Advertisement Banner

যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের হাতে মানুষ মরছে বেশি, কেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের হাতে মানুষ মরছে বেশি, কেন?
আলবুকার্ক শহর। ছবি: উইকিপিডিয়া

নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্ক শহরের পশ্চিম পাশের আট নম্বর সড়কের ১৫১৫ নম্বর অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি প্রথম নজরে কোনো বন্দুকযুদ্ধের জায়গা বলে মনে হবে না। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট যখন সেখানে পরিদর্শনে যায়, তখন শিশুরা বাইরে একটি সুইমিং পুলে খেলছিল। কিন্তু গত ২৬ মে এই ব্লকের শেষের একটি বাড়ি আচমকাই এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হোসে আর্মস নামের ২৩ বছর বয়সী এক তরুণ তখন আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছিলেন।

তার পরিবার সাহায্য চেয়ে জরুরি সেবায় ফোন করে। তারা আশা করেছিল কোনো সমাজকর্মী এসে তরুণটিকে বোঝাবেন, কিন্তু তার বদলে বাড়িটি ঘিরে ফেলে একদল সশস্ত্র পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা আর্মসকে লক্ষ্য করে চিৎকার করতে থাকেন। তার ভাইয়ের ভাষ্যমতে, আর্মস প্রথমে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় বাইরে এসেছিলেন। কিন্তু পুলিশের এমন আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি আবার ভেতরে যান এবং একটি বন্দুক নিয়ে এসে গুলি ছোড়েন। এতে পুলিশের একটি গাড়ির জানলা ভেঙে দেয়। এর পরপরই পুলিশ পাল্টা গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করে।

চলতি বছরে আলবুকার্ক পুলিশ বিভাগের হাতে এটি ছিল চতুর্থ মৃত্যুর ঘটনা। ‘ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স’ নামের একটি অলাভজনক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে এই একটি শহরেই পুলিশের গুলিতে ১১৬ জন প্রাণ হারিয়েছে। অথচ আলবুকার্কের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি জনসংখ্যার শহর বোস্টনে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ১৬। আর কঠোর বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকা যুক্তরাজ্যে গত ১৩ বছরের এই দীর্ঘ সময়ে পুলিশের গুলিতে মোট নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪।

আলবুকার্কের এই পরিস্থিতি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহত্তর ও গভীর সংকটের চরম রূপ মাত্র। ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত এক দশকে মার্কিন পুলিশের হাতে সাধারণ নাগরিক নিহতের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর এই সংখ্যা কিছুটা কমলেও, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তা আবারও দ্রুত বাড়ছে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

যখন পুরো যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ হত্যাকাণ্ডের হার দিন দিন কমছে, তখন পুলিশের হাতে মৃত্যুর হার বাড়ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গুলিতে নিহত প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন মারা যাচ্ছেন খোদ পুলিশের হাতে। ছয় বছর আগে মিনিয়াপলিসে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর যখন লাখো মানুষ রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করেছিলেন, তখন আশা করা হয়েছিল পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

আলবুকার্কের জন্য এই চ্যালেঞ্জ নতুন নয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে দেশটির বিচার বিভাগ এক কঠোর প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, এই শহরের পুলিশ কর্মকর্তারা সামান্যতম হুমকিতেও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেন। সেই রিপোর্টের কিছু আগেই একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে পকেটছুরি হাতে থাকা জেমস বয়েড নামের এক সিজোফ্রেনিক গৃহহীন মানুষের ওপর পুলিশ প্রথমে স্টান গ্রেনেড ছোড়ে, তারপর তার পেছনে হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দেয় এবং তাকে গুলি করে হত্যা করে।

