চরচা ডেস্ক

চলতি মাসের শুরুতে টেক্সাসের ফোর্ট হুডে ‘ব্ল্যাক জ্যাক’ ব্রিগেডের প্রায় ৪ হাজার মার্কিন সেনা পোল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে ন্যাটোকে সহায়তা করাই ছিল এই মোতায়েনের উদ্দেশ্য। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি মাসে এটি ছিল দ্বিতীয়বার, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থনে অসন্তুষ্ট ছিলেন ট্রাম্প। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় ইউরোপকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও কমানো হতে পারে।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই ট্রাম্প ট্রান্স-আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট (ন্যাটো) ও এর পরস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা (আর্টিকেল ৫) নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এতে ইউরোপের দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে শুরু করলেও সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প আরও বড় পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন এবং জার্মানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করেছেন।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। কারণ, তারা মনে করেছিল নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও নজরদারি সহায়তার বিকল্প গড়ে তুলতে তাদের আরও সময় থাকবে। একই সময়ে ইরানে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কারণে আমেরিকা নিজেদের অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠনে ব্যস্ত থাকায় ইউরোপ ও ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহেও বিলম্ব হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জানুয়ারিতে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ন্যাটোর কিছু সদস্য আশঙ্কা করছে, রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা পাশে না-ও পেতে পারে। পাশাপাশি ন্যাটোর পদক্ষেপেও বাধা দিতে পারে দেশটি। যদিও এমন সম্ভাবনাকে এখনো কম বলেই ধরা হচ্ছে।
কী করবে ইউরোপ?
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের কয়েকটি দেশ গোপনে বিকল্প পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’ নিয়ে ভাবছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বা ন্যাটোর বিদ্যমান কমান্ড কাঠামো ছাড়াও কীভাবে প্রতিরক্ষা চালানো সম্ভব, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সুইডিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, “গ্রিনল্যান্ড সংকট আমাদের সতর্ক করেছে। তখনই আমরা বুঝেছি, বিকল্প পরিকল্পনা দরকার।”
তবে কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইছেন না। তাদের আশঙ্কা, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো থেকে আরও দ্রুত দূরে সরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণেই ন্যাটোর ভেতরে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে–কোনো সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা না করলে ইউরোপ কার নেতৃত্বে এবং কোন সামরিক কাঠামোর অধীনে নিজেদের রক্ষা করবে।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এ ধরনের ‘প্ল্যান বি’ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা নিরুৎসাহিত করছেন বলে জানিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট। এক অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্য, রুটে মনে করেন এ বিষয়ে প্রকাশ্য আলোচনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
গত বছর ফিনিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ম্যাটি পেসু একটি প্রবন্ধে বিকল্প পরিকল্পনার পক্ষে মত দিলেও তখন ফিনল্যান্ডের কর্মকর্তারা এমন কোনো পরিকল্পনা বিবেচনার কথা অস্বীকার করেছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে যে ন্যাটো কোনো কারণে কার্যকর না থাকলে ইউরোপ কীভাবে এবং কার নেতৃত্বে নিজেদের প্রতিরক্ষা চালাবে।
এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার প্রশ্ন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর সিদ্ধান্ত আটকে দেয়, তাহলে কোন কমান্ড কাঠামোর অধীনে কাজ করা হবে?”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ প্রশ্ন ন্যাটোর কার্যকারিতার মূল জায়গায় আঘাত করছে। সাধারণ সামরিক জোটে সদস্য দেশগুলো আলাদাভাবে কাজ করলেও ন্যাটো গড়ে উঠেছে একটি সমন্বিত কাঠামোর ভিত্তিতে। এর নেতৃত্বে থাকেন সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ইউরোপ (এসএসিইউআর), যিনি সাধারণত একজন মার্কিন জেনারেল এবং ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীরও নেতৃত্ব দেন।
