Advertisement Banner

মান্টো কি শুধু মরতেই চেয়েছিলেন?

মান্টো কি শুধু মরতেই চেয়েছিলেন?
সাদত হাসান মান্টো। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

মানুষের রক্তের রঙ লাল। আমরা পাউরুটিতে যে জেলি মেখে খাই, সেটিও লাল রঙের হয় সাধারণত। হ্যাঁ, অন্য রঙেরও হয়। তবে জেলি শুনলেই লাল রঙটা আমাদের চোখের সামনে ভাসে যেন।

অথচ এই জেলিকে মানুষের রক্ত হিসেবে দেখিয়েছিলেন এক সাহিত্যিক। নাম তার সাদত হাসান মান্টো। ১৯১২ সালের আজকের ১১ মে তারিখে জন্মেছিলেন তিনি।

মান্টোর বিষয়ে বেশির ভাগ সাহিত্য সমালোচকের অভিধা হলো—তিনি ছিলেন তুমুল প্রতিভাবান, একই সাথে তার সাহিত্য বেশ ‘ডিস্টার্বিং’। বিশেষ করে মান্টোর ছোট গল্প। বিষয়টি এমন নয় যে, সাহিত্য খারাপ। কথা হলো, মান্টোর গল্পের শেষটা পাঠককে এমন এক খাদের কিনারায় ঠেলে দেয় মানসিকভাবে, যেটি অস্বস্তিকর অবশ্যই। মানে, মান্টোর গল্প ঠিক মনের ভেতরে কোনো স্বস্তি এনে দেওয়ার কাজ করে না। বরং এতটাই অস্বস্তি দেয় যে, গল্প পড়ার পর বইটা একটু বন্ধ করে ভাবতে ইচ্ছা করে।

আর মান্টোর সাহিত্যের ঠিক এমন ধরন নিয়েই একটি গবেষণা হয়েছে প্রায় ১ যুগ আগে। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের ওয়েবসাইটে গেলেই সেটি পড়াও যায়। আর্টিকেলের নাম, ‘The Touch of Madness:Manto as a Psychiatric Case Study’। একেবারে মান্টোর মনোজগত নিয়ে গবেষণা। চলুন তবে, ঘুরে আসা যাক মান্টোর মনের গভীরে।

১৯১২ সালের আজকের দিনে অবিভক্ত ভারতে জন্ম হয় উর্দু সাহিত্যিক সাদত হাসান মান্টোর। বয়স চল্লিশের ওপারে যাওয়ার পর পরই তার মৃত্যু। মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে, অতিরিক্ত মদ্যপানের কথা। গবেষকেরা বলছেন, সারা জীবন তিনি উদ্বেগ (anxiety) এবং বিষণ্নতার (depression) লক্ষণগুলোতে ভুগেছেন। তার এই মদ্যপান বা অ্যালকোহল আসক্তি তার মানসিক যন্ত্রণা এবং সৃজনশীল প্রতিভা—দুটোর সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে অবশ্য মান্টোর এমন জীবনযাপন নিছক পাগলামি ছাড়া হয়তো কিছু নয়।

জীবনের শেষ বছরগুলোতে মান্টো মদ্যপান কমাতে চিকিৎসার জন্য মানসিক হাসপাতালেও কাটিয়েছিলেন। অদ্ভুতভাবে সেখানে বসেই তিনি তার অন্যতম মাস্টারপিস ‘টোবা টেক সিং’ লিখেছিলেন।

অবশ্য মান্টোর এমন অবস্থার একটা সম্ভাব্য ব্যাখা হলো – সৃজনশীলতা আর খানিকটা পাগলামি একে অপরের পরিপূরক। মোজার্ট, ভিনসেন্ট ভ্যান গগ, ভার্জিনিয়া উলফ, সিলভিয়া প্লাথ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং আরও অনেক শিল্পীর মানসিক কষ্ট মানুষের চিরন্তন আগ্রহের বিষয়। প্রায়ই এই শিল্পীদের মানসিক অস্থিরতাকে এক ধরনের অলঙ্কার হিসেবে তুলে ধরা হয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরাও এমন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন।

আন্দ্রেয়াসেন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সৃজনশীল লেখকদের মধ্যে মুড ডিজঅর্ডারের হার অনেক বেশি। অনেক সময় এই বৈশিষ্ট্যগুলো বংশগতভাবেও আসে। বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় লেখকদের মধ্যে বিষণ্নতা বা কখনো কখনো মাদকাসক্তির উচ্চ হারও পাওয়া গেছে।

