Advertisement Banner

১৩ এপ্রিল, ১৯৯৭: এমন তারিখ আর কখনো আসেনি বাংলাদেশে

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
১৩ এপ্রিল, ১৯৯৭: এমন তারিখ আর কখনো আসেনি বাংলাদেশে
আইসিসি ট্রফি জেতা বাংলাদেশ দল। ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৭ সালে যাদের জন্ম, তারাই আজকের জেন জি প্রজন্ম। জেন জিদের দুনিয়াজুড়ে বলা হচ্ছে বদলে দেওয়ার প্রজন্ম। সব পুরোনো প্রথাকে ভেঙেচুরে এগিয়ে যাওয়ার প্রজন্মের শুরু যে বছরটিতে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের বদলে যাওয়া তখন থেকেই। ১৯৯৭ সালের মার্চ–এপ্রিল, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক রোলার কোস্টার রাইড। অধরা এক স্বপ্নকে সত্যি করার রোমাঞ্চকর এক সময়।

১৯৯৭ সালের দুটি তারিখকে কখনোই ভুলতে পারবে না বাংলাদেশের ক্রিকেট। একটি ৯ এপ্রিল, অন্যটি ১৩ এপ্রিল। শুধু ক্রিকেট কেন, এ দুটি তারিখ যে বাংলাদেশের গোটা একটি প্রজন্মই কখনো ভুলবে না। ৯ এপ্রিল বিশ্বকাপযাত্রা নিশ্চিত করা গিয়েছিল। আর ১৩ এপ্রিল স্বপ্নের আইসিসি ট্রফির শিরোপাটা নিজেদের করে নিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এ দুটি সাফল্য গোটা দেশকে যে আনন্দ আর উৎসবে মাতিয়ে দিয়েছিল, তেমনটা আর কখনোই দেখেনি বাংলাদেশের মানুষ। একটা খেলা, একটা সাফল্য যে গোটা জাতিকে এভাবে এক সুতোয় গেঁথে দিতে পারে, সেটা ছিল অনন্য এক ঘটনা। প্রজন্মের এক স্মৃতি কাতরতা। ৯ এপ্রিল আইসিসি ট্রফির সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার দিনই ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। বেরিয়েছিল মিছিল, রঙের উৎসবে রঙিন হয়েছিল দেশ। দেশের একটা অর্জন যে এভাবে মানুষকে আনন্দে ভাসাতে পারে, সেই আশ্চর্য ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ।

আজকের প্রজন্মের কাছে বিশ্বকাপযাত্রা কিংবা আইসিসি ট্রফি জয়কে খুব বড় কিছু মনে হবে না। কারণ তারা অভ্যস্ত অনেক কিছুতেই। ২০০০ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দশম টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। তার আগে ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপ খেলে প্রথম আবির্ভাবেই পাকিস্তানের মতো দলকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এর পরের দুই দশক ধরে ক্রিকেটে আছে অনেক সাফল্য। এসব দেখেই বেড়ে উঠেছে আজকের প্রজন্ম। বিশ্বকাপ খেলাটা যে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কত বড় এক অর্জন ছিল সেটা শুধু নব্বইয়ের প্রজন্মই অনুভব করতে পারবে। আইসিসি ট্রফি জয়টা ছিল ওই সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বিশ্বকাপ জেতার মতোই কিছু। সবচেয়ে বড় কথা আইসিসি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিজেদের টেস্ট খেলা দেশগুলোর বাইরে সেরা দল হিসেবে প্রমাণ করেছিল। সেটা ছিল তখনকার প্রেক্ষাপটে অনেক বড় কিছু। বড় সাফল্য।

১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়, বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই করাটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কত বড় অর্জন ছিল, সেটা বুঝতে ফিরে যেতে হবে ১৯৯৪ সালে। এর আগে ১৯৯২ সালে আইসিসি নিয়ম করে টেস্ট খেলুড়ে ৯ দেশের বাইরে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবে আইসিসি ট্রফির শীর্ষ ৩ দল। ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া–নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেবারই বাংলাদেশে বিশ্বকাপের ২২টি ম্যাচ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। ক্রিকেট বিশ্ব সেবার প্রথমবারের মতো রঙিন জার্সি, সাদা বল আর ফ্লাডলাইটে দিনরাতের ক্রিকেট দেখেছিল। অস্ট্রেলিয়ার চ্যানেল নাইনের মোহনীয় সম্প্রচার এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে এক ধরনের আক্ষেপও সৃষ্টি করেছিল। ইশ! বাংলাদেশও যদি বিশ্বকাপ খেলত!