এই কাঠামোর অধীনে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থায়ী সামরিক সদরদপ্তরের একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেখানে হাজারো কর্মকর্তা ও সদস্য যেকোনো সংঘাতের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন।
ব্রাসেলসের ফ্রি ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিকিউরিটি, ডিপ্লোম্যাসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির পরিচালক লুইস সিমনের ভাষায়, “ন্যাটোকে একসঙ্গে ধরে রাখার আঠা হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব। এটি না থাকলে জোটের প্রতিরোধব্যবস্থায় ভাঙন দেখা দিতে পারে।”

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের জন্য ‘প্ল্যান বি’ শুধু নতুন অস্ত্র কেনার বিষয় নয়। তাদের এমন একটি সামরিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে যার অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর ইউরোপে এ ধরনের বিকল্প জোটের কেন্দ্র হতে পারে বাল্টিক ও নর্ডিক দেশগুলোর সঙ্গে পোল্যান্ড। এসব দেশের মধ্যে রাশিয়া নিয়ে উদ্বেগ এবং নিরাপত্তা স্বার্থে মিল রয়েছে। পাশাপাশি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো কয়েকটি বড় ইউরোপীয় দেশের সেনাও ইতোমধ্যে বাল্টিক অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে, ফলে সংঘাত শুরু হলে তারাও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক আরইউএসআইর গবেষক এডওয়ার্ড আর্নল্ডের মতে, ন্যাটোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য আর্টিকেল ৫ কার্যকর হোক বা না হোক, সংঘাতের প্রথম দিন থেকেই লড়াইয়ে অংশ নিতে পারে। তিনি মনে করেন, সিদ্ধান্তের জন্য সবাই নর্থ আটলান্টিক কাউন্সিলে বসে অপেক্ষা করবে না।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন ‘জয়েন্ট এক্সপেডিশনারি ফোর্স’ বা জেইএফ। মূলত বাল্টিক ও নর্ডিক অঞ্চলের ১০টি দেশ নিয়ে গঠিত এই জোটের সদরদপ্তর লন্ডনের কাছে। ২০১৪ সালে এটি গঠিত হয়েছিল দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী হিসেবে, বিশেষ করে এমন পরিস্থিতির জন্য যেখানে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ প্রয়োগের প্রয়োজন নাও হতে পারে। পরে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড এতে যোগ দিলে জোটটির গুরুত্ব আরও বাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, জেইএফের একটি বড় সুবিধা হলো এটি ন্যাটোর মতো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। ন্যাটোতে আর্টিকেল ৫ কার্যকর করতে সব সদস্যের সম্মতি লাগে, কিন্তু জেইএফ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে সামরিক মহড়া ও নৌ টহলের জন্য এটি কয়েকবার সক্রিয়ও হয়েছে।
আর্নল্ডের মতে, বিকল্প কাঠামোগুলোর মধ্যে জেইএফ সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত। এর নিজস্ব গোয়েন্দা, পরিকল্পনা ও সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে এবং সীমিত হলেও ন্যাটোর বাইরে নিজস্ব নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থাও আছে। ব্রিটেনের পারমাণবিক সক্ষমতাও এতে বাড়তি প্রতিরোধ শক্তি দিতে পারে।
তবে জেইএফের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি মূলত উত্তর ইউরোপকেন্দ্রিক এবং এতে ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডের মতো বড় শক্তি নেই। পাশাপাশি ব্রিটেনের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও কিছু কর্মকর্তার উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থসংকটের কারণে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন ও সেনা ইউনিটের সংখ্যা সীমিত বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউরোপ যদি ন্যাটোর বর্তমান কাঠামো পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে না পারে, তাহলে জেইএফের মতো কোনো বিকল্প ব্যবস্থাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে। কারণ, যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি এমন এক মিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যে সংকটে পাশে নাও থাকতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে টেক্সাসের ফোর্ট হুডে ‘ব্ল্যাক জ্যাক’ ব্রিগেডের প্রায় ৪ হাজার মার্কিন সেনা পোল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে ন্যাটোকে সহায়তা করাই ছিল এই মোতায়েনের উদ্দেশ্য। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি মাসে এটি ছিল দ্বিতীয়বার, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থনে অসন্তুষ্ট ছিলেন ট্রাম্প। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় ইউরোপকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও কমানো হতে পারে।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই ট্রাম্প ট্রান্স-আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট (ন্যাটো) ও এর পরস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা (আর্টিকেল ৫) নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এতে ইউরোপের দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে শুরু করলেও সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প আরও বড় পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন এবং জার্মানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করেছেন।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। কারণ, তারা মনে করেছিল নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও নজরদারি সহায়তার বিকল্প গড়ে তুলতে তাদের আরও সময় থাকবে। একই সময়ে ইরানে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কারণে আমেরিকা নিজেদের অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠনে ব্যস্ত থাকায় ইউরোপ ও ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহেও বিলম্ব হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জানুয়ারিতে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ন্যাটোর কিছু সদস্য আশঙ্কা করছে, রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা পাশে না-ও পেতে পারে। পাশাপাশি ন্যাটোর পদক্ষেপেও বাধা দিতে পারে দেশটি। যদিও এমন সম্ভাবনাকে এখনো কম বলেই ধরা হচ্ছে।
কী করবে ইউরোপ?
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের কয়েকটি দেশ গোপনে বিকল্প পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’ নিয়ে ভাবছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বা ন্যাটোর বিদ্যমান কমান্ড কাঠামো ছাড়াও কীভাবে প্রতিরক্ষা চালানো সম্ভব, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সুইডিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, “গ্রিনল্যান্ড সংকট আমাদের সতর্ক করেছে। তখনই আমরা বুঝেছি, বিকল্প পরিকল্পনা দরকার।”
তবে কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইছেন না। তাদের আশঙ্কা, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো থেকে আরও দ্রুত দূরে সরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণেই ন্যাটোর ভেতরে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে–কোনো সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা না করলে ইউরোপ কার নেতৃত্বে এবং কোন সামরিক কাঠামোর অধীনে নিজেদের রক্ষা করবে।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এ ধরনের ‘প্ল্যান বি’ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা নিরুৎসাহিত করছেন বলে জানিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট। এক অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্য, রুটে মনে করেন এ বিষয়ে প্রকাশ্য আলোচনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
গত বছর ফিনিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ম্যাটি পেসু একটি প্রবন্ধে বিকল্প পরিকল্পনার পক্ষে মত দিলেও তখন ফিনল্যান্ডের কর্মকর্তারা এমন কোনো পরিকল্পনা বিবেচনার কথা অস্বীকার করেছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে যে ন্যাটো কোনো কারণে কার্যকর না থাকলে ইউরোপ কীভাবে এবং কার নেতৃত্বে নিজেদের প্রতিরক্ষা চালাবে।
এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার প্রশ্ন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর সিদ্ধান্ত আটকে দেয়, তাহলে কোন কমান্ড কাঠামোর অধীনে কাজ করা হবে?”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ প্রশ্ন ন্যাটোর কার্যকারিতার মূল জায়গায় আঘাত করছে। সাধারণ সামরিক জোটে সদস্য দেশগুলো আলাদাভাবে কাজ করলেও ন্যাটো গড়ে উঠেছে একটি সমন্বিত কাঠামোর ভিত্তিতে। এর নেতৃত্বে থাকেন সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ইউরোপ (এসএসিইউআর), যিনি সাধারণত একজন মার্কিন জেনারেল এবং ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীরও নেতৃত্ব দেন।
