Advertisement Banner

সিদ্ধান্তের আগেই রাজধানীর বাসে বাড়তি ভাড়া, ক্ষোভ যাত্রীদের

সিদ্ধান্তের আগেই রাজধানীর বাসে বাড়তি ভাড়া, ক্ষোভ যাত্রীদের
ডিজেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়তি ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের সাথে বাগবিতণ্ডা হচ্ছে কন্ডাক্টরদের। ছবি: চরচা

দেশে ডিজেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীর ভেতরে চলাচল করা বাসগুলোতে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার হচ্ছে। সরকারিভাবে বাস ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও রাজধানীর বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বাসের কর্মীদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। পেট্রোল, অকটেনের দাম বাড়ায় অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং-এর চালকরাও চুক্তিতে ছাড়া যাত্রী পরিবহন করতে চাইছেন না।

আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বাসচালক, সহকারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

গত শনিবার রাতে সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য ঘোষণা করে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রোববার থেকে নতুন দামে তেল বিক্রি শুরু হয়।

রাজধানীতে চলাচল করা বাসগুলোর সিংহভাগই ডিজেলচালিত।

সাভার থেকে গাবতলী হয়ে নতুন বাজার রুটে চলাচল করে বৈশাখী পরিবহন। নতুন বাজার থেকে সাভার পর্যন্ত আগে ভাড়া ছিল ৬০ টাকা। সোমবার থেকে এই ভাড়া সেখানে ৯০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এই বাসের নতুন বাজার থেকে গাবতলি পর্যন্ত নিয়মিত যাত্রী সোহেল চরচাকে বলেন, “এই রুটে আগে ৪০ টাকা ভাড়া ছিল। আজকে আমার কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়েছে। এ নিয়ে অনেক যাত্রীর সঙ্গে চালকের সহকারীদের তর্কাতর্কি হয়েছে।”

গাবতলী থেকে ফার্মগেট হয়ে যাত্রাবাড়ি রুটে চলাচলকারী গাবতলী-৮ নম্বর বাসে আগে ৩০ টাকা ভাড়া থাকলেও এখন যাত্রীদের কাছ থেকে ৪০ থেকে ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

যা স্বীকারও বাসের কন্ডাক্টর মো. রুবেল বলেন, “আমরা ভাড়া তেমন বাড়াইনি। কেউ দিতে না চাইলে জোর করছি না। তেলের দাম বেড়েছে, আমাদেরও চালাতে কষ্ট হচ্ছে।”

তবে যাত্রী আফজাল বলেন, “আমি প্রেসক্লাব থেকে যাত্রাবাড়ী যাচ্ছি। আগে এখান থেকে ১০ টাকা ভাড়া নিত, আজ ২০ টাকা নিয়েছে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই দ্বিগুণ ভাড়া নেওয়া ঠিক না।”

বিকল্প পরিবহনের মিরপুর-১২ থেকে গুলিস্তান রুটের বাসে আগে ৩০ টাকা ভাড়া নিত। এখন সেখানে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

মিরপুর-১২ থেকে কারওয়ান বাজারের যাত্রী ফরিদা পারভীন বলেন, “আগে ২০ টাকা ভাড়া ছিল। আজ আমার কাছ থেকে ৩০ টাকা রাখা হয়েছে। প্রতিবাদ করেছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।”

চালক ও সহকারীরা বলছেন, লিটারপ্রতি তেলের দাম ২০ টাকা বেড়েছে। অনেক সময় একদিন তেল পেলে তিন দিন পাওয়া যায় না। ফলে খরচ সামাল দিতে কিছুটা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের ভাড়ায় বাস চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

গাবতলী-যাত্রাবাড়ি রুটে চলাচলকারী ৮ নম্বর বাসের এক চালক মো. কামাল হোসেন বলেন, “তেলের দাম হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেছে। আগে যে পরিমাণ খরচে বাস চালানো যেত, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি লাগছে। আমরা মালিকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট জমা দিয়ে গাড়ি চালাই। আয় কমে গেলে নিজের পকেট থেকেই ঘাটতি দিতে হয়। তাই কিছুটা ভাড়া সমন্বয় না করলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়।”

পেট্রোল, অকটেনের দাম বাড়ায় অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং-এর চালকরাও চুক্তিতে ছাড়া যাত্রী পরিবহন করতে চাইছে না। ছবি: চরচা
পেট্রোল, অকটেনের দাম বাড়ায় অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং-এর চালকরাও চুক্তিতে ছাড়া যাত্রী পরিবহন করতে চাইছে না। ছবি: চরচা

মিরপুর-গুলিস্তান রুটের বিকল্প বাসের চালক আব্দুল মালেক বলেন, “শুধু তেলের দাম না, যন্ত্রাংশ আর মেইনটেইনেন্স খরচও বাড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হয়। এতে একদিকে সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে ট্রিপ কমে যায়। যাত্রীদের কষ্ট আমরা বুঝি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।”

জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাসভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে পরিবহন মালিক সমিতি। এ বিষয়ে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে ওই বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়ে সোমবার সিদ্ধান্ত আসার কথা। যদিও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর কথা জানা যায়নি।

অ্যাপ বন্ধ করে ‘কন্ট্রাক্ট’ রাইডে চালকরা

তেলের দাম বাড়ার পর ভাড়া সমন্বয়, কমিশন কমানো এবং ১১ দফা দাবি জানিয়েছে উবার-পাঠাওসহ অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং চালকরা।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে গতকাল রোববার তারা অ্যাপের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০০ টাকা এবং প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ৩৫ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।

তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এখনো ভাড়া সমন্বয়ের ঘোষণা আসেনি। এতে অনেক মোটরসাইকেল চালক অ্যাপভিত্তিক ট্রিপের বদলে সড়কের বিভিন্ন মোড়ে যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি ‘কন্ট্রাক্টে’ ভাড়া ঠিক করে রাইড দিচ্ছেন। সোমবার রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে চালকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

চালকদের দাবি, আগেও তেলের দাম বাড়ার পর অ্যাপে ভাড়া বাড়ানো হয়নি। ফলে কমিশন, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মিলিয়ে অ্যাপভিত্তিক ট্রিপে লাভ কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই বিকল্প হিসেবে সরাসরি চুক্তিভিত্তিক রাইড নিচ্ছেন।

ফার্মগেটে অবস্থানরত মোটরসাইকেল চালক বেলাল হোসেন বলেন, “অফিস টাইমে অ্যাপে ভাড়া কিছুটা বাড়ে, আবার সাধারণ সময়ে কমে যায়। কিন্তু তেলের দাম বাড়লে ভাড়া সেই অনুপাতে বাড়ে না। আগেও এমন হয়েছে। তাই আমার মতো অনেক চালক কন্ট্রাক্টে খ্যাপ মারি—তাতে অন্তত খরচটা ওঠে।”

সজীব নামে আরেক চালক বলেন, “অ্যাপে ট্রিপ নিলে কমিশন কেটে নেওয়ার পর যা থাকে, তাতে তেলের খরচই ঠিকমতো ওঠে না। এখন লিটারপ্রতি দাম বেড়েছে, কিন্তু অ্যাপে কোনো আপডেট নেই। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি কথা বলে ভাড়া ঠিক করি। যাত্রীও অনেক সময় তাড়াহুড়ায় রাজি হয়ে যায়।”

যাত্রীদের একটি অংশ বলছেন, অ্যাপের বাইরে রাইড নিলে ভাড়া নিয়ে স্বচ্ছতা কম থাকে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ে। আবার অ্যাপে কল দিয়েও রাইডার পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে উবার-এর পাবলিক রিলেশন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে পাঠাও-এর পক্ষ থেকেও কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

সম্পর্কিত