Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> ভাবনা

রবীন্দ্রনাথের কষ্ট ও হাস্যরসবোধ

কবিকে বেনারসি-জোড়া পড়ানো হয়। কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, চাদর, কপালে চন্দন, গলায় মালা দিয়ে সাজানো হয়। রানী চন্দ (কবির ব্যক্তিগত সচিব অনিলচন্দের মেয়ে) কবির বুকের ওপরে রাখা হাতে ধরিয়ে দিলেন পদ্মকোরক। কবি চললেন চিরবিদায়ের পথে।

খান মো. রবিউল আলম

খান মো. রবিউল আলম

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ১৯: ০৩
রবীন্দ্রনাথের কষ্ট ও হাস্যরসবোধ

২৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙলামানসের এক চূড়ান্ত পরিশীলিত প্রকাশ। তিনি বহুমাত্রিক। বহুগুণের সমন্বয় ঘটেছে তার সৃষ্টিতে। বাংলা ভাষা, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান, চিত্রকলা ও প্রবন্ধসহ সব শাখায় ছিল ছিল তার ঋদ্ধ বিচরণ। রবীন্দ্রনাথের কাছে বাঙালির অনেক ঋণ। তার সৃষ্টি কেবল বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেনি বিশ্বসাহিত্যেও সংযোজন ঘটিয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

তার জীবন আনন্দ-সমৃদ্ধিতে ভরপুর ছিল না। তিনি দুখের সাগর পাড়ি দিয়েছেন। ছিল গভীর দুঃখবোধ। তাকে মৌনতা ও একাকিত্ব বরণ করতে হয়েছে। তিনি ভেতরে ভেতরে দারুণ নিঃসঙ্গ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রিয় ছাত্র ও অনুরাগী প্রমথনাথ বিশী তার মধুসূদন থেকে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতা তার সৃষ্টির মূল রসদ হিসেবে কাজ করেছে।

তিনি লিখেছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের মতো এমন নিঃসঙ্গ, নির্বান্ধব লোক সংসারে বিরল। বাল্যে, যৌবনে, প্রৌঢ় বয়সে কখনো এমন বন্ধু তিনি পান নি, যাঁকে মনের কথা বলতে পারেন। এ তার দুর্ভাগ্য। আমাদের সৌভাগ্য, কেননা অকথিত সব কথা গানে পরিণত হয়ে গিয়েছে।” বিশী মন্তব্য করেন, মনের কথা বলবার মতো লোক থাকলে রবীন্দ্র-সাহিত্যের পরিমাণ হয়তো কিঞ্চিৎ কম হতো কিন্তু পূর্ণতর, স্বচ্ছন্দতর হতো তার ব্যক্তি জীবন। মানুষ কেবল বাণীতে সন্তুষ্ট নয় স্পর্শের আবশ্যক তার। (পৃ.৯২)

রবীন্দ্রনাথের কষ্ট বা দুঃখগুলোর সঙ্গে সবার সমানভাবে পরিচয় নেই। এ লেখায় তার দুঃখের মানচিত্রটি দেখবো। কোনো দুঃখ-কষ্ট তাকে নিঃশেষ করতে পারেনি। তিনি দুঃখ-কষ্টকে পুঁজি করে সৃষ্টিতে মেতেছেন। জীবন নিয়ে হাসি-তামাশা করেছেন। কবিগুরুর হাস্যরসবোধ ছিল অনন্য উচ্চতার।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

রবীন্দ্রনাথের রোগব্যাধি ও প্রয়াণ

পুত্রবধু প্রতিমা দেবীকে কবিগুরু বলছিলেন, ‘‘মা-মণি, আমি ক্রমশ নিভে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি, এ-ব্যামোর হাত এড়াতে পারব না।’’ কিডনির অসুখ ইউরিমিয়া, পায়ের সমস্যা, কানে কম শোনা এবং চোখে কম দেখা পেয়ে বসেছিল গুরুদেবকে।

কবিগুরু ডাক্তার পছন্দ করতেন না। এটা তার পুত্রবধুর জবানীতে পাওয়া যায়। অন্যেরা বলছেন, কবি অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি কবিরাজি, হোমিওপ্যাথি ও বায়োকেমিক চিকিৎসা নিতেন। মৃণালিনী দেবীকে হোমিওপ্যাথ ও বায়োকোমিকে আবদ্ধ করে ফেলেছিলেন বলে কবির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। যা হোক অসুখগুলো গুরুদেবকে ভুগিয়েছে বিস্তর।

