Advertisement Banner

আল জাজিরার প্রতিবেদন

ইরানের যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কতটা ধাক্কা দিয়েছে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরানের যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কতটা ধাক্কা দিয়েছে?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে একটি নতুন সহায়তা কর্মসূচির জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত আইএমএফের মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার গত মঙ্গলবার জানিয়েছেন, বাংলাদেশ আইএমএফ সমর্থিত একটি নতুন কর্মসূচির জন্য অনুরোধ করেছে।

বাংলাদেশ ঠিক কী ধরনের সহায়তা চেয়েছে, আইএমএফের সঙ্গে এই দক্ষিণ এশীয় দেশটির পূর্ব ইতিহাস কেমন এবং এই যুদ্ধ কীভাবে দেশটির অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে–তা জেনে নেওয়া যাক।

এক বিবৃতিতে ক্রজনার বলেন, “আইএমএফের কর্মকর্তারা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সংস্কার এজেন্ডা এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছেন।”

তবে আইএমএফের কাছে চাওয়া বাংলাদেশের এই আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের আকার বা সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী সম্পর্কে কোনো পক্ষই এখনো কিছু প্রকাশ করেনি।

গত মার্চে, ইরানের এই যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার ঋণ চেয়েছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে এবং তেলের দাম হয়েছে আকাশছোঁয়া। গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয় । এটি এখনো ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে। এসব কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী সময় থেকে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৬৬ ডলার থেকে বেড়ে এখন প্রায় ১০০ ডলারে ঠেকেছে।

১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। দেশটি নিজের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৯৫ শতাংশই আমদানি করে থাকে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে যখন ঘরবাড়ি ও অফিস শীতল রাখার প্রয়োজন হয়, তখন এই জ্বালানির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। এই আমদানির একটি বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করতে ঢাকা ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বেশিরভাগ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে গত ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের বাইরে থাকা দেশগুলোর জাহাজ আটকে আছে। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের বাইরে থাকা দেশগুলোর জাহাজ আটকে আছে। ছবি: রয়টার্স

তবে, ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা কেবল জ্বালানি সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) খাতেও আঁচ লেগেছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশির জোগান দেয় এই খাত, সেটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো তাদের কাঁচামালের একটি বড় অংশ আমদানি করে চীন থেকে। এই পণ্যবাহী জাহাজগুলো লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাতায়াত করে, তাই সাম্প্রতিক সময়ে নৌ-যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটার কারণে আমদানি খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

ফ্যাব্রিকস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ডেনিম-এর পরিচালক সাঈদ আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-কে জানিয়েছেন, আগামী মৌসুমে তাদের কাজের অর্ডার (ওয়ার্ক অর্ডার) প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ মাসে বেশ কয়েকটি বিমানসংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিল করে। এর ফলে জারা-এর মালিকানাধীন ‘ইন্ডিটেক্স’ এবং অন্যান্য বড় বড় পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা তৈরি পোশাকের চালান বাংলাদেশ ও ভারতের বিমানবন্দরগুলোতে আটকে পড়ে।

সরবরাহ ব্যবস্থার এই অচলাবস্থা বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্প খাতকেও প্রভাবিত করেছে। প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামালের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রেজিন-এর দামও লাফিয়ে বেড়েছে। অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত এই রেজিন প্লাস্টিক শিল্পের একটি অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। বাংলাদেশের দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে রেজিনের দাম আগে প্রতি টন প্রায় ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলার ছিল, তা এখন বেড়ে প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

আইএমএফ-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামোগত প্রকল্পে অর্থায়ন এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ঠিক রাখতে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। এর ফলে দেশের ওপর মাঝারি কিন্তু ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবং বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের উচ্চচাপ তৈরি হয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'আইএসআই'-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫ বিলিয়ন (১১,৩৫০ কোটি) ডলারে, যা এর আগের প্রান্তিকে ছিল ১১২.২ বিলিয়ন ডলার।

২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকিমুক্ত বা স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল। কারণ তখন দেশটির ঋণের বোঝা ছিল মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) প্রায় ২২ শতাংশ। তবে ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আইএমএফ-এর একটি ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে, যা ২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল এবং চার বছর মেয়াদে চলার কথা ছিল।

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফ-এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে উভয় পক্ষই একটি নতুন কর্মসূচি চালু করার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়েছে। সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট তীব্র সংকটের পর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আমদানি খরচ সামাল দিতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে তারা ৩৫০ মিলিয়ন (৩৫ কোটি) ডলারের একটি ঋণ অনুমোদন করেছে।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং মধ্য ইউরোপের দেশগুলো করোনাভাইরাস মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণের বোঝা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল।

ফাইল ছবি: রয়টার্স
ফাইল ছবি: রয়টার্স

উদাহরণস্বরূপ, বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত ঋণ গ্রহণ এবং দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ২০২৩ সালে দেশটি একটি চার বছর মেয়াদি কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ-এর কাছ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিশ্চিত করে এবং চীন, ভারত ও জাপানসহ ঋণদাতাদের একটি গোষ্ঠীর সাথে ঋণ পুনর্গঠন চুক্তি সম্পন্ন করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণ ছিল তার মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশ।

গত এপ্রিলে আইএমএফ সতর্কবার্তা দিয়েছিল যে, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী ঋণের মাত্রা আরও বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, গত বছর বিশ্বব্যাপী সরকারের মোট ঋণ বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে এবং সতর্ক করা হয়েছে যে ২০২৯ সালের মধ্যে এটি ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর পথে রয়েছে,যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনো দেখা যায়নি।

সম্পর্কিত