চরচা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানে দ্বিতীয় দফা আলোচনার গতি বাড়ার সাথে সাথে একটি কেন্দ্রীয় বিষয় বিরোধের মূল কারণ হয়ে উঠেছে–বিদেশে আটক বা জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ১০ এপ্রিল তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন, কোনো আলোচনা শুরুর আগেই বিদেশের ব্যাংকগুলিতে জব্দ ইরানি সম্পদ মুক্ত করতে হবে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতি আলোচনার সময় কিছু প্রতিবেদনে বলা হয় ওয়াশিংটন অন্তত কিছু জমাট সম্পদ মুক্ত করতে রাজি হয়েছে।
কিন্তু মার্কিন সরকার দ্রুত সেই রিপোর্ট নাকচ করে দেয়। আল জাজিরার সংবাদদাতা প্রিয়াংকা শঙ্করের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি ২২ এপ্রিলের প্রথম প্রহরে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগে আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার প্রত্যাশায় এই টানাপোড়েন আবার সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জব্দ সম্পদের পরিমাণ কত
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঠিক পরিমাণ অস্পষ্ট হলেও ইরানের সরকারি প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞরা বিদেশে ইরানের জব্দ বা আটক সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বলে নির্ধারণ করেছেন। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফ্রেডেরিক স্নেইডার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই সম্পদ ইরানের বার্ষিক হাইড্রোকার্বন বিক্রির আয়ের প্রায় তিনগুণ। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত একটি সমাজের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক। তবে তিনি যোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সম্পদ মুক্ত করলেও তা কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার শর্ত জুড়ে দেবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত। নিষেধাজ্ঞার বিশৃঙ্খল ইতিহাস ও মার্কিন পক্ষে বিশেষজ্ঞের ঘাটতির কারণে ইরান সন্দিহান।
সাবেক মার্কিন অর্থমন্ত্রী (ট্রেজারি সেক্রেটারি) জ্যাকব লিউ ২০১৬ সালে কংগ্রেসে বলেছিলেন, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও ইরান তার বিদেশের সব জব্দ সম্পদ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবে না। কারণ বাকি অংশ আগে থেকে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বা ঋণ পরিশোধের কথা রয়েছে। বর্তমান যুদ্ধবিরতি আলোচনায়, তেহরানের মূল দাবি হলো তাদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে অন্তত ৬০০ কোটি ডলার মুক্ত করা হোক।
জব্দ সম্পদ আসলে কী এবং কেন হয়
প্রিয়াংকা শঙ্করের প্রতিবেদনে জব্দ সম্পদের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল, সম্পত্তি বা সিকিউরিটি যখন অন্য দেশের কর্তৃপক্ষ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা সাময়িকভাবে আটক করে রাখে–তখন সেটাকে সম্পদ জব্দ করা বলা হয়। নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণের কারণে মালিক এই সম্পদ বিক্রি করতে পারেন না। সরকারিভাবে দেশগুলো অপরাধমূলক কার্যক্রম, মানি লন্ডারিং বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অন্য দেশ বা কোম্পানির সম্পদ জমাট করে বলে দাবি করে। তবে সমালোচকরা এই প্রক্রিয়ার বেছে বেছে ব্যবহারের দিক হিসেবে তুলে ধরেন। ইসরায়েল বারবার মানবাধিকার লঙ্ঘন, অবৈধ যুদ্ধ পরিচালনা ও বর্ণবৈষম্যের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কোনো দেশ তার বিদেশি সম্পদ জব্দ করেনি। অথচ ইরান, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা ও কিউবার সম্পদ বিদেশি সরকারগুলো জব্দ করেছে। এটা একটি সাধারণ সূত্র দিয়ে বাঁধা–তা হলো এই দেশগুলি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে।
ইরানের সম্পদ জব্দের ইতিহাস
আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম সম্পদ জব্দের ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বলেছিলেন, ইরান মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক নীতি ও অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি। তখন ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জন আমেরিকান নাগরিককে জিম্মি করে রেখেছিল। অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম মিলার জানিয়েছিলেন, ইরানের তখনকার সম্পদ ছিল ৬০০ কোটি ডলারের কম। ১৯৮১ সালে আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় আলজিয়ার্স অ্যাকর্ড স্বাক্ষরিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তখনো তেহরানে বন্দী ৫২ জন আমেরিকানের মুক্তির বিনিময়ে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছেড়ে দেয়। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলিতে মার্কিন-ইরান সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়।
