অর্থাৎ, এক ধরনের কম-বেশি হিসাব নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যেই বিদ্যমান। ইসি বলতেই পারে যে, বেসরকারি ফলে একটু কম-বেশি হতেই পারে। তা হতে পারে। কিন্তু তাই বলে ৫ লাখ বা ২ লাখের কম-বেশি, আসলে একটু বেশি বেশিই!

এবার আসা যাক আসল প্রশ্নে। এ দেশের কত মানুষ আসলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিয়েছে?
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে (২৯৯ আসনে) মোট ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৫২২ জন ভোটার ভোট দেওয়ার যোগ্য। এর মধ্যে ৬ কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার ৭৭ জন পুরুষ, ৬ কোটি ২৬ লাখ ৭৭ হাজার ২৩২ জন নারী এবং এক হাজার ২১৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার। ৩০০ আসনে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯।
নির্বাচন কমিশন যে গেজেট প্রকাশ করেছে, তাতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী কাস্ট হওয়া বৈধ ভোটের ৬৮ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ ভোট। দেওয়া ভোটের হিসাবে তাই অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টিকে যদি সামগ্রিক ভোটারের হিসাবে দেখা হয়, তাহলে উঠে আসে আরেক বাস্তবতা। কারণ, সারা দেশে ভোট পড়েছে ৬০ শতাংশের মতো, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ যোগ্য ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকেই বিরত ছিলেন। একে অনিচ্ছা বা অনাগ্রহ হিসেবে ধরাই যায়। কারণ, ইচ্ছা বা আগ্রহ থাকলে তারা তো ভোটই দিতেন।
এই হিসাব করতে গেলে দেখা যায়, মোট ভোটারের ৩৭.৮% ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। আর মোট ভোটারের প্রায় ৬২% সরাসরি ‘না’ ভোট দিয়েছে বা ভোট দেওয়া থেকেই বিরত থেকেছে। অর্থাৎ, গণভোটের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে এই দেশের যোগ্য ভোটারদের প্রতি ১০০ জনে ৬২ জনই। ফলে এই গণভোটে যেসব এজেন্ডায় রাষ্ট্রের যেসব সংস্কার আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তাতে একমত হননি ৬২ শতাংশ ভোটার।
কথা হলো, এত বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি গণভোটে তোলা সংস্কার প্রস্তাবের সাথে একমত না থাকে, তবে কি এই গণভোটের ফলকে সম্মতি উৎপানকারী হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত হবে? একদম সাধারণ গাণিতিক হিসাব যদি টানা হয়, তাহলে বলতে হয়, ১০০ জন মানুষের মধ্যে মাত্র ৩৮ জনের হিসাব অনুযায়ী কি ১০০ জনের ভাগ্যের পরিবর্তন করা জায়েজ হয়? এটি কি ওই ৬২ জনের ওপর একটি মতামত চাপিয়ে দেওয়ার মতো হবে না? সেক্ষেত্রে যদি কমসংখ্যক মানুষের পছন্দ বাকি বেশিসংখ্যক মানুষকে জোর করে মেনে নিতেই হয়, তাহলে কি তা একনায়কতান্ত্রিক এবং বৈষম্যমূলক হবে না? অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে বৈষম্যহীন সমাজ করার জন্য!
যদিও এই বৈপরীত্য নিয়ে খুব একটা ভাবছে না অন্তর্বর্তী সরকার বা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। অন্তত তাদের হাবেভাবে তেমনটাই মনে হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে এক সংবাদ বিফ্রিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের বৃহদাংশ আর পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বা স্থিতাবস্থা রাখতে চান না।
আলী রীয়াজ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান ছিলেন। তার কমিশনের কাজ নিয়েই অনেক রাজনৈতিক দলের প্রশ্ন ছিল। এবং কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক দল জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে যেসব আপত্তি উঠিয়েছিল, সেগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার অভিযোগও আছে জোরেশোরে। এখন আলী রীয়াজ যেভাবে ৩৮ শতাংশ ভোটারের দেওয়া ‘হ্যাঁ’ ভোটকে ‘সংস্কারের পক্ষে রায়’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এবং ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের বৃহদাংশ আর পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায় না’ বলে মন্তব্য করছেন, সেটি কি গণিত ও পরিসংখ্যানের স্বাভাবিক সূত্রেও সঠিক? অন্তত ন্যূনতম গাণিতিক শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তির এতে ‘বেঠিক’ বলাই উচিত হয়তো। তবে আমাদের দেশের বিশিষ্ট থেকে অবিশিষ্ট–সব ধরনের মানুষের মধ্যেই তো আবার ‘যুক্তিতে মুক্তি মেলে না’ বলে চিৎকার করে ওঠার হার বেশি!
