Advertisement Banner

এই গরমে দইবড়া কেন খাবেন

ফাহাদ বিন মর্তুজা
ফাহাদ বিন মর্তুজা
এই গরমে দইবড়া কেন খাবেন
চকবাজারের দইবড়া। ছবি: পেক্সেলস

বর্তমানে আধুনিক অনেক খাবারের ভিড়ে দইবড়া কিছুটা আড়ালে চলে গেলেও অনেকের কাছেই এটি পছন্দের খাবার। আগ্রহের ঘাটতির কারণে অন্য সময়ের চেয়ে দইবড়া এখন রমজান মাসে বেশি বিক্রি হতে দেখা যায়।

দইবড়া মূলত তেলে ভাজা ডালের বড়া (সাধারণত মাষকলাইয়ের ডাল) যা চিনি, জিরা, পুদিনা পাতাসহ নানা উপাদান মেশানো টক দইয়ের তরল মিশ্রণে বড়াকে ভিজিয়ে তৈরি করা হয়। দইবড়ায় ডালের বড়ার সাথে মশলাদার ও টক-মিষ্টি দই যোগ হয়ে একটি ইউনিক-কম্বিনেশন তৈরি করে। যা এখনকার প্রচলিত খাবার থেকে ভিন্ন একটি স্বাদ দেয়। যারা স্বাদে বৈচিত্র্য খোঁজেন, দইবড়া নিঃসন্দেহে তাদের কাছে একটি উল্ল্যেখযোগ্য খাবার হতে পারে।

প্রচণ্ড গরমে শরীর ও মন ঠান্ডা করতে টক দইয়ের জুড়ি নেই। আর এই টক দই দিয়েই তৈরি হয় দইবড়া। দইবড়ায় সাধারণত পুদিনা পাতা ব্যবহার করা হয়। খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পুদিনা পাতা কেবল স্বাদের জন্য নয়, হজমের ক্ষেত্রেও সহায়ক। দইয়ের সঙ্গে পুদিনা পাতার মিশ্রণ হজমের সমস্যা মেটাতে ও শরীর ঠান্ডা রাখতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে এই গরমে যখন মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো, তখন স্বাস্থ্যকর সুস্বাদু দইবড়া হতে পারে একটি স্বস্তিদায়ক খাবার। মোঘলরা দইয়ে মশলা, ভেষজ উপাদান যোগ করে খাওয়ার প্রচলন শুরু করেছিল পেটের অসুখ নিরাময় করতে। দইবড়ার উল্লেখ ১২ শতকের সংস্কৃত বই ‘মানসোল্লাস’-এ পাওয়া যায়। সেই দইবড়ারই রকমফের এখন বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে তৈরি হয়।

ঢাকার কয়েকটি আলোচিত দইবড়ার স্বাদের বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য জেনে নেওয়া যাক।

ঢাকার বিরিয়ানি, কাবাবের মতো কয়েকটি জনপ্রিয় খাবারের মতো দইবড়ার প্রচলনও শুরু হয় পুরান ঢাকায়। পুরান ঢাকার অধিবাসীদের কাছে দইবড়া এখনো জনপ্রিয় একটি খাবার, তাই রাস্তার পাশেও দইবড়া বিক্রি হয়। এমনই একটি অস্থায়ী দোকান ‘মামুন হালিম অ্যান্ড দইবড়া’ (খাজা দেওয়ান, প্রথম লেন, চকবাজার)। এখানকার দইবড়া সাধারণমানের। টক দইয়ের তরল মিশ্রণটি অনেকটা বোরহানির মতো। খেতে ভালোই লাগে। প্রায় একই স্বাদ পাওয়া যাবে সুরীটোলা এলাকাবাসীর পছন্দের ‘আল-মুইজ্ব’-এর দইবড়ায় (মাজহার মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পাশের গলিতে)।

দোকান দেখতে ভালো না হলেও খাবার ভালো হতে পারে, পুরান ঢাকার খাবারের দোকানগুলোতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়; যেমন- নয়াবাজারের কে.পি. ঘোষ স্ট্রিটের চাকচিক্যহীন ‘মন্টু ভাইয়ের কাবাব ঘর’। এলাকাবাসীর কাছে এই দোকানের কয়েক ধরনের কাবাবের সাথে এখানকার দইবড়াও বেশ জনপ্রিয়। মন্টু ভাইয়ের কাবাব ঘরের দইবড়ায় মশলার ব্যবহার উপরিউক্ত দুটি দইবড়ার তুলনায় কিছুটা কম হলেও সরিষার স্বাদ ও ঝাঁজের উপস্থিতি রয়েছে যা বিবৃত অন্যান্য দইবড়ায় অনুপস্থিত।

এবার আলোচিত চকবাজারের ইফতারির বাজারে আসা যাক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সারা দেশজুড়ে চকবাজারের ইফতারির বাজারের প্রতি একটি আগ্রহ তৈরি হলেও বাস্তবে বেশিরভাগ খাবারই ভোক্তাদের হতাশ করে। ‘ওভারহাইপড’ চকবাজারের ‘আব্দুল জব্বারের শাহী দইবড়া’ (৬৯ নং চক সার্কুলার রোড) আপনাকে একইভাবে হতাশ করবে। বেখেয়ালে, ভুল পরিমাণে দেওয়া অল্প কয়েকটি উপদান বা মসলার সাথে পাতলা টক দইয়ের তরল মিশ্রণে তৈরি দইবড়া খেতে টক-এছাড়া আর কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। আপনার ভাগ্য খারাপ হলে রাস্তার পাশে এই অস্থায়ী দোকানের দইবড়া কতটা অযত্নে তৈরি হয়, তা আপনার সামনেই দেখিয়ে দেওয়া হতে পারে।

ড্রাম থেকে পাতলা দই নিয়ে, হাতের আন্দাজে জিরা, লবণসহ অন্যান্য মশলা বা উপাদান যোগ করে আপনার সামনেই দইয়ের তরল মিশ্রণ তৈরি করা হবে। এখানে আপত্তির বিষয় যতটা না হাইজিন মেইনটেইন না করা নিয়ে, তার থেকে বেশি আপত্তির কারণ পরিমাণ মতো মশলা বা উপাদান না দেওয়া নিয়ে।

ভারতীয় স্টাইলের দইবড়া। ছবি: পেক্সেলস
ভারতীয় স্টাইলের দইবড়া। ছবি: পেক্সেলস

উপরে উল্লেখ করা দইবড়াগুলো পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া দইবড়া-এর বাইরেও দইবড়া পাওয়া যায়। যেমন-ধানমন্ডির ৬ নম্বর রোডে অবস্থিত ‘ওয়েসিস’ দইবড়ার জন্য বেশ জনপ্রিয়, তবে দইয়ে কড়া একটি গন্ধ অনেকের ভালো লাগতে না-ও পারে। ফাস্ট ফুড রিটেইল ব্র্যান্ড ‘টেস্টি ট্রিট’-এ মোটামুটি মানসম্মত দইবড়া পাওয়া গেছে, এ দইবড়ায় তেঁতুলের স্বাদ রয়েছে।

পুরান ঢাকার আবুল হাসনাত রোডে (সাত রওজায়) অবস্থিত ‘আনন্দ কনফেকশনারী’-এর দইবড়া বেশ সুস্বাদু, এতে হালকা জিরার স্বাদ রয়েছে, দইবড়ার দইটি বেশ ঘন-এ কারণে ক্রিমি একটি স্বাদ পাওয়া যায়। বেশ মিষ্টি এই দইবড়া। যারা দইবড়া খেতে অভ্যস্ত নন, তাদেরও পছন্দ হতে পারে আনন্দ কনফেকশনারীর দইবড়া।

লেখক: গবেষক

সম্পর্কিত