রোগব্যাধি তার জীবনবোধ করেছে আরও প্রখর। কষ্টগুলোর মধ্যে তিনি ভয়ংকরভাবে ঝলসে ওঠেছেন। গড়ে তুলেছেন শিল্পের আকাশসম সৌধ। ফরহাদ মজহার যর্থাথই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ একটি বাধা। তিনি এতো উঁচু যে তাকে ডিঙানো যায় না। ফরহাদ মজহার সম্ভবত এ রকম একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, রবীন্দ্রনাথ হলেন জননী ভাষার জনক।

রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?Rabindranath

প্রস্টেট ক্যান্সার কবিকে নিয়ে যায়। তিনি দীর্ঘদিন ভুগেছিলেন। অপারেশন করা হলেও বিশেষ ফল আসেনি। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সব্যসাচী বসু জানান, অধিকাংশ মানুষই জানেন না যে, তিনি হয়তো প্রস্টেট ক্যান্সারে ভুগছিলেন।

১৯৪০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কালিঙপং-এ হঠাৎ তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথার কথা জানান কবি। মূত্রথলিতে মারাত্মক সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। প্রস্রাব প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাকে দ্রুত জোড়াসাঁকোতে নিয়ে আসা হয়। তিনি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার প্রতি জোর দিয়েছিলেন; অন্যরা সম্পূরক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিধান রায় ও নীল রতন সরকারের পরামর্শে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাদের অস্ত্রোপচারের পরামর্শ নাকচ করে দেন। বলেছিলেন, কাঁটা-ছেড়া করে কী লাভ?

রোগ-শোক নিয়েও কবিগুরু মজা করতেন। ডাক্তার যখন তাকে বলেন সাবধানের মার নেই। তখন তিনি বলেন, মারেরও সাবধান নেই। কবিকে টিকা দেওয়ার জন্য লোকজন এসেছিলেন। হাতে মোটা সূঁচ। কবি বললেন- কীসের টিকা। টিকা যারা দিতে এসেছিলেন তারা জানালেন, বসন্ত রোগের। তিনি মজা করে বললেন– এখনো আমার জীবনে বসন্ত আসেনি!

প্রস্রাব প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। সিদ্ধান্ত নেন, কোনোভাবে অস্ত্রোপচার স্থগিত করা যাবে না। সার্জারির জন্য ঠাকুর বাড়িতে একটা স্টেরিলাইজড ওটি স্থাপন করা হয়। রোগব্যাধি থাকলেও কবির শরীর ছিল বেশ সুঠাম। অপারেশনের আগে হার্ট পরীক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথ যখন পাঞ্জাবির বোতাম খোলেন, কবির দীর্ঘ ও বলিষ্ঠ শরীর দেখে ইংরেজ ডাক্তার বললেন, হোয়াট এ বড়ি ড. টেগর! জমাট প্রস্রাব বের করতে তার সার্জারি করা হয়।

১৯৪১ সালের ২৪ জুলাই অপারেশন করা হয় এবং ৭ আগস্ট কবির মহাপ্রয়াণ ঘটে। তিনি ৪ আগস্ট সকালে চার আউন্সের মতো কফি খান। সম্ভবত এটিই তার শেষ খাবার। জ্বর বাড়ে। ৫ আগস্ট ডা. নীলরতন সরকার ও বিধান রায়কে নিয়ে আসা হয়। রাতে স্যালাইন দেওয়া হয়। অক্সিজেন আনিয়ে রাখা হয়। ৬ আগস্ট হিক্কা উঠে। প্রতিমা দেবী ডেকেছিলেন, ‘বাবা মশায়!’ তাতে একটু সাড়া দিয়েছিলেন কবি। রাত ১২টার দিকে অবস্থার অবনতি হয়। ৭ আগস্ট ছিল ২২ শ্রাবণ। নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকে। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তা একেবারে থেমে যায়।

কবিকে বেনারসি-জোড়া পড়ানো হয়। কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, চাদর, কপালে চন্দন, গলায় মালা দিয়ে সাজানো হয়। রানী চন্দ (কবির ব্যক্তিগত সচিব অনিলচন্দের মেয়ে) কবির বুকের ওপরে রাখা হাতে ধরিয়ে দিলেন পদ্মকোরক। কবি চললেন চিরবিদায়ের পথে।

রবীন্দ্রনাথ রানী চন্দ্রকে বলেছিলেন, ঝরা পাতাও বাগান ও গাছের একটি অঙ্গ। শুকনো পাতা ঝাঁট দিয়ে বাগান পরিষ্কার রাখে। শুকনো পাতারও একটা অন্য ভাষা আছে।

ঠিক, কবিগুরু তুমি যেমন বাঙলা মানসের শ্রেষ্ঠভাষা!

