Advertisement Banner

রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি: সংগৃহীত

‘মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়?’ কথাটি কি শুনেছেন? না শুনে থাকলে আজ সোশ্যালে নজর রাখলে শুনতে বা পড়তেও পারেন।

কথাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখে গুঁজে দেওয়া হয়।

আচ্ছা বলুন তো–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কে? এক পক্ষ উত্তর দেবেন–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আবার এই উত্তর শুনে কেউ হয়তো তেড়েফুঁড়ে আসতে চাইবেন। উভয় পক্ষকেই বলি–একটু থামুন।

আজ ২৫ শে বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মদিন। অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রথম নোবেলজয়ী এই মহিরুহকে নিয়ে আলোচনপা যেমন আছে, সমালোচনাও আছে বেশ। এর একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এক পক্ষের দাবি, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন, বলেছেন, ‘মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়?’ আর এ উক্তি নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গেই। অন্যপক্ষের দাবি, রবী ঠাকুর এমনটা বলতেই পারেন না।

প্রশ্ন হলো–আসলেই কি রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছিলেন?

২০২২ সালে ফ্যাক্টচেক ডট ওআরজি এই বিতর্কের আদৌ কোনো ভিত্তি আছে কি না, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অনলাইন পোর্টাল সারাবাংলার বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “এই দাবিটি মূলত আলোচনায় আসে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এমএ মতিনের ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা’ নামক বই থেকে। বইয়ে উল্লেখ করা হয় ‘১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলিকাতার গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। এখানে বলা প্রয়োজন যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বও সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথ তখন ছিলেন হিন্দু সমাজ তথা হিন্দু মনমানসিকতা ও হিন্দু চেতনা ও হিন্দু ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ একজন হিন্দু স্বভাবকবি।”

এ তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর এ জেড এম আবদুল আলী সমকাল পত্রিকায় এ বক্তব্যের সত্যতা চ্যালেঞ্জ করে রেফারেন্স বা তথ্যসূত্র জানতে চান, কিন্তু কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ছবি: স্ক্রিনশট
ছবি: স্ক্রিনশট

২০২০ সালে বণিক বার্তায় দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনিতিবিদ ড. সেলিম জাহান বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। অনেকে বলেন তিনি বিরোধিতা করেছিলেন, অনেক বলেন–না। তবে যারা বলছেন যে, রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছেন তারা কিন্তু কোনোরকম তথ্য দিতে পারছেন না এবং যে সমস্ত ঘটনার ভিত্তিতে তারা বলছেন সেগুলো কিন্তু কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না।”

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারীদের মধ্যে কলকাতার যেসব গুণী ব্যক্তি ছিলেন, তাদের অনেকের সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠতা ও পারিবারিক যোগাযোগ ছিল। এ ছাড়া বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণেও এ ধারণাকে জোরালো হতে সহযোগিতা করেছে। মূলত তৎকালীন কলকাতার সুধী সমাজ ও প্রভাবশালী মহলের একটি বিশাল অংশ এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে অন্তত ১০-১২টি প্রতিবাদ সভা করেছিল, যা রবীন্দ্র-বিরোধিতার বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি সেসব সভায় আসলেও ছিলেন?

২০২১ সালে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক লেখায় বলা হয়, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ তারিখটি ১৩১৮ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসের সঙ্গে মিলে যায়। ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ ছিল ১৩১৮ বঙ্গাব্দের ১৪ বা ১৫ চৈত্র। তবে ইতিহাস বলছে, রবীন্দ্রনাথ ওই সময় ছিলেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে। শিলাইদহ থেকে তিনি কলকাতায় ফিরেছিলেন ১২ এপ্রিল ১৯১২।

রবীন্দ্রনাথ তার সব কবিতা, পত্র ও প্রবন্ধের নিচে রচনার স্থান ও তারিখ উল্লেখ করতেন। ওই সময় শিলাইদহে অবস্থানকালে তিনি ১৭-১৮টি কবিতা ও গান লেখেন। দেখা যায়, ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ গানটি তিনি রচনা করেন শিলাইদহে; তারিখ ১৪ চৈত্র ১৩১৮ বঙ্গাব্দ, ইংরেজি দিনপঞ্জি অনুযায়ী যা হয় ১৯১২ সালের ২৭ মার্চ। আরও একটি গান ‘এবার ভাসিয়ে দিতে হবে আমার এই তরী’—এটিও শিলাইদহে বসেই কবি লিখেছিলেন ১৩১৮ বঙ্গাব্দের ২৬ চৈত্র, ইংরেজি দিনপঞ্জি অনুযায়ী যা ১৯১২ সালের ৭ বা ৮ এপ্রিল। (সঞ্চয়িতা, অষ্টম মুদ্রণ, প্রতীক প্রকাশন সংস্থা, পৃষ্ঠা ৩৩১)।

রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছিলেন–এর প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এবং ইতিহাসের অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদারের আত্মজীবনী ‘জীবনীর স্মৃতিদ্বীপে’ বইটিকে। ওই বইয়ে দাবি করা হয়েছে, “রবীন্দ্রনাথসহ সকল বাঙালি হিন্দু নেতা ও বুদ্ধিজীবী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চরম বিরোধিতা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার আশুতোষ মুখার্জীর (রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি জামাতা) নেতৃত্বে সেই সময়কার ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না করার জন্য ১৮ বার স্মারকলিপি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। নীচতা এত নীচে নেমেছিল যে, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিদ্রুপ করে বলতেন মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়।”

ছবি: স্ক্রিনশট
ছবি: স্ক্রিনশট

অথচ ২৫৮ পৃষ্ঠার ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’ বইটা পড়তে গিয়ে এর কোথাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ সম্বোধনের প্রমাণ পাওয়া গেল না।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি স্যার আশুতোষ মুখার্জী প্রাথমিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন ঠিকই, তবে বইয়ের বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই প্রতিবাদ ছিল অনানুষ্ঠানিক।

লেখকের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফরে আসেন ১৯২৬ সালে। সে বর্ণনা থাকলেও রবীন্দ্রনাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধিতার কোনো প্রমাণ এই বইয়ে নাই।

তার মানে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে কি কোনো প্রশ্ন করা হয়েছিল? করা হলে রবীন্দ্রনাথ আসলে কী বলতেন? তার আগে জেনে নেওয়া দরকার রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা নিয়ে ভাবনা কী ছিল?

পথের সঞ্চয়ে তিনি বলেছেন, “যে শিক্ষা স্বজাতির নানা লোকের নানা চেষ্টার দ্বারা নানা ভাবে চালিত হইতেছে তাহাকেই জাতীয় বলিতে পারি। স্বজাতীয়ের শাসনেই হউক আর বিজাতীয়ের শাসনে হউক, যখন কোনো একটা বিশেষ শিক্ষাবিধি সমস্ত দেশকে একটা কোনো ধ্রুব আদর্শে বাঁধিয়া ফেলিতে চায় তখন তাহা জাতীয় বলিতে পারি না—তাহা সাম্প্রদায়িক, অতএব জাতির পক্ষে তাহা সাংঘাতিক।”

আজকের যে শিক্ষাক্ষেত্রে বিউপনিবেশায়নের কথা বলা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ তা বহু আগেই তার শিক্ষায় হেরফের, শিক্ষা ও লক্ষ্য এবং অন্যান্য লেখা ও বিভিন্ন বক্তৃতায় বলে গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে তার সময়ে যে শিক্ষাব্যবস্থা দেশে চলেছিল, তাতে হতে পারত না চিন্তা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ। তাই তিনি তার পরবর্তী জীবনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তনের চেষ্টা করেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও কল্পনাশক্তির বিকাশে সহায়ক হবে। তার কাছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় শিক্ষার্থীদের কেবলই কিছু তথ্য প্রদান করা নয়; তথ্য নিয়ে ভাবতে শেখানো। যুক্তি বলতে বোঝায় বিভিন্ন ঘটনাবলির মধ্যে সম্বন্ধ নির্ণয়কে। শিক্ষার লক্ষ্য হতে হবে বিভিন্ন ঘটনাবলির মধ্যে সম্বন্ধ নির্ণয়ের ক্ষমতা বাড়ানো। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি ভাষার পরিবর্তে শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের প্রস্তাব রাখেন। কারণ, এর ফলে জ্ঞান সহজেই তাদের চেতনার অংশ হয়ে উঠবে।

বলে রাখা ভালো ভাষা আন্দোলনের পর থেকে আজ অবধি এ প্রস্তাব শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা ফিরে তুলেই যাচ্ছেন। বাস্তবায়ন দূর অস্ত। আর নিজের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর বর্তমান দশা ও কারিকুলাম দেখলে রবীন্দ্রনাথ কী করতেন, তা সত্যিই এক বড় প্রশ্ন।

সম্পর্কিত