২০১৫ সালে ইরান ওবামা প্রশাসনের মধ্যস্থতায় বিশ্বশক্তিগুলির সাথে জয়েন্ট কম্প্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন চুক্তি করে। এই চুক্তির আওতায় তেহরান পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে তার বেশির ভাগ বিদেশি সম্পদে পুনরায় প্রবেশাধিকার পায়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে বের করে আনেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পুনরায় চাপিয়ে দেন। ২০২৩ সালে মার্কিন-ইরান বন্দী বিনিময় চুক্তিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় জব্দ থাকা ৬০০ কোটি ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু পরের বছর বাইডেন ইসরায়েলে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করলে দোহায় ওই অর্থে ইরানের প্রবেশাধিকার আবার বন্ধ হয়।
কোন দেশে কত আছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাধিক দেশে ইরানের জব্দ সম্পদ রয়েছে। ইরানি মিডিয়ার আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানে আছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার, ইরাকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার, চীনে কমপক্ষে ২০০০ কোটি ডলার এবং ভারতে ৭০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ আছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি প্রায় ২০০ কোটি ডলার ইরানি সম্পদ জমাট করে রেখেছে। লুক্সেমবার্গের মতো ইইউ দেশগুলিতে রয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার। আর কাতারে রয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার–যা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ইরানকে দেওয়ার জন্য স্থানান্তরিত হয়েছিল কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র অবরুদ্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নও মানবাধিকার লঙ্ঘন, পরমাণু চুক্তিতে অসম্মতি, সন্ত্রাসবাদ এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহের অভিযোগে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ আংশিকভাবে জব্দ করে রেখেছে।
সম্পদ ছাড় করা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ইরানের জন্য
আল জাজিরার প্রতিবেদনে একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামতের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে কেন ইরানের কাছে এই সম্পদ মুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের অর্থনীতি দশকের পর দশকের নিষেধাজ্ঞায় সংকটে, তেল রপ্তানি সীমিত এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্প আধুনিকায়নের সক্ষমতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও রিয়ালের পতনে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে, যা পরে শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করার বড় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে নিহত হয়েছেন। ১০ হাজার কোটি ডলার ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় এক চতুর্থাংশের সমান।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিক্ষক রক্সানে ফারমানফারমাইয়ান আল জাজিরাকে বলেছেন, সম্পদ মুক্তি ইরানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। তেল বিক্রির আয় দেশের অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। মুদ্রার ওঠানামার ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসবে, যে মুদ্রার অস্থিরতা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের বিক্ষোভের সূত্রপাত করেছিল। তেলক্ষেত্র, পানি ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ গ্রিডসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো অবকাঠামোর অবনতির মুখে আছে–সম্পদ মুক্ত হলে এই খাতগুলোতে উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যাবে। যুদ্ধের পর পুনর্নির্মাণেও জমাট সম্পদের মুক্তি প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করবে এবং দুর্নীতি থেকে বের হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা শুরু করতে সহায়ক হবে।
ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরানের সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে মার্কিন সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তাও দেবে। আন্তর্জাতিকভাবে এটি ইরানের অর্থনীতিতে মার্কিন চাপ কমানোর সংকেত হতে পারে। এতে অন্য দেশ ও আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সাথে বাণিজ্য ও একীভূতকরণ সম্পর্ক বিকশিত হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অপ্রত্যাশিত আচরণ ও ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এটি মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করা কতটা কঠিন তারও প্রমাণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানে দ্বিতীয় দফা আলোচনার গতি বাড়ার সাথে সাথে একটি কেন্দ্রীয় বিষয় বিরোধের মূল কারণ হয়ে উঠেছে–বিদেশে আটক বা জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ১০ এপ্রিল তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন, কোনো আলোচনা শুরুর আগেই বিদেশের ব্যাংকগুলিতে জব্দ ইরানি সম্পদ মুক্ত করতে হবে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতি আলোচনার সময় কিছু প্রতিবেদনে বলা হয় ওয়াশিংটন অন্তত কিছু জমাট সম্পদ মুক্ত করতে রাজি হয়েছে।
