Advertisement Banner

জাপানি ঔদ্ধত্য নাকি ব্রাজিলিয়ান ঐতিহ্য?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
জাপানি ঔদ্ধত্য নাকি ব্রাজিলিয়ান ঐতিহ্য?
ছবি: রয়টার্স

জাপানের সাবেক তারকা ফুটবলার তুলিও তানাকার কথায় চটে যেতে পারেন ব্রাজিল সমর্থকেরা। যদিও এরই মধ্যে জাপানিরা ব্রাজিল নিয়ে যেসব মন্তব্য করছে, তাতে বেজায় ক্ষুব্ধ ব্রাজিলিয়ানরা। ব্যাপার অনেকটা এমন, কয়েকটা ম্যাচ ভালো খেলে নিজেদের কী মনে করছেন আপনারা! ব্রাজিল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, যে দলের কাছে দ্বিতীয় হওয়া মানেই ব্যর্থতা, যে দেশের ফুটবলের ঐতিহ্য নিয়ে কোনো কথা হবে না, সেই দলকে নিয়ে তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য!

তানাকা আবার ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভুত। তিনি যা বলেছেন, তা নেইমারের জন্য অবমাননাকর। কী বলেছেন? বলেছেন–আজ রাতের ম্যাচে নেইমার খেললে নাকি জাপানের জন্য ভালো। নেইমার এখন নাকি আর আগের মতো গতিতে ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিতে পারেন না। একই সঙ্গে তার কথা–নেইমার যদি গোলও করেন, তার বর্তমান ফর্ম ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী তাকে মাঠে পাওয়া নাকি জাপানের জন্য বেশ সুবিধাজনক। এমন কথা কোন ব্রাজিলিয়ান সহ্য করতে পারেন!

জাপানের তরুণ স্ট্রাইকার কেন্তো শিওগাই তো আরেক কাঠি সরেস। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল নাকি হাল সময়ে ফুটবলের কোনো পরাশক্তিই নয়। দলটা একসময় শক্তিশালীও ছিল; কিন্তু শিওগাই নাকি ইদানীং ব্রাজিল নিয়ে তেমন কিছু শোনেন না। তিনি বরং ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনাকে অনেক বেশি শক্তিশালী দল মনে করেন।

এসব কথাবার্তা নিয়ে ব্রাজিলে চলছে সমালোচনা। ব্রাজিলের পত্র–পত্রিকাগুলো এসব মন্তব্যকে জাপানিদের ঔদ্ধত্ব বলছে। অধিনায়ক মার্কুইনহোস অবশ্য এসব মন্তব্যকে ‘পাত্তা’ দিতে চান না। তিনি বরং এসব কথাবার্তাকে তার দলের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী মনে করেন।

কথা চালাচালির মধ্যে জাপান যে এসব কথাবার্তা বলছে, সেটা যে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণেই সম্ভব হয়েছে, সেটা না বললেও চলছে। এবারের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স সমর্থকদের মধ্যে হাহাকার তৈরি করেছিল। হাইতির বিপক্ষে বড় জয়ও মন ভরাতে পারেনি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে কিছু স্বস্তি ফিরলেও এখন পর্যন্ত ব্রাজিলকে একমাত্র মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি ছাড়া বড় পরীক্ষা দিতে হয়নি। তাতেই দলের নড়বড়ে অবস্থাটা প্রকাশ্য। উল্টো দিকে জাপান গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই ভালো খেলেছে। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাদের পারফরম্যান্স সবাইকে আলাদা করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তিউনিসিয়াকে উড়িয়ে দেওয়ার পর সুইডেনের বিপক্ষে ড্র করলেও জাপানের ফুটবল–শক্তি হয়ে ওঠার ইঙ্গিতটা স্পষ্ট।

ধারে–ভারে ব্রাজিল যে জাপানের চেয়ে এগিয়ে, সেটা সবাই জানে–বোঝে। এমনকি জাপানও খুব ভালো জানে। ইতিহাস তো ব্রাজিলের পক্ষেই। এমনকি অতীতে জাপানের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়েও জাপান যোজন ব্যবধানে পিছিয়ে। জাপান অবশ্য ২০২৩ সালে একবারই ব্রাজিলকে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে হারাতে পেরেছিল। তবে এ ম্যাচের আগে ব্রাজিলের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসের রসদ জাপান পাচ্ছে নিকট অতীত থেকেই। এক, ২০২৩ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়, আর ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স।

