Advertisement Banner

হারেৎজের বিশ্লেষণ

কেন পুরো মধ্যপ্রাচ্য জ্বালিয়ে দিতে পারেন নেতানিয়াহু

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কেন পুরো মধ্যপ্রাচ্য জ্বালিয়ে দিতে পারেন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

‘আমি এক কথার মানুষ’—ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে এই বাক্যটি একেবারেই খাপ খায় না। তবে ইরান ইস্যুতে এবার তিনি নিজের কথার ফাঁদেই নিজে আটকা পড়েছেন। চলমান নির্বাচনী প্রচারে তার নিজের অতীতের মন্তব্যগুলোই এখন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, যা আগামী দিনে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় এক উদ্বেগের কারণ হতে যাচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী ইরানে হামলা শুরু করে, সেদিন নেতানিয়াহু দেশবাসীর উদ্দেশে এক ভিডিও বার্তায় দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘এই অভিযানের একমাত্র লক্ষ্য ইরানের আয়াতুল্লাহ শাসনের হুমকি চিরতরে মুছে দেওয়া। লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে... তারা যদি এখন পার পেয়ে যায়, তবে অজেয় হয়ে উঠবে। তাদের কূটনীতিকরা আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের সঙ্গে যে আলোচনা করছে, তা স্রেফ সময়ক্ষেপণের প্রতারণা।’’

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্য হারেৎজ বলছে, ঠিক ১৫ সপ্তাহ পর বাস্তবতার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছাতে একমত হয়েছে। হোয়াইট হাউসে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় ‘বন্ধু’ ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সেই ‘প্রতারণাপূর্ণ’ আলোচনার টেবিলেই শেষমেশ বসলেন, আর ‘আয়াতুল্লাহ শাসন গুঁড়িয়ে দেওয়ার’ নেতানিয়াহুর সেই স্বপ্নও যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

ইসরায়েলের জন্য এক বিপর্যয়কর চুক্তি?

এই চুক্তিটি যে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় একটি ধাক্কা, তা বুঝতে কোনো ঝানু কূটনীতিক হওয়ার প্রয়োজন নেই। আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আগামী ৬০ দিনের আলোচনার জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার টেবিল থেকেই পুরোপুরি বাদ পড়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

নেতানিয়াহুর জন্য এটি এক বহুমাত্রিক ব্যর্থতা। কয়েক দশক ধরে তিনি যে ইরানি হুমকিকে পুঁজি করে রাজনীতি করেছেন এবং গত এক বছরের হামলাকে যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন, নতুন চুক্তিটি সেই লক্ষ্য থেকে যোজন যোজন দূরে। উল্টো বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে তাদের অর্থনীতি চাঙ্গা করার সুযোগ পাবে, যা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সিদের আরও শক্তিশালী করতে জ্বালানি জোগাবে। কূটনৈতিক মহলে ইরানের স্বেচ্ছায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমানোর প্রতিশ্রুতিটিকে তাই মোটেও বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হচ্ছে না।

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের আসল রূপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের অসাধারণ কেমিস্ট্রি'র যে বড়াই নেতানিয়াহু করতেন, এই সংকটে তার আসল কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে। এই মহাগুরুত্বপূর্ণ আলোচনা থেকে ইসরায়েলকে পুরোপুরি দূরে রাখা হয়েছে; ট্রাম্প বাধ্য করেছেন নেতানিয়াহুকে শুধু দর্শকের ভূমিকায় বসে থাকতে।

আসলে ট্রাম্প এখন এমন এক যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত, যা থেকে দ্রুত কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক ফায়দা মিলছে না, অথচ মার্কিন কোষাগারের খরচ হু হু করে বাড়ছে। নেতানিয়াহুর শক্তির জোরে সব সমাধান করার একগুঁয়ে নীতিতেও মার্কিন প্রশাসন বিরক্ত। গত রোববার বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার পর ট্রাম্প চরম ক্ষুব্ধ হয়ে মন্তব্য করেন যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই।

ট্রাম্প যখন তার সমর্থকদের খুশি করতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ গুটিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, তখন নেতানিয়াহুর ঝুলিতে রইল কেবলই শূন্যতা । গত তিন বছরে ইসরায়েল কৌশলে যেটুকু সামরিক সুবিধা অর্জন করেছিল, তা এখন ভেস্তে যাওয়ার মুখে।

নতুন মধ্যপ্রাচ্যের স্বপ্ন বনাম রূঢ় বাস্তবতা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহু বারবার দাবি করেছিলেন যে, তার নেতৃত্বেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি চিরতরে বদলে যাবে। গাজার বুকে চলমান ধ্বংসযজ্ঞ হয়তো তার সেই আগ্রাসী নীতির সবচেয়ে নির্মম প্রমাণ।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

নেতানিয়াহু শুধু হামাস, হিজবুল্লাহ বা ইরানকে নির্মূল করতে চাননি; তিনি চেয়েছিলেন ইসরায়েলকে এই অঞ্চলের একক পরাশক্তি বানাতে। আসাদ-পরবর্তী সিরিয়া এবং নাসরুল্লাহ-পরবর্তী লেবানন থেকে যখন ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের কিছু নজিরবিহীন কূটনৈতিক প্রস্তাব আসছিল, তখন নেতানিয়াহুর জবাব ছিল একটাই—কূটনীতি নয়, আরও বেশি বোমাবর্ষণ।

এমনকি ট্রাম্পের সেই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ধারণাও এখন ধোপে টিকছে না। ফিলিস্তিন ইস্যুর স্থায়ী সমাধান ছাড়া সৌদি আরব যে একচুলও নড়বে না, তা পরিষ্কার। গত দেড় বছরে যখন হামাস ও হিজবুল্লাহ সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল, তখন ইসরায়েলের সামনে সুযোগ ছিল আঞ্চলিক ভারসাম্যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনার। কিন্তু নিজের অহংকার, কূটনৈতিক অবজ্ঞা এবং কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের চাপের মুখে পড়ে নেতানিয়াহু জয়ের মুখ থেকে পরাজয় ছিনিয়ে এনেছেন।

ভোটের রাজনীতি ও চরমপন্থার আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে ব্যর্থতা ঢাকতে এবং আসন্ন নির্বাচনে জিততে নেতানিয়াহু এখন আরও চরমপন্থার পথ বেছে নিতে পারেন। গত রোববার বৈরুতের দাহিয়েহতে তাঁর আকস্মিক বোমাবর্ষণের নির্দেশ ছিল মূলত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করার এবং নিজের কট্টরপন্থী জোটকে শান্ত রাখার একটি মরিয়া চেষ্টা।

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহুর কাছে এখন সবকিছুই যেন বিক্রির জন্য প্রস্তুত—বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনিদের জীবন। ইরান বা লেবানন সীমান্তে সুবিধা করতে না পারলে তিনি হয়তো আবার পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন অবরুদ্ধ গাজার ওপরই।

গত ১৯ মার্চ এক বিতর্কিত সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘‘নেতাদের কাজ হলো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলা, পরিস্থিতি যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন।’’ সেদিন কথাটি বলার সময় হয়তো তাঁর নিজেরও সত্যের পথে হাঁটার কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু নিজের পর্বতপ্রমাণ ব্যর্থতাকে মহাবিজয় হিসেবে দেখানোর এই সব কূটকৌশলের মাঝে, ওই একটি বাক্যেই হয়তো নেতানিয়াহু নিজের অজান্তে জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি বলে ফেলেছিলেন।

সম্পর্কিত