ভোটের পর কি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে?

ভোটের পর কি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে?
গত বছরের ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। ছবি: পিআইডি

গত কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাউর হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকার আরও ছয় মাস ক্ষমতায় থাকবে। পরে গত ৩০ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ফ্যাক্টসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে (সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টস) এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভোটের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আরও ছয় মাস থাকার খবর ‘ভিত্তিহীন’।

ভোটের পর বর্তমান সরকারের আরও ছয় মাস ক্ষমতায় থাকার কথা চাউর হওয়ার ভিত্তি আসলে কী?

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এর একটি ধারার ব্যাখ্যার কারণেই এই ছয় মাসের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

গত ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদ সই করে। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে গত ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের তৈরি করা জুলাই সনদের খসড়ায় বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একযোগে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে; তবে সংস্কার পরিষদের মেয়াদ হবে ২৭০ দিন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিষদ তার দায়িত্ব শেষ করতে না পারে, তাহলে গণভোটে গৃহীত বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।

খসড়ায় এই ‘স্বয়ংক্রিয়’ বিধান নিয়ে নানা মহল থেকে আপত্তি উঠতে থাকে। পরে যে আদেশ জারি হয়, সেখানে ওই ‘স্বয়ংক্রিয়’ বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। আর ২৭০ দিনের জায়গায় ১৮০ কার্যদিবসের বিধান রাখা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস

রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশের ৭ (গ) ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গণভোটের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবস থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। এরপর পরিষদ বিলুপ্ত হবে।

এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনের পর ১৮০ দিন অন্তর্বর্তী সরকারই ক্ষমতায় থাকবে। গোল বেঁধেছে এখানেই। কারণ, নির্বাচনে জিতে যারা সংসদে এমপি হিসেবে বসবেন, তারাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন। প্রথমে তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। এরপর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন।

ভোটের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাস ক্ষমতায় থাকা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সরকার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, তারা নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। দুদিন আগে চীনের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকেও প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, তার দায়িত্ব আর কয়েক সপ্তাহ।

দিন ও কার্যদিবসের ব্যাখ্যা

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে ১৮০ কার্যদিবস বলা হলেও অনেকেই এটাকে ‘ক্যালেন্ডার ডে’; অর্থাৎ, দিন হিসেবে ধরে নিচ্ছেন। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, দিন নয় এক্ষেত্রে গণ্য হবে কার্যদিবস। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিতদের শপথ নিতে হবে। আর ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশনের বৈঠক বসার মতো একইভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠকও বসবে। অর্থাৎ, যেদিন সংসদ বসবে, সেদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদও বৈঠকে বসবে।

পরিষদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের আদলে সভাপ্রধান ও উপপ্রধান নির্বাচিত হবেন। প্রথম বৈঠকে বসার ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে পরিষদ তার কাজ শেষ করবে।

একাদশ জাতীয় সংসদের কথা ধরা যাক। ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে একাদশ জাতীয় সংসদ। ২৫টি অধিবেশনের ওই সংসদের মোট কার্যদিবস ছিল ২৭২। অর্থাৎ, ১৮০ কার্যদিবস পূর্ণ হতে পারে কয়েক বছরে। পরিষদ চাইলে টানাও কাজ করতে পারে। আবার সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, এক অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরের অধিবেশন ডাকা বাধ্যতামূলক।

সরকার কী বলছে

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেন, “নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই সংসদ স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। অর্থাৎ, সরকার গঠন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও বাজেট প্রণয়ন করবে। তবে সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরাতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। সে জন্য নির্বাচিত সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।”

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বৈঠক। ছবি: বাসস
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বৈঠক। ছবি: বাসস

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, আদেশের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী–গণভোটে উত্থাপিত প্রশ্নের বিপক্ষে নয়, বরং পক্ষে (‘হ্যাঁ’) ভোট বেশি পড়লে, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ প্রথম বৈঠকের দিন থেকে ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফল অনুযায়ী সংস্কার কাজ শেষ করবে। এরপর পরিষদের কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হবে।

সরকারের ভাষ্য, এই সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যরা একদিকে সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যদিকে সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষমতাও প্রয়োগ করবেন। তবে কোথাও বলা নেই যে, অন্তর্বর্তী সরকার ১৮০ দিন ক্ষমতায় থাকবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ হলে সংসদের দ্বৈত ভূমিকার অবসান ঘটবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন।

সংসদ বসলেই কি সব হবে?

অনেকের মধ্যেই ধারণা রয়েছে যে, সংসদ ও সংবিধান পরিষদ বসলেই অনেক বিষয় আইনি ভিত্তি পাবে। এখানে একটু কিন্তু রয়ে গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, সংসদের প্রথম বৈঠকে এর আগে জারি হওয়া সব অধ্যাদেশ তুলতে হবে। এরপর ৩০ দিনের মধ্যে ওই অধ্যাদেশ আইন করার জন্য বিল আকারে তোলা না হলে, তা বাতিল হয়ে যাবে।

১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট হলেও এটি নির্ভর করছে পরবর্তী সংসদের ওপর। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েও অধ্যাদেশ যদি পাস না হয়, তবে কী হবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।

সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর বিজয়ী দল বা জোট সরকার গঠনের কাজ শুরু করে। সেক্ষেত্রে ১২ জানুয়ারির ভোটের পরও একই ধারাবাহিকতা থাকবে বলে ধারণা করা যায়। তবে সব আলোচনা নির্ভর করছে ত্রয়োদশ সংসদের ওপর। সংসদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে–অধ্যাদেশ নিয়ে কী হবে।

ভোটের পর অন্তর্বর্তী সরকার থাকবে?

গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এরপর দেশ পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন।

এর দুদিন পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: বাসস
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: বাসস

অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও শপথের আগে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন নিয়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের কাছে মতামত চেয়ে রেফারেন্স পাঠান।

রাষ্ট্রপতির বিশেষ রেফারেন্সের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ ৮ আগস্ট মতামত দেয়; অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শোনা হয়।

আদালতের মতামতে বলা হয়, “রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্যপরিচালনার নিমিত্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি ওইরূপ নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টা ও অন্য উপদেষ্টাদের শপথ পাঠ করাতে পারবেন।”

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। সংবিধানে এ-সংক্রান্ত কোনো বিধান না থাকায় রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ আদালতের মতামত নেন। এই সরকারের বৈধতা একটি রিটও সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করে দেয়।

তবে ভোটের পর সরকার গঠন হলে অন্তর্বর্তী সরকারের আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। কারণ আদালত তার মতামতে বলেছিলেন, “সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন।” ভোটের পর যদি সেরকম কোনো শূন্যতা না হয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় থাকার সুযোগও থাকবে না।

সম্পর্কিত