তো, এমন এক পরিস্থিতিতেই এই বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সংস্কার আনার চেষ্টা হচ্ছে। রাষ্ট্রের সংস্কার আনা প্রয়োজন অবশ্যই। তবে এক্ষেত্রে নাগরিকদের ঐকমত্য প্রয়োজন। অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের একমত হওয়া অতীব জরুরি। তাতে তথাকথিত গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটির প্রতিনিধিত্বমূলক সংখ্যাগরিষ্ঠতার অন্ততপক্ষে চর্চা হবে। নইলে এটি হয়ে যাবে সংখ্যালঘিষ্ঠের মতামত সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটি বৈষম্যমূলক, অভিজাততান্ত্রিক ও একেবারে একচেটিয়া প্রক্রিয়া। যেখানে গণমানুষকে উপেক্ষা করেই গণের জন্য কিছু বিধান বানিয়ে বলা হবে–‘এসব মানতে হবে’। একে আর যাই হোক গণতন্ত্রের চর্চা বলা যাবে না আর। বরং এটি হয়ে যাবে রাজতন্ত্রেরই একবিংশ শতকীয় একটি সংস্করণ!
আশা করা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া একটি দেশ স্বাধীনতা লাভের ৫৪ বছর পর আর নতুন করে রাজা-রাণীর শাসনে ফিরবে না। এই দেশের যেকোনো করদাতা নাগরিক এতটুকু চাইলে কি খুব অপরাধ হবে?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অন্য ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়েছে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের উদ্দেশে। আবার একইসাথে জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রস্তাব আনা মেনে নেওয়ার ইস্যুতে জনমত যাচাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভোট।
এই গণভোট নিয়ে শুরু থেকেই নানা ধরনের বিতর্ক জারি ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জুলাই সনদের সব ধারা নিয়ে বা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সব প্রস্তাব নিয়ে একমত হতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামী যেমন এতে মোটামুটি রাজিই ছিল। বিএনপি আবার সংস্কারের অনেক প্রস্তাবেও একমত হয়নি। আর বাম ও ডানপন্থী নানা দলের মধ্যেও কেউ রাজি ছিল, কেউ কিছু কিছু প্রস্তাবে রাজি ছিল, আবার কোনো কোনো দল পুরো প্রস্তাবই প্রত্যাখান করেছিল।
ফলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য আদতে হয়নি। সবই আছে নানা ভাগে বিভক্ত অবস্থায়। এমন পরিস্থিতিতে দাবি উঠেছিল যে, রাষ্ট্রীয় সংস্কার বিষয়ে গণভোট যেন সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পরে কোনো সময় নেওয়া হয়। যুক্তি ছিল যে, গণভোট আসলে একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে হওয়া উচিত। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সেই দাবি মেনে নেয়নি। উল্টো গণভোটে যেন ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়, তার প্রচারেও নেমে পড়ে। এ নিয়ে সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞরা নানামাত্রিক সমালোচনাও করেছিলেন এবং এখনও করছেন। ফলে গণভোট নিয়ে বিতর্ক আছে ভালোমতোই।
কারণ, গণভোটে প্রায় ৮৪-এর কাছাকাছি বিষয়ে একমত বা দ্বিমত থাকার বিষয়টি জনতাকে জানাতে হয়েছে একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে। মানে একজন ভোটারকে হয় সবকিছুতে একমত হতেই হয়েছে, নইলে সবকিছুতেই দ্বিমত হতে হয়েছে। আবার গণভোটে অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালিয়েছে কেবল এবং ‘না’ ভোট দেওয়াকে একটা ‘জাতীয় লজ্জা’র পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এক ধরনের ‘ভালো’ পক্ষ বা ‘খারাপ’ পক্ষ যেন তৈরি করা হয়েছে। ফলে এক ধরনের পক্ষপাতমূলক সরকারি আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। গণভোটকে বিতর্কিত রূপ দিতে এসব বিষয়ই যথেষ্ট।
