Advertisement Banner

বৃষ্টি-লিমনের সঙ্গে আসলে কী হয়েছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বৃষ্টি-লিমনের সঙ্গে আসলে কী হয়েছে
জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা এস বৃষ্টি। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ফ্লোরিডার পিনেলাস কাউন্টির একটি নদী থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এই দেহাবশেষ নিখোঁজ শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির কি না–তা যাচাই করা হচ্ছে।

এর আগে গত শুক্রবার নিখোঁজ আরেক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ।

গত সপ্তাহে ২৭ বছর বয়সী নাহিদা বৃষ্টি ও জামিল লিমন নিখোঁজ হন। ধারণা করা হচ্ছে, বৃষ্টিও আর বেঁচে নেই। গত শুক্রবার ফ্লোরিডার টাম্পার কাছে একটি সেতুতে লিমনের লাশ পাওয়া যায়। শনিবার লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তদন্তে কী পাওয়া গেল

মার্কিন আদালতের নথির বরাত দিয়ে ফ্লোরিডাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাম্পা বে টাইমস জানিয়েছে, মামলার প্রাথমিক প্রমাণে অভিযোগের ভয়াবহতা স্পষ্ট। এ কারণে প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে রাখার দাবি জানান প্রসিকিউটররা।

নিখোঁজের খবর স্থানীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর, হিশাম আবারও চ্যাটজিপিটিতে খোঁজ করেন, “মিসিং এনডেঞ্জারাড এডাল্ট বলতে কী বোঝায়”।

পিনেলাস কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনার অফিসের ময়নাতদন্তে দেখা যায়, লিমনের শরীরে অনেকগুলো কাটা ও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

আদালতের নথিতে পাওয়া গেছে, লিমন ও বৃষ্টি নিঁখোজ হওয়ার আগে হিশাম চ্যাটজিপিটিকে বেশ কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিল।

১৩ এপ্রিল তিনি চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেছিল, “একজন মানুষকে কালো ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হয়।” চ্যাটজিপিটি উত্তর দিয়েছিল, “এটি বিপজ্জনক শোনাচ্ছে”। তখন হিশাম লিখেছিল, “তারা কীভাবে জানবে।”

দুই শিক্ষার্থী নিঁখোজ হওয়ার একদিন আগে হিশাম জিজ্ঞেস করেছিল, গাড়ির ভিআইএন নম্বর বদলানো যায় কি না, লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে বন্দুক রাখা যায় কি না।

ঘটনার তিনদিন পর হিশাম চ্যাটজিপিটিকে আবার প্রশ্ন করেন, স্নাইপারের গুলি মাথায় লাগলে কেউ বাঁচে কিনা, প্রতিবেশীরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে কিনা।

হিশাম আবুঘারবিহ। ছবি: হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস
হিশাম আবুঘারবিহ। ছবি: হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস

টাম্পা বে টাইমস প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ১৭ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৪টার কিছু পর ইউএসএফের শিক্ষার্থী ওমর হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বিভাগে গিয়ে জানান, আগের দিন সকাল প্রায় ১০টার পর থেকে তিনি তার বন্ধু বৃষ্টির কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না, তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাদের আরেক বন্ধু লিমনের ফোনে কল দিলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

ওমর হোসেন জানান, তিনি অ্যাভালন হাইটস স্টুডেন্ট হাউজিং কমপ্লেক্সে লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে যান। সেখানে লিমনের স্কুটার ছিল। তবে তার রুমমেট রিশিত রাজ মাথুর জানান, তিনি লিমনকে দেখেননি। লিমনের শোবার ঘরের দরজায় নক করলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

আরেক বন্ধু নিশাত তাসনিম জানান, ১৬ এপ্রিল দুপুর ১১টা ৩০ মিনিটে এবং দুপুর ২টা ১৪ মিনিটে বৃষ্টির সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। দ্বিতীয়বার বৃষ্টি তার চশমা নিয়ে আসতে বলেছিলেন। বিকেল ৫টায় বন্ধু অপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু বৃষ্টি আর আসেননি।

ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওইদিন দুপুরের কিছু পর বৃষ্টি ভবন থেকে বের হয়ে উত্তর দিকে হাঁটছিলেন। রোদ থেকে বাঁচতে তার হাতে একটি ছাতা ছিল। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ভবনে বৃষ্টির আইপ্যাড ও লাঞ্চবক্স পেয়েছে পুলিশ।

