‘বিলায়াত-ই ফকিহ’ তত্ত্বের ওপর কীভাবে চলছে ইরান

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
‘বিলায়াত-ই ফকিহ’ তত্ত্বের ওপর কীভাবে চলছে ইরান
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: রয়টার্স

অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচিত একটি বিষয়। ইরানের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার পতন হবে কি না—তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনা চলছে। বাস্তবে ইরানের শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির। এখানে ধর্মতন্ত্র ও গণতন্ত্র একসঙ্গে সহাবস্থান করে, পাশাপাশি দেশের শাসনে সেনাবাহিনীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স।

ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ‘বিলায়াত-ই ফকিহ’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, নবম শতকে অন্তর্ধান হওয়া শিয়া মুসলমানদের দ্বাদশ ইমামের প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা একজন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে ন্যস্ত থাকা উচিত।

প্রথম সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন। তিনি এমন একটি শাসনব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়ন করেন, যেখানে নির্বাচিত সরকারের ঊর্ধ্বে একজন ধর্মীয় নেতা অবস্থান করেন।

তার উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর এই নীতিকে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে তিনি চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হন এবং নির্বাচিত সরকারের পাশাপাশি তার অনুগতদের নিয়ে একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

খামেনি তার কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে, যার নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে তার উপদেষ্টা আলী লারিজানির হাতে ছিল। খামেনির অন্যান্য উপদেষ্টারাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত, যাদের মধ্যে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলী শামখানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর ভেলায়াতি উল্লেখযোগ্য।

৮৬ বছর বয়সী খামেনি এখনো কোনো উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করেননি। তিনি নিহত বা ক্ষমতাচ্যুত হলে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন, তা স্পষ্ট নয়। তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হলেও, তার পূর্বসূরির নাতি হাসান খোমেনি এবং কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাও আলোচনায় রয়েছেন।

ইরান কি ধর্মতান্ত্রিক দেশ?

ইরানের ধর্মীয় অভিজাত গোষ্ঠীর অধীনে একাধিক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে তারা দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

বিশেষজ্ঞ পরিষদ নির্বাচিত জ্যেষ্ঠ আয়াতুল্লাহদের নিয়ে গঠিত, যার মেয়াদ আট বছর। এই পরিষদ সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগের দায়িত্ব পালন করে। সংবিধান অনুযায়ী, প্রয়োজনে তারা সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে বা তাকে অপসারণও করতে পারে। তবে বাস্তবে কখনোই এই ক্ষমতার প্রয়োগ দেখা যায়নি।

ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ‘বিলায়াত-ই ফকিহ’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রতীকী ছবি
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ‘বিলায়াত-ই ফকিহ’ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রতীকী ছবি

গার্ডিয়ান কাউন্সিল-এর অর্ধেক সদস্যকে নিয়োগ দেন সর্বোচ্চ নেতা এবং বাকি অর্ধেককে বিচার বিভাগের মাধ্যমে মনোনীত করা হয়। এই কাউন্সিল সংসদে পাস হওয়া আইন বাতিল করতে পারে এবং নির্বাচনী প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখে। খামেনির সমালোচকদের নির্বাচন থেকে বাদ দিতে এই ক্ষমতা প্রায়ই ব্যবহৃত হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হলো এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল, যার সদস্যরা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা খামেনি কর্তৃক নির্বাচিত হন। এই কাউন্সিল নির্বাচিত সংসদ ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তি করে।

ইরানে শিয়া মতাদর্শভিত্তিক ইসলামী শরিয়াহ আইন অনুসরণ করা হয় এবং বিচারকরাও ধর্মীয় নেতা বা আলেম। বিচার বিভাগের প্রধানকে নিয়োগ দেন সর্বোচ্চ নেতা। বর্তমান প্রধান গোলামহোসেন মোহসেনি এজেই, যিনি ২০০৯ সালে মন্ত্রী থাকাকালে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়নের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন।

অন্যান্য প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছেন এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের প্রধান ও সাবেক বিচার বিভাগের প্রধান সাদিক লারিজানি, বিশেষজ্ঞ পরিষদ ও এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সদস্য মোহসেন আরাকি এবং তেহরানের জুমার নামাজের খতিব আহমদ খাতামি।

তবে সব ধর্মীয় নেতা ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সমর্থক নন। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা এর সমালোচকও। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির মতো কিছু নেতা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সংস্কার ও আরও নমনীয় করার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি সফল হননি।

ইরানের সেনাবাহিনী কতটা শক্তিশালী?

ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হলেও, তারা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কাছে জবাবদিহি করে।

ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নির্বাচিত সরকারের অধীনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। ছবি: রয়টার্স
ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নির্বাচিত সরকারের অধীনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। ছবি: রয়টার্স

ইসলামি বিপ্লবের পরপরই এই বাহিনী গঠিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা। ১৯৮০–৮৮ সালের ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসির ভূমিকা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। বর্তমানে এটি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও আধুনিক অংশ।

গত কয়েক দশকে এই বাহিনীর সদস্যরা রাজনীতি ও ব্যবসা—উভয় ক্ষেত্রেই তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে। এর ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

আইআরজিসির অভিজাত শাখা কুদস ফোর্স মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে লেবানন ও ইরাকের শিয়া গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের মাধ্যমে। তবে ২০২০ সালে ইরাকে মার্কিন বিমান হামলায় কুদস ফোর্সের তৎকালীন কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়া এবং ২০২৪ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলায় লেবাননের হিজবুল্লাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই কৌশল বড় ধাক্কা খেয়েছে।

আইআরজিসির অধীনে একটি খণ্ডকালীন আধাসামরিক বাহিনী রয়েছে, যার নাম বাসিজ মিলিশিয়া। তারা মূলত ইরানের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ দমনের কাজে নিয়োজিত।

এই শতাব্দীর শুরু থেকে বিপ্লবী গার্ডদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাতাম আল-আনবিয়া ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প পেয়েছে।

গত বছর ইসরায়েলের হামলায় আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের নিহত হওয়া এবং ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহ নেতাদের মৃত্যুর ঘটনায় আইআরজিসির উচ্চপর্যায়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না—সে প্রশ্নও উঠেছে।

এসব সত্ত্বেও আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, তার উপপ্রধান আহমাদ বাহিদি, নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরি এবং বর্তমান কুদস ফোর্স কমান্ডার ইসমাইল ঘানি এখনও অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত।

ইরানে গণতন্ত্র কীভাবে কাজ করে?

ইরানে প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বাধীন সরকার সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদিত সীমার মধ্যেই প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরের বছরগুলোতে নির্বাচনে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা দেখা গেলেও, প্রার্থীদের ওপর গার্ডিয়ান কাউন্সিলের কঠোর বিধিনিষেধ এবং ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনী ফলাফল বহু ভোটারের আস্থা ক্ষুণ্ন করে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতার সর্বব্যাপী ভূমিকার কারণে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা ও কার্যপরিধি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রথম দফার ভোটে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার অংশ নেন, তবে দ্বিতীয় দফায় এই হার অর্ধেকে নেমে আসে। ওই নির্বাচনে তিনি খামেনির ঘনিষ্ঠ অনুগত ও পশ্চিমবিরোধী কট্টরপন্থী নেতা সাঈদ জালিলিকে পরাজিত করেন, যিনি এখনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে রয়ে গেছেন।

২০২০ সাল থেকে ইরানের সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ।

সম্পর্কিত