কিন্তু মার্কিন সরকার দ্রুত সেই রিপোর্ট নাকচ করে দেয়। আল জাজিরার সংবাদদাতা প্রিয়াংকা শঙ্করের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি ২২ এপ্রিলের প্রথম প্রহরে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগে আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার প্রত্যাশায় এই টানাপোড়েন আবার সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জব্দ সম্পদের পরিমাণ কত
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঠিক পরিমাণ অস্পষ্ট হলেও ইরানের সরকারি প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞরা বিদেশে ইরানের জব্দ বা আটক সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বলে নির্ধারণ করেছেন। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফ্রেডেরিক স্নেইডার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই সম্পদ ইরানের বার্ষিক হাইড্রোকার্বন বিক্রির আয়ের প্রায় তিনগুণ। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত একটি সমাজের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক। তবে তিনি যোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সম্পদ মুক্ত করলেও তা কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার শর্ত জুড়ে দেবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত। নিষেধাজ্ঞার বিশৃঙ্খল ইতিহাস ও মার্কিন পক্ষে বিশেষজ্ঞের ঘাটতির কারণে ইরান সন্দিহান।
সাবেক মার্কিন অর্থমন্ত্রী (ট্রেজারি সেক্রেটারি) জ্যাকব লিউ ২০১৬ সালে কংগ্রেসে বলেছিলেন, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও ইরান তার বিদেশের সব জব্দ সম্পদ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবে না। কারণ বাকি অংশ আগে থেকে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বা ঋণ পরিশোধের কথা রয়েছে। বর্তমান যুদ্ধবিরতি আলোচনায়, তেহরানের মূল দাবি হলো তাদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে অন্তত ৬০০ কোটি ডলার মুক্ত করা হোক।
জব্দ সম্পদ আসলে কী এবং কেন হয়
প্রিয়াংকা শঙ্করের প্রতিবেদনে জব্দ সম্পদের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল, সম্পত্তি বা সিকিউরিটি যখন অন্য দেশের কর্তৃপক্ষ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা সাময়িকভাবে আটক করে রাখে–তখন সেটাকে সম্পদ জব্দ করা বলা হয়। নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণের কারণে মালিক এই সম্পদ বিক্রি করতে পারেন না। সরকারিভাবে দেশগুলো অপরাধমূলক কার্যক্রম, মানি লন্ডারিং বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অন্য দেশ বা কোম্পানির সম্পদ জমাট করে বলে দাবি করে। তবে সমালোচকরা এই প্রক্রিয়ার বেছে বেছে ব্যবহারের দিক হিসেবে তুলে ধরেন। ইসরায়েল বারবার মানবাধিকার লঙ্ঘন, অবৈধ যুদ্ধ পরিচালনা ও বর্ণবৈষম্যের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কোনো দেশ তার বিদেশি সম্পদ জব্দ করেনি। অথচ ইরান, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা ও কিউবার সম্পদ বিদেশি সরকারগুলো জব্দ করেছে। এটা একটি সাধারণ সূত্র দিয়ে বাঁধা–তা হলো এই দেশগুলি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে।
ইরানের সম্পদ জব্দের ইতিহাস
আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম সম্পদ জব্দের ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বলেছিলেন, ইরান মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক নীতি ও অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি। তখন ইরানি শিক্ষার্থীরা তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জন আমেরিকান নাগরিককে জিম্মি করে রেখেছিল। অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম মিলার জানিয়েছিলেন, ইরানের তখনকার সম্পদ ছিল ৬০০ কোটি ডলারের কম। ১৯৮১ সালে আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় আলজিয়ার্স অ্যাকর্ড স্বাক্ষরিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তখনো তেহরানে বন্দী ৫২ জন আমেরিকানের মুক্তির বিনিময়ে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছেড়ে দেয়। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলিতে মার্কিন-ইরান সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়।
