চরচা ডেস্ক

তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক পুনর্বিন্যাস এবং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তাইওয়ান প্রতিরক্ষা নিয়ে দুমুখো অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যস্ততা চীনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত আমান্ডা হসিও এবং বোনি এস গ্লাসের-এর বিশ্লেষণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের মতে, বেইজিং এখনই তাইওয়ানে সামরিক আগ্রাসনে যেতে চায় না। এর বদলে সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর কৌশল নিয়েছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মূল লক্ষ্য তাইওয়ানের সঙ্গে ‘পুনরেকত্রীকরণ’। তবে সেটি তারা সর্বনিম্ন খরচে এবং সর্বনিম্ন ঝুঁকিতে অর্জন করতে চায়। বেইজিংয়ের ধারণা, সময় যত যাবে, ততই শক্তির ভারসাম্য তাদের পক্ষে ঝুঁকবে। অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তারা এমন অবস্থায় পৌঁছাতে চায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক হবে। তাইপেও বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হবে। অর্থাৎ চীন মনে করছে, পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন ছাড়াই তারা তাইওয়ানকে ধীরে ধীরে নিজেদের কাছে টেনে আনতে পারবে।
এই কৌশলের পেছনে বেইজিংয়ের আত্মবিশ্বাসের বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি উত্থানের ধারণা। চীনা নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে বিভাজন ও অকার্যকারিতা বাড়ছে। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক মডেল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বেশি কার্যকর। বিশেষ করে ২০২৫ সালের বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ এবং বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর বেইজিং মনে করছে, তারা ওয়াশিংটনের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিপ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতে অগ্রগতি চীনের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ‘ডিপসিক’ নামের চীনা ভাষাভিত্তিক এআই মডেলের উল্লেখ করা হয়েছে, যা তুলনামূলক কম ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বড় মডেলগুলোর সমান পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।

তবে চীন যে নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অজ্ঞ নয়, সেটিও এই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। দেশটির সাম্প্রতিক পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় স্থানীয় সরকারের ঋণ সংকট, সম্পত্তি খাতের অস্থিরতা, উৎপাদনশীলতার ধীরগতি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বড় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফলে এখন যুদ্ধ শুরু হলে তা চীনের দীর্ঘমেয়াদি ‘জাতীয় পুনর্জাগরণ’ প্রকল্পকে বিপদে ফেলতে পারে।
তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের এই ধৈর্যশীল অবস্থানের আরেকটি কারণ হলো সামরিক সংঘাতের সম্ভাব্য বিপর্যয়কর খরচ। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি অনুমান করা কঠিন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে কোনো আগ্রাসনকে নিজের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সাম্প্রতিক সামরিক শুদ্ধি অভিযানের ফলে পিপলস লিবারেশন আর্মির ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বহু জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে সরিয়ে দেওয়ায় বড় আকারের জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনায় সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে এখন যুদ্ধ শুরু হলে সেটি চীনের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বেইজিং মনে করছে তাদের বর্তমান কৌশল ইতিমধ্যেই কাজ করতে শুরু করেছে। তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভাজন বাড়ছে এবং স্বাধীনতার প্রতি তরুণদের সমর্থন আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলে জরিপে দেখা যাচ্ছে। বিরোধী দল কুয়ামিংটং বা কেএমটি এখনো ‘এক চীন’ ধারণার ভিত্তিতে গঠিত ১৯৯২ সালের ঐকমত্যকে সমর্থন করে। এপ্রিল মাসে কেএমটির চেয়ারম্যান চেং লি-উন বেইজিং সফর করে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেন। বেইজিং এই ঘটনাকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছে।
তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিংতে-কে চীন কট্টর স্বাধীনতাপন্থী হিসেবে দেখে। তবে বেইজিংয়ের মূল্যায়ন হলো, তিনি এখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। তার দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে এবং বিরোধীরা প্রতিরক্ষা ব্যয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নীতিগত পদক্ষেপ আটকে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা মনে করছে তাইওয়ানের অভ্যন্তরে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে যেখানে বেইজিংপন্থী বা অন্তত বেইজিংয়ের সঙ্গে আপসকামী শক্তিগুলো আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তরুণদের মধ্যে মতামতের পরিবর্তনও চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তাইওয়ানের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন কমেছে। একই সঙ্গে ‘এক চীন’ ধারণার বিরোধিতাও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এর পেছনে চীনের দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও ডিজিটাল প্রভাব বিস্তারের কৌশল কাজ করছে। চীনপন্থী অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের কাছে চীনের আধুনিক নগরজীবন, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। তাইওয়ানের বহু তরুণ এখন চীনা অ্যাপ ব্যবহার করছে এবং সাংস্কৃতিকভাবে আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও বেইজিং আশাবাদী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাইওয়ানকে রক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। বরং তিনি বারবার বলেছেন, তাইওয়ানকে নিজেদের নিরাপত্তার খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চিপ শিল্প ‘চুরি’ করার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। ওয়াশিংটনের কিছু পদক্ষেপ চীনের কাছে আরও ইতিবাচক সংকেত হিসেবে ধরা দিয়েছে। যেমন ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট লাই-কে নিউইয়র্কে ট্রানজিটের অনুমতি না দেওয়া এবং তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি বিলম্বিত হওয়ার খবর বেইজিংকে মনে করিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি ঠেকাতে কিছু ক্ষেত্রে সংযম দেখাতে প্রস্তুত।