রবীন্দ্রনাথ যেখানে ‘ফ্লপ’Natir Pooja_1.jpg

রবীন্দ্রনাথের আর্থিক টানাপড়েন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে আর্থিক টানাপোড়েন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। তিনি জমিদার পরিবারের সন্তান হলেও, নিজের আদর্শ বাস্তবায়ন এবং প্রজাদের কল্যাণে প্রায়শই অর্থসংকটে ভুগেছেন। প্রজাদের চড়া সুদের মহাজনী হাত থেকে বাঁচাতে ১৯০৫ সালে তিনি নওগাঁর পতিসরে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যাংকের জন্য তিনি বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছিলেন, কিন্তু কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতেন। পরবর্তীতে এই ব্যাংকের ঋণের বোঝা এবং প্রজাদের অর্থ পরিশোধে অক্ষমতা তাঁকে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। ১৯৩৮ সাল নাগাদ প্রায় ১,৩৩,৫৭১ টাকারও বেশি লোকসান হয়েছিল, যা সেই সময়ে বিশাল অংকের অর্থ ছিল।

শান্তিনিকেতন স্কুল ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় তার সমস্ত সঞ্চয় এবং নোবেল পুরস্কারের অর্থও খরচ হয়ে গিয়েছিল। যদিও তিনি তিনটি জমিদারির (শিলাইদহ, বিরাহিমপুর ও পতিসর) দেখাশোনা করতেন, কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত খরচ ও সামাজিক কাজের জন্য তিনি মাত্র ২০০ টাকা মাসোহারা পেতেন। ঋণের চাপে এবং ভক্তদের অতিরিক্ত আবদারে, এক সময় তিনি অটোগ্রাফ দেওয়ার জন্য ১ টাকা করে নিতে শুরু করেছিলেন।

স্ত্রী বিয়োগ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু (১৯০২) ছিল একটি গভীর ও মর্মান্তিক ঘটনা, যা তার ব্যক্তিগত জীবনে শূন্যতা সৃষ্টি করে। তবে তা শিল্পসত্তায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

মৃণালিনী দেবী মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যান। যদিও জীবনীকারদের মধ্যে তাদের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, তবে মৃণালিনী দেবীর অকাল মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে শোকাহত হয়েছিলেন। ‘স্মরণ’ কাব্যের কবিতাগুলো মূলত তিনি মৃণালিনী দেবীর স্মৃতিতে উৎসর্গ করেন। এই কাব্যগ্রন্থে বিরহ, শূন্যতা ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের দর্শন ফুটে উঠেছে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ আর বিয়ে করেননি। স্ত্রীকে হারানোর পর যখন তিনি যখন পতিসরে গেছেন জামাইয়ের পরিচর্যা বিশেষত দেখভাল ও রান্নাবান্নায় সহায়তার জন্য তাঁর শ্বাশুড়ি কবির সঙ্গে যেতেন। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি খুলনা জেলার দক্ষিণ ডিহিতে– যা আজও অক্ষুণ্ণ আছে।

রবীন্দ্রনাথ, তিন কন্যা ও বরপক্ষের উৎপাত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে তাঁর তিন কন্যা– মাধুরীলতা (বেলা), রেণুকা (রানী) এবং মীরা দেবীদের নিয়ে অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক, ট্রাজিক ।

