বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি বা ফুয়েল লোডিংয়ের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পটি নির্মাণ পর্যায় পেরিয়ে এখন একটি ‘অপারেশনাল নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটি’তে রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করল।
এই ধাপকে দেশের জন্য এক বিশাল কারিগরি ও অবকাঠামোগত সাফল্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর। তবে ফুয়েল লোডিং থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে সময় লাগবে আনুমানিক দুই থেকে তিন মাস। আর প্রথম ইউনিটের পুরো বিদ্যুৎ গ্রিডে পেতে সময় লাগবে আট থেকে ১০ মাস।
ফুয়েল লোডিং থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ যাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যেসব ধাপ অতিক্রম করতে হবে-
ফুয়েল লোডিং: প্রথম ভৌত পদক্ষেপ
পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের কোরে ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভৌত ধাপ। ড. শৌকত আকবরের ভাষায়, “আজকের যে ঘটনাটা ঘটলো-দিস ইজ দ্য ফার্স্ট ফিজিক্যাল স্টেপ অব জেনারেটিং কার্বন-ফ্রি ইলেকট্রিসিটি।”
এই ফুয়েল লোডিং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া, যা নির্ধারিত সিকোয়েন্স অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়। এর আগে যেসব পরীক্ষা হয়েছে, সেগুলো ছিল জ্বালানিবিহীন অবস্থায়। এখন প্রকৃত জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে পুরো সিস্টেমের কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর গাইডলাইন অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে।
নিরাপত্তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
ফুয়েল লোডিংয়ের পর থেকেই প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আসে। এখন থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটির পাশাপাশি নিউক্লিয়ার সেফটি, রেডিওলজিক্যাল সেফটি এবং নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে।
শৌকত আকবর বলেন, “প্রতিটা ধাপে সেফটি ফার্স্ট প্রায়োরিটি। যখনই আমরা বলছি ট্রান্সফরমেশন, তখনই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে নিউক্লিয়ার সেফটি-এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি।”
এই পর্যায়ে প্রতিটি অপারেশন, প্রতিটি মুভমেন্ট এবং প্রতিটি পরীক্ষাই কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকলের আওতায় পরিচালিত হয়।
লোডিং পরবর্তী পরীক্ষা ও ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি
ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর শুরু হবে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ। আগে করা ফাংশনাল টেস্টগুলো এবার জ্বালানিসহ পুনরায় সম্পন্ন করা হবে।
সবকিছু সন্তোষজনক হলে রিঅ্যাক্টরকে ধীরে ধীরে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ পর্যায়ে নেওয়া হবে। যেখানে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু হয়। শৌকত আকবর বলেন,
“লোডিং থেকে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি অ্যাচিভ করার জন্য সাধারণত ২৯ থেকে ৩০ দিনের একটি স্ট্যান্ডার্ড টাইম রয়েছে।”
এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর খুব কম ক্ষমতায় চালু হয় এবং এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, চেইন রিঅ্যাকশন নিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফুয়েল লোডিং। ছবি: রোসাটমপাওয়ার র্যাম্প-আপ ও হাউজ লোড
ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির পর শুরু হয় ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বৃদ্ধি বা ‘পাওয়ার র্যাম্প-আপ’। প্রকল্পের সাবেক পরিচালক শৌকত আকবরের ভাষায়, “প্রথমে লো পাওয়ারে অপারেশন শুরু হবে। তারপর ৩%, ৫%, ১০%, ১৫%—এভাবে প্রতিটি ধাপে টেস্ট করা হবে এবং ধীরে ধীরে পাওয়ার বাড়ানো হবে।”
এই সময় উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিজস্ব প্রয়োজন-যেমন কুলিং, কন্ট্রোল সিস্টেম—চালাতে ব্যবহৃত হয়, যা ‘হাউজ লোড’ নামে পরিচিত। এই ধাপটি রিঅ্যাক্টরের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন: গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
রিঅ্যাক্টর যখন নির্দিষ্ট একটি ক্ষমতায় স্থিতিশীলভাবে চলতে সক্ষম হয়, তখন সেটিকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়—যাকে বলা হয় গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন।
শৌকত আকবর বলেন, “সিনক্রোনাইজেশনের জন্য যে পাওয়ার লেভেল প্রয়োজন, সেটা প্রায় ২৫ শতাংশ অব নোমিনাল পাওয়ার।”
এটি প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সমতুল্য। এই পর্যায়ে পৌঁছানোর মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এবং সেখান থেকেই শুরু হবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথচলা। শুরু হবে দ্বিতীয় ইউনিতের বিদ্যুতের অপেক্ষা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে ২০১১ সালের চুক্তি থেকে শুরু করে ২০১৭ সালে নির্মাণকাজের সূচনা—প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে এখন প্রকল্পটি তার সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রকল্পটি এগিয়ে এসেছে এই পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আইনি কাঠামো এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণের পরই এই ধাপে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের একটি বড় পদক্ষেপ। শুরু হওয়া ফুয়েল লোডিং সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এখন সবকিছু নির্ভর করছে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো কতটা সফলভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর।
সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে—যা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরে রাশিয়ার আধুনিক ‘ভিভিইআর-১২০০’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। দুটি ইউনিট থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যেটা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
নিরাপত্তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে ৯০০-এর বেশি প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি জনবল এই প্রকল্পে কাজ করছেন।