১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহতম দিন। সেদিনের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হেনে এক রাতে প্রাণ কেড়ে নেয় ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষের। লক্ষাধিক মানুষ হয়ে পড়ে গৃহহীন। ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগের এই ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পুরো উপকূলীয় অঞ্চল, বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
এটি ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি। অথচ এই ঘূর্ণিঝড়ের পর চাকরি হারাতে হয়েছিল বাংলাদেশের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধানকে। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল?
এই ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি দাঁড়ায় প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে অকল্পনীয়। তখন দেশের বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। ফলে এই ক্ষয়ক্ষতি দেশের জন্য ছিল ভয়াবহ আঘাত।
ঘূর্ণিঝড়ের পর দেখা যায়, শুধু প্রাণহানি নয়-ক্ষুধার্ত, গৃহহীন মানুষের আর্তনাদে ভরে গেছে চারদিক। প্রায় এক কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল দেশের বাকি অংশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো। জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিমানবন্দর অচল হয়ে পড়ে।
ছবি: সংগৃহীতসেই রাতে প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে উপকূলে। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। একটি দৃশ্য আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন-কর্ণফুলী সেতু দুই টুকরো হয়ে গেছে, আর তার ওপর আছড়ে পড়েছে নৌবাহিনীর একটি বিশাল ফ্রিগেট।
এখন প্রশ্ন কেন বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী প্রধানকে চাকরি হারাতে হয়েছিল?
মূল অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় তাদের গাফিলতি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত। কারণ, এই ঘূর্ণিঝড় আকস্মিক ছিল না। ২৩ এপ্রিল বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়, যা ২৭ এপ্রিলের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। ২৮ এপ্রিল সকাল নাগাদ এটি হারিকেন শক্তি অর্জন করে। অর্থাৎ, পর্যাপ্ত সতর্কতা নেওয়ার সময় ছিল।
তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল মমতাজউদ্দিন আহমেদ এবং নৌবাহিনী প্রধান ছিলেন রিয়ার অ্যাডমিরাল আমির আহমেদ মোস্তফা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও তারা সামরিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমানবন্দরে (বর্তমান শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) রাশিয়া থেকে সদ্য আনা কয়েকটি হেলিকপ্টার কন্টেইনারে রাখা ছিল, যেগুলোর সংযোজন কাজও শেষ হয়নি। পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিমানঘাঁটিতে প্রায় ৪০টি যুদ্ধবিমান খোলা অবস্থায় রাখা ছিল। ভয়াবহ ঝড়ে এসব যুদ্ধবিমান খড়কুটোর মতো ছিটকে পড়ে এবং অধিকাংশই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যায়। এই ক্ষতির ধাক্কা সামাল দিতে বিমানবাহিনীকে বহু বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা নৌবাহিনীর ফ্রিগেটসহ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ ঝড়ে ছিটকে পড়ে। একটি ফ্রিগেট কর্ণফুলী সেতুর ওপর আছড়ে পড়ে সেটিকে ভেঙে ফেলে।
ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই প্রশ্ন ওঠে—হাজার হাজার কোটি টাকার সামরিক সম্পদ কেন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়নি? বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়, গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।
তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল এক সংবেদনশীল পর্যায়ে। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি, এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। তবে তখনও রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বহাল ছিল।
ছবি: সংগৃহীতসশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ বিমান ও নৌবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি তদন্তের নির্দেশ দেন। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তদন্ত শেষে গঠিত কমিটি দুই বাহিনী প্রধানের অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণ পায়। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত আরেকটি তদন্ত কমিটিও একই ফলাফল দেয়।
দুই তদন্তের ফলাফল মিলিয়ে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালের ৪ জুন রাষ্ট্রপতি মমতাজউদ্দিন আহমেদ ও আমির আহমেদ মোস্তফাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠান।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ছিল বাংলাদেশের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। বিপুল প্রাণহানি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসের পাশাপাশি ছিল ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব সম্প্রদায় সাহায্যের হাত বাড়ালেও বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সেই সাহায্য পৌঁছে দেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন।
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ‘অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল’ নামে একটি বৃহৎ ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। এটি আজও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সহায়তা অভিযান হিসেবে পরিচিত।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামাল দেয়। তবে বিমান ও নৌবাহিনীর এই ক্ষতি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।