বাংলাদেশের জয়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উদ্‌যাপন। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের জয়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উদ্‌যাপন। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের পরপরই আইসিসির সেই ঘোষণা স্বপ্নে বিভোর করেছিল বাংলাদেশকে। ১৯৯০ সালে নেদারল্যান্ডসে আইসিসি ট্রফির সেমিফাইনালে জিম্বাবুয়েকে বাগে পেয়েও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। সেবার আইসিসি ট্রফিতে তৃতীয় হয়েছিল দল। তাই মানুষ ধরেই নিয়েছিল আইসিসি ট্রফির শীর্ষ তিন দলের মধ্যে থেকে পরের বিশ্বকাপ খেলাটা বাংলাদেশের জন্য কঠিন কিছু হবে না।

১৯৯৪ সালে কেনিয়ায় আইসিসি ট্রফি হয়েছিল। বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশও নেমেছিল আটঘাঁট বেঁধেই। ভারত থেকে কোচ হিসেবে আনা হয়েছিল ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী তারকা মহিন্দর অমরনাথকে। আইসিসি ট্রফির আগে ভারত, পাকিস্তান, হংকং সফরের পাশাপাশি পাকিস্তানের বিপক্ষে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ব্যাপারে ছিল দারুণ আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু শেষপর্যন্ত স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের। আরব আমিরাতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্যায়ে হেরে দ্বিতীয় দল হিসেব দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়ে বাংলাদেশ পড়েছিল নেদারল্যান্ডস ও কেনিয়ার সামনে। জয়ের কাছে গিয়েও ওই দুটি ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপ স্বপ্ন দূরে সরে গিয়েছিল। ১৯৯৭ সালের এপ্রিল যেমন দেশের ক্রিকেটের আনন্দময় সময়, অর্জনের সময়, ঠিক তেমনি তার ঠিক তিন বছর আগে চুরানব্বইয়ের ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বপ্ন ভঙ্গের সময়। পিছিয়ে পড়ার সময়। যেদিন কেনিয়ার বিপক্ষে ১৩ রানে হেরে গিয়ে বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল, সেই দিনটির স্মৃতি মনে করতে পারবেন অনেকেই। গোটা দেশ সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়। অনেকেই বলেন ১৯৯৬ বিশ্বকাপ খেলতে না পারায় বাংলাদেশের ক্রিকেট পিছিয়ে গিয়েছে অন্তত দশটি বছর।

১৯৯৭ সালের ৯ এপ্রিল বিশ্বকাপ যাত্রা নিশ্চিত করা আর ১৩ এপ্রিল আইসিসি ট্রফি জয়; আনন্দ তাই বাঁধ ভেঙেছিল। রাস্তায় তারুণ্যের মিছিল আর রঙ খেলা সেদিন ছুঁয়ে গিয়েছিল সবাইকে। বাড়ির আপাত গম্ভীর মুরুব্বির মুখেও ছিল হাসি। তৃপ্তির হাসি। ওই রকম সময় আসলেই আর আসেনি বাংলাদেশে।

সেবার আইসিসি ট্রফি হয়েছিল মালয়েশিয়ায়। মালয়েশিয়ার বৃষ্টির কথা মাথায় রেখেই আইসিসি ট্রফির সেমিফাইনাল ও ফাইনাল দুই দিনে করা হয়েছিল। মূলত আইসিসি ট্রফির ফাইনাল শুরু হয়েছিল ১২ এপ্রিল। প্রতিপক্ষ কেনিয়া। শুরুর বিপর্যয় সামলে কেনিয়া স্কোরবোর্ডে তুলেছিল ২৪২ রান। কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাবের স্যাঁতস্যাতে মাঠ আর অ্যাস্ট্রোটার্ফ উইকেটে ২৪৩ রানের লক্ষ্য ছিল অনেক কঠিন। ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে নামার কথা। কিন্তু সেদিন কুয়ালালামপুরে সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি। একটা সময় মনে হচ্ছিল ফাইনালটা হয়তো পরিত্যক্তই হয়ে যাবে। কিন্তু হেলিকপ্টার দিয়ে মাঠ শুকিয়ে ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতির হিসাব–নিকাশে ফেলে ফাইনাল শেষ করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আইসিসি।

