Advertisement Banner

হরমুজ প্রণালির অবরোধ ভাঙছে পাকিস্তান-ইরান করিডোর

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
হরমুজ প্রণালির অবরোধ ভাঙছে পাকিস্তান-ইরান করিডোর
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

ইরানকে বাড়তি সুযোগ দিয়ে পাকিস্তান কি বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে? সাদা চোখে এমনটা মনে হলেও বাস্তবে ঘটনাটা অন্যরকম। মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব কমার সাথে সাথে পাকিস্তান তার দিক পরিবর্তন করছে। এবং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেই আপতত মনে হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তে ঝুঁকি যুক্ত থাকলেও ভবিষ্যতে লাভ আছে ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা।

গত ৮ মে দ্য ক্রেডল–এর অনলাইনে প্রকাশিত সাংবাদিক এফ এম শাকিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরের বাণিজ্যিক পথগুলোতে মার্কিন চাপের মুখে পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক নতুন কৌশলগত মোড় নিয়েছে। করাচি বন্দরে তিন হাজারের বেশি ইরানগামী কন্টেইনার আটকা পড়ার প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ ইরানের জন্য ছয়টি স্থলপথ উন্মুক্ত করার যে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা কেবল একটি সাময়িক সমাধান নয়, বরং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের প্রভাব হ্রাসের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত।

প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর হরমুজ প্রণালি অবরোধের ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তান তাদের বন্দর ও সীমান্ত ব্যবহার করে ইরানকে একটি বিকল্প ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ বা স্থল সেতু উপহার দিয়েছে। পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৫ এপ্রিল জারি করা ‘ট্রানজিট অব গুডস থ্রু টেরিটরি অফ পাকিস্তান অর্ডার ২০২৬’–এর মাধ্যমে করাচি পোর্ট, পোর্ট কাসিম এবং গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দরকে ইরানের ট্রানজিট কার্গো গ্রহণ ও প্রেরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এটি মূলত এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন পশ্চিম এশীয় দেশগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব ক্রমাগত কমছে এবং চীন ও রাশিয়ার সমর্থনে একটি বিকল্প আঞ্চলিক ব্যবস্থার উত্থান ঘটছে।

এই করিডোরের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পাকিস্তানের সাবেক তথ্যমন্ত্রী এবং সিনেট প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান মুশাহিদ হোসেন সৈয়দ দ্য ক্রেডলকে জানিয়েছেন, যদিও পাকিস্তান এই পদক্ষেপকে একটি বিশুদ্ধ ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, তবুও এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানি জনগণের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, যা এই স্থলপথের মাধ্যমে এখন নিরসন হওয়া সম্ভব। তবে এই বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের ‘নীরব সম্মতি’ বা নেপথ্য আলোচনার ভূমিকা থাকতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।

ভারতের ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’-এর মতো গণমাধ্যমগুলো একে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের একটি দ্বিমুখী চাল হিসেবে অভিহিত করলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। ১ মে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ সম্পর্কে অবগত আছেন বলে জানান এবং পাকিস্তানি নেতৃত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।

এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন অব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মাজিদ আজিজ মনে করেন, চীন ও রাশিয়ার সরাসরি প্রভাব এবং ওয়াশিংটনের মৌন সম্মতি ছাড়া এমন বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামাবাদের পক্ষে কঠিন ছিল। বিশেষ করে রাশিয়ার জন্য এটি উষ্ণ পানির বন্দরে পৌঁছানোর একটি সুযোগ এবং চীনের জন্য এটি ‘সিপেক’ (চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর) প্রকল্পের মাধ্যমে ইরান-চীন বাণিজ্যকে আরও সুসংহত করার পথ।

প্রতিবেদনটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দর থেকে ইরানের লজিস্টিক অবকাঠামো সরিয়ে পাকিস্তানের গোয়াদর ও করাচি বন্দরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া। গত ২০২৫ সালে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের আমদানি পরিচালনা করেছিল। কিন্তু বর্তমান নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি থেকে বাঁচতে তেহরান এখন পাকিস্তানের ওপর বেশি নির্ভর করছে।

তেহরান টাইমস-এর বরাতে জানা যায়, ইরান এখন দুবাইয়ের বিকল্প হিসেবে পাকিস্তানের সমুদ্র বন্দরগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। যা ইরানকে ৬০ বিলিয়ন ডলারের সিপেক নেটওয়ার্ক এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে। এর ফলে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরেশিয়ার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের সামনে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংকিং চ্যানেল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে পাকিস্তানি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখনো ইরানের সঙ্গে ট্রানজিট বাণিজ্যে এলসি খুলতে বা বিমা সুবিধা দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। এই আর্থিক জটিলতা নিরসন না হলে করিডোরটি একটি স্থায়ী বাণিজ্যিক পথ হওয়ার পরিবর্তে কেবল একটি জরুরি ত্রাণবাহী পথ হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ইরান-আমেরিকার পতাকা। ছবি: রয়টার্স
ইরান-আমেরিকার পতাকা। ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কথা বিবেচনা করলে, অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে হরমুজ প্রণালীর সংকট কেটে গেলেও এই ছয়টি স্থলপথ স্থায়ী বাণিজ্য রুটে পরিণত হবে। মাজিদ আজিজের মতে, এই করিডোর কেবল পাকিস্তানের রাজস্ব বৃদ্ধি করবে না, বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন সচল করার পথও প্রশস্ত করবে।

সামগ্রিকভাবে, করিডোরটি মধ্য এশীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সংযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। যেখানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার অভাব বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে, সেখানে পাকিস্তান-ইরান এই নতুন বাণিজ্যিক অক্ষটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

দ্য ক্রেডল-এর এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে নতুন জোট গঠন করছে, যেখানে বাণিজ্যকে কৌশলগত লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বিবর্তন কেবল ইরানের অবরোধ ভাঙার গল্প নয়, বরং এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় পাকিস্তানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন।

সম্পর্কিত