Advertisement Banner

স্বাস্থ্যসেবার মেরুদণ্ড ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে?

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
স্বাস্থ্যসেবার মেরুদণ্ড ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে?
এআই দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পেশা। একজন রোগীর চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্সরাই সর্বাধিক সময় সেবা প্রদান করেন। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের নার্সিং শিক্ষা খাত বর্তমানে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার অভাবে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, গত এক দশকে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কার্যকর তদারকির অভাবে দেশে পাঁচ শতাধিকেরও বেশি বেসরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং মানসম্পন্ন শিক্ষার ন্যূনতম শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠান, বাস্তবে সার্টিফিকেট উৎপাদনের কারখানা

স্বাস্থ্যখাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অনেক নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট কার্যত ‘সার্টিফিকেট উৎপাদন কেন্দ্র’-এ পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ ছাড়াই ডিগ্রি অর্জন করছে। কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কোথাও নেই আধুনিক দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী সনদ নিয়ে বের হলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তাদের দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২৫ থেকে ২৬ হাজার নার্স ও মিডওয়াইফ নিবন্ধিত হচ্ছেন। কিন্তু শ্রমবাজারের চাহিদা, সরকারি নিয়োগ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে এই উৎপাদনের কোনো সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রতি বছর নতুন করে যুক্ত হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার নার্স ও মিডওয়াইফ।

বেকারত্বের বোঝা বহন করছে তরুণ প্রজন্ম!

নার্সিং শিক্ষা গ্রহণের জন্য অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বল পর্যন্ত ব্যয় করে। শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখে একটি সম্মানজনক পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। কিন্তু কোর্স শেষ করার পর তাদের অধিকাংশই চাকরির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিয়োগ সীমিত, আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অস্বাভাবিক কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য করা হয় নার্সদের। অনেক ক্ষেত্রে মাসিক বেতন এমন পর্যায়ে থাকে যা একজন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর জীবনধারণের জন্যও যথেষ্ট নয়।

ফলে দেখা যাচ্ছে, একদিকে দেশে দক্ষ নার্সের ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে হাজার হাজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বেকার জীবনযাপন করছেন। এটি নিঃসন্দেহে পরিকল্পনাহীন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি বড় উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে?

বিশ্বব্যাপী বর্তমানে নার্সদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বহু দেশে দক্ষ নার্সের সংকট বিদ্যমান।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের নার্সরা সেই সুযোগ কতটুকু কাজে লাগাতে পারছেন?

সংশ্লিষ্টদের মতে, এর প্রধান কারণ দুটি-

প্রথমত: আন্তর্জাতিক মানের ক্লিনিক্যাল দক্ষতার অভাব।

দ্বিতীয়ত: ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষায় দুর্বলতা।

অনেক শিক্ষার্থী তিন বা চার বছরের কোর্স সম্পন্ন করলেও আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ভাষাগত ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন।

কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স কোথায়?

একটি শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো গুণগত মান নিশ্চিতকরণ। কিন্তু নার্সিং শিক্ষা খাতে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত একাডেমিক অডিট নেই, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের মান যাচাই নেই, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত মানা হয় না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনের শর্তাবলিও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না।

ফলে শিক্ষার মান নিম্নমুখী হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে অপর্যাপ্ত দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ।

স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার, কিন্তু নার্সিং খাতে নীরবতা?

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের নানা আলোচনা হচ্ছে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা শিক্ষা, ওষুধনীতি, স্বাস্থ্যবীমা-সবকিছু নিয়েই সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার সম্মুখসারির যোদ্ধা নার্স ও মিডওয়াইফদের পেশাগত উন্নয়ন, কর্মপরিবেশ, বেতন কাঠামো এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ খুবই সীমিত।

এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ একজন দক্ষ নার্স ছাড়া আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না।

করণীয় কী

বিশেষজ্ঞদের মতে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি-

দেশের সব নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একাডেমিক অডিট ও সঠিক পরিসংখ্যান বের করা।

  • মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা পুনর্গঠন।
  • আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিকুলাম বাস্তবায়ন।
  • ইংরেজি ও বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
  • সরকারি ও বেসরকারি খাতে পরিকল্পিত নিয়োগ বৃদ্ধি।
  • বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি কর্মসূচি চালু।
  • নার্সিং শিক্ষা ও সার্ভিস এর জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা।
  • বেতন ও কর্মপরিবেশের ন্যূনতম মান নির্ধারণ।

নার্সিং পেশা কোনো সাধারণ পেশা নয়; এটি মানবসেবার এক মহৎ দায়িত্ব। অথচ পরিকল্পনাহীন সম্প্রসারণ, দুর্বল তদারকি, মানহীন শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের অভাবে আজ এই গুরুত্বপূর্ণ খাত গভীর সংকটে নিমজ্জিত। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এর মূল্য শুধু নার্সরাই নয়, সমগ্র দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই চুকাতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে টেকসই ও জনবান্ধব করতে হলে নার্সিং শিক্ষা ও নার্সিং সেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পুনর্গঠন করা সময়ের দাবি। কারণ হাসপাতালের শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে একজন রোগীর সবচেয়ে কাছের মানুষটি চিকিৎসক নন, একজন নার্স। আর সেই নার্স যদি দক্ষ না হন, তবে স্বাস্থ্যসেবার সকল উন্নয়নই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

লেখক: নার্সিং শিক্ষাবিদ ও সাবেক অধ্যক্ষ রুফাইদা কলেজ অব নার্সিং, মোহাম্মদপুর ঢাকা।

সম্পর্কিত