এই বিষয়গুলো বিতর্ক তৈরি করেছে গণভোটের আগে। আবার ভোটের পরও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। চরচা’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফা গণভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, গণভোটের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পাশে আবার টিক চিহ্ন দেওয়া ছিল। আর ‘না’ ভোটের পাশে ছিল ক্রস চিহ্ন। সাবির মুস্তাফার মতে, এভাবে আসলে ভোটারদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে সরকারিভাবে। কারণ, প্রতীকেরও ভাষা আছে। সেই হিসাবে টিক চিহ্ন এক ধরনের ইতিবাচক ও সঠিক মনোভাব প্রকাশ করে। আর ক্রস চিহ্ন প্রকাশ করে নেতিবাচক ও বেঠিক মনোভাব। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ভোটাররা মনে করতেই পারেন যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়াটাই হয়তো সঠিক, ‘না’ দিলে বেঠিক হয়ে যেতে পারে! বিবিসি বাংলার এই সাবেক প্রধান মনে করেন, এটি এক ধরনের জালিয়াতি।
গণভোট নিয়ে সাধারণের মধ্যেও নানা বিভ্রান্তি ছিল এবং এখনো আছে। এমনকি ভোটের দিনও ছিল এই বিভ্রান্তি। সরেজমিনে চরচা’র প্রতিবেদকেরা দেখেছেন, খোদ রাজধানীতেই অনেক স্বল্প শিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর ভোটারেরা প্রায় সবাই গণভোটে সিল দিয়েছেন না বুঝে কিংবা অন্যের কথায়। শিক্ষিত তরুণসহ বিভিন্ন বয়সী ভোটারদের অনুযোগ ছিল, চার প্রশ্নের বিপরীতে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তরের ব্যবস্থা রাখা নিয়ে।
এমন একটি অবস্থার মধ্যেই যে গণভোট হয়েছে, তার ফল নিয়েও উত্থান-পতন দেখা গেছে। যেমন, গত শুক্রবার যখন নির্বাচন কমিশন প্রাথমিকভাবে গণভোটের ‘হ্যাঁ-না’-এর হিসাব জানাল, তখন জানা গেল ‘হ্যাঁ’ পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯। আর ‘না’ পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭। এখন গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ পড়েছে আসলে ৪ কোটি ৮২ লাখের বেশি। আর ‘না’ পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬। অর্থাৎ, এক ধরনের কম-বেশি হিসাব নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যেই বিদ্যমান। ইসি বলতেই পারে যে, বেসরকারি ফলে একটু কম-বেশি হতেই পারে। তা হতে পারে। কিন্তু তাই বলে ৫ লাখ বা ২ লাখের কম-বেশি, আসলে একটু বেশি বেশিই!

এবার আসা যাক আসল প্রশ্নে। এ দেশের কত মানুষ আসলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিয়েছে?
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে (২৯৯ আসনে) মোট ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৫২২ জন ভোটার ভোট দেওয়ার যোগ্য। এর মধ্যে ৬ কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার ৭৭ জন পুরুষ, ৬ কোটি ২৬ লাখ ৭৭ হাজার ২৩২ জন নারী এবং এক হাজার ২১৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার। ৩০০ আসনে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯।
নির্বাচন কমিশন যে গেজেট প্রকাশ করেছে, তাতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী কাস্ট হওয়া বৈধ ভোটের ৬৮ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ ভোট। দেওয়া ভোটের হিসাবে তাই অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টিকে যদি সামগ্রিক ভোটারের হিসাবে দেখা হয়, তাহলে উঠে আসে আরেক বাস্তবতা। কারণ, সারা দেশে ভোট পড়েছে ৬০ শতাংশের মতো, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ যোগ্য ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকেই বিরত ছিলেন। একে অনিচ্ছা বা অনাগ্রহ হিসেবে ধরাই যায়। কারণ, ইচ্ছা বা আগ্রহ থাকলে তারা তো ভোটই দিতেন।