পরবর্তী ১১ বছর ধরে আলবুকার্ক পুলিশ বিভাগকে একটি কেন্দ্রীয় আদালতের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছিল, যা শহর কর্তৃপক্ষকে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ কমানোর নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করে। গত বছর এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়, যখন কেন্দ্রীয় সরকার এবং শহর কর্তৃপক্ষ একমত হয় যে পুলিশ এর শর্তগুলো সঠিকভাবে মেনে চলেছে। কিন্তু কাগজে-কলমে এই সংস্কার স্থায়ী রূপ নিলেও বাস্তবে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এটা নিয়ে কাজ করা ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর ল স্কুলের অধ্যাপক অ্যালফ্রেড ম্যাথিউসন করে বলেন, “এই নজরদারি চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই ছিল পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনা কমানো, কিন্তু আমরা সেই মূল লক্ষ্যটি অর্জন করতে পারিনি।”

তাহলে এই পরিস্থিতির সমাধানে কী করা যেতে পারে? জাতীয়ভাবে এখন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও প্রাণঘাতী আচরণের জন্য অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টা কিছুটা বাড়লেও সেই সংখ্যা খুবই কম। প্রতি বছর বেসামরিক নাগরিক হত্যার দায়ে বড়জোর ডজনখানেক পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের চার্জ আনা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকে সরাসরি দোষ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ গুলিতে নিহত ব্যক্তিদের বেশিরভাগই সশস্ত্র থাকেন।

ফলে, যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকের ওপর আইনি বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অনীহা থাকায়, সংস্কারবাদীরা এখন পুলিশের রণকৌশল পরিবর্তনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, শিকাগোতে পুলিশ কর্মকর্তাদের পায়ে হেঁটে অপরাধীদের তাড়া করার ওপর সীমাবদ্ধতা দেওয়ার পর সেখানে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। কারণ হেঁটে তাড়া করতে গিয়ে অনেক সময় অফিসাররা সশস্ত্র অপরাধীর সামনে কোণঠাসা হয়ে পড়েন।

আলবুকার্কের মানবাধিকার আইনজীবী লরা আইভস, যিনি এই শহরের বেশ কয়েকটি অন্যায়ভাবে হত্যার মামলা নিয়ে কাজ করেছেন, তিনি উল্লেখ করেন যে এই নজরদারি চুক্তিটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। এর ফলে পুলিশ এখন অন্তত এই প্রশিক্ষণ পেয়েছে যে, কখন অস্ত্র উঁচিয়ে ধরতে হবে আর কখন টেসার (লেজার গান) ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া এখন সব অফিসারের কাছেই বডি ক্যামেরা থাকে।

কিন্তু সমস্যাটি অত্যন্ত গভীর। পুলিশ অফিসাররা এখন নিজেদের সুরক্ষার বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক। আইনজীবী লরা আইভস দ্য ইকোনোমিস্টকে বলেন, “আগে অফিসাররা অপরাধীকে হাত দিয়ে বা শারীরিকভাবে কাবু করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।” কিন্তু এখন যেকোনো ঝুঁকিপূর্ণ বা জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেই তারা সরাসরি অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করেন। এর ওপর মানসিক রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০১০-এর দশকে মানসিক স্বাস্থ্য খাতের সরকারি বাজেটে যে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছিল, তার নেতিবাচক প্রভাব আলবুকার্ক শহর আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে তীব্র গণবিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল, পুলিশের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো হয়তো এখনো তেমন ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, প্রতিদিন এমন কোনো না কোনো ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে যা যেকোনো মুহূর্তে আবারও বড় আন্দোলনের সূত্রপাত করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কাউন্টি শেরিফদের গুলিতে নিহতের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা বড় বড় শহরের ইতিবাচক সংস্কারের সাফল্যকেও ম্লান করে দিচ্ছে।

যেমন, সম্প্রতি মিসিসিপির একটি ছোট শহরে এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে যেখানে পুলিশ অফিসাররা একটি গাড়ি লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গাড়ির ভেতরে থাকা মাত্র এক বছর বয়সী এক শিশুকে হত্যা করে। পুলিশের দাবি, গাড়িটির চালক, যার বিরুদ্ধে শিশুদের ডায়াপার চুরির অভিযোগ ছিল; তিনি গাড়ি দিয়ে পুলিশদের চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। তবে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশের এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন। অফিসারদের দাবি ছিল, তারা গাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন পুলিশ গাড়িটিকে তাড়া করার সময় গুলি চালিয়েছিল।

সম্পর্কিত