ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আন্দোলন ঘিরে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে নতুন করে কথা বলছেন। ওই ব্যাংকটিতে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সরানো নিয়ে গ্রাহকদের আন্দোলনের মধ্যেই দলটির নেতারা ব্যাংকটি নিয়ে কঠোর বক্তব্যও দিচ্ছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাংকটি কি জামায়াতের? দলটির একজন শীর্ষ নেতাকে এই প্রশ্ন করলে জবাব আসে, ওই ব্যাংক তাদের নয়। তবে সেখানে তাদের ‘লোকেরা’ কাজ করে।
ইসলামী ব্যাংকের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে গত ১ জুন মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত গ্রাহকদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ও টিয়ারগ্যাসও ছোড়া হয়। এরপর থেকে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে জামায়াত নেতারা বক্তব্য দিতে থাকেন।
ওই বিক্ষোভের দুই দিন পর ঢাকায় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক ‘দখলের পাঁয়তারা’ হলে নিজেই রাস্তায় নামবেন। তিনিও এই ব্যাংকের মালিক বলে উল্লেখ করেন।
শফিকুর বলেন, ‘‘ওই ব্যাংকের ক্ষতি হলে, আমরা চুপ করে বসে থাকব না। সেখানে তাদের (শেয়ার হোল্ডার) ওপর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে পুলিশ বাহিনীকে। গুলি, টিয়ারশেল, জলকামান। আমি তখন সিলেটে ছিলাম, সেখানে বলেছি, যে আগামী দিন আমিও নামব, ইনশাল্লাহ। একটা শেয়ার থাকলে আমিও এই ব্যাংকের মালিক। আমার এই স্বত্ত্বা নিয়ে কাউকে টানাটানি করার সুযোগ দেব না। সামনে গিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় বলব, গুলি আমার বুকে মার।”
বেসরকারি খাতে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি এক সময় ছিল জামায়াত নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৭ সালে ব্যাংকটি ‘নিয়ন্ত্রণে’ নেয় বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি ‘এস আলম মুক্ত’ হয়। একইসঙ্গে ব্যাংকটিতে পুরনোদের প্রভাব আবারও বাড়তে শুরু করে।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে এস আলম গ্রুপের ‘সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে তাকে সরানোর দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের ভাষ্য ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের দখলে যাওয়ার আগে যারা পর্ষদে ছিলেন, তাদেরকে পরিচালনায় ফেরাতে হবে।
খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন। ওই বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর খুরশীদসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এস আলম গ্রুপ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা ইসলামী ব্যাংকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের নানা ঘটনা ঘটে। বিএনপি সরকারের সময়ে গত ২৪ মে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ব্যাংকটি নিয়ে দলীয় অবস্থান অতীতে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা স্পষ্ট করলেও এখন ব্যাংকটি নিয়ে দলীয় আমিরের বক্তব্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। অতীতেও ব্যাংকটির সঙ্গে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে ব্যাংকটি ‘কুক্ষিগত’ করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন জামায়াত আমির।
ব্যাংকটির সে সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। যা নিয়ে সরকারের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “সবকিছু কুক্ষিগত করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে অভ্যুত্থান করার পরে এখন দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংকে নতুন করে অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে।” এই ‘অপসংস্কৃতি’ চলতে থাকলে জামায়াতে ইসলামী ‘বসে বসে আঙুল চুষবে না’ বলেও হুঁশিয়ার করেন শফিকুর।
গত ৩ জুন জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘এখন ইসলামী ব্যাংকের ডিপজিটার, শেয়ার হোল্ডার সকলে মিলে রাস্তায় নেমেছে। এখন বলা হচ্ছে এগুলো জামায়াতে ইসলামীর মানুষ। আগে যেভাবে বলতো, তেলের লাইনে সব জামায়াতে ইসলামী সবাইকে পাঠায় দিচ্ছে। এবার সেই ভাবে বলে। আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, এরা জামায়াতে ইসলামীর মানুষ। এবং এরা এই দেশের নাগরিক। এরা জামায়াত, আওয়ামী লীগ না বিএনপি, এরা কোনো দল করে না, এটা দেখার বিষয় নয়। তারা এই ব্যাংকের মালিক।”