আর্নল্ড এম. লুডভিগ এই বিষয়ে কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন। তিনি উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, পাগলামি সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত না হলেও, সামান্য মানসিক অস্থিরতা সৃজনশীলতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। বর্তমান মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানসিক রোগের হালকা লক্ষণগুলো সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয় কারণ এগুলো কগনিটিভ ডিসইনহিবিশন বা চিন্তার চিরাচরিত গণ্ডি ভেঙে ফেলার ক্ষমতা তৈরি করে।

অভাব ও মানসিক অস্থিরতা মান্টোকে আরও বেশি ঠেলে দেয় মদের বোতলের দিকে। অনেক সময় তিনি পত্রিকার অফিসে বসে গল্প লিখে নগদ টাকা নিয়েই চলে যেতেন মদের দোকানে। এমনকি পত্রিকার অফিসে কখনো কখনো টাকার বদলে তার হাতে সরাসরি মদের বোতলও ধরিয়ে দিত।

জীবনের শেষ বছরগুলোতে মান্টো মদ্যপান কমাতে চিকিৎসার জন্য মানসিক হাসপাতালেও কাটিয়েছিলেন। অদ্ভুতভাবে সেখানে বসেই তিনি তার অন্যতম মাস্টারপিস ‘টোবা টেক সিং’ লিখেছিলেন।

ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের শৈশবের অভিজ্ঞতা তার অবচেতন মন গঠন করে। মান্টোর বাবা মৌলভী গোলাম হোসেন ছিলেন একজন রক্ষণশীল মানুষ। মান্টোর মা ছিলেন তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী, যাকে পরিবার সহজভাবে গ্রহণ করেনি। গবেষকেরা মনে করেন, বাবার এই কঠোরতা ও স্নেহের অভাব মান্টোর মনে রাগ ও তিক্ততার জন্ম দিয়েছিল। ফ্রয়েডের ইডিপাস কমপ্লেক্স তত্ত্ব অনুযায়ী, বাবার প্রতি ভয় এবং মায়ের প্রতি গভীর অনুরাগ মান্টোর মানসিকতাকে প্রভাবিত করেছিল। তার গল্পগুলোতে তাই দেখা যায় পুরুষ চরিত্রগুলো প্রায়ই নিষ্ঠুর বা গুরুত্বহীন, কিন্তু নারী চরিত্রগুলো অনেক বেশি সাহসী, এবং সহমর্মী। গবেষকেরা মনে করেন, এটি ছিল সম্ভবত তার মায়ের প্রতি ভালোবাসারই এক প্রতিফলন।

ছবি: এআই দিয়ে বানানো
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

মদ্যপানের সাথে অন্যান্য মানসিক সমস্যার গভীর সম্পর্ক আছে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা মদ্যপানে আসক্ত, তাদের মধ্যে উদ্বেগ বা বিষণ্নতায় ভোগার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি। ‘সেলফ-মেডিকেশন হাইপোথিসিস’ অনুযায়ী, অনেক সময় রোগীরা তাদের মানসিক কষ্ট উপশম করার জন্য মাদককে ব্যবহার করে এবং ক্রমে আসক্ত হয়ে পড়ে। গবেষকদের ধারণা, মান্টোও সম্ভবত তার অস্থিরতা ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে মদ্যপানকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যদিও সরাসরি নথিপত্রের অভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মানসিক রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে তার জীবনের ঘটনাগুলো এমন ধারণাকেই সমর্থন করে বলে মনে করেন গবেষকরা।

মান্টো ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়কার দাঙ্গার নৃশংসতায় গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সেটাই অবিকল যেন তুলে ধরেছিলেন সাহিত্যে। তাই তিনি নিজেই বলেছিলেন: “আপনারা যদি এই সময়ের কথা জানতে চান, তবে আমার গল্প পড়ুন। যদি সেগুলো সহ্য করতে না পারেন, তবে বুঝবেন এই সময়টাই অসহ্য।”

আবার এই দেশভাগ মান্টোর নিজের জীবনকেও তছনছ করে দিয়েছিল। বোম্বের সিনেমাজগত মান্টোকে সচ্ছলতা দিয়েছিল। কিন্তু দেশভাগের পর মান্টো যখন লাহোর চলে যান, তখন পরিস্থিতি বদলে যায় একেবারে। মান্টো পড়ে গিয়েছিলেন ‘দিন আনি, দিন খাই’ অবস্থায়। আবার হাত পাততেও ছিল মান্টোর আপত্তি। নিজের মেরুদণ্ডটাকে ভুলতে পারছিলেন না কোনোভাবেই। আর শির সোজা রেখে কি আর করুণা চাওয়া যায়? নাকি কেউ দেয়?

ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মধ্যে দুটি মূল চালিকাশক্তি কাজ করে- একটি এরোস বা জীবনের শক্তি। এবং অন্যটি থানাতোস বা মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা। মান্টোর জীবন পর্যালোচনা করলে তাই গবেষকদের মনে হয়, তিনি অবচেতনভাবে হয়তো মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছিলেন!

এই অভাব ও মানসিক অস্থিরতা মান্টোকে আরও বেশি ঠেলে দেয় মদের বোতলের দিকে। অনেক সময় তিনি পত্রিকার অফিসে বসে গল্প লিখে নগদ টাকা নিয়েই চলে যেতেন মদের দোকানে। এমনকি পত্রিকার অফিসে কখনো কখনো টাকার বদলে তার হাতে সরাসরি মদের বোতলও ধরিয়ে দিত। এই সময় তার মানসিক বিভ্রান্তি বা সাইকোসিস দেখা দিয়েছিল বলেও শোনা যায়। কাল্পনিক চেহারা দেখতেন মান্টো, বলতেন অসংলগ্ন কথা।

মান্টোর স্ত্রী সাফিয়া তাকে সুস্থ করার অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। অবশেষে যকৃতের প্রদাহে তার মৃত্যুই হয়। নিজের এপিটাফও নিজেই লিখে গিয়েছিলেন মান্টো। তার কবরে লেখা ছিল, “এখানে শুয়ে আছে মান্টো, যার সাথে সমাহিত গল্প লেখার সব কৌশল”।

জীবনের শেষ দিকটায় নিজের কোনো কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না মান্টো। লিখেছিলেন, ‘যা-ই ঘটুক না কেন, আমি কোনো কিছুতেই সন্তুষ্টি পাই না। এমনকি নিজের ওপরও আমি সন্তুষ্ট নই।’

সাদত হাসান মান্টো। ছবি: মেইড ইন কাশ্মীরের সৌজন্যে
সাদত হাসান মান্টো। ছবি: মেইড ইন কাশ্মীরের সৌজন্যে

অথচ চরম শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যেও লাহোরে কাটানো সাত বছরে মান্টো ১২৭টি ছোটগল্প এবং প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সাহিত্যের কারণেই ভারত ও পাকিস্তানে মোট ছয়বার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল মান্টোকে।

ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মধ্যে দুটি মূল চালিকাশক্তি কাজ করে- একটি এরোস বা জীবনের শক্তি। এবং অন্যটি থানাতোস বা মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা। মান্টোর জীবন পর্যালোচনা করলে তাই গবেষকদের মনে হয়, তিনি অবচেতনভাবে হয়তো মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছিলেন!

শেষটা করা যাক ‘The Touch of Madness: Manto as a Psychiatric Case Study’তে গবেষকদের টানা উপসংহার দিয়েই। দুই গবেষক আলি এম হাশমি ও মুহাম্মদ আওয়াইজ আফতাব বলছেন, মান্টো অ্যাংজাইটি ও ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন। তিনি মদে ডুবেছিলেন ওসব থেকে বাঁচার আশাতেই। তবে শেষ জীবনে সেই মদই তাকে উপহার দিয়েছিল সাইকোসিস। এই দুই গবেষকই বলছেন, সঠিক চিকিৎসায় আর দীর্ঘ জীবন যাপন করতে পারতেন সাদত হাসান মান্টো। তবে তাতে হয়তো মান্টোর সৃজনশীলতাই হারিয়ে যেতে পারতো।

অবশেষে তাই প্রাচীন রোমের দার্শনিক সেনেকার কথাই বরং স্মরণে থাক। সেনেকা লিখেছিলেন, সামান্য পাগলামির ছোঁয়া ছাড়া কেউ প্রতিভাবান হতে পারে না। মান্টো হয়তো ছিলেন তেমনই এক প্রতিভা, যাকে প্রতিভার বিনিময়মূল্য হিসেবে দিতে হয়েছিল গোটা জীবনটাই।

সম্পর্কিত