Advertisement Banner

কেন খুন হলেন টিটন?

দুই দশক কারাবন্দি থাকার পর ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর টিটন জামিন পান। কিন্তু আইনি জটিলতায় জেল থেকে বের হতে পারেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি জেল থেকে বের হন। পরে নিয়মিত আদালতে হাজিরা না দেওয়ায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
কেন খুন হলেন টিটন?
নিউমার্কেটের সামনে গুলিতে নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন বলে ধারণা পুলিশের। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত ঢাকার অপরাধ জগতের পরিচিত মুখ খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন হত্যাকাণ্ডে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী এনামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের নাম উঠে এসেছে।

নিহত টিটনের পরিবারের দাবি, বছিলা এলাকায় গরুর হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের জেরে পিচ্চি হেলাল ও তার সহযোগীরা টিটনকে খুন করেছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ জগতের পুরনো দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আধিপত্য বিস্তার-এই তিনটির সংঘাতই টিটনের হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান কারণ হয়ে থাকতে পারে।

আজ বুধবার দুপুরে এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন নিউ মার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় পিচ্চি হেলাল ছাড়াও বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাজাহান ও রনি ওরফে ভাঙ্গারি রনিসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে নিউমার্কেট এলাকার শাহনেওয়াজ হল সংলগ্ন বটতলা পাকা সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সন্ত্রাসী টিটন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেলে করে আসা দুইজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে থাকা আরও পাঁচ থেকে সাতজনের একটি দল পরিকল্পিতভাবে টিটনের ওপর এলোপাতারি গুলি চালায়। এতে তার মাথা, হাত ও বুকে একাধিক গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক রাত সাড়ে আটটার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব, সমঝোতার ডাকেই মৃত্যু

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গরুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল ও তার সহযোগীদের সঙ্গে টিটনের বিরোধ তৈরি হয়। এ ঘটনার আগের দিন ২৭ এপ্রিল টিটন তার বড় ভাইকে জানান, প্রতিপক্ষ তাকে ডেকেছে এবং সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে চায়। তবে সেই বৈঠকই শেষ পর্যন্ত তার জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।

এজাহার অনুযায়ী, গুলিতে টিটনের শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত লাগে—ডান কানের উপরের অংশ, কপাল, পিঠের দুই পাশ, হাতের কনুইয়ের অংশ এবং বগলের নিচে। পরে তার ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার দুপুরে টিটনে মরদেহ নিয়ে যায় পরিবারের সদস্যরা।

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ২০০১ সালে যে পুলিশ যে ২৩ ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীর’ তালিকা প্রকাশ করে সেখানে টিটনের নামও ছিল। তার ভগ্নিপতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। তারা দুজনই মোহাম্মদপুরের ‘সন্ত্রাসী চক্র’ হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমণ্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়।

দুই দশক কারাবন্দি থাকার পর ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর টিটন জামিন পান। কিন্তু আইনি জটিলতায় জেল থেকে বের হতে পারেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি জেল থেকে বের হন। পরে নিয়মিত আদালতে হাজিরা না দেওয়ায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

এজাহারে আরও বলা হয়, টিটন কারামুক্ত হওয়ার পর নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন। অতীতের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে তিনি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করছিলেন।

এদিকে, বুধবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোয়েন্দারা এরই মধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছে। কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং দ্রুতই দৃশ্যমান অগ্রগতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, নিহত টিটনের ভাই একটি মামলা দায়ের করেছেন। সেখানে বছিলায় গরুর হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের বিষয় আরেক শীর্ষসন্ত্রাসীর পিচ্চি হেলালসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন। সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করছি।

তিনি বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এখনও কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। তদন্ত চলছে।

অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলছে। যেসব আসামির নাম মামলায় এসেছে এবং তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “পুলিশের দায়িত্ব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা-এর বাইরে কোনো কিছু করার প্রশ্নই আসে না। আমরা পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করছি এবং তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।”

পুলিশের ধারণা, আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরেই টিটনকে খুন করা হয়েছে।

টিটন ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। একাধিক হত্যা মামলায় জড়িত থাকার পাশাপাশি অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

২০০৪ সালে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০১৪ সালে ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।

সম্পর্কিত