ইউএসএফ পুলিশ লিমনের ফোন ট্র্যাক করার চেষ্টা করে। ১৬ এপ্রিল বিকেলে ফোনটির অবস্থান ক্যাম্পাস এলাকায় দেখা গেলেও পরে সেটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল সেতুর কাছে শনাক্ত হয়। আরও দুটি লোকেশন স্যান্ড কি পার্ক এলাকার কাছাকাছি পাওয়া যায়। এরপর ফোনটি আর কোনো অবস্থানের সংকেত দেয়নি।

আদালতের নথিতে আরও বলা হয়, নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের খোঁজে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের তদন্তকারীরা নেতৃত্ব দেন। তারা লিমনের আরেক রুমমেট হিশামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন তার বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। তিনি দাবি করেন, পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে আঘাত পেয়েছেন।

পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন হিশাম আবুগারবিয়েহ। ছবি: হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস
পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন হিশাম আবুগারবিয়েহ। ছবি: হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস

তদন্তে দেখা যায়, ১৬ এপ্রিল রাতে কোর্টনি ক্যাম্পবেল সেতুতে তার গাড়ি হুন্দাই জেনেসিস জি৮০ চলাচলের রেকর্ড রয়েছে। একই সময় লিমনের ফোনের অবস্থানও ওই এলাকায় ছিল।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গাড়িটি ইউএসএফ এলাকা থেকে ক্লিয়ারওয়াটার হয়ে স্যান্ড কি এলাকায় গিয়ে আবার রাতে টাম্পায় ফিরে যান।

প্রথমে হিশাম দাবি করেন, নিখোঁজ দুজন তার গাড়িতে ছিলেন না। পরে ফোন রেকর্ড দেখানোর পর তিনি বলেন, লিমনের অনুরোধে তাদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে চলে যান। আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হিশামের গাড়িটি সম্প্রতি পরিষ্কার করা হয়েছে।

হিশামের অ্যাপার্টমেন্টের ডাস্টবিন থেকে তদন্তকারীরা ১৬ এপ্রিল রাত ১০টা ৪৭ মিনিটে একটি সিভিএস রসিদ উদ্ধার করেন, যেখানে ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইসোল ওয়াইপস, ফেব্রিজসহ বিভিন্ন জিনিস কেনার তথ্য ছিল। প্রথমে তিনি কেনাকাটার বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে জানা যায়, ডোরড্যাশের মাধ্যমে তিনি এসব অর্ডার করেছিলেন।

ডাস্টবিনে একটি সিলভার ডাক্ট-টেপও পাওয়া যায়, যাতে রক্তের দাগ ছিল। লিমনের ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় বৃষ্টির পার্স, পরিচয়পত্র, জুতা ও সেই ছাতাটি, যা সিসিটিভিতে দেখা গিয়েছিল।

রুমমেট মাথুর জানান, অ্যাপার্টমেন্ট থেকে রান্নাঘরের ম্যাট, তোয়ালে, হাঁড়ি-পাতিলসহ কিছু জিনিস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি আরও বলেন, হিশাম একটি ট্রলিতে করে কিছু বাক্স ‘ডাস্ট কমপ্যাক্টরে’ ফেলেছিলেন। সেই কমপ্যাক্টর থেকে উদ্ধার করা হয় লিমনের ওয়ালেট, চশমা, বৃষ্টির আইফোন কভারসহ রক্তমাখা পোশাক ও অন্যান্য জিনিস।

ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা যায়, রান্নাঘর থেকে হিশামের ঘর পর্যন্ত ছোট ছোট রক্তের দাগ রয়েছে। তার ঘরের মেঝেতে দুটি আলাদা রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায় বলে তদন্তকারীরা উল্লেখ করেছেন। বিছানার নিচে পাওয়া যায় ট্র্যাশ ব্যাগ ও ডাক্ট-টেপ।

ফোন রেকর্ড অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতের পর হিশাম আবার টাম্পা বে অতিক্রম করে সেন্ট পিটার্সবার্গের দিকে যান।

এদিকে নিখোঁজের খবর স্থানীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর, হিশাম আবারও চ্যাটজিপিটিতে খোঁজ করেন, “মিসিং এনডেঞ্জারাড এডাল্ট বলতে কী বোঝায়”।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউজ উইকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুগারবিয়েহ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক সহিংস অপরাধের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।

সম্পর্কিত