Advertisement Banner

ইসরায়েল-লেবাননের চুক্তিটি আসলে কী?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইসরায়েল-লেবাননের চুক্তিটি আসলে কী?
ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবানন গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে একটি ঐতিহাসিক ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট সই করেছে।

চুক্তি সইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিষয়টিকে ‘শুরুর শুরু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “সামনে এখনো অনেক কাজ বাকি। আজকের এই দিনটি হলো প্রথম পদক্ষেপ। আর প্রথম পদক্ষেপটিই অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন হয়।”

চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে এই সরাসরি আলোচনা শুরু হয়েছিল। তিন পক্ষের এই আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও সই করেছে। তবে এই চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েল এখনই দক্ষিণ লেবাননের সেই বিশাল এলাকা থেকে এখনই সেনা সরাতে বাধ্য নয়। এলাকাটি ইসরায়েলি সেনারা দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছে।

এছাড়াও, ইসরায়েল স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে যে, নিজেদের সুরক্ষায় প্রয়োজন মনে করলে তারা লেবাননে হামলা চালানো অব্যাহত রাখবে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলের এই যুদ্ধ চলছে এবং গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

চুক্তিতে কী আছে?

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনা, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এবং তাদের সামরিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে হুমকি দূর হলে ইসরায়েলি নাগরিকেরা নিরাপদে নিজেদের সীমান্তে ফিরে যেতে পারবে। চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় সামরিক সমন্বয় গ্রুপও গঠন করা হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

এদিকে, লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো সমস্ত লেবানিজ ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা। তবে তিনি আরও বলেন, চুক্তিটি মূলত অতীতের চুক্তি এবং জাতিসংঘের প্রস্তাবনারই একটি ধারাবাহিকতা, যা লেবাননের সেনাবাহিনীকে দেশের সব অংশের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব দেবে এবং একই সাথে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয়ের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

চুক্তি সইয়ের কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই চুক্তির লিখিত অংশ প্রকাশ করে। এতে একটি পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া বা ধাপে ধাপে এগোনোর কথা বলা হয়েছে। যেখানে লেবানিজ সেনাবাহিনী প্রথমে হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র সন্ত্রাস গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করবে এবং পুরো দেশে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করবে।

এরপরই কেবল ইসরায়েল পর্যায়ক্রমে লেবানন থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করতে পারবে। প্রাথমিক সেনা প্রত্যাহারের জন্য দুটি পাইলট জোন বা পরীক্ষামূলক এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে লেবানন সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। সেখানে হিজবুল্লাহর অস্ত্রহীন হওয়া এবং তাদের অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক সহায়তায় পুনর্গঠন কাজ শুরু হবে এবং সাধারণ নাগরিকেরা নিরাপদে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবে।

লেবাননের বর্তমান সামরিক পরিস্থিতি

ইসরায়েল এরইমধ্যে দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম ও শহর ধ্বংস করে দিয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাজধানী বৈরুত এবং পূর্ব অঞ্চলের বেকা উপত্যকাতেও হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে তীব্র হামলা চালানো হয়েছে। পূর্বে ওয়াশিংটনে হওয়া আলোচনার ফলে লড়াই কিছুটা কমলেও ইসরায়েল আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করেনি এবং এখনো লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের দিনও মেফাদুন শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুজন নিহত হন এবং নাবাতিহ আল-ফাওকা শহরেও বোমাবর্ষণ করা হয়। এছাড়া আল-মানসুরি শহরের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বিমান থেকে লিফলেট ফেলেছে। হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি যোদ্ধাদের মধ্যে এখনো লড়াই চলছেই। তবে লেবাননের একটি সামরিক সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগত আলি আল-তাহের পর্বত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। সেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এই চুক্তি শান্তি আনতে পারবে?

প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি কি শান্তি আনতে পারবে নাকি ব্যর্থ হবে?

এই প্রশ্নটির উত্তরে আসলে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা কঠিন। কারণ ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব এখানে লেবানন রাষ্ট্রের সাথে যতটা, তার চেয়ে বেশি হিজবুল্লাহর সাথে। ১৯৪৮ সালে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিবেশী লেবাননের সাথে তাদের যুদ্ধাবস্থা চলছে। এর আগে ১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন দখল করে রেখেছিল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধকে উত্তর ইসরায়েলের নাগরিকদের সুরক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যতক্ষণ না হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র হচ্ছে এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর থেকে হুমকি কাটছে, ততক্ষণ ইসরায়েলি বাহিনী লেবানন ছাড়বে না। অন্যদিকে, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই চুক্তিকে লেবাননের সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়ার এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘরে ফেরার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

ছবি: এআই
ছবি: এআই

তবে সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো, ওয়াশিংটনের এই আলোচনা টেবিলে হিজবুল্লাহর কোনো উপস্থিতি ছিল না। টেবিলে না থাকলেও এই চুক্তি বাস্তবায়নে তাদের মতামতকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। তাদের দাবি- ইসরায়েলকে নিঃশর্তভাবে লেবানন ত্যাগ করতে হবে এবং ইসরায়েলের সাথে কোনো ধরনের স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। হিজবুল্লাহর অবস্থান হলো ইসরায়েলকে বিশ্বাস করা যায় না এবং লেবানিজ সেনাবাহিনী যদি তাদের রক্ষা করতে না পারে, তবে লড়াইয়ের জন্য তাদের নিজেদের কাছেই অস্ত্র রাখতে হবে। দলটির সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, লেবানন সেনাবাহিনী যদি ওয়াশিংটনের এই চুক্তি জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চায়, তবে দেশে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে।

স্বভাবতই, এই চুক্তির যে রূপরেখা, যেখানে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আগে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার কথা বলা হয়েছে তা হিজবুল্লাহ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। চুক্তিতে যদিও একটি লাইন লেখা আছে যে লেবাননের ভূমির প্রতি ইসরায়েলের কোনো আঞ্চলিক লোভ নেই, কিন্তু ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইসরায়েল দীর্ঘ মেয়াদে লেবাননে অবস্থান করতে পারে। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, “হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানে আছি এবং আমি মনে করি এর পরেও আমাদের থাকতে হবে, কারণ আমাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য একটি নিরাপদ সীমান্ত প্রয়োজন।”

সম্পর্কিত