চীন এখন ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট বা সমন্বিত উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে তাইওয়ানের ব্যবসা ও জনশক্তিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে চাইছে। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক যোগাযোগ, রাজনৈতিক বিভাজন ও মানসিক চাপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাইওয়ানকে নিজেদের প্রভাববলয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সামরিক চাপও অব্যাহত রয়েছে। চীনা যুদ্ধজাহাজ ও বিমান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তাইওয়ানের কাছাকাছি এলাকায় টহল দিচ্ছে। তবে এগুলোকে এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, বরং চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে এই ধৈর্যের কৌশল অনির্দিষ্টকালের জন্য চলবে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। ওই বছর তাইওয়ানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। যদি লাই চিং-তে পুনর্নির্বাচিত হন এবং তার দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাহলে তিনি তাইওয়ানের স্বতন্ত্র পরিচয় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও নতুন প্রশাসন আসতে পারে, যারা চীনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। এই দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে বেইজিং মনে করতে পারে যে শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।

সেই পরিস্থিতিতে চীন হয়তো পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনে না গেলেও আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন তাইওয়ানের আকাশসীমা ও জলসীমার আরও গভীরে সামরিক টহল, বাণিজ্যিক জাহাজে তল্লাশি, অথবা কার্যত এক ধরনের ‘কোয়ারেন্টিন’ (অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখা) আরোপ। এর মাধ্যমে তাইওয়ানের ওপর অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ বাড়ানো হবে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, চীন এমন একটি ধূসর কৌশল অনুসরণ করতে পারে, যা যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি অবস্থান তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে এই বিশ্লেষণ থেকে যে চিত্র উঠে আসে, তা হলো– চীন এখনই তাইওয়ান দখলের জন্য তড়িঘড়ি সামরিক অভিযান চালাতে চায় না। বরং বেইজিং বিশ্বাস করে, সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে। অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক সংযোগ এবং সামরিক চাপ– সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তাইওয়ানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই চীনের লক্ষ্য পূরণ হবে। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট যে, যদি বেইজিং মনে করে তাইওয়ান আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছে অথবা যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিচ্ছে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। তখন ধৈর্যের জায়গা নিতে পারে আরও আক্রমণাত্মক কৌশল।

তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক পুনর্বিন্যাস এবং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তাইওয়ান প্রতিরক্ষা নিয়ে দুমুখো অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যস্ততা চীনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত আমান্ডা হসিও এবং বোনি এস গ্লাসের-এর বিশ্লেষণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের মতে, বেইজিং এখনই তাইওয়ানে সামরিক আগ্রাসনে যেতে চায় না। এর বদলে সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর কৌশল নিয়েছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মূল লক্ষ্য তাইওয়ানের সঙ্গে ‘পুনরেকত্রীকরণ’। তবে সেটি তারা সর্বনিম্ন খরচে এবং সর্বনিম্ন ঝুঁকিতে অর্জন করতে চায়। বেইজিংয়ের ধারণা, সময় যত যাবে, ততই শক্তির ভারসাম্য তাদের পক্ষে ঝুঁকবে। অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তারা এমন অবস্থায় পৌঁছাতে চায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক হবে। তাইপেও বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হবে। অর্থাৎ চীন মনে করছে, পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন ছাড়াই তারা তাইওয়ানকে ধীরে ধীরে নিজেদের কাছে টেনে আনতে পারবে।
এই কৌশলের পেছনে বেইজিংয়ের আত্মবিশ্বাসের বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি উত্থানের ধারণা। চীনা নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে বিভাজন ও অকার্যকারিতা বাড়ছে। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক মডেল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বেশি কার্যকর। বিশেষ করে ২০২৫ সালের বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ এবং বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর বেইজিং মনে করছে, তারা ওয়াশিংটনের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিপ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতে অগ্রগতি চীনের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ‘ডিপসিক’ নামের চীনা ভাষাভিত্তিক এআই মডেলের উল্লেখ করা হয়েছে, যা তুলনামূলক কম ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বড় মডেলগুলোর সমান পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।