এই কাঠামোর অধীনে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থায়ী সামরিক সদরদপ্তরের একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেখানে হাজারো কর্মকর্তা ও সদস্য যেকোনো সংঘাতের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন।
ব্রাসেলসের ফ্রি ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিকিউরিটি, ডিপ্লোম্যাসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির পরিচালক লুইস সিমনের ভাষায়, “ন্যাটোকে একসঙ্গে ধরে রাখার আঠা হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব। এটি না থাকলে জোটের প্রতিরোধব্যবস্থায় ভাঙন দেখা দিতে পারে।”

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের জন্য ‘প্ল্যান বি’ শুধু নতুন অস্ত্র কেনার বিষয় নয়। তাদের এমন একটি সামরিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে যার অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর ইউরোপে এ ধরনের বিকল্প জোটের কেন্দ্র হতে পারে বাল্টিক ও নর্ডিক দেশগুলোর সঙ্গে পোল্যান্ড। এসব দেশের মধ্যে রাশিয়া নিয়ে উদ্বেগ এবং নিরাপত্তা স্বার্থে মিল রয়েছে। পাশাপাশি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো কয়েকটি বড় ইউরোপীয় দেশের সেনাও ইতোমধ্যে বাল্টিক অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে, ফলে সংঘাত শুরু হলে তারাও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক আরইউএসআইর গবেষক এডওয়ার্ড আর্নল্ডের মতে, ন্যাটোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য আর্টিকেল ৫ কার্যকর হোক বা না হোক, সংঘাতের প্রথম দিন থেকেই লড়াইয়ে অংশ নিতে পারে। তিনি মনে করেন, সিদ্ধান্তের জন্য সবাই নর্থ আটলান্টিক কাউন্সিলে বসে অপেক্ষা করবে না।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন ‘জয়েন্ট এক্সপেডিশনারি ফোর্স’ বা জেইএফ। মূলত বাল্টিক ও নর্ডিক অঞ্চলের ১০টি দেশ নিয়ে গঠিত এই জোটের সদরদপ্তর লন্ডনের কাছে। ২০১৪ সালে এটি গঠিত হয়েছিল দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী হিসেবে, বিশেষ করে এমন পরিস্থিতির জন্য যেখানে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ প্রয়োগের প্রয়োজন নাও হতে পারে। পরে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড এতে যোগ দিলে জোটটির গুরুত্ব আরও বাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, জেইএফের একটি বড় সুবিধা হলো এটি ন্যাটোর মতো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। ন্যাটোতে আর্টিকেল ৫ কার্যকর করতে সব সদস্যের সম্মতি লাগে, কিন্তু জেইএফ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে সামরিক মহড়া ও নৌ টহলের জন্য এটি কয়েকবার সক্রিয়ও হয়েছে।
আর্নল্ডের মতে, বিকল্প কাঠামোগুলোর মধ্যে জেইএফ সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত। এর নিজস্ব গোয়েন্দা, পরিকল্পনা ও সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে এবং সীমিত হলেও ন্যাটোর বাইরে নিজস্ব নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থাও আছে। ব্রিটেনের পারমাণবিক সক্ষমতাও এতে বাড়তি প্রতিরোধ শক্তি দিতে পারে।
তবে জেইএফের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি মূলত উত্তর ইউরোপকেন্দ্রিক এবং এতে ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডের মতো বড় শক্তি নেই। পাশাপাশি ব্রিটেনের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও কিছু কর্মকর্তার উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থসংকটের কারণে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন ও সেনা ইউনিটের সংখ্যা সীমিত বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউরোপ যদি ন্যাটোর বর্তমান কাঠামো পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে না পারে, তাহলে জেইএফের মতো কোনো বিকল্প ব্যবস্থাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে। কারণ, যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি এমন এক মিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যে সংকটে পাশে নাও থাকতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জানুয়ারিতে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ন্যাটোর কিছু সদস্য আশঙ্কা করছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা পাশে না-ও পেতে পারে, পাশাপাশি ন্যাটোর পদক্ষেপেও বাধা দিতে পারে দেশটি।