জাপান সাহস দেখাচ্ছে আত্মবিশ্বাসটা প্রবল বলেই। গত বিশ্বকাপে যে দল স্পেন আর জার্মানিকে পরপর দুই ম্যাচে হারিয়ে দিতে পারে, তারা যে ফেলনা কোনো দল নয়, সেটা না বললেও চলছে। রাউন্ড অব ৩২–এর নকআউট ম্যাচ বলেই হয়তো অতীতের রেকর্ড–ফেকর্ড খুব বড় করে দেখছে না সবাই। ব্রাজিলের শক্তি–সামর্থ্য, ইতিহাস–ঐতিহ্য যা–ই হোক, জাপান গত কয়েক বছরে এটা খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে, যেকোনো ম্যাচে, যেকোনো পরিস্থিতিতে রূপকথা লেখার সামর্থ্য তাদের আছে।

তবে জাপানিদের কথাবার্তাকে ‘ঔদ্ধত্য’ মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে ব্রাজিলিয়ানদের। আজকে জাপানের ফুটবল যে জায়গায় পৌঁছেছে, তাতে ব্রাজিলিয়ান অবদানই বেশি। আজ থেকে ৪০ বছর আগে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার রুই রামোসকে সরাসরি নাগরিকত্ব দিয়ে জাপান দলে খেলানো হয়েছিল। জাপানের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার জাপানের ফুটবল বদলে দেওয়ার অন্যতম কারিগর। রামোসের কথা বাদ দিন ১৯৯৩ সালে জাপানে চালু হওয়া পোশাদার ‘জে লিগ’ আলোকিত হয়েছিল জিকোর মতো ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির ছোঁয়ায়। তিনি পরবর্তীকালে জাপান ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে কাজ করেছেন বিভিন্ন ভূমিকায়। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে তিনি জাপান ফুটবলের যুব উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজিয়ে দিয়েছেন, কোচ হিসেবে জাপান জাতীয় ফুটবল দলের পারফরম্যান্সের উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছেন। আজ জাপানের ফুটবলের যে এই রমরমা, এত উন্নতি, সেটার পেছনে জিকোর অবদান জাপানিরাই কখনো অস্বীকার করতে পারবে না।

উল্টো আজকের ম্যাচে জাপান গুরুর শেখানো বিদ্যাই প্রয়োগ করবে—এমন কথাও অবলীলায় বলে দেওয়া যায়। জাপানে বসবাসরত ব্রাজিলিয়ানরা দেশটির ফুটবলে যে অবদান রেখেছেন, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই জাপানিদের।

জাপানিরা আজ ভরসা করবে পরিশ্রমী ফুটবল, আর নিজেদের কৌশলে। আগের তুলনায় জাপান দলটা এখন অনেক বেশি সৃষ্টিশীল। নিজেদের ‘আন্ডারডগ’ ভাবাটাই জাপানের শক্তি।

তবুও ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে জাপান কোনোভাবেই ফেবারিট নয়। মরক্কোর ম্যাচ দেখে ব্রাজিলকে বিচার করলে হবে না। হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ধীরে ধীরে ব্রাজিল ছন্দে ফিরেছে। কোচ আনচেলত্তিও এক ধরনের দলীয় সমন্বয় খুঁজে পেয়েছেন। আজ জাপানের বিপক্ষে আনচেলত্তির কৌশল সর্বোচ্চ কার্যকারিতায় দেখালে ম্যাচ বের করে নেওয়া জাপানের পক্ষে কষ্টকরই। বিশ্বকাপের বড় ম্যাচগুলোর বেশির ভাগ সময়ই ঐতিহ্যের পক্ষে কথা বলে।

একটা তথ্য এখানে দেওয়া যায়। আজ থেকে ঠিক ৩০ বছর আগে, ১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকে ব্রাজিলকে ১–০ গোলে হারিয়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল জাপান। জাপানের ফুটবলে সেই জয় ‘মায়ামি নো কিসেকি’ বা ‘মায়ামির অলৌকিক ঘটনা’ নামে পরিচিত। এখন ‘হিউস্টন নো কিসেকি’ সম্ভব কিনা, সেই রোমাঞ্চকর অপেক্ষারই ম্যাচ এটা। কিন্তু ব্রাজিল কোনো ‘অলৌকিক ঘটনা’ যে ঘটতে দিতে চাইবে না—এতটুকু বলা যায়। আজ হিউস্টনে যদি কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটে যায়, সেটিকে ব্রাজিলিয়ানরা নির্দ্বিধায় ‘মারাকানাজো’ কিংবা ‘মিনেইরোজো’র মতো ‘হিউন্টনজো’ বলে চিত্রিত করবে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে।

সম্পর্কিত