জামায়াত আমির এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাতে নীলফামারীর সৈয়দপুরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এক পথসভায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ব্যাংকটি নিয়ে বলেছিলেন, “ব্যাংকটি তার মায়ের কোলে ফিরে এসেছে।” তিনি বলেন, ‘‘ইসলামী ব্যাংক দখল করেনি জামায়াতে ইসলামী। নতুন ডাকাতরা ৫ আগস্টের পর ব্যাংক দখল করতে গিয়েছিল। তারা পালিয়ে এসেছে। জামায়াতে ইসলামী ব্যাংক দখল করেনি, বরং এই ব্যাংক তার মায়ের কোলে ফিরে এসেছে।”
২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠকের পর দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পর্ক নেই। গত নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের বিরোধিতা করে তখন জামায়াতের সেক্রেটারি বলেছিলেন, ‘‘বিএনপি ইসলামী ব্যাংকসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নির্বাচনি দায়িত্বে না দেওয়ার কথা বলেছে-এই মন্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জামায়াতের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা নেই।”
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘‘আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কারভাবে স্টেটমেন্ট দিয়েছি। যেসব আর্থিক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে সেগুলোর কোনো মালিকানা বা প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা দায়িত্ব পালন করেন। তাহলে কি তাদের ব্যাংকের তালিকাও প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন?’’
গত ৩০ এপ্রিল দলটির নায়েবে আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের সংসদে বলেন, “জামায়াতে ইসলামীর কোনো ব্যাংক নেই। তিনি বলেন, আমাদের যারা এমপি আছি, ইসলামী ব্যাংকে তাদের কেউ পরিচালক নেই। আমরা কোনো ঋণ পুনঃতফসিলও করিনি।”
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এক মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “ইসলামী ব্যাংক ছিল একদল সৎ ও উদ্যোগী মানুষের প্রচেষ্টার ফসল। যদি বলেন, ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় আমাদের ভূমিকা আছে, তবে আমরা তা স্বীকার করি।”
গত রোববার ইসলামী ব্যাংক নিয়ে মন্তব্য করেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিমও। তিনি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে ব্যাংকটির স্বাভাবিক ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং আন্দোলনরত গ্রাহকদের ন্যায্য দাবিগুলো দ্রুত মেনে নিয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হলে ফ্যাসিবাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে।”
দলীয় ব্যাংক না, তবে…
আবদুল হালিমের কাছে চরচা জানতে চায় ইসলামী ব্যাংক জামায়াতের কি না? জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এটা তো দলীয় ব্যাংক না। ব্যাংক তো সবার। ব্যাংক তো দলের হয় না। আমরা দলের লোকেরা এটাতে আছি। এটা হলো কথা।”
‘দলের লোক আছে’ তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘মীর কাসেম আলী সাহেবকে তো ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই ফাঁসি দিলো। তো? উনি ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। এখন কেউ যদি বলে ইসলামী ব্যাংক জামায়াতের না, ক্যামনে? ব্যাংকে তো লেখা থাকবে না, যে এটা জামায়াতে ইসলামীর ব্যাংক।”
তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘‘এখন অন্যান্য ব্যাংক সেটা আওয়ামী লীগ, বিএনপির মালিক ওইখানে কি আওয়ামী লীগ, বিএনপি লেখা আছে।”
জামায়াতের এই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘‘ব্যাংক তো দলীয় নয়। তবে সেখানে আমাদের লোক থাকতে পারে, এটা হলো কথা।”
জামায়াতের আমিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে এই নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘আমিও তো সেই ব্যাংকের একজন গ্রাহক। এটা নিয়ে প্যাঁচাপেচির কী আছে? আমরা কখনো বলিনি, এটা আমাদের দলীয় ব্যাংক । ব্যাংক কখনো দলীয় হয় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। এগুলি মানুষ বানায়। তবে আমাদের লোকেরা সেখানে কাজ করে।”