সিরিয়া থেকে ভেনেজুয়েলা: মিত্রদের রক্ষায় রাশিয়া কতটুকু সফল?

আলেকজান্ডার গাবুয়েভ ও সের্গেই ভ্যাকুলেঙ্কো
আলেকজান্ডার গাবুয়েভ ও সের্গেই ভ্যাকুলেঙ্কো
সিরিয়া থেকে ভেনেজুয়েলা: মিত্রদের রক্ষায় রাশিয়া কতটুকু সফল?
নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য চালানো মার্কিন হামলায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন। ছবি: রয়টার্স

গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় এক ঝটিকা অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী। মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করতে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। হোয়াইট হাউস যখন এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে, তখন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক লিখিত বিবৃতিতে জানায়, ‘‘আজ সকালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়েছে। এই ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাই এবং একটি সার্বভৌম দেশের বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীর মুক্তি দাবি করছি।’’

বিবৃতি দিলেও বাস্তবে মস্কো মাদুরো সরকারকে রক্ষায় কিছুই করেনি। অথচ লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা ছিল রাশিয়ার অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার। মাত্র সাত মাস আগে, ২০২৫ সালের মে মাসে, মাদুরো ও পুতিন ক্রেমলিনে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, যেখানে সামরিক সম্পর্ক জোরদার ও বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার ছিল। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র যখন অভিযান চালায়, মস্কো মাদুরোকে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি কিংবা তাকে সুরক্ষাও দেয়নি; বরং নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।

ভেনেজুয়েলায় ক্রেমলিনের এই অক্ষমতা নতুন কিছু নয়। বিগত চার বছর ধরে ইউক্রেনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় রাশিয়ার সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও কৌশলগত ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন এবং গত বছর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার সময়ও রাশিয়া কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দামেস্ক ও তেহরানের জন্য মস্কো যেটুকু করেছিল, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে তাও দেখা যায়নি।

ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় আমেরিকা। ছবি: রয়টার্স
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় আমেরিকা। ছবি: রয়টার্স

মাদুরোর পতন পুতিনের জন্য বিশেষভাবে অপমানজনক। যদিও ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে ছিল, তবুও মস্কো দাবি করত যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিপরীতে এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বিকল্প বলয় গড়ে তুলেছে। মাদুরোর উৎখাত প্রমাণ করেছে যে মিয়ানমার থেকে নিকারাগুয়া—বিশ্বের স্বৈরাচারী শাসকদের কাছে রাশিয়ার দেওয়া নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি আসলে ‘ফাঁপা বুলি’ ছিল।

কাগুজে বাঘ

রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের বয়স প্রায় ২৫ বছর। ২০০০ সালে পুতিন ও হুগো শাভেজের সাক্ষাতের মাধ্যমে এর শুরু। শুরুর এক দশক এই সম্পর্ক ছিল মূলত লেনদেনভিত্তিক। শাভেজ তেল বিক্রির অর্থ দিয়ে রুশ অস্ত্র কিনতেন। ২০০৮ সালে জর্জিয়ার যুদ্ধের পর এই সম্পর্ক একটি আদর্শিক রূপ নেয়। মস্কো চেয়েছিল তাদের মিত্ররা আবখাজিয়া ও দক্ষিণ ওসেতিয়াকে স্বীকৃতি দিক; নিকারাগুয়ার পর ২০০৯ সালে ভেনেজুয়েলা এই স্বীকৃতি দিলে ক্রেমলিন কারাকাসকে ২.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও তেল খাতে বড় বিনিয়োগের সুযোগ দেয়।

২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরোর শাসনামলে ভেনেজুয়েলা রাশিয়ার জন্য ভূ-রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি আদর্শিক প্রকল্পে পরিণত হয়। পুতিন তাঁর সোভিয়েত পূর্বসূরিদের মতোই ক্রমবর্ধমান ব্যয় সত্ত্বেও মিত্রদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। রুশ রাষ্ট্রীয় কোম্পানি 'রসনেফট' ভেনেজুয়েলার তেল কোম্পানিকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অগ্রিম ঋণ দেয়, যা আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। মস্কো কারাকাসকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করেছে এবং ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধা পাঠিয়ে মাদুরোর ক্ষমতা রক্ষা করার চেষ্টা করেছে।

তবে ২০১৯ সালেই তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে রাশিয়া ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন থেকে সরে গেলে তারা ভেনেজুয়েলা ত্যাগ করতে প্রস্তুত। অর্থাৎ, মস্কোর কাছে মিত্রদের গুরুত্ব ছিল দাবার ঘুঁটির মতো। এছাড়া সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযানের বিষয়ে রাশিয়া মাদুরোকে কোনো সঠিক গোয়েন্দা তথ্য দিতে পারেনি এবং তাদের সরবরাহ করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অকেজো প্রমাণিত হয়েছে।

অসমাপ্ত পরিকল্পনা

গত ২০ বছরে রাশিয়া প্রমাণ করেছে যে তারা বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কিন্তু তাতে রাশিয়ার প্রকৃত নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসেনি। ভেনেজুয়েলার মতো দেশে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা ছিল মূলত পুতিনের ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের অর্থ উপার্জনের সুযোগ।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

ক্রেমলিনের এই সুযোগসন্ধানী নীতি দীর্ঘমেয়াদী কোনো ফল বয়ে আনে না। তারা কেবল স্বৈরশাসকদের টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে পারে না। সিরিয়ায় তারা আসাদকে সামরিক সাহায্য দিলেও অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ধস ঠেকাতে পারেনি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভকে গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তা দিয়ে পুতিনের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে, যা দুই পরাশক্তির সক্ষমতার ফারাক স্পষ্ট করে।

ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম, অর্থ ও মনোযোগের বড় অংশ শুষে নেওয়ায় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মস্কোর প্রভাব এখন ক্ষয়িষ্ণু। যদিও তারা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র বা তাজিকিস্তানের মতো ছোট অঞ্চলে প্রভাব রাখতে পারে, বড় মঞ্চে তারা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়।

তবুও ওয়াশিংটনকে সতর্ক থাকতে হবে। পশ্চিমা প্রভাব যেখানে দুর্বল থাকে, রাশিয়া সেখানে শূন্যতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। যেমনটি তারা সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পরেও করছে। একইভাবে ভেনেজুয়েলায় যদি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, রাশিয়া সেই সুযোগ নিতে ওত পেতে থাকবে। তারা চেষ্টা করবে ভেনেজুয়েলাকেও আফগানিস্তান বা লিবিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের একটি 'ব্যর্থ হস্তক্ষেপ' হিসেবে প্রচার করতে। শেষ পর্যন্ত, নিজেদের সক্ষমতার অভাব ঢাকতে রাশিয়া হয়তো আবারও তার পুরনো 'বিঘ্নসৃষ্টিকারী' (Spoiler) পরিচয়েই ফিরে যাবে।

লেখক: আলেকজান্ডার গাবুয়েভ, পরিচালক, কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার, বার্লিন

সের্গেই ভ্যাকুলেঙ্কো, সিনিয়র ফেলো, কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার, বার্লিন

(ফরেন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত)

সম্পর্কিত