চরচা ডেস্ক

বেশ কিছু দিন ধরে বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তুমুল আলাপ। কেউ কেউ তো খুব দ্রুতই ইউরেনিয়াম তোলার আবেদনও জানাচ্ছেন।
বাংলাদেশে এই মূল্যবান পদার্থটির মজুত নিয়ে কিন্তু অনেক আগেই গবেষণা করা হয়েছে। দুটি গবেষণার খোঁজও পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ইউরেনিয়ামের হাল–হকিকত জানার সাথে সাথে চলুন জেনে নেওয়া যাক ইউরেনিয়ামের বিস্তারিত।
ইউরেনিয়াম কী
ইউরেনিয়াম হলো প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত একটি তেজস্ক্রিয় মৌল। এটি ‘অ্যাক্টিনাইডস’ নামক মৌলগুলোর একটি বিশেষ দলের অন্তর্ভুক্ত।
পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই ইউরেনিয়াম। যা সারা বিশ্বে পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়। অন্য সব অ্যাক্টিনাইডের মতো ইউরেনিয়ামও ‘তেজস্ক্রিয়’। মুরগির ডিমের আকারের সমপরিমাণ ইউরেনিয়াম জ্বালানি ৮৮ টন কয়লার সমান বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
১৭৮৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ মার্টিন হাইনরিখ ক্ল্যাপরথ আবিষ্কার করেন ইউরেনিয়াম মৌল। তিনি ইউরেনাস গ্রহের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম রাখেন। ১৮৯৬ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী হেনরি বেকরেল গবেষণা করে দেখান, ইউরেনিয়াম স্বতঃস্ফূর্তভাবে অদৃশ্য রশ্মি নির্গত করে। সেটাই ছিল এই মৌলের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার।

আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা (আইএইএ) বলছে, ইউরেনিয়াম সোনার চেয়ে প্রায় ৫০০ গুণ বেশি সহজলভ্য। যদিও এটি একটি খুব বিরল মৌল বলে মনে হয়, তবুও খুব অল্প পরিমাণে ইউরেনিয়াম সব জায়গায় উপস্থিত থাকে। শিলা, মাটি, পানি, এমনকি মানব শরীরেও এই মৌল পাওয়া যায়। মহাসাগরেও প্রচুর পরিমাণে অত্যন্ত লঘু বা তরলীকৃত ইউরেনিয়াম রয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় চার বিলিয়ন (৪০০ কোটি) টন বলে জানিয়েছে আইএইএ।
অন্য যেকোনো মৌলের মতোই, ইউরেনিয়ামেরও বিভিন্ন রূপভেদ রয়েছে যা ভর এবং ভৌত বৈশিষ্ট্যে ভিন্ন কিন্তু একই রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। এদের বলা হয় আইসোটোপ। ইউরেনিয়ামের তিনটি প্রাকৃতিক আইসোটোপ রয়েছে—ইউ-২৩৪, ইউ-২৩৫ এবং ইউ-২৩৮।
ইউ-২৩৮ হলো সবচেয়ে সাধারণ, যা পৃথিবীতে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের প্রায় ৯৯ শতাংশ। বেশির ভাগ পারমাণবিক চুল্লিতে ইউ-২৩৫ যুক্ত জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। তবে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে সাধারণত মাত্র ০.৭২ শতাংশ ইউ-২৩৫ থাকে এবং বেশির ভাগ চুল্লির জ্বালানিতে উচ্চ ঘনত্বের এই আইসোটোপের প্রয়োজন হয়। তাই, এনরিচমেন্ট বা সমৃদ্ধকরণ নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ইউ-২৩৫-এর ঘনত্ব বৃদ্ধি করা হয়।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কী?
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ইউ-২৩৫-এর আইসোটোপিক অনুপাত ০.৭২ শতাংশ থেকে ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
ইউরেনিয়ামে ইউ-২৩৫-এর আইসোটোপিক অনুপাত ২০ শতাংশের নিচে থাকলে তাকে কম-সমৃদ্ধ বা লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম (এলইইউ) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বেশির ভাগ বাণিজ্যিক চুল্লিতে পাঁচ শতাংশের নিচে কম-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যাকে ‘রিয়্যাক্টর-গ্রেড ইউরেনিয়াম’ বলা হয়। এটি বহু বছর ধরে নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায়।
যদি ইউরেনিয়াম ২০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ করা হয়, তবে এটিকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ বা হাইলি এনরিচড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউ-২৩৫-এর এত উচ্চ আইসোটোপিক অনুপাতযুক্ত ইউরেনিয়াম মূলত নৌ-চলাচল বা নেভাল প্রপালশন রিয়্যাক্টরে (সাবমেরিন), পারমাণবিক অস্ত্র এবং কিছু গবেষণা চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়।
ইউরেনিয়াম কীভাবে উত্তোলন করা হয়? কতদিন লাগে?
গত শতকে ইউরেনিয়াম আকরিক বেশির ভাগই খোলা গর্ত বা ভূগর্ভস্থ খনন স্থল থেকে উত্তোলন করা হতো, যার জন্য অন্য উপাদান থেকে ইউরেনিয়াম আলাদা করতে আকরিককে শোধন করতে হতো।
একবিংশ শতাব্দীতে এই পদ্ধতিটি ধীরে ধীরে ‘ইন-সিটু লিচিং’ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ২০০০ সালে এই কৌশলের মাধ্যমে মাত্র ১৬ শতাংশ ইউরেনিয়াম উৎপাদিত হলেও, বর্তমানে ইন-সিটু লিচিং ইউরেনিয়াম উত্তোলনের বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫৮ শতাংশ ইউরেনিয়াম এই পদ্ধতি ব্যবহার করে উত্তোলন করা হয়েছিল।
এই পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম আকরিকের মধ্য দিয়ে অতিরিক্ত উপাদান, যেমন কমপ্লেক্সিং বা অক্সিডেন্ট এজেন্ট অথবা অ্যাসিড মিশ্রিত পানি সঞ্চালিত করা হয়। এই পদ্ধতিটি সরাসরি ইউরেনিয়াম দ্রবীভূত করতে সাহায্য করে। এরপর উৎপন্ন দ্রবণটি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয় এবং ইউরেনিয়াম অক্সাইড-বা ‘ইয়েলো কেক’ তৈরি করতে শোধন প্রক্রিয়া চালানো হয়। এভাবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হয়।
ইউরেনিয়াম উত্তোলন, একে পারমাণবিক জ্বালানিতে পরিণত করা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানিটি ব্যবহার করা এবং সৃষ্ট বর্জ্য অপসারণের ধাপভিত্তিক প্রক্রিয়াকে পারমাণবিক জ্বালানি চক্র বা নিউক্লিয়ার ফুয়েল সাইকেল বলা হয়। উত্তোলন থেকে একে পারমাণবিক বোমায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও সময় প্রয়োজন হয়। আইএইএ বলছে, উত্তোলনযোগ্য ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর উপযোগী খনির উত্তোলন কার্যক্রম শুরু করতেই ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এতে খরচ হতে পারে ১০০ মিলিয়ন ডলার থেকে বিলিয়ন বিলিয়নও। মূলত, তেজস্ক্রিয় মৌল হওয়ার কারণে ইউরেনিয়ামের খনিতে নানা ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়। আর এ কারণে খরচ ও সময় বেশি লাগে।
পারমাণবিক ফিশন বোমার মূল উপাদান ইউরেনিয়াম। ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণু ভাঙলে প্রচণ্ড শক্তি ও অতিরিক্ত নিউট্রন বের হয়। এই নিউট্রন পাশের ইউরেনিয়াম পরমাণুকে ভাঙে। আর এভাবে মুহূর্তের মধ্যে চেইন রিঅ্যাকশন হয়ে বিপুল শক্তি বেরিয়ে আসে। এই অনিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন থেকেই জন্ম নেয় ভয়াবহ বিস্ফোরণ।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা শহরে নিক্ষিপ্ত ‘লিটল বয়’ পারমাণবিক বোমাটিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করা হয়েছিল। এক মুহূর্তেই শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিহত হয়। নাগাসাকিতে প্লুটোনিয়ামভিত্তিক বোমা ব্যবহৃত হয়, যার নাম ছিল ‘ফ্যাট ম্যান’।
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম আছে?
আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় একটি অনুসন্ধান চালায়।
বাংলাদেশের পাললিক স্তরবিন্যাসে লিগনাইট ও জৈব পদার্থসহ মহাদেশীয় বেলেপাথর রয়েছে। যাকে পাললিক ইউরেনিয়ামের ভালো উৎস হিসেবে মনে করা হয়। দেশের আশেপাশের শিল্ড এলাকাগুলোকে ইউরেনিয়ামের ভালো উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। এমন ধারণা থেকেই ১৯৭৬ সালে ওই অনুসন্ধান শুরু করা হয়।

১৯৭৬-১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালানো হয়। রেডিওমেট্রিক জরিপে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ৫ গুণের বেশি ‘অস্বাভাবিকতা’ বা অ্যানোমালি চিহ্নিত করা হয়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলার কিছু অ্যান্টিকলাইনে রেডিওমেট্রিক জরিপ চালানো হয়। এই জরিপগুলোয় স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ৬০ গুণ বেশি রেডিওমেট্রিক ‘অস্বাভাবিকতা’ পাওয়া যায় ৩০০টিরও বেশি।
এই অস্বাভাবিকতগুলো মায়ো-প্লায়োসিন যুগের (২৩ দশমিক ০৩ থেকে ৫ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন বছর আগে) ডুপিটিলা (প্রধানত বালি, কাদা ও কিছু ক্ষেত্রে পাথরের মিশ্রণ, এটি বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও ঢাকার কিছু অঞ্চলে অবস্থিত) এবং টিপাম ফরমেশনের (ভূমির এই স্তরটি প্রধানত বিশাল ধূসর-হলুদ বালু বা স্যান্ডস্টোন দ্বারা গঠিত)।
এই অস্বাভাবিক স্তরগুলোতে স্লাইম এবং ভারী খনিজের পরিমাণের তারতম্য দেখা যায়। এই স্তরগুলো থেকে সংগ্রহ করা কিছু নমুনায় ২০ থেকে ১০০ পিপিএম ইউরেনিয়াম এবং ১০০ থেকে ১০০০ পিপিএম থোরিয়াম পাওয়া গেছে। সিলেট জেলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খুব সীমিত পরিসরে প্রায় ৪০০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত অনুসন্ধানমূলক খনন কাজ চালানো হয়।
পরবর্তীতে জরিপের উপযোগিতা যাচাই করার জন্য সিলেটের কিছু নির্বাচিত এলাকায় ভূ-রাসায়নিক ওরিয়েন্টেশন সমীক্ষা এবং রেডন জরিপ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে আইএইএ।
মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলার হারাগাছায় ইউরেনিয়ামের সন্ধানের কথা জানিয়েছে পরমাণু শক্তি কমিশন। পরে বিভিন্ন সময় খনিজ অনুসন্ধানে বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম থাকার কথা আলোচনায় আসে। সিলেটের জৈন্তাপুরেও ইউরেনিয়ামের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় পরমাণু শক্তি কমিশন।
২০১৬ সালে ইস্ট চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষণাপত্রে বলা হয়, ওই বছরের মার্চ মাসে মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও কুলাউড়ায় এক জরিপ চালানো হয়। বিভিন্ন ধরনের ম্যাট্রিক্সে ট্রেস এলিমেন্ট বা অতিসামান্য মৌল নির্ধারণের জন্য নিউট্রন অ্যাক্টিভেশন অ্যানালাইসিস (আইএনএএ) একটি স্বীকৃত শক্তিশালী হাতিয়ার। ওই এলাকায় আইএনএএ পদ্ধতিতে পাওয়া ইউরেনিয়াম ঘনত্বের ফলাফলগুলো নগণ্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে ওই এলাকার পেবলি স্যান্ডস্টোন বা নুড়িময় বেলেপাথরে পাওয়া ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি গবেষণা এলাকা এবং এর আশেপাশে ইউরেনিয়াম নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। যদিও তেমন ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনও পর্যন্ত চালানো হয়নি।

