Advertisement Banner

বাংলাদেশ সীমান্তে কেন সাপ-কুমির ছাড়তে চায় ভারত?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাংলাদেশ সীমান্তে কেন সাপ-কুমির ছাড়তে চায় ভারত?
সীমান্তে কুমির ছাড়তে চায় ভারত। ছবি: রয়টার্স

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় এবং মিজোরাম রাজ্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এই অঞ্চলের ভূখণ্ড অত্যন্ত দুর্গম এবং প্রতিকূল, যা পাহাড়, নদী এবং উপত্যকার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ভারত সীমান্তের প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বেড়া নির্মাণ করেছে। কিন্তু অবশিষ্ট অংশগুলো জলাভূমি ও নদীমাতৃক এলাকা, যার উভয় পাশেই স্থানীয় জনবসতি রয়েছে।

ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী-বিএসএফ তাদের সাম্প্রতিক এক বার্তায় সীমান্ত ইউনিটগুলোকে নদীপথের ফাঁকা জায়গাগুলোতে ‘সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করার’ মাধ্যমে নির্দেশনাবলী কঠোরভাবে পালন করার নির্দেশ দিয়েছে। কর্মকর্তাদের এই নির্দেশনা পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ প্রথম এই খবরটি প্রকাশ করে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, অত্যন্ত প্রতিকূল ভূখণ্ড সত্ত্বেও বিএসএফ বাংলাদেশ থেকে অবৈধ আন্তঃসীমান্ত কর্মকাণ্ড এবং নথিপত্রহীন অভিবাসন রোধে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু সমস্যাযুক্ত এলাকা যেমন নদীমাতৃক বা নিচু এলাকা, সীমান্তের খুব কাছের জনবসতি, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ঝুলে থাকা মামলা এবং সীমান্তবাসীর প্রতিবাদের কারণে এই সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু অংশে বেড়া দেওয়ার কাজ ধীরগতিতে চলছে।

বিশ্লেষক এবং মানবাধিকার কর্মীরা শরণার্থী ও অভিবাসীদের ঠেকাতে কুমিরের মতো বিপজ্জনক প্রাণী ব্যবহারের এই সম্ভাবনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উত্তর-পূর্ব এবং পূর্ব ভারতের সীমান্ত রাজ্যগুলো নিয়ে কাজ করা গবেষক অংশুমান চৌধুরী আল-জাজিরাকে বলেন, “এটি যদি অশুভ এবং বিপজ্জনক না হতো, তবে তা হাস্যকর শোনাত। পুরো বিষয়টি কি অদ্ভুত নয়?”

অংশুমান চৌধুরীর যুক্তি, “একবার যদি বিষধর সাপ ও কুমির ছেড়ে দেওয়া হয়, তারা বুঝতে পারবে না কে বাংলাদেশি আর কে ভারতীয়।”

তিনি আরও বলেন, “এটি নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চরম নিষ্ঠুরতা এবং অমানবিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। মানুষের বিরুদ্ধে প্রকৃতি ও প্রাণীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন উপায়। এটি এক নতুন ধরনের জৈব-রাজনৈতিক সহিংসতা।”

অংশুমান আল জাজিরাকে বলেন, “নদীই হলো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। এই চিন্তাধারাটি মূলত বিএসএফ-এর দীর্ঘদিনের এই অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে যে, সীমান্তের নদীতে বেড়া দেওয়া কার্যত অসম্ভব।”

এই ভাবনার পেছনে আসল কারণ কী?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, নথিপত্রহীন অভিবাসীরা দেশের জন্য এক বড় হুমকি, কারণ তারা ভারতের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদি সরকার এই ধরনের বাগাড়ম্বর বা বক্তব্য ব্যবহার করে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাঙালি মুসলমানদের হয়রানি করছে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির সময় বাংলা দ্বিখণ্ডিত আলাদা করা হয়েছিল, যার ফলে সীমান্তের উভয় পাশে বসবাসকারী মানুষেরা আজও একই সাংস্কৃতিক ও জাতিগত শিকড় বহন করে চলেছে।

বিএসএফ কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার ভারতীয় মুসলমানদের বন্দুকের মুখে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার জন্য সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। ভারতে কতজন নথিপত্রহীন অভিবাসী রয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। যদিও এই মাস থেকে একটি নতুন আদমশুমারি শুরু হয়েছে, তবে সর্বশেষ আদমশুমারি হয়েছিল ২০১১ সালে।

মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মান্দার বলেন, “নথিপত্রহীন অভিবাসীদের সংখ্যা যদি বেড়েও থাকে, তবে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনা করে বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের হস্তান্তরের পরিবর্তে ভারত ‘বিচারবহির্ভূত’ পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।” 

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ভারত সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের অভিবাসীদের সাথে গুলিয়ে ফেলে তাদের ওপর অন্যায় আচরণ করার অজুহাত হিসেবে একে ব্যবহার করছে।

সরকারের অভিবাসীদের চিহ্নিত করার অভিযানের কথা উল্লেখ করে মান্দার আল জাজিরাকে বলেন, “তথাকথিত ‘বিতর্কিত নাগরিকত্ব’ প্রশ্নে ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিষ্ঠুরতা। এটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার অবজ্ঞার শামিল। বাস্তবে ভারতীয় মুসলমানদের সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।”

মান্দার আরও যোগ করেন, “ভারতীয় মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু করা বাঙালি মুসলমানদের ক্রমাগত এই আতঙ্কের মধ্যে রাখার একটি উপায় ।”

গবেষক অংশুমান চৌধুরী জানান, তিনি আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে এমন অনেক ভারতীয় নাগরিকের মামলা নিয়ে কাজ করেছেন যাদেরকে কেবল নাগরিকত্বের প্রমাণস্বরূপ নথিপত্র দেখাতে না পারার কারণে বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

অংশুমান বলেন, “এই জোরপূর্বক বহিষ্কার বা বিতাড়ন হলো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের নতুন এক প্রক্রিয়া, যা অত্যন্ত অশুভ।”

সীমান্ত এলাকায় কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ার ধারণাটি মূলত ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি সেই একই নীতির বর্ধিত রূপ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সম্পর্কিত