Advertisement Banner

ট্রাম্প এমন যুদ্ধ শুরু করেছেন যা তার নিয়ন্ত্রণে নেই

জন হাল্টিওয়াঙ্গার
জন হাল্টিওয়াঙ্গার
ট্রাম্প এমন যুদ্ধ শুরু করেছেন যা তার নিয়ন্ত্রণে নেই
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চাইলেও ইরান, ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কয়েক মাস ধরে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ব্যর্থ চেষ্টার পরও ট্রাম্প নিজেকে পরিস্থিতির মূল চালক হিসেবে দাবি করে আসছেন। তবে বাস্তবে তিনি এখন এই ইরান যুদ্ধের একজন নিষ্ক্রিয় যাত্রী মাত্র। মাঠপর্যায়ের এই জটিল বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নিজেকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখানোর যে মরিয়া চেষ্টা ট্রাম্প করছেন, তা মূলত একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর পথকে আরও বেশি কঠিন করে তুলেছে।

যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে ট্রাম্পের এই সীমিত ক্ষমতার বিষয়টি গত রাতেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে, যখন গত এপ্রিলের শুরুতে হওয়া একটি যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম ইসরায়েল এবং ইরান সরাসরি একে অপরের ওপর হামলা চালায়। গত রোববার বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার ঘটনায় ট্রাম্প প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তিনি এতে মোটেও খুশি নন। কিন্তু তার এই আপত্তির পরপরই ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে এক ঝাঁক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাঝ আকাশেই প্রতিহত করা হয় এবং এতে কোনো অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে এই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ট্রাম্প এমন ভাব দেখান যেন পরিস্থিতি পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাল্টা আঘাত না হানার জন্য অনুরোধ করবেন। ট্রাম্প ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-কে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনিই সব সিদ্ধান্ত নেন, সব সিদ্ধান্ত তার কথা মতোই হয় এবং নেতানিয়াহু এখানে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক নন।

কিন্তু ট্রাম্পের এই দাবিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন যে, ইরান ইসরায়েলে ১১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। পৃথিবীর কোনো আত্মমর্যাদাশীল দেশ নিজের ওপর এমন আক্রমণ বরদাশত করবে না এবং ইসরায়েলও তা করবে না। আর এই কারণেই ইসরায়েলি বাহিনী এখন ইরানের ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এই ঘটনার পর গত সোমবার ট্রাম্প দুই পক্ষকেই অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতিতে আসার আহ্বান জানান এবং আপাতত দুই পক্ষ একে অপরের দিকে হামলা চালানো বন্ধ রেখেছে।

তবে ইরান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, দক্ষিণ লেবাননসহ অন্যান্য অঞ্চলে যদি এই ধরনের আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তবে তারা আরও মারাত্মক এবং বিধ্বংসী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যদিকে ইসরায়েলও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের এই লড়াই অব্যাহত থাকবে। ট্রাম্প যেহেতু যেকোনো মূল্যে একটি শান্তি চুক্তি করতে চান এবং পুনরায় একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে মরিয়া, তাই ইরান খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে তারা এই পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে। তেহরান এখন হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে শান্তি আলোচনার টেবিলে নিজেদের পক্ষে বাড়তি সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইসরায়েলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশিওনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর রিসার্চ ফেলো ওফার শেলাহ্ এই অঞ্চলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেছেন যে, তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, যার অর্থ হলো লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর যেকোনো ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ চালাবে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই অত্যন্ত জটিল এবং এক সুতোয় গাঁথা পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ট্রাম্প আগামী দিনগুলোতে যে মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হবেন, এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলি নেতাদের ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব আসলে খুবই সীমিত। হোয়াইট হাউস অবশ্য লেবানন সংঘাতের বিষয়ে তাদের বিবৃতিতে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে ক্রমাগত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই পুরো পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তিনি ইরান যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নেওয়ার একটি পথ খুঁজছেন।

এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইতিমধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার গ্রাফ একবারে নিচে নামিয়ে দিয়েছে এবং এর ফলে আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন লেবানন সংকটকে ইরান যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে ইরান এই শান্তি চুক্তিকে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করার শর্তের সাথে জুড়ে দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মঙ্গলবার সিনেটরদের সামনে এই জটিলতা স্বীকার করে বলেছেন যে, আমেরিকা লেবানন-ইসরায়েল আলোচনাকে ইরানের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং ভিন্ন বিষয় হিসেবে দেখতে চাইছে, কিন্তু ইরান যা করতে চাচ্ছে তা হলো এই সবগুলোকে একসাথে গুলিয়ে ফেলা।