২০১৫ সালে ইরান ওবামা প্রশাসনের মধ্যস্থতায় বিশ্বশক্তিগুলির সাথে জয়েন্ট কম্প্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন চুক্তি করে। এই চুক্তির আওতায় তেহরান পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে তার বেশির ভাগ বিদেশি সম্পদে পুনরায় প্রবেশাধিকার পায়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে বের করে আনেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পুনরায় চাপিয়ে দেন। ২০২৩ সালে মার্কিন-ইরান বন্দী বিনিময় চুক্তিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় জব্দ থাকা ৬০০ কোটি ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু পরের বছর বাইডেন ইসরায়েলে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করলে দোহায় ওই অর্থে ইরানের প্রবেশাধিকার আবার বন্ধ হয়।
কোন দেশে কত আছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাধিক দেশে ইরানের জব্দ সম্পদ রয়েছে। ইরানি মিডিয়ার আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানে আছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার, ইরাকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার, চীনে কমপক্ষে ২০০০ কোটি ডলার এবং ভারতে ৭০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ আছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি প্রায় ২০০ কোটি ডলার ইরানি সম্পদ জমাট করে রেখেছে। লুক্সেমবার্গের মতো ইইউ দেশগুলিতে রয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার। আর কাতারে রয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার–যা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ইরানকে দেওয়ার জন্য স্থানান্তরিত হয়েছিল কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র অবরুদ্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নও মানবাধিকার লঙ্ঘন, পরমাণু চুক্তিতে অসম্মতি, সন্ত্রাসবাদ এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহের অভিযোগে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ আংশিকভাবে জব্দ করে রেখেছে।
সম্পদ ছাড় করা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ইরানের জন্য
আল জাজিরার প্রতিবেদনে একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামতের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে কেন ইরানের কাছে এই সম্পদ মুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের অর্থনীতি দশকের পর দশকের নিষেধাজ্ঞায় সংকটে, তেল রপ্তানি সীমিত এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্প আধুনিকায়নের সক্ষমতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও রিয়ালের পতনে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে, যা পরে শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করার বড় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে নিহত হয়েছেন। ১০ হাজার কোটি ডলার ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় এক চতুর্থাংশের সমান।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিক্ষক রক্সানে ফারমানফারমাইয়ান আল জাজিরাকে বলেছেন, সম্পদ মুক্তি ইরানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে। তেল বিক্রির আয় দেশের অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। মুদ্রার ওঠানামার ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসবে, যে মুদ্রার অস্থিরতা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের বিক্ষোভের সূত্রপাত করেছিল। তেলক্ষেত্র, পানি ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ গ্রিডসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো অবকাঠামোর অবনতির মুখে আছে–সম্পদ মুক্ত হলে এই খাতগুলোতে উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যাবে। যুদ্ধের পর পুনর্নির্মাণেও জমাট সম্পদের মুক্তি প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করবে এবং দুর্নীতি থেকে বের হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা শুরু করতে সহায়ক হবে।
ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরানের সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে মার্কিন সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তাও দেবে। আন্তর্জাতিকভাবে এটি ইরানের অর্থনীতিতে মার্কিন চাপ কমানোর সংকেত হতে পারে। এতে অন্য দেশ ও আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সাথে বাণিজ্য ও একীভূতকরণ সম্পর্ক বিকশিত হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অপ্রত্যাশিত আচরণ ও ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এটি মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করা কতটা কঠিন তারও প্রমাণ হতে পারে।