Advertisement Banner

কার কথায় ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ থামালেন ট্রাম্প

গত রোববার ট্রাম্প কারো সঙ্গে আগাম আলোচনা না করেই হুট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর ঘোষণা দিলে ক্ষুব্ধ হন সৌদি আরবের নেতারা।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কার কথায় ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ থামালেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে আকস্মিকভাবে সরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় পাকিস্তানের অনুরোধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।

নতুন তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র সৌদি আরব ও কুয়েত তাদের ঘাঁটি বা আকাশসীমায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত রোববার ট্রাম্প কারো সঙ্গে আগাম আলোচনা না করেই হুট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর ঘোষণা দিলে ক্ষুব্ধ হন সৌদি আরবের নেতারা। এমনকি ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে কাতার ও ওমানের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও বিস্মিত হয়।

এরপর সৌদি আরব সাফ জানিয়ে দেয়, তারা রিয়াদে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন সামরিক বিমান ওড়াতে দেবে না। এমনকি এই অভিযানে সহায়তা করার জন্য সৌদি আকাশসীমাও ব্যবহার করা যাবে না।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, সংকট নিরসনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ফোনালাপ হলেও কোনো সমাধান আসেনি। শেষ পর্যন্ত আকাশসীমা ও ঘাঁটির সুবিধা ফিরে পেতে ট্রাম্প এ অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হন।

ফাইল ছবি: রয়টার্স
ফাইল ছবি: রয়টার্স

তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার রাতে এক ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও সৌদি যুবরাজ বিষয়টি সমাধান করেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওই অপারেশন পুনরায় চালুর পথ তৈরি হয়েছে। যদিও এটি কবে থেকে শুরু হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা কে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছেন, এটি চলতি সপ্তাহেই শুরু হতে পারে।

সৌদি আরব কেন আকাশসীমা দিতে অস্বীকৃতি জানায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, রিয়াদের এই সতর্ক অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান উত্তেজনার স্থায়ী অবসান চায় তারা। সৌদি আরবের আশঙ্কা, এতে তেহরানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বাড়তে পারে।

ফিনান্সিয়াল টাইমসকে এক সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডমকে ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর মতো এবং যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ছাড়া নেওয়া পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছে রিয়াদ।

সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ‘অসংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্তে’ অসন্তুষ্ট সৌদি। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত বেশি চাপে পড়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আব্রাহাম একর্ডসে স্বাক্ষরকারী হিসেবে শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অবস্থান থেকে কিছুটা সুবিধা দেখেছিল রিয়াদ। তবে বর্তমানে ট্রাম্পের অনিশ্চিত অবস্থান ও সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দেশটির।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ফিনান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছে, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ট্রাম্পের দেওয়া হামলার হুমকি রিয়াদকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তাদের আশঙ্কা, এতে তেহরানের পক্ষ থেকে আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

এ অবস্থায় সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশ যুদ্ধ এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার জন্য ওয়াশিংটনকে আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর জন্য পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকেও সমর্থন দিয়েছে রিয়াদ।

প্রজেক্ট ফ্রিডম নিয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়া

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র উদ্যোগ নেওয়ার পরই তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর এক ডজনের বেশি বিমান হামলা চালায় ইরান। বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত করা হলেও ফুজাইরাহর একটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায়, এতে সেখানে কর্মরত তিন ভারতীয় আহত হন।

এ ছাড়া ইরানি বাহিনী তিনটি মার্কিন নৌযান ও কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার চেষ্টা চালায়, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রতিহত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের খতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এক বিবৃতিতে জানায়, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইরানি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলার পর মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী।

ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই অভিযানে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল এবং উচ্চ বিস্ফোরণের ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, ইরানের উসকানিমূলক আক্রমণগুলো তারা রুখে দিয়েছে এবং আত্মরক্ষার্থে পাল্টা হামলা করেছে।

সেন্টকমের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং তারা উত্তেজনা চায় না, তবে নিজেদের সুরক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে।

এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চরম উত্তেজনার মুখে পড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে।

আল জাজিরা বলছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবরোধের বিপরীতে এটিই তেহরানের প্রথম সামরিক প্রতিক্রিয়া। গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি ইরানি জাহাজ জব্দ করেছে। গত মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নৌ-অবরোধ তেহরানের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।

সম্পর্কিত