ট্রফি হাতে আকরাম খান। ছবি: সংগৃহীত
ট্রফি হাতে আকরাম খান। ছবি: সংগৃহীত

ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে ২৫ ওভারে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬৬ রানের। অনেক কঠিন সেই লক্ষ্য। তখন টি–টোয়েন্টি ক্রিকেট কেমন–কেউ জানত না। টি–টোয়েন্টির যুগ আসতেই ঢের বাকি। ২৫ ওভারে স্লো আউটফিল্ডে ১৬৬ রান তোলা ছিল পর্বত আরোহনের মতোই কঠিন এক কাজ। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এমন চেজিংয়ের অভিজ্ঞতাও আগে ছিল না কখনো। তবুও বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিল। মোহাম্মদ রফিকের মারকুটে ব্যাটিংয়ের কারণে তাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন তখনকার কোচ গর্ডন গ্রিনিজ। রফিককে ওপেনিংয়ে পাঠানো হয়েছিল। মারকাট ব্যাটিং করেছিলেন নাঈমুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ রফিক, মিনহাজুল আবেদীন, আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ, সাইফুল ইসলাম খান, এনামুল হক, খালেদ মাসুদরা। কারওরই বড় কোনো স্কোর নেই, কিন্তু সবাই যতো বল খেলেছিলেন, তার চেয়ে বেশি রান করে গিয়েছিলেন। কমবেশি অবদান রেখেছিলেন সবাই।

বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় ছিল শেষ ওভারটি। হাতে ২ উইকেট। ৬ বলে দরকার ১১ রান। কঠিন, অনেক কঠিন সেই চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উইকেটে থাকা হাসিবুল হোসেনের ছক্কাটক্কা মারার রেকর্ড থাকলেও খালেদ মাসুদকে মারকুটে ব্যাটিং করতে আগে কেউ দেখেনি। কেনিয়ান পেসার মার্টিন সুজির প্রথম বলেই ঐতিহাসিক এক ছক্কায় খেলাটিকে নাগালের মধ্যে নিয়ে আসেন খালেদ মাসুদ। ৫ বলে দরকার ৫ রান। এর মধ্যে একটি বলও মিসও করেছিলেন খালেদ মাসুদ। এক–দুই করে রান নিয়ে শেষ বলে বাংলাদেশের দরকার এক রান। স্ট্রাইকিং এন্ডে হাসিবুল হোসেন। হাসিবুল ও খালেদ মাসুদ নিজেদের মধ্যে ঠিক করে রেখেছিলেন যেকোনো মূল্যে রানটা নিয়ে নেবেন তারা। সুজির শেষ বলটি হাসিবুলের প্যাডে লাগতেই দৌড় লাগালেন নন স্ট্রাইকে থাকা খালেদ মাসুদ। দৌড়ালেন হাসিবুলও। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রানটা চোখের পলকেই নিয়ে নেন তারা। কুয়ালালামপুরের মাঠ সেদিন ভর্তি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশি দর্শকে। হাজার হাজার দর্শক তখন উন্মাতাল, আনন্দে, উৎসবে। রেডিওর সামনে উৎকণ্ঠা নিয়ে বসা দেশের কোটি কোটি দর্শকের আনন্দও তখন বাঁধ ভেঙেছে। অসাধারণ এক মুহূর্ত, ঐতিহাসিক, নস্টালজিক এক মুহূর্ত। আইসিসি ট্রফি বাংলাদেশের। ২৯ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু একটা প্রজন্মের কাছে ওই মুহূর্তের স্মৃতি দারুণ উজ্জ্বল।

২৯ বছরে টেস্ট মর্যাদা অর্জন, ওয়ানডে, টি–টোয়েন্টি মিলিয়ে ১৬টি বিশ্বকাপ। প্রতিটি টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে জয়, বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা, সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মাহমুদউল্লাহ, মুশফিকুর রহিমদের মতো বিশ্বমানের ক্রিকেটারদের আবির্ভাব, কোনো কিছুই যেন ফিকে হতে দেয় না ১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল দিনটিকে। ক্রিকেট বা কোনো খেলা নিয়ে এমন আবেগের দিন যে আর কখনো আসেনি বাংলাদেশের ইতিহাসে।

সম্পর্কিত