Advertisement Banner

পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে কেন, দায় কার?

পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে কেন, দায় কার?
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত ৮ মে মাঝরাতে ঢাকার দোহারের বিলাশপুর রাধানগর গ্রামে আগুনে পুড়ে মারা যান স্বামী–স্ত্রী। রাত দেড়টার দিকে নিজেদের ঘরে আগুন লাগলে ঘরে দুই সন্তানসহ আটকা পড়েন আবদুস সালাম শিকদার ও নাসিমা বেগম। আগুনে ঘর থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই সন্তানকে ঘরের জানালা দিয়ে বের করে দেন তারা। অনেক চেষ্টা করেও নিজেরা বের হতে পারেননি। টিন-কাঠের ঘরটির সঙ্গে পুড়ে অঙ্গার হন দুজনই।

একই সময়ে বিপরীত এক ঘটনা ঘটে গাজীপুরে। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় রাউৎকোনা গ্রামের ভাড়াটিয়া ফোরকান মিয়া পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী শারমিন আক্তার, তিন মেয়ে–১৫ বছরের মীম খানম, আট বছরের উম্মে হাবিবা ও মাত্র দুই বছরের ফারিয়া এবং স্ত্রী শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়াকে গলা কেটে হত্যা করেন। বাবার ক্রোধ আর ক্ষোভে গোটা পরিবারের নিঃশেষ হওয়ার ঘটনাটি পরদিন সকালে সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়।

প্রথম দুঃখজনক ঘটনাটি আশা জাগানিয়াও। কিন্তু পরের ঘটনাটি মুহূর্তেই ভীতির জন্ম দেয়–তবে কি বাবা-মায়ের কাছেও সন্তান নিরাপদ নয়?

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরও কিছু ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক। গত ১০ মে ফেনীর দাগনভূঞায় মাদকাসক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন মা। ২ এপ্রিল ময়মনসিংহের ত্রিশালে লাবিব নামে তিন বছরের শিশুকে পারিবারিক কলহের জেরে হত্যা করেন বাবা সোহাগ। ৪ এপ্রিল রাজধানীর খিলগাঁওয়ের নার্গিস বেগম তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মাহিমকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন।

গত ৬ মার্চ জামালপুর শহরের দড়িপাড়া এলাকায় পারিবারিক কলহের জেরে তাহমিনা আক্তার তানিয়া নামে এক গৃহবধূকে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেন তার আইনজীবী স্বামী।

প্রায় প্রতিদিনই এমন সহিংসতার খবর গণমাধ্যমে আসছে। প্রশ্ন উঠছে, কোথায় হারালো পরিবারকেন্দ্রিক সব আস্থা–বিশ্বাস–নিরাপত্তার জায়গা? দায় কার?

প্রতীকী ছবি। ছবি: চরচা
প্রতীকী ছবি। ছবি: চরচা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধের অবনতি, ব্যক্তির নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তিসহ নানা কারণেই বাড়ছে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা। ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রের ওপরও এর দায় বর্তায়।

পারিবারিক সহিংসতার যত খবর, তার অধিকাংশের নেপথ্যে মেলে মাদক সংশ্লিষ্টতার তথ্য। গাজীপুরের ওই নৃশংস হত্যার পরও প্রতিবেশীদের অভিযোগ, প্রাইভেটকার চালক গৃহকর্তা ফোরকানও ছিলেন মাদকাসক্ত। প্রায়ই স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদে জড়াতেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক সহিংসতাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে মাদকই মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার চরচাকে বলেন, “মাদক মানুষের স্বাভাবিক বোধশক্তিকে প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত করে। নিয়মিত মাদক সেবনকারীর মস্তিষ্ক সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাই একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি সুস্থ মানুষের মতো ভাবতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না।”

মেখলা বলেন, “তাই কোনটি অপরাধ বা অপরাধ নয়, সেটি তিনি (মাদকাসক্ত ব্যক্তি) আলাদা করতে পারেন না। তাই মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের দ্বারাই অপরাধ বেশি ঘটে। এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ করতেও তিনি দ্বিধা করেন না। তার মস্তিষ্ক এমনভাবে কাজ করে, যেন নির্দিষ্ট সময়ে বা ঘটনায় হত্যাকাণ্ডটিই বরং সঠিক সিদ্ধান্ত।”

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, “মাদকাসক্ত ব্যক্তির কাছে মাদক গ্রহণ হলো নিয়মিত চাহিদা। তার মস্তিষ্ক সবসময় এটি গ্রহণের জন্য চাপ তৈরি করে। এটির তাৎক্ষণিক যোগান নিশ্চিত না হলে ওই ব্যক্তি বিরূপ আচরণ শুরু করে। এ জন্য আমরা নানা সময় এমন ঘটনাও দেখি যে, মাদকের টাকা না পেয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তি পরিবারে সহিংসতা শুরু করে।”

মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সাধারণ মানুষ হিসেবে না দেখে বরং রোগী হিসেবে মূল্যায়ন করে তার সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন মেখলা সরকার। তিনি বলেন, সঠিক চিকিৎসা নিলে মাদকাসক্ত ব্যক্তিও সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।

পারিবারিক সহিংসতার আরেকটি পর্যায় উল্লেখ করতে গিয়ে মেখলা সরকার জানান, ডিপ্রেশন নামক রোগটি খুব সাধারণ হলেও এর ভয়াবহতা অনেক বেশি। ডিপ্রেশনে থাকা রোগীরা বাহ্যিকভাবে অন্য দশজন স্বাভবিক মানুষের মতো হলেও তারা জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। হতাশার চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে একসময় তারা নিজেদের জীবনকে ব্যর্থ মনে করে হত্যাকাণ্ড এবং আত্মহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন। এমন সমস্যার সঠিক চিকিৎসা নিয়ে সকলকে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার আহ্বান জানান এই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ।

গাজীপুরে তিন সন্তান এবং ভাইয়ের সঙ্গে হত্যার শিকার শারমিনের স্বজনরা অভিযোগ করেন, শারমিন তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন–এটি পছন্দ ছিল না স্বামী ফোরকানের। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল না তাদের। এমনকি শারমিনকে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিতেন না ফোরকান। পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে গেলেও সামনে বসে থাকতেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবালের মতে, পারিবারিক সহিংসতা বাড়ার অন্যতম বড় কারণ হলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের ‘আস্থার ঘাটতি’। আর বর্তমানে এই পারিবারিক আস্থা বিনষ্টের জন্য দায়ী মানুষের ডান হাতের ‘বৃদ্ধাঙ্গুল’ অর্থাৎ, মোবাইল ফোন আসক্তি।

রেজিনা ইকবাল চরচাকে বলেন, “এক সময় ছিল যৌথ পরিবার। পরিবