Advertisement Banner

শ্রেণিকক্ষে এআই: শিক্ষার্থীদের চিন্তা, আলোচনা ও মূল্যায়নের ধরন বদলে যাচ্ছে?

শ্রেণিকক্ষে এআই: শিক্ষার্থীদের চিন্তা, আলোচনা ও মূল্যায়নের ধরন বদলে যাচ্ছে?
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করেছে। শুরুতে অনেকেই এর ব্যবহার জানত না। কিন্তু এখন প্রায় সব বয়সী মানুষই কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিচ্ছে। বড়দের পাশাপাশি স্কুলপড়ুয়া শিশুরাও এখন এআই ব্যবহার করছে। যাদের নিজের মোবাইল নেই, তারা বাবা-মায়ের ফোনে এআই ব্যবহার করে নানা কাজ করছে। ছবি এডিট, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেওয়া, এমনকি ছবির ক্যাপশন ঠিক করা—সবকিছুতেই এখন এআই ভূমিকা রাখছে। তবে এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা গেছে শিক্ষাক্ষেত্রে।

এআই এখন শিক্ষাজগতের এক বড় বাস্তবতা। কয়েক বছর আগেও যেটি শুধু প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার বিষয় ছিল, এখন সেটি ক্লাসরুম, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা এবং বিষয় নির্বাচনের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এখন পড়াশোনা, নোট তৈরি, ক্লাস আলোচনায় অংশ নেওয়া, অ্যাসাইনমেন্ট লেখা, এমনকি পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহার করছে। তবে এই পরিবর্তন নতুন করে এক প্রশ্নও সামনে এনেছে–এআই কি শিক্ষার্থীদের শেখার সহযোগী, নাকি এটি তাদের চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে?

সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এখন ক্লাস চলাকালে শিক্ষকের প্রশ্ন সরাসরি এআই চ্যাটবটে লিখে উত্তর নিচ্ছে এবং সেই উত্তরই ক্লাসে বলছে।

ইয়েলের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আমান্ডা (ছদ্মনাম) সিএনএনকে বলেন, “একদিন দেখলাম স্যার একটি প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে আমার পাশের শিক্ষার্থী দ্রুত ল্যাপটপে টাইপ করছে এবং চ্যাটবট থেকে পাওয়া উত্তরই ক্লাসে স্যারকে বলছে।”

তার মতে, আগে ক্লাসগুলোতে প্রাণবন্ত আলোচনা হতো। একই বিষয়ের ওপর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও ব্যাখ্যা পাওয়া যেত। কিন্তু এখন দেখা যায় অনেক শিক্ষার্থীর উত্তর একইরকম হয়ে যাচ্ছে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী জেসিকা (ছদ্মনাম) সিএনএনকে বলেন, “প্রায় সকল ক্লাসেই, বিশেষ করে যেসব ক্লাসে শিক্ষক হঠাৎ করে প্রশ্ন করেন, তখন শিক্ষার্থীরা বেশি এআইয়ের সাহায্য নেয়।”

জেসিকা বলেন, “হাইস্কুলের তুলনায় আমার পরিশ্রম এখন অনেক কমে গেছে। আগে নিজে ভাবতাম, তারপর লিখতাম। কিন্তু এখন অনেক সময় এআইকে বলি লিখে দিতে।”

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী সোফিয়া (ছদ্মনাম) মনে করেন, এআইয়ের ওপর নির্ভরতার বড় কারণ হলো আত্মবিশ্বাসের অভাব। তিনি বলেন, “অনেকেই মনে করে, যদি নিজে কিছু বলে বা লিখে ভুল হয়, তাহলে সমস্যা হতে পারে। তাই তারা এআই দিয়ে আগে স্ক্রিপ্ট তৈরি করে নেয়, যাতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা না থাকে।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ছবি: রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ছবি: রয়টার্স

অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউএসসি) মনোবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের অধ্যাপক মরতেজা দেহঘানি এআই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

মরতেজা দেহঘানি বলেন, “যদি মানুষ নিজস্বভাবে চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং অলসতায় ভুগতে শুরু করে, তবে এর প্রভাব পুরো সমাজে পড়বে।” তার মতে, “এআই সহযোগী হতে পারে। কিন্তু নির্ভরশীল হয়ে পড়া ঠিক নয়।”

ইয়েলের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক সান-জু শিন বলেন, “আমি চাই আমার শিক্ষার্থীরা ক্লাসের বিষয়বস্তু বুঝুক, একই সঙ্গে এআইকে তাদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করুক।”

এই কারণে তিনি এখন বাড়ির কাজের পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা, ক্লাস টেস্ট ও প্রেজেন্টেশনে গুরুত্ব বাড়িয়েছেন।

পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন

ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের ইয়র্কশায়ার ডেলসের ওয়েনস্লিডেল স্কুলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের চিত্র দেখা গেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এআই ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের খাতা দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে পক্ষপাতহীনভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব।

সেখানকার স্কুলের প্রধান শিক্ষক জুলিয়া পলি বিবিসিকে জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলক এই পদ্ধতি মূলত ইংরেজি ও ইতিহাস বিষয়ের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিষয়গুলোতে বর্ণনামূলক উত্তর থাকায় মূল্যায়নে অনেক সময় ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা বা বিষয়ভিত্তিক মতামতের প্রভাব পড়ে। এআই প্রযুক্তি কতটা নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করতে পারে, তা যাচাইের উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জুলিয়া পলি বলেন, “আমাদের শিক্ষকরা এআইয়ের পাশাপাশি নিজেরাও খাতা মূল্যায়ন করেছেন। আমরা দেখতে চেয়েছিলাম এআই কতটা সঠিকভাবে উত্তর বুঝতে পারে, কোথাও ভুল ব্যাখ্যা করে কি না।”

জুলিয়া জানান, এই মূল্যায়নের বড় সুবিধা হলো–এটি শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত ও বিস্তারিত ফিডব্যাক দিতে পারে, যা অবশ্য একজন শিক্ষকও দিতে পারেন। তবে অনেক বেশি সময় লাগে।

পরীক্ষা চলাকালীন শিক্ষার্থীরা। ছবি: রয়টার্স
পরীক্ষা চলাকালীন শিক্ষার্থীরা। ছবি: রয়টার্স

প্রধান শিক্ষক বলেন, “আমাদের শিক্ষকরা প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, “আমরাই আমাদের শিক্ষার্থীদের খাতা দেখতে চাই।”তাই আমরা এটিকে শিক্ষকের প্রতিস্থাপন নয়, বরং একটি সহায়ক হিসেবে দেখেছি।

তবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচও কম নয়। প্রতিটি দীর্ঘ উত্তরের প্রশ্ন মূল্যায়নে খরচ হচ্ছে প্রায় শূন্য দশমিক ৫৭ ডলার। প্রাথমিকভাবে স্কুলটি ৭৬০ ডলার ব্যয় করে ১,২৫০ ক্রেডিট কিনেছে, যা ইংরেজি ও ইতিহাসের পরীক্ষার খাতায় ব্যবহার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ইয়র্ক সেন্ট জন বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. থিওচারিস কিরিয়াকু বিবিসিকে বলেন, স্কুলে এআই ব্যবহারের সরকারি নির্দেশিকা মাত্র এক বছর আগে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “এখনো এটি খুব প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। স্কুলগুলোতে এটি শুরু হলেও ব্যবহার এখনও সীমিত।”

তিনি আরও বলেন, পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যদি সম্পূর্ণভাবে এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার ভাষায়, “সম্পূর্ণভাবে এআইকে মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া ভালো হবে না। এতে শিক্ষকের দক্ষতা কমে যাবে।”

এদিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অনেকেই জানতে চান, কীভাবে এবং কোন মানদণ্ডে এআই নম্বর দিচ্ছে।

এ বিষয়ে ডিপার্টমেন্ট ফর এডুকেশনের (ডিএফই) এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, শিক্ষকরা এআই ব্যবহার করতে পারবেন। তবে যেকোনো ফলাফল চূড়ান্ত করার আগে তাদের পেশাগত দিক থেকে নির্ভুলতা যাচাই করতে হবে। তিনি বলেন, “চূড়ান্ত দায়িত্ব সবসময় শিক্ষকদের ওপরই থাকবে।”

এআইয়ের প্রভাবে বাড়ছে বিষয় পরিবর্তন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত বদলে দিচ্ছে চাকরির বাজার। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রে এখন অনেক কলেজ শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ চাকরির সুযোগ এবং প্রযুক্তির প্রভাব বিবেচনায় নিজেদের পড়াশোনার বিষয় পরিবর্তন করছে। সাম্প্রতিক একাধিক জরিপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি তাদের একাডেমিক বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনটিতে দেখা যায়, গ্যালাপ এবং লুমিনা ফাউন্ডেশনের যৌথ এক জরিপে প্রায় ৩,৮০০ শিক্ষার্থীর মতামত নেওয়া হয়। সেখানে দেখা গেছে, প্রতি ৬ জনে ১ জন; অর্থাৎ, প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে এআইয়ের কারণে তাদের বিষয় পরিবর্তন করেছে। এই পরিবর্তনের মূল কারণ হলো চাকরির বাজারে দ্রুত পরিবর্তন এবং কিছু পেশায় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রভাব।

জরিপ অনুযায়ী, ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তারা অন্তত একবার বিষয় পরিবর্তনের কথা ভেবেছেন। অর্থাৎ, কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় যে বিষয় নির্ধারণ করা হয়, তা শেষ পর্যন্ত এখন আর স্থায়ী থাকছে না, বরং শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝপথে তাদের সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছেন।

বিভিন্ন এআই প্ল্যাটফর্ম। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বিভিন্ন এআই প্ল্যাটফর্ম। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

প্রযুক্তি ও ভোকেশনাল প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয় পরিবর্তনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এই দুই বিষয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তারা বড় পরিবর্তনের কথা ভেবেছেন। এর পেছনে বড় কারণ হলো প্রযুক্তি খাতের ভেতরে দ্রুত পরিবর্তন। আগে যেখানে প্রোগ্রামিং বা কোডিং কেন্দ্রিক বিষয়গুলো বেশি জনপ্রিয় ছিল, তবে এখন শিক্ষার্থীরা বেশি ঝুঁকছেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, মেশিন লার্নিং ও এআই–কেন্দ্রিক বিষয়ে।

দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ সালে কম্পিউটার সায়েন্সে প্রোগ্রামিং–সংক্রান্ত বিষয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থী ছিল ১৪ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে কমে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, এআই কেন্দ্রিক বিষয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থী ২০২৩ সালের থেকে ১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬–এ ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে কিছু বিষয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম বিষয় পরিবর্তন করছে। কারণ, এসব ক্ষেত্রে এখনো কম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতে মানুষের সরাসরি দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বেশি থাকায় শিক্ষার্থীরা এই বিষয়গুলোকে ভবিষ্যতের জন্য বেশি নিরাপদ মনে করছেন।

যারা ইতোমধ্যে বিষয় পরিবর্তন করেছেন, তাদের মধ্যে ২৬ শতাংশ সামাজিক বিজ্ঞান, ১৭ শতাংশ ব্যবসায় শিক্ষা এবং ১৩ শতাংশ প্রযুক্তি–সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দিকে গেছেন।

এআই বদলে দিচ্ছে শেখার ধরন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন উচ্চশিক্ষায় দ্রুত প্রভাব ফেলছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউএসসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বেশির ভাগ কলেজ শিক্ষার্থী চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল ব্যবহার করছে শুধু দ্রুত উত্তর পাওয়ার জন্য, শেখার জন্য নয়। তবে শিক্ষকরা যদি সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দেন, তাহলে একই প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউএসসির সেন্টার ফর জেনারেটিভ এআই অ্যান্ড সোসাইটি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে এআই ব্যবহারের বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় দুটি নতুন জরিপ ও একটি পরীক্ষামূলক স্টাডি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ছিল একটি নতুন এআই রাইটিং টুল নিয়ে পরীক্ষা এবং পাঁচটি দেশের শিক্ষকদের ওপর একটি বৈশ্বিক জরিপ।

গবেষণার নেতৃত্বে থাকা স্টিফেন জে আগুইলার, যিনি ইউএসসি রসিয়ার স্কুল অব এডুকেশনের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি বলেন, “জেনারেটিভ এআই ইতোমধ্যেই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–আমরা এটি নিজের বিকাশে ব্যবহার করছি, নাকি শুধু দ্রুত উত্তরের আশায় ব্যবহার করছি।”

গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী এআইকে মূলত দ্রুত উত্তর, অ্যাসাইনমেন্টের সমাধান বা কম পরিশ্রমে কাজ শেষ করার জন্য ব্যবহার করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ছবি: রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ছবি: রয়টার্স

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে এআই ব্যবহারের উৎসাহ পায়, তারা একে সহায়ক হিসেবে বেশি ব্যবহার করে। এতে বোঝা যায়, শিক্ষকদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আগুইলার বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এআই ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের একা ছেড়ে না দেওয়া।”

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কাতার, কলম্বিয়া ও ফিলিপাইনের ১,৫০৫ জন শিক্ষককে নিয়ে করা জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষকদের মধ্যে নকল, সৃজনশীলতা হ্রাস এবং প্রতিষ্ঠানগত সহায়তার অভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবুও অধিকাংশ শিক্ষক এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ শিক্ষক বলেছেন, এআই নিয়মিত কাজ দ্রুত করতে সাহায্য করে। ৭৩ শতাংশ মনে করেন, এটি শিক্ষার্থীদের ফলাফল উন্নত করতে পারে। এবং ৬৯ শতাংশ বলেছেন, এটি আরো ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সুযোগ তৈরি করে।

গবেষণায় এআই ফর ব্রেইনস্টর্মিং অ্যান্ড এডিটিং নামের একটি নতুন এআই টুলও পরীক্ষা করা হয়। এই টুলটি শিক্ষার্থীদের পুরো লেখা তৈরি করে দেওয়ার বদলে ভাবনা, যুক্তি শক্তিশালী করা এবং পাল্টা যুক্তি খুঁজে বের করতে সহায়তা করে।

এআইয়ে ভরসা বাড়ছে

এআই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে এখন শিক্ষার্থীরা। শুধু ব্যবহার বললে কম বলা হবে—অনেক ক্ষেত্রে তারা এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আগে যেখানে শিক্ষার্থীরা এটিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করত, এখন অনেকেই পড়াশোনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অ্যাসাইনমেন্ট, নোট তৈরি, এমনকি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও এআই ব্যবহার বাড়ছে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকরাও এখন বিভিন্ন কাজে এআই ব্যবহার করছেন। এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নেও এআই ব্যবহার দেখা গেছে।

শিক্ষায় এআই-এর ব্যবহার নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রাসেল খান চরচাকে বলেন, “আমি প্রথম বর্ষ থেকেই একটা কোচিংয়ে পড়াই। সেই কারণে দেখা যায় আমার তেমন একটা ক্লাস করা হয়নি। সেই কারণে পরীক্ষার সময় দেখা যেত, আমি টপিকের জন্য শিক্ষকরা যে বই বা পিডিএফ দিত, আমি সেই টপিকগুলোর ছবি তুলে বা পিডিএফ সরাসরি এআই-কে দিয়ে বলতাম–এই পুরো বিষয়টিকে সহজ করে বুঝিয়ে দাও। তো সেখান থেকে অনেক জটিল বিষয় আনেক সহজেই আমি বুঝতে পারতাম এবং সেখান থেকে পড়েই আমি পরীক্ষা দিতাম।”

বাংলাদেশে এখনো অতটা না হলেও উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়–এআই শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এটি শেখাকে সহজ করেছে, সময় বাঁচাচ্ছে এবং জটিল বিষয়কে সহজভাবে বোঝার সুযোগ দিয়েছে। তবে অতিরিক্ত নির্ভরতা বিপজ্জনক হতে পারে।

এআই ব্যবহার নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মেহনাজ হক চরচাকে বলেন, “আমি সহজেই বুঝতে পারি শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করছে কিনা। বিশেষ করে অ্যাসাইনমেন্টে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা হুবহু এআই থেকে পাওয়া লেখা জমা দেয়।”

নিজে এআই ব্যবহার করেন কিনা–এমন প্রশ্নের জবাবে এই শিক্ষক বলেন, “হ্যাঁ আমি নিজেও এআই ব্যবহার করি। তবে সেটি সময় বাঁচানোর জন্য এবং ক্লাসের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, “কোনো বিষয় পড়ানোর আগে আমি দেখে নিই–কী ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে। এতে প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হয়।”

মেহনাজ বলেন, এআই ব্যবহার করা উচিত শেখার জন্য, নিজের জ্ঞান বাড়ানোর জন্য। কিন্তু যদি পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে যায়, তাহলে তা ক্ষতিকর হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতা কমে যায়। এই সমস্যা মোকাবিলায় তিনি শিক্ষার্থীদের বেশি করে প্র্যাকটিক্যাল কাজ ও প্রেজেন্টেশন দিচ্ছেন, যাতে তারা নিজেরা চিন্তা করে কাজ করতে বাধ্য হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে এআইকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার কী হবে, কীভাবে হবে, কতটা হবে–তা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ হচ্ছে। শিক্ষকসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা এতে নিজেকে যুক্ত করছেন। পাশাপাশি কাঠামোগত একটা পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনো তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো–প্রযুক্তির এই ধারাটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটা জানেন বলেই মেহনাজ হক নিজের মতো করে একটি কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এটি ব্যক্তিপর্যায়ে। সার্বিকভাবে এআইয়ের সুফল নিতে হলে কাঠামোগতভাবে পরিকল্পনামাফিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, এর সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীই শুধু নয়, গোটা শিক্ষাব্যবস্থা।

সম্পর্কিত