প্রথম সন্তান মাধুরীলতাকে রবীন্দ্রনাথ প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। কিন্তু বেলার বিবাহিত জীবন সুখের ছিল না। স্বামী শরৎকুমার চক্রবর্তীকে তিনি খুব ভালোবাসলেও, পারিবারিক কলহ ও শ্বশুরবাড়ির নানাবিধ সমস্যায় বেলার জীবন বিষাদময় হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল বেলার অকাল মৃত্যু। মাত্র ৩২ বছর বয়সে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় 'বেলি'র মৃত্যুযন্ত্রণা সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের মেজো মেয়ে রেণুকা ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কিছুটা জেদি প্রকৃতির। রেণুকার বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় (১৯০৩ সালে) যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় যা কবির জন্য ছিল মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় কার আমন্ত্রণে এসেছিলেন?rabindra-nath-tagore

তিন কন্যার মধ্যে মীরা দেবী সবচেয়ে বেশিদিন বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তাঁর জীবনও সুখের ছিল না। মীরা দেবীর বিয়ে এবং পরবর্তীকালে স্বামী নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন রবীন্দ্রনাথকে প্রায়শই উদ্বিগ্ন করত।

এমন সব যন্ত্রণার ভার নিজের সৃষ্টি ছাড়া আর কার ওপরই বা দিতে পারতেন তিনি?

রবীন্দ্রনাথের হাস্যরসবোধ

মংপুতে রবীন্দ্রনাথ; মৈত্রেয়ী দেবীর লেখা এই বইয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের দারুণসব হাস্যরসবোধ উঠে এসেছে। কবিগুরুর সেন্স অব হিউমার ছিল দারুণ। সেসব হিউমারের ভেতর ছিল দারুণ সব শিক্ষণীয় বিষয়।

হিউমার সেন্স সমৃদ্ধ জীবনের প্রতীক। তীক্ষ্ন জীবনবোধ ছাড়া হিউমার সেন্স আসে না। প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন, “মানুষের যেদিন সেন্স অব হিউমার চলে যায়, হি ইজ ওল্ড”। রবীন্দ্রনাথ জীবনভরে সজীব ছিলেন, তরুণ ছিলেন।

ব্রেন খাওয়া প্রসঙ্গে

মৈত্রেয়ী দেবী: এটা একটু খাবেন? রোজ রোজ আপনাকে কী নিরামিষ খাওয়াবো ভেবে পাই না?

রবীন্দ্রনাথ: ও পদার্থটা কী?

মৈত্রেয়ী দেবী: ব্রেইন।

রবীন্দ্রনাথ: এই দেখ কাণ্ড, এ তো প্রায় অপমানের সামিল। কি করে ধরে নিলে ও পদার্থটার আমার দরকার আছে? আজকাল কি আর লিখতে পারছিনে? বিশ্বকবির কবিত্ব শক্তি হ্রাস হয়ে আসছে। যাক সন্দেহ যখন একবার প্রকাশ করে ফেলেছ তখন শুরু করা যাক। (পৃ.১৭)

কবিগুরুর বিয়ে প্রসঙ্গে

মৈত্রেয়ী দেবী: আপনার বিয়ের গল্প বলুন?

রবীন্দ্রনাথ: আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই। ... জানো একবার একটি বিদেশী মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল। সে এক পয়সাওয়ালা লোকের মেয়ে, জমিদার আর কি, বড় গোছের। সাত লক্ষ টাকার উত্তরাধিকারিণী সে। আমরা কয়জন গেলুম মেয়ে দেখতে। দুটি অল্পবয়সী মেয়ে এসে বসলেন, একটি নেহাৎ সাদাসিধে জড়ভরতের মতো এক কোনে বসে রইল; আর অন্য মেয়েটি যেমন সুন্দরী তেমন চটপটে। চমৎকার আর স্মার্ট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

একটু জড়তা নেই, বিশুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজালো ভাল– তারপর মিউজিক সমন্ধে আলোচনা শুরু হলো। আমি ভাবলুম এ আর কথা কি? এখন পেলে হয়! এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকলেন। বয়েস হয়েছে, কিন্তু সৌখিন লোক। ঢুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন মেয়ের সঙ্গে, সুন্দর মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন-হেয়ার ইজ মাই ওয়াইফ এবং জড়ভরতটিকে দেখিয়ে বললেন-হেয়ার ইজ মাই ডটার । আমরা আর করব কি, পরষ্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপ করে রইলুম। আরে তাই যদি হবে তাহলে ভদ্রলোকদের ডেকে এনে নাকাল করা কেন? যাক, এখন মাঝে মাঝে অনুশোচনা হয়!...যাহোক হলে এমন কি মন্দ হত। মেয়ে যেমনই হোক সাত লক্ষ টাকা থাকলে বিশ্বভারতীর জন্য তো এ হাঙ্গামা করতে হত না। তবে শুনেছি মেয়ে নাকি বিয়ের বছর দুই পরই বিধবা হয়। তাই ভাবি ভালই হয়েছে, কারণ স্ত্রী বিধবা হলে আবার প্রাণ রাখা শক্ত। (পৃ.১৫)

জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের নতুন কমিটি ঘোষণাjatio rabindro sommilon

কবিগুরুর পকেটে চশমার খাপ

রবীন্দ্রনাথ: তুমি একটা কবিতা লিখলে না যে? (জন্মদিন উপলক্ষে মৈত্রেয়ী দেবীকে)। কিছুদিন থেকে দেখছি তোমার ভঙ্গি অসম্ভব কমে যাচ্ছে। ওই তো কাগজ কলম রয়েছে, চট করে, হে রবীন্দ্র কবীন্দ্র’ বলে একটা লিখে ফেল না। আমার নামটা ভারী সুবিধের, কবিদের জন্য খুব সুবিধের হয়ে গেছে। মিলের জন্য হাহাকার করে বেড়াতে হয় না। রবীন্দ্রের পর কবীন্দ্র লাগিয়ে দিলেই হলো।

সেদিন অজস্র ফুল এসেছিল, কালিংপঙের অধিবাসীরা মালা পরিয়ে গেল। চিত্রিতা (মৈত্রেয়ী দেবীর ছোট বোন) আর নন্দিনী তার শোবার খাট ফুল দিয়ে সাজিয়ে ছিল।

বনমালী (কবির ব্যক্তিগত কাজের লোক): দাদামশায়, দেখবে এস তোমার ঘরে কি করেছি? রবীন্দ্রনাথ: এই দ্যাখ কাণ্ড! এসব দেখলে মন খারাপ হয়ে যায় সঙ্গিনীহীন ফুলশয্যা!

(জন্মদিনে অনুষ্ঠান শেষে) সন্ধ্যা বেলায় ফেরার সময় চিত্রিতা চশমার খাপ পাওয়া গেল না। বাড়িশুদ্ধ লোক তোলপাড় করে খুঁজলো। বনমালী একবার বলেছিল বটে, বাবামশায়ের (কবিগুরু) পকেটটা দেখছেন?

রবীন্দ্রনাথ: যদি নিতেই হয় তেমন জিনিস নেব, চশমার খাপ নেব? তোর মতো পছন্দ তো নয়!

পরদিন মংপুতে একটা চিঠি ও চশমা এসে উপস্থিত। বনমালীর সন্দেহই সত্যি। তার পকেটেই ছিল। তবে সেটা ইচ্ছাকৃত নয়, নিজের চশমা ভেবে ভুল করে জোব্বার বিশাল পকেটের গহ্বরে তাকে ফেলেছেন। সেখান থেকে চশমার পুনরুদ্ধার বনমালীর অমর কীর্তি।

মৈত্রেয়ী দেবী: সে থেকে কোনো কিছু হারালে প্রথমেই মনে পড়ত– বাবামশায়ের পকেটটা দেখেছেন?

এটা কিন্তু জোড়াসাঁকো না

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার শিলাইদহতে নৌকায় আসছিলেন। তার সঙ্গে একটি বজরাসহ আরও কয়েকটি নৌকা ছিল। পথের মাঝে নৌকাগুলো নদীর ধারে দাঁড়ায়। পাশাপাশি নৌকাগুলো সাজানো। রবীন্দ্রনাথ সহযাত্রীদের সর্তক করে বললেন তোরা সর্তকভাবে এক নৌকা থেকে আরেক নৌকায় লাফ দিস। মনে রাখিস, এটা কিন্তু জোড়াসাঁকো না।

পদ্মা নদীে প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল বিশেষ আকর্ষণ। “বাংলাদেশের মতো মনটা আমার নদীমাতৃক। পদ্মা থেকে দূরে এসে অবধি আমি যেন নির্বাসনে আছি-দূর হতে প্রায়ই তার ডাক শুনতে পাই। কিন্তু গঙ্গাতীরে আমার গতি হবে কিনা আশু তার কোনো স্থিরতা নেই”- (সূত্র: মৈত্রেয়ী দেবীর চিঠির উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; স্বর্গের কাছাকাছি (১৯৮১); মৈত্রেয়ী দেবী; পৃ.২৩০)