এই হিসাব করতে গেলে দেখা যায়, মোট ভোটারের ৩৭.৮% ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। আর মোট ভোটারের প্রায় ৬২% সরাসরি ‘না’ ভোট দিয়েছে বা ভোট দেওয়া থেকেই বিরত থেকেছে। অর্থাৎ, গণভোটের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে এই দেশের যোগ্য ভোটারদের প্রতি ১০০ জনে ৬২ জনই। ফলে এই গণভোটে যেসব এজেন্ডায় রাষ্ট্রের যেসব সংস্কার আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তাতে একমত হননি ৬২ শতাংশ ভোটার।
কথা হলো, এত বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি গণভোটে তোলা সংস্কার প্রস্তাবের সাথে একমত না থাকে, তবে কি এই গণভোটের ফলকে সম্মতি উৎপানকারী হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত হবে? একদম সাধারণ গাণিতিক হিসাব যদি টানা হয়, তাহলে বলতে হয়, ১০০ জন মানুষের মধ্যে মাত্র ৩৮ জনের হিসাব অনুযায়ী কি ১০০ জনের ভাগ্যের পরিবর্তন করা জায়েজ হয়? এটি কি ওই ৬২ জনের ওপর একটি মতামত চাপিয়ে দেওয়ার মতো হবে না? সেক্ষেত্রে যদি কমসংখ্যক মানুষের পছন্দ বাকি বেশিসংখ্যক মানুষকে জোর করে মেনে নিতেই হয়, তাহলে কি তা একনায়কতান্ত্রিক এবং বৈষম্যমূলক হবে না? অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে বৈষম্যহীন সমাজ করার জন্য!
যদিও এই বৈপরীত্য নিয়ে খুব একটা ভাবছে না অন্তর্বর্তী সরকার বা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। অন্তত তাদের হাবেভাবে তেমনটাই মনে হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে এক সংবাদ বিফ্রিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের বৃহদাংশ আর পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বা স্থিতাবস্থা রাখতে চান না।
আলী রীয়াজ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান ছিলেন। তার কমিশনের কাজ নিয়েই অনেক রাজনৈতিক দলের প্রশ্ন ছিল। এবং কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক দল জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে যেসব আপত্তি উঠিয়েছিল, সেগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার অভিযোগও আছে জোরেশোরে। এখন আলী রীয়াজ যেভাবে ৩৮ শতাংশ ভোটারের দেওয়া ‘হ্যাঁ’ ভোটকে ‘সংস্কারের পক্ষে রায়’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এবং ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের বৃহদাংশ আর পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায় না’ বলে মন্তব্য করছেন, সেটি কি গণিত ও পরিসংখ্যানের স্বাভাবিক সূত্রেও সঠিক? অন্তত ন্যূনতম গাণিতিক শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তির এতে ‘বেঠিক’ বলাই উচিত হয়তো। তবে আমাদের দেশের বিশিষ্ট থেকে অবিশিষ্ট–সব ধরনের মানুষের মধ্যেই তো আবার ‘যুক্তিতে মুক্তি মেলে না’ বলে চিৎকার করে ওঠার হার বেশি!
তো, এমন এক পরিস্থিতিতেই এই বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সংস্কার আনার চেষ্টা হচ্ছে। রাষ্ট্রের সংস্কার আনা প্রয়োজন অবশ্যই। তবে এক্ষেত্রে নাগরিকদের ঐকমত্য প্রয়োজন। অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের একমত হওয়া অতীব জরুরি। তাতে তথাকথিত গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটির প্রতিনিধিত্বমূলক সংখ্যাগরিষ্ঠতার অন্ততপক্ষে চর্চা হবে। নইলে এটি হয়ে যাবে সংখ্যালঘিষ্ঠের মতামত সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটি বৈষম্যমূলক, অভিজাততান্ত্রিক ও একেবারে একচেটিয়া প্রক্রিয়া। যেখানে গণমানুষকে উপেক্ষা করেই গণের জন্য কিছু বিধান বানিয়ে বলা হবে–‘এসব মানতে হবে’। একে আর যাই হোক গণতন্ত্রের চর্চা বলা যাবে না আর। বরং এটি হয়ে যাবে রাজতন্ত্রেরই একবিংশ শতকীয় একটি সংস্করণ!
আশা করা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া একটি দেশ স্বাধীনতা লাভের ৫৪ বছর পর আর নতুন করে রাজা-রাণীর শাসনে ফিরবে না। এই দেশের যেকোনো করদাতা নাগরিক এতটুকু চাইলে কি খুব অপরাধ হবে?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট