চরচা ডেস্ক

ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনার পর দেশটি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা শুনলে মনে হবে, ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার হস্তক্ষেপ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনবে। তারা লাভজনক বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ পাবে। তেলখাতে অঢেল অর্থ বিনিয়োগ থেকে মুনাফা উপচে পড়বে।
কিন্তু তেল কোম্পানিগুলোর মালিকপক্ষ ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। ভেনেজুয়েলার তেলখাতে বিনিয়োগ করা বিষয়ে হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর এক্সনমোবিলের প্রধান নির্বাহী দেশটিকে সরাসরি ‘বিনিয়োগের অযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। এই মন্তব্যে বিরক্ত হয়ে ট্রাম্প যখন এক্সনকে ভেনেজুয়েলা থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেন, তখন উল্টো কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে যায়।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যাপারটি দেখলে মনে হয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হলে তা থেকে সামান্য হলেও উপকার পাওয়া যায়। বাণিজ্যের জন্য এটি ইতিবাচক বিষয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ ধরনের মুহূর্ত সবসময় আসে না। কয়েক বছর ধরেই দ্য ইকোনমিস্টসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যম সতর্ক করে আসছে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কী উৎপাদন করবে এবং কোথায় তাদের পণ্য বিক্রি করবে। রাজনীতিবিদরা সেখানে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলে তা বিশ্বায়নের সুফলকে ব্যাহত করবে, ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও লাভ কমে যাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় বড় ও বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠন করছে এবং এর ফলে তাদের মুনাফা অর্জনে বিঘ্ন ঘটছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ভূরাজনীতির প্রভাব নিয়ে ভাবার সময় এসে গেছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, তালিকাভুক্ত বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর মোট মূল্যের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যেগুলোর মোট বিক্রির ৩০ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আসে। এই কোম্পানিগুলোর বার্ষিক মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারে। বিশ্বজুড়ে তারা প্রায় ১০ কোটি মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়।
শুরুটা কেমন?
বিশ্বজুড়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অগ্রযাত্রা গতি পায় ১৯৯০-এর দশকে, যখন অনেক পশ্চিমা ও উন্নয়নশীল দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিতে উদারপন্থা অবলম্বন করে। ২০০১ সালে চীন যখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়, তখন বিশ্ব জিডিপির ৪৯ শতাংশ আসত বৈশ্বিক বাণিজ্যের মাধ্যমে, এক দশক আগে এর পরিমাণ ছিল ৩৮ শতাংশ। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ২০০৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামার আগে জিডিপির ৫.৩ শতাংশ আসত এখান থেকে। পরবর্তীতে অর্থনীতি কিছুটা ঠিকঠাক হলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কারখানা গড়া ও পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল, আর অধিকাংশ সময়ই এর অগ্রগণ্য ছিল চীন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণবাদ অনেক সুবিধা নিয়ে এসেছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে শ্রমিক ও সরবরাহকারীর সন্ধান পেয়েছিল। নতুন ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজারের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলো প্রবৃদ্ধির ধীরগতিকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছিল। বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন খরচ কমাতে সক্ষম হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি সহায়ক হয়েছিল।
গত এক দশকে বিশ্বায়নের সমস্ত চমক সত্ত্বেও পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের চেয়ে বেশি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা ‘এফডিআই মার্কেটস’-এর তথ্যমতে, ২০১৬ সালে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের মূলধনের মাত্র ৪৪ শতাংশ বিনিয়োগ করেছিল। এরপর থেকে সেই হার ক্রমাগত বেড়েছে এবং ২০২৫ সালে তা ৬৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিসের ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিদেশি শাখার বিক্রি ১ শতাংশ কমেছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি বেড়েছে ৮ শতাংশ।
ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোও বাইরের বাজারের তুলনায় আমেরিকাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর তথ্য বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আমেরিকায় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর কর্মচারীর সংখ্যা ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ লাখে পৌঁছেছে। ইউরোপ আমেরিকাতে বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আমেরিকায় ইউরোপের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মরগান স্ট্যানলি ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর আমেরিকা থেকে প্রাপ্ত আয় ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এখন যা চলছে?
আমেরিকায় ব্যাপক হারে বিনিয়োগ বাড়ালেও পশ্চিমা কোম্পানিগুলো চীনের প্রতি উৎসাহ হারাচ্ছে। আমেরিকার গ্রিনফিল্ডের বৈদেশিক বিনিয়োগের মাত্র ২ শতাংশ এখন চীনে যাচ্ছে, এক দশক আগে যা ছিল ৭ শতাংশ। ইউরোপীয় প্রবাহও ৫ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইউরোপীয় এবং আমেরিকান কোম্পানিগুলো চীনে তাদের কর্মসংস্থান প্রায় এক-দশমাংশ কমিয়েছে। চীন এক সময় অন্য যেকোনো বিদেশি দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি আমেরিকান কর্মী নিয়োগ দিত; এখন তাদের অবস্থান চতুর্থ। স্টারবাকস, আইবিএম এবং এয়ারবিএনবির মতো বেশ কিছু বড় কোম্পানি চীন থেকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।

তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর চীন থেকে সরে আসার প্রবণতার পেছনে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর পিছুটান ছাড়াও আরও অনেক কারণ রয়েছে। গবেষকরা দেখেছেন, কোম্পানিগুলো এখন সেইসব দেশেই বেশি সক্রিয় হচ্ছে, যারা তাদের নিজ দেশের সাথে আদর্শিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমেরিকা এবং চীনকে এই বিশ্লেষণ থেকে বাদ দিলেও এই বিনিয়োগের ধারাটি মোটামুটি একই রকম।
একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের শাখাসমূহ যেসব দেশে অবস্থিত, সেসব দেশের সঙ্গে মূল দেশের মতাদর্শিক পার্থক্য থাকলে, সেখানে মূলধনী ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। এই মতাদর্শগত মিল পরিমাপ করা হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেশ দুটি কতবার সংহতি প্রদর্শন করেছে তার ওপর ভিত্তি করে। বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন আদর্শিক ঘনিষ্ঠতা ভৌগোলিক দূরত্বের মতোই গুরুত্ব পাচ্ছে।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এই আমূল পরিবর্তনের কারণ কেবল ভূরাজনীতি নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। গত পাঁচ বছরে আমেরিকার অর্থনীতির অগ্রগতি সন্তোষজনক। একই সময়ে চীনের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে তুলনামূলক কম। ইউরোপের প্রবৃদ্ধি এই সময়ে স্থবির ছিল। আমেরিকার এই অর্থনৈতিক সাফল্যের মূলে রয়েছে দেশটির ভোক্তারা।
ভূরাজনীতির বাইরের আরেকটি কারণ চীনা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা। অনেক ক্ষেত্রেই চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখন পশ্চিমকে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে রাজনীতিরও বড় ভূমিকা আছে এখানে। চীনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানো এবং প্রযুক্তিগতভাবে দেশটিকে দুর্বল করার পশ্চিমা আকাঙ্ক্ষা থেকে শুল্ক এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম অন্য দেশে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ও ধরণ বদলে যায়। প্রযুক্তির বদলে তেলের গুরুত্ব বাড়তে থাকে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চরম আকার ধারণ করে। কৌশলগত প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যদের তুলনায় আগেভাগে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। ইউরোপীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলিও চীন থেকে সরে আসছে।
এই পশ্চাদপসরণ পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য ক্ষতির কারণ হবে। আলাদা করে বলতে গেলে সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি এবং তাদের সরবরাহকারীরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম হলেও অন্যান্য সংবেদনশীল শিল্প যেমন: ডেটা সেন্টার কোম্পানি, গাড়ি নির্মাতা এবং ওষুধ শিল্পও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভূরাজনীতি ছাড়া আরও যা আছে
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কৌশলগত শিল্পের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে, যার কারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাবও আরও গুরুতরভাবে দেখা দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দেশীয় ব্যবসার জন্য সহায়ক মনে হলেও ট্রাম্পের বৈরী মনোভাবের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নও আমেরিকার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর বিপুল অঙ্কের জরিমানা আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে।
একটি ইউরোপীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ভবিষ্যতে ব্যবসার ধরণ কেমন হতে পারে তার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। চীনে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম অন্যান্য অঞ্চলের কার্যক্রম থেকে পৃথক হবে। ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কোম্পানিগুলোকে তাদের কার্যক্রমের ধরণ পরিবর্তন করতে বাধ্য করবে। এর ফলে সম্ভবত বিশ্বজুড়ে একাধিক স্থানে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যদিও এসব স্থাপনার অনেকগুলোই হবে সাময়িক কারখানা, সম্পূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র নয়। কোন শিল্প কোন দেশে গড়ে তোলা হবে, সে বিষয়ে কোম্পানিগুলোকে আরও সতর্কভাবে ভাবতে হবে। বেসামরিক ব্যবহারের জন্য হলেও চীনে ড্রোন তৈরি করা বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু আমেরিকার ক্ষেত্রে তা হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, “ভুল সময়ে ভুল দিকের লাঠির মাথায় কেউই থাকতে চায় না।”
এই বিস্তৃত কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত ও খণ্ডিত কর্পোরেট দৈত্যের ছবি অতীতের কোম্পানিগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর বহুদিনের বিভিন্ন সুবিধা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকবে। এর ফলে এসব কোম্পানি পরিচালনা করা আরও কঠিন হবে, কোম্পানিগুলোর গতিশীলতা ও লাভ হ্রাস পাবে। রাজনীতিবিদদের অবস্থান শক্তিশালী করতে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।

ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনার পর দেশটি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা শুনলে মনে হবে, ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার হস্তক্ষেপ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনবে। তারা লাভজনক বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ পাবে। তেলখাতে অঢেল অর্থ বিনিয়োগ থেকে মুনাফা উপচে পড়বে।
কিন্তু তেল কোম্পানিগুলোর মালিকপক্ষ ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। ভেনেজুয়েলার তেলখাতে বিনিয়োগ করা বিষয়ে হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর এক্সনমোবিলের প্রধান নির্বাহী দেশটিকে সরাসরি ‘বিনিয়োগের অযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। এই মন্তব্যে বিরক্ত হয়ে ট্রাম্প যখন এক্সনকে ভেনেজুয়েলা থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেন, তখন উল্টো কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে যায়।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যাপারটি দেখলে মনে হয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হলে তা থেকে সামান্য হলেও উপকার পাওয়া যায়। বাণিজ্যের জন্য এটি ইতিবাচক বিষয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ ধরনের মুহূর্ত সবসময় আসে না। কয়েক বছর ধরেই দ্য ইকোনমিস্টসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যম সতর্ক করে আসছে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কী উৎপাদন করবে এবং কোথায় তাদের পণ্য বিক্রি করবে। রাজনীতিবিদরা সেখানে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলে তা বিশ্বায়নের সুফলকে ব্যাহত করবে, ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও লাভ কমে যাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় বড় ও বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠন করছে এবং এর ফলে তাদের মুনাফা অর্জনে বিঘ্ন ঘটছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ভূরাজনীতির প্রভাব নিয়ে ভাবার সময় এসে গেছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, তালিকাভুক্ত বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর মোট মূল্যের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যেগুলোর মোট বিক্রির ৩০ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আসে। এই কোম্পানিগুলোর বার্ষিক মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারে। বিশ্বজুড়ে তারা প্রায় ১০ কোটি মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়।
শুরুটা কেমন?
বিশ্বজুড়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অগ্রযাত্রা গতি পায় ১৯৯০-এর দশকে, যখন অনেক পশ্চিমা ও উন্নয়নশীল দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিতে উদারপন্থা অবলম্বন করে। ২০০১ সালে চীন যখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়, তখন বিশ্ব জিডিপির ৪৯ শতাংশ আসত বৈশ্বিক বাণিজ্যের মাধ্যমে, এক দশক আগে এর পরিমাণ ছিল ৩৮ শতাংশ। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ২০০৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামার আগে জিডিপির ৫.৩ শতাংশ আসত এখান থেকে। পরবর্তীতে অর্থনীতি কিছুটা ঠিকঠাক হলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কারখানা গড়া ও পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল, আর অধিকাংশ সময়ই এর অগ্রগণ্য ছিল চীন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণবাদ অনেক সুবিধা নিয়ে এসেছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে শ্রমিক ও সরবরাহকারীর সন্ধান পেয়েছিল। নতুন ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজারের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলো প্রবৃদ্ধির ধীরগতিকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছিল। বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন খরচ কমাতে সক্ষম হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি সহায়ক হয়েছিল।
গত এক দশকে বিশ্বায়নের সমস্ত চমক সত্ত্বেও পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের চেয়ে বেশি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা ‘এফডিআই মার্কেটস’-এর তথ্যমতে, ২০১৬ সালে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের মূলধনের মাত্র ৪৪ শতাংশ বিনিয়োগ করেছিল। এরপর থেকে সেই হার ক্রমাগত বেড়েছে এবং ২০২৫ সালে তা ৬৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিসের ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিদেশি শাখার বিক্রি ১ শতাংশ কমেছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি বেড়েছে ৮ শতাংশ।
ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোও বাইরের বাজারের তুলনায় আমেরিকাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর তথ্য বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আমেরিকায় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর কর্মচারীর সংখ্যা ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ লাখে পৌঁছেছে। ইউরোপ আমেরিকাতে বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আমেরিকায় ইউরোপের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মরগান স্ট্যানলি ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর আমেরিকা থেকে প্রাপ্ত আয় ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এখন যা চলছে?