লেবাননে ইসরায়েল তাদের সামরিক তৎপরতা ক্রমেই বাড়িয়ে চলায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড চটেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জানা গেছে যে, লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক একটি ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাকে গালিগালাজ করেন এবং তাকে একজন ‘অকৃতজ্ঞ’ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু নেতানিয়াহুর সামনে তার নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির যে সমীকরণ রয়েছে, তা তাকে বিবেচনা করতে হচ্ছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছেন। যেখানে তার নিজের দেশের জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তার পারদ এখন একবারে তলানিতে এবং সামনেই একটি জাতীয় নির্বাচন কড়া নাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এবং ওয়াশিংটনের তরফ থেকে যুদ্ধ থামানোর সব অনুরোধ উপেক্ষা করার জন্য নেতানিয়াহুর ওপর তার দেশের ভেতর থেকে প্রচণ্ড চাপ রয়েছে।

বিশেষ করে উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দারা, যারা দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার মূল শিকার হয়েছেন, তারা নেতানিয়াহুর ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও জোরাল পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। এই মনোভাব কেবল উত্তর ইসরায়েলের মানুষের নয়, বরং পুরো ইসরায়েল জুড়েই এটি একটি সাধারণ জনমত। মে মাসের শেষের দিকে আইএনএসএস প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে যে, ৫৯ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক মনে করেন যে ইসরায়েলের উচিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই আরও তীব্র করা।

ইরানের সাথে একটি শান্তি চুক্তি যাতে ভেস্তে না যায়, সেজন্য ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে লেবানন আক্রমণ থেকে পিছিয়ে আসার জন্য যে চাপ দিচ্ছেন, তা মূলত তেহরানের এই দাবিকেই আরও শক্তিশালী করছে যে এই দুটি বিষয় আসলে একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এবং বাস্তব সত্য এটাই যে, লেবানন সংঘাত এবং ইরান যুদ্ধকে কোনোভাবেই আলাদা করা সম্ভব নয়, কারণ এগুলো একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে বছরের পর বছর ধরে মাঝেমধ্যেই লড়াই হয়েছে। তবে তাদের সংঘাতের এই বর্তমান রূপটি শুরু হয়েছে মূলত ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে।

ইরান যুদ্ধের যুদ্ধবিরতির শুরুর দিনগুলো থেকেই এটা স্পষ্ট ছিল যে লেবানন ট্রাম্পের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে এবং একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির পথে প্রধান অন্তরায় হবে। আমেরিকা এবং ইসরায়েল শুরুতে লেবাননকে এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর চুক্তিটি প্রায় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল এবং লেবানন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, কিন্তু সীমান্ত পরিস্থিতি এখনো চরম উত্তেজনাপূর্ণ এবং হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রতিনিয়ত গোলাগুলি চলছেই।

হিজবুল্লাহ, যারা লেবাননে একটি রাজনৈতিক দল এবং একই সাথে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বিশাল প্রভাব বিস্তার করে আছে, তারা তাদের অস্ত্র সমর্পণ করার সমস্ত আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীকে হিজবুল্লাহর হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অক্ষম হিসেবে দেখা হয়। আর এই বিষয়টিকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সার্বিক উপস্থিতি এবং তাদের ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রধান যৌক্তিকতা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

এই বিষয়ে গবেষক ওফার শেলাহ্ বলেছেন, নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েল এখন খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এই যুদ্ধের সামরিক বা কৌশলগত কোনো গুরুত্ব নেই। তিনি শুধু চান যুদ্ধটা যেকোনো উপায়ে শেষ হোক। ট্রাম্পের কাছে এখন একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানিদের সাথে যেকোনো ধরনের একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যা দেখিয়ে তিনি নিজেকে বিজয়ী দাবি করতে পারবেন এবং ঘোষণা করতে পারবেন যে যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

ওফার শেলাহ্ আরও উল্লেখ করেন যে, গত জানুয়ারি মাসে একটি সফল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর ট্রাম্প ভেবেছিলেন ইরানের ক্ষেত্রেও হয়তো তিনি এমন একটি ‘সহজ জয়’ পেয়ে যাবেন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে সেই ‘মাদুরো পরিস্থিতি’ আর তৈরি হয়নি, যার ফলে ট্রাম্প এখন এই যুদ্ধের ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এবং দ্রুত এখান থেকে পিঠটান দিতে চাইছেন। তবে গোটা ঘটনা আমেরিকার পূর্ববর্তী একাধিক প্রেসিডেন্টের সেই পুরোনো অভিজ্ঞতার কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো একবার শুরু হলে তা এক অন্তহীন জলাভূমি বা ‘কোয়াগমায়ার’-এ রূপ নেয়, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ রাস্তা থাকে না।

লেখক: ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রভাশালী মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির স্টাফ রাইটার।

(লেখাটি ফরেন পলিসির সৌজন্যে)

সম্পর্কিত