ওস্তাদজীর মাথাটি রেখে দাও

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কবিগুরুর আমন্ত্রণে সংগীত বিষয়ে তালিম দেওয়ার জন্য দুমাস শান্তিনিকেতন ছিলেন। বিদায়ের সময় কবিগুরু ভাস্কর শ্রী রামকিঙ্কর বেইজকে ডেকে বললেন– আলাউদ্দিনের মাথাটা রেখে দাও। প্রথমে ওস্তাদ ভয় পেয়েছিলেন। মূলত বেইজকে তিনি ওস্তাদের মাথার আদলে কাঠের একটি ডিজাইন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন যা তিনি শান্তি নিকেতনে রাখতে চেয়েছিলেন (সূত্র: আমার কথা– আলাউদ্দিন খাঁ; পৃ.২৩)

শেষ করা যাক কবিগুরু স্মরণ করে-

“দুঃখেরে দেখেছি নিত্য, পাপেরে দেখেছি নানা ছলে;

অশান্তির ঘূর্ণি দেখি জীবনের স্রোতে পলে পলে” –বলাকা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

লেখক: যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক

বিষয়: কবিকন্যাসন্তানরবীন্দ্র সংগীতরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকুষ্টিয়াস্ত্রী
সর্বশেষ
  • ১

    লং মার্চ থেকে কী পেল বিরোধীরা?

  • ২

    মহাখালীতে পরিত্যক্ত ভবনে আগুন

  • ৩

    রাজধানীর ধানমন্ডিতে ভবনে আগুন

  • ৪

    হংকংয়ের বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ সুবিধার প্রস্তাব বাংলাদেশের

  • ৫

    মেঘের শারীরিক অবস্থা এখনো ‘অস্থিতিশীল’, মেডিকেল বোর্ড গঠন

সম্পর্কিত
  • মব দেশে বাড়ছে, বিদেশে কি রপ্তানিও হচ্ছে?

    মব দেশে বাড়ছে, বিদেশে কি রপ্তানিও হচ্ছে?

    আমাদের দেশে মব আর নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং দিনকে দিন কিছুটা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠছে যেন। কখনও বাড়ে, কখনও একটু কমে- কিন্তু মব বিদায় হচ্ছে না কোনোভাবেই। উল্টো যেন মব রপ্তানির দেশে পরিণত হচ্ছে আমাদের এই বাংলাদেশ! ভাবে? চলুন, আলোচনার ভেতরে ঢোকা যাক। শুরুতেই বর্তমানে দেশের ভেতরে মব কি অবস্থায় আছ

  • সাক্ষরতার সংখ্যায় অগ্রগতি, জীবনের পরীক্ষায় কত দূর?

    সাক্ষরতার সংখ্যায় অগ্রগতি, জীবনের পরীক্ষায় কত দূর?

    মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও উন্নয়নের জন্য সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরতে ইউনেসকো ১৯৬৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষণা করে। বিশ্বজুড়ে এর উদযাপন শুরু হয় ১৯৬৭ সালে; আর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে।

  • রংপুরে ৪ খুন: ব্যর্থ আসলে কারা?

    রংপুরে ৪ খুন: ব্যর্থ আসলে কারা?

    ২৩ আগস্ট রাতে সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পুরো পরিবারের শেষ হয়ে যাওয়ার খবরটা প্রথম শুনে বুঝিনি যে এই ঘটনা সামনে অনেক চমক তৈরি করে রেখেছে। হত্যা রহস্য উন্মোচনের জন্য গোলকধাঁধা অপেক্ষা করছে–কে জানত? রাতে ঘুমিয়ে সকালে উঠেই শুনি দুই আসামি ধরা পড়েছে, এমনকি হত্যার দায়ও স্বীকার করে নিয়েছেন

  • সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিরোধিতা কেন?

    সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিরোধিতা কেন?

    গত রোববার জাতীয় সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হয়েছে। এর মধ্যে বহুলালোচিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’ নিয়ে পরে আলোচনা করার ইচ্ছা আছে। এখানে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬’ নিয়ে কথা বলব। এই আইনের উদ্দেশ্য–বাবা–মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়া