আমেরিকায় ব্যাপক হারে বিনিয়োগ বাড়ালেও পশ্চিমা কোম্পানিগুলো চীনের প্রতি উৎসাহ হারাচ্ছে। আমেরিকার গ্রিনফিল্ডের বৈদেশিক বিনিয়োগের মাত্র ২ শতাংশ এখন চীনে যাচ্ছে, এক দশক আগে যা ছিল ৭ শতাংশ। ইউরোপীয় প্রবাহও ৫ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইউরোপীয় এবং আমেরিকান কোম্পানিগুলো চীনে তাদের কর্মসংস্থান প্রায় এক-দশমাংশ কমিয়েছে। চীন এক সময় অন্য যেকোনো বিদেশি দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি আমেরিকান কর্মী নিয়োগ দিত; এখন তাদের অবস্থান চতুর্থ। স্টারবাকস, আইবিএম এবং এয়ারবিএনবির মতো বেশ কিছু বড় কোম্পানি চীন থেকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।

তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর চীন থেকে সরে আসার প্রবণতার পেছনে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর পিছুটান ছাড়াও আরও অনেক কারণ রয়েছে। গবেষকরা দেখেছেন, কোম্পানিগুলো এখন সেইসব দেশেই বেশি সক্রিয় হচ্ছে, যারা তাদের নিজ দেশের সাথে আদর্শিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমেরিকা এবং চীনকে এই বিশ্লেষণ থেকে বাদ দিলেও এই বিনিয়োগের ধারাটি মোটামুটি একই রকম।
একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের শাখাসমূহ যেসব দেশে অবস্থিত, সেসব দেশের সঙ্গে মূল দেশের মতাদর্শিক পার্থক্য থাকলে, সেখানে মূলধনী ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। এই মতাদর্শগত মিল পরিমাপ করা হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেশ দুটি কতবার সংহতি প্রদর্শন করেছে তার ওপর ভিত্তি করে। বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন আদর্শিক ঘনিষ্ঠতা ভৌগোলিক দূরত্বের মতোই গুরুত্ব পাচ্ছে।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এই আমূল পরিবর্তনের কারণ কেবল ভূরাজনীতি নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। গত পাঁচ বছরে আমেরিকার অর্থনীতির অগ্রগতি সন্তোষজনক। একই সময়ে চীনের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে তুলনামূলক কম। ইউরোপের প্রবৃদ্ধি এই সময়ে স্থবির ছিল। আমেরিকার এই অর্থনৈতিক সাফল্যের মূলে রয়েছে দেশটির ভোক্তারা।
ভূরাজনীতির বাইরের আরেকটি কারণ চীনা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা। অনেক ক্ষেত্রেই চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখন পশ্চিমকে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে রাজনীতিরও বড় ভূমিকা আছে এখানে। চীনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানো এবং প্রযুক্তিগতভাবে দেশটিকে দুর্বল করার পশ্চিমা আকাঙ্ক্ষা থেকে শুল্ক এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম অন্য দেশে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ও ধরণ বদলে যায়। প্রযুক্তির বদলে তেলের গুরুত্ব বাড়তে থাকে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চরম আকার ধারণ করে। কৌশলগত প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যদের তুলনায় আগেভাগে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। ইউরোপীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলিও চীন থেকে সরে আসছে।
এই পশ্চাদপসরণ পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য ক্ষতির কারণ হবে। আলাদা করে বলতে গেলে সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি এবং তাদের সরবরাহকারীরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম হলেও অন্যান্য সংবেদনশীল শিল্প যেমন: ডেটা সেন্টার কোম্পানি, গাড়ি নির্মাতা এবং ওষুধ শিল্পও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভূরাজনীতি ছাড়া আরও যা আছে
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কৌশলগত শিল্পের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে, যার কারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাবও আরও গুরুতরভাবে দেখা দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দেশীয় ব্যবসার জন্য সহায়ক মনে হলেও ট্রাম্পের বৈরী মনোভাবের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নও আমেরিকার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর বিপুল অঙ্কের জরিমানা আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে।
একটি ইউরোপীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ভবিষ্যতে ব্যবসার ধরণ কেমন হতে পারে তার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। চীনে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম অন্যান্য অঞ্চলের কার্যক্রম থেকে পৃথক হবে। ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কোম্পানিগুলোকে তাদের কার্যক্রমের ধরণ পরিবর্তন করতে বাধ্য করবে। এর ফলে সম্ভবত বিশ্বজুড়ে একাধিক স্থানে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যদিও এসব স্থাপনার অনেকগুলোই হবে সাময়িক কারখানা, সম্পূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র নয়। কোন শিল্প কোন দেশে গড়ে তোলা হবে, সে বিষয়ে কোম্পানিগুলোকে আরও সতর্কভাবে ভাবতে হবে। বেসামরিক ব্যবহারের জন্য হলেও চীনে ড্রোন তৈরি করা বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু আমেরিকার ক্ষেত্রে তা হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, “ভুল সময়ে ভুল দিকের লাঠির মাথায় কেউই থাকতে চায় না।”
এই বিস্তৃত কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত ও খণ্ডিত কর্পোরেট দৈত্যের ছবি অতীতের কোম্পানিগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর বহুদিনের বিভিন্ন সুবিধা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকবে। এর ফলে এসব কোম্পানি পরিচালনা করা আরও কঠিন হবে, কোম্পানিগুলোর গতিশীলতা ও লাভ হ্রাস পাবে। রাজনীতিবিদদের অবস্থান শক্তিশালী করতে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।