তবে চীন যে নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অজ্ঞ নয়, সেটিও এই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। দেশটির সাম্প্রতিক পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় স্থানীয় সরকারের ঋণ সংকট, সম্পত্তি খাতের অস্থিরতা, উৎপাদনশীলতার ধীরগতি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বড় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফলে এখন যুদ্ধ শুরু হলে তা চীনের দীর্ঘমেয়াদি ‘জাতীয় পুনর্জাগরণ’ প্রকল্পকে বিপদে ফেলতে পারে।
তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের এই ধৈর্যশীল অবস্থানের আরেকটি কারণ হলো সামরিক সংঘাতের সম্ভাব্য বিপর্যয়কর খরচ। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি অনুমান করা কঠিন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে কোনো আগ্রাসনকে নিজের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সাম্প্রতিক সামরিক শুদ্ধি অভিযানের ফলে পিপলস লিবারেশন আর্মির ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বহু জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে সরিয়ে দেওয়ায় বড় আকারের জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনায় সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে এখন যুদ্ধ শুরু হলে সেটি চীনের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বেইজিং মনে করছে তাদের বর্তমান কৌশল ইতিমধ্যেই কাজ করতে শুরু করেছে। তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভাজন বাড়ছে এবং স্বাধীনতার প্রতি তরুণদের সমর্থন আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলে জরিপে দেখা যাচ্ছে। বিরোধী দল কুয়ামিংটং বা কেএমটি এখনো ‘এক চীন’ ধারণার ভিত্তিতে গঠিত ১৯৯২ সালের ঐকমত্যকে সমর্থন করে। এপ্রিল মাসে কেএমটির চেয়ারম্যান চেং লি-উন বেইজিং সফর করে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেন। বেইজিং এই ঘটনাকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছে।
তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিংতে-কে চীন কট্টর স্বাধীনতাপন্থী হিসেবে দেখে। তবে বেইজিংয়ের মূল্যায়ন হলো, তিনি এখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। তার দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে এবং বিরোধীরা প্রতিরক্ষা ব্যয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নীতিগত পদক্ষেপ আটকে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা মনে করছে তাইওয়ানের অভ্যন্তরে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে যেখানে বেইজিংপন্থী বা অন্তত বেইজিংয়ের সঙ্গে আপসকামী শক্তিগুলো আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তরুণদের মধ্যে মতামতের পরিবর্তনও চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তাইওয়ানের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন কমেছে। একই সঙ্গে ‘এক চীন’ ধারণার বিরোধিতাও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এর পেছনে চীনের দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও ডিজিটাল প্রভাব বিস্তারের কৌশল কাজ করছে। চীনপন্থী অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের কাছে চীনের আধুনিক নগরজীবন, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। তাইওয়ানের বহু তরুণ এখন চীনা অ্যাপ ব্যবহার করছে এবং সাংস্কৃতিকভাবে আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও বেইজিং আশাবাদী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাইওয়ানকে রক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। বরং তিনি বারবার বলেছেন, তাইওয়ানকে নিজেদের নিরাপত্তার খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চিপ শিল্প ‘চুরি’ করার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। ওয়াশিংটনের কিছু পদক্ষেপ চীনের কাছে আরও ইতিবাচক সংকেত হিসেবে ধরা দিয়েছে। যেমন ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট লাই-কে নিউইয়র্কে ট্রানজিটের অনুমতি না দেওয়া এবং তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি বিলম্বিত হওয়ার খবর বেইজিংকে মনে করিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি ঠেকাতে কিছু ক্ষেত্রে সংযম দেখাতে প্রস্তুত।

চীন এখন ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট বা সমন্বিত উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে তাইওয়ানের ব্যবসা ও জনশক্তিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে চাইছে। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক যোগাযোগ, রাজনৈতিক বিভাজন ও মানসিক চাপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাইওয়ানকে নিজেদের প্রভাববলয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সামরিক চাপও অব্যাহত রয়েছে। চীনা যুদ্ধজাহাজ ও বিমান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তাইওয়ানের কাছাকাছি এলাকায় টহল দিচ্ছে। তবে এগুলোকে এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, বরং চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে এই ধৈর্যের কৌশল অনির্দিষ্টকালের জন্য চলবে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। ওই বছর তাইওয়ানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। যদি লাই চিং-তে পুনর্নির্বাচিত হন এবং তার দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাহলে তিনি তাইওয়ানের স্বতন্ত্র পরিচয় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও নতুন প্রশাসন আসতে পারে, যারা চীনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। এই দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে বেইজিং মনে করতে পারে যে শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।

সেই পরিস্থিতিতে চীন হয়তো পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনে না গেলেও আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন তাইওয়ানের আকাশসীমা ও জলসীমার আরও গভীরে সামরিক টহল, বাণিজ্যিক জাহাজে তল্লাশি, অথবা কার্যত এক ধরনের ‘কোয়ারেন্টিন’ (অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখা) আরোপ। এর মাধ্যমে তাইওয়ানের ওপর অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ বাড়ানো হবে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, চীন এমন একটি ধূসর কৌশল অনুসরণ করতে পারে, যা যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি অবস্থান তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে এই বিশ্লেষণ থেকে যে চিত্র উঠে আসে, তা হলো– চীন এখনই তাইওয়ান দখলের জন্য তড়িঘড়ি সামরিক অভিযান চালাতে চায় না। বরং বেইজিং বিশ্বাস করে, সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে। অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক সংযোগ এবং সামরিক চাপ– সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তাইওয়ানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই চীনের লক্ষ্য পূরণ হবে। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট যে, যদি বেইজিং মনে করে তাইওয়ান আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছে অথবা যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিচ্ছে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। তখন ধৈর্যের জায়গা নিতে পারে আরও আক্রমণাত্মক কৌশল।