বেশ কিছু দিন ধরে বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তুমুল আলাপ। কেউ কেউ তো খুব দ্রুতই ইউরেনিয়াম তোলার আবেদনও জানাচ্ছেন।
বাংলাদেশে এই মূল্যবান পদার্থটির মজুত নিয়ে কিন্তু অনেক আগেই গবেষণা করা হয়েছে। দুটি গবেষণার খোঁজও পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ইউরেনিয়ামের হাল–হকিকত জানার সাথে সাথে চলুন জেনে নেওয়া যাক ইউরেনিয়ামের বিস্তারিত।
ইউরেনিয়াম কী
ইউরেনিয়াম হলো প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত একটি তেজস্ক্রিয় মৌল। এটি ‘অ্যাক্টিনাইডস’ নামক মৌলগুলোর একটি বিশেষ দলের অন্তর্ভুক্ত।
পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই ইউরেনিয়াম। যা সারা বিশ্বে পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়। অন্য সব অ্যাক্টিনাইডের মতো ইউরেনিয়ামও ‘তেজস্ক্রিয়’। মুরগির ডিমের আকারের সমপরিমাণ ইউরেনিয়াম জ্বালানি ৮৮ টন কয়লার সমান বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
১৭৮৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ মার্টিন হাইনরিখ ক্ল্যাপরথ আবিষ্কার করেন ইউরেনিয়াম মৌল। তিনি ইউরেনাস গ্রহের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম রাখেন। ১৮৯৬ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী হেনরি বেকরেল গবেষণা করে দেখান, ইউরেনিয়াম স্বতঃস্ফূর্তভাবে অদৃশ্য রশ্মি নির্গত করে। সেটাই ছিল এই মৌলের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার।

আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা (আইএইএ) বলছে, ইউরেনিয়াম সোনার চেয়ে প্রায় ৫০০ গুণ বেশি সহজলভ্য। যদিও এটি একটি খুব বিরল মৌল বলে মনে হয়, তবুও খুব অল্প পরিমাণে ইউরেনিয়াম সব জায়গায় উপস্থিত থাকে। শিলা, মাটি, পানি, এমনকি মানব শরীরেও এই মৌল পাওয়া যায়। মহাসাগরেও প্রচুর পরিমাণে অত্যন্ত লঘু বা তরলীকৃত ইউরেনিয়াম রয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় চার বিলিয়ন (৪০০ কোটি) টন বলে জানিয়েছে আইএইএ।
অন্য যেকোনো মৌলের মতোই, ইউরেনিয়ামেরও বিভিন্ন রূপভেদ রয়েছে যা ভর এবং ভৌত বৈশিষ্ট্যে ভিন্ন কিন্তু একই রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। এদের বলা হয় আইসোটোপ। ইউরেনিয়ামের তিনটি প্রাকৃতিক আইসোটোপ রয়েছে—ইউ-২৩৪, ইউ-২৩৫ এবং ইউ-২৩৮।
ইউ-২৩৮ হলো সবচেয়ে সাধারণ, যা পৃথিবীতে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের প্রায় ৯৯ শতাংশ। বেশির ভাগ পারমাণবিক চুল্লিতে ইউ-২৩৫ যুক্ত জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। তবে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে সাধারণত মাত্র ০.৭২ শতাংশ ইউ-২৩৫ থাকে এবং বেশির ভাগ চুল্লির জ্বালানিতে উচ্চ ঘনত্বের এই আইসোটোপের প্রয়োজন হয়। তাই, এনরিচমেন্ট বা সমৃদ্ধকরণ নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ইউ-২৩৫-এর ঘনত্ব বৃদ্ধি করা হয়।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কী?
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ইউ-২৩৫-এর আইসোটোপিক অনুপাত ০.৭২ শতাংশ থেকে ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
ইউরেনিয়ামে ইউ-২৩৫-এর আইসোটোপিক অনুপাত ২০ শতাংশের নিচে থাকলে তাকে কম-সমৃদ্ধ বা লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম (এলইইউ) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বেশির ভাগ বাণিজ্যিক চুল্লিতে পাঁচ শতাংশের নিচে কম-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যাকে ‘রিয়্যাক্টর-গ্রেড ইউরেনিয়াম’ বলা হয়। এটি বহু বছর ধরে নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায়।
যদি ইউরেনিয়াম ২০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ করা হয়, তবে এটিকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ বা হাইলি এনরিচড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউ-২৩৫-এর এত উচ্চ আইসোটোপিক অনুপাতযুক্ত ইউরেনিয়াম মূলত নৌ-চলাচল বা নেভাল প্রপালশন রিয়্যাক্টরে (সাবমেরিন), পারমাণবিক অস্ত্র এবং কিছু গবেষণা চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়।
ইউরেনিয়াম কীভাবে উত্তোলন করা হয়? কতদিন লাগে?
গত শতকে ইউরেনিয়াম আকরিক বেশির ভাগই খোলা গর্ত বা ভূগর্ভস্থ খনন স্থল থেকে উত্তোলন করা হতো, যার জন্য অন্য উপাদান থেকে ইউরেনিয়াম আলাদা করতে আকরিককে শোধন করতে হতো।
একবিংশ শতাব্দীতে এই পদ্ধতিটি ধীরে ধীরে ‘ইন-সিটু লিচিং’ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ২০০০ সালে এই কৌশলের মাধ্যমে মাত্র ১৬ শতাংশ ইউরেনিয়াম উৎপাদিত হলেও, বর্তমানে ইন-সিটু লিচিং ইউরেনিয়াম উত্তোলনের বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫৮ শতাংশ ইউরেনিয়াম এই পদ্ধতি ব্যবহার করে উত্তোলন করা হয়েছিল।
এই পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম আকরিকের মধ্য দিয়ে অতিরিক্ত উপাদান, যেমন কমপ্লেক্সিং বা অক্সিডেন্ট এজেন্ট অথবা অ্যাসিড মিশ্রিত পানি সঞ্চালিত করা হয়। এই পদ্ধতিটি সরাসরি ইউরেনিয়াম দ্রবীভূত করতে সাহায্য করে। এরপর উৎপন্ন দ্রবণটি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয় এবং ইউরেনিয়াম অক্সাইড-বা ‘ইয়েলো কেক’ তৈরি করতে শোধন প্রক্রিয়া চালানো হয়। এভাবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হয়।
ইউরেনিয়াম উত্তোলন, একে পারমাণবিক জ্বালানিতে পরিণত করা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানিটি ব্যবহার করা এবং সৃষ্ট বর্জ্য অপসারণের ধাপভিত্তিক প্রক্রিয়াকে পারমাণবিক জ্বালানি চক্র বা নিউক্লিয়ার ফুয়েল সাইকেল বলা হয়। উত্তোলন থেকে একে পারমাণবিক বোমায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও সময় প্রয়োজন হয়। আইএইএ বলছে, উত্তোলনযোগ্য ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর উপযোগী খনির উত্তোলন কার্যক্রম শুরু করতেই ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এতে খরচ হতে পারে ১০০ মিলিয়ন ডলার থেকে বিলিয়ন বিলিয়নও। মূলত, তেজস্ক্রিয় মৌল হওয়ার কারণে ইউরেনিয়ামের খনিতে নানা ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়। আর এ কারণে খরচ ও সময় বেশি লাগে।
পারমাণবিক ফিশন বোমার মূল উপাদান ইউরেনিয়াম। ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণু ভাঙলে প্রচণ্ড শক্তি ও অতিরিক্ত নিউট্রন বের হয়। এই নিউট্রন পাশের ইউরেনিয়াম পরমাণুকে ভাঙে। আর এভাবে মুহূর্তের মধ্যে চেইন রিঅ্যাকশন হয়ে বিপুল শক্তি বেরিয়ে আসে। এই অনিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন থেকেই জন্ম নেয় ভয়াবহ বিস্ফোরণ।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা শহরে নিক্ষিপ্ত ‘লিটল বয়’ পারমাণবিক বোমাটিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করা হয়েছিল। এক মুহূর্তেই শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিহত হয়। নাগাসাকিতে প্লুটোনিয়ামভিত্তিক বোমা ব্যবহৃত হয়, যার নাম ছিল ‘ফ্যাট ম্যান’।
বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম আছে?
আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় একটি অনুসন্ধান চালায়।
বাংলাদেশের পাললিক স্তরবিন্যাসে লিগনাইট ও জৈব পদার্থসহ মহাদেশীয় বেলেপাথর রয়েছে। যাকে পাললিক ইউরেনিয়ামের ভালো উৎস হিসেবে মনে করা হয়। দেশের আশেপাশের শিল্ড এলাকাগুলোকে ইউরেনিয়ামের ভালো উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। এমন ধারণা থেকেই ১৯৭৬ সালে ওই অনুসন্ধান শুরু করা হয়।

১৯৭৬-১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালানো হয়। রেডিওমেট্রিক জরিপে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ৫ গুণের বেশি ‘অস্বাভাবিকতা’ বা অ্যানোমালি চিহ্নিত করা হয়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলার কিছু অ্যান্টিকলাইনে রেডিওমেট্রিক জরিপ চালানো হয়। এই জরিপগুলোয় স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ৬০ গুণ বেশি রেডিওমেট্রিক ‘অস্বাভাবিকতা’ পাওয়া যায় ৩০০টিরও বেশি।
এই অস্বাভাবিকতগুলো মায়ো-প্লায়োসিন যুগের (২৩ দশমিক ০৩ থেকে ৫ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন বছর আগে) ডুপিটিলা (প্রধানত বালি, কাদা ও কিছু ক্ষেত্রে পাথরের মিশ্রণ, এটি বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও ঢাকার কিছু অঞ্চলে অবস্থিত) এবং টিপাম ফরমেশনের (ভূমির এই স্তরটি প্রধানত বিশাল ধূসর-হলুদ বালু বা স্যান্ডস্টোন দ্বারা গঠিত)।
এই অস্বাভাবিক স্তরগুলোতে স্লাইম এবং ভারী খনিজের পরিমাণের তারতম্য দেখা যায়। এই স্তরগুলো থেকে সংগ্রহ করা কিছু নমুনায় ২০ থেকে ১০০ পিপিএম ইউরেনিয়াম এবং ১০০ থেকে ১০০০ পিপিএম থোরিয়াম পাওয়া গেছে। সিলেট জেলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খুব সীমিত পরিসরে প্রায় ৪০০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত অনুসন্ধানমূলক খনন কাজ চালানো হয়।
পরবর্তীতে জরিপের উপযোগিতা যাচাই করার জন্য সিলেটের কিছু নির্বাচিত এলাকায় ভূ-রাসায়নিক ওরিয়েন্টেশন সমীক্ষা এবং রেডন জরিপ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে আইএইএ।
মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলার হারাগাছায় ইউরেনিয়ামের সন্ধানের কথা জানিয়েছে পরমাণু শক্তি কমিশন। পরে বিভিন্ন সময় খনিজ অনুসন্ধানে বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম থাকার কথা আলোচনায় আসে। সিলেটের জৈন্তাপুরেও ইউরেনিয়ামের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় পরমাণু শক্তি কমিশন।
২০১৬ সালে ইস্ট চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষণাপত্রে বলা হয়, ওই বছরের মার্চ মাসে মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও কুলাউড়ায় এক জরিপ চালানো হয়। বিভিন্ন ধরনের ম্যাট্রিক্সে ট্রেস এলিমেন্ট বা অতিসামান্য মৌল নির্ধারণের জন্য নিউট্রন অ্যাক্টিভেশন অ্যানালাইসিস (আইএনএএ) একটি স্বীকৃত শক্তিশালী হাতিয়ার। ওই এলাকায় আইএনএএ পদ্ধতিতে পাওয়া ইউরেনিয়াম ঘনত্বের ফলাফলগুলো নগণ্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে ওই এলাকার পেবলি স্যান্ডস্টোন বা নুড়িময় বেলেপাথরে পাওয়া ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি গবেষণা এলাকা এবং এর আশেপাশে ইউরেনিয়াম নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। যদিও তেমন ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনও পর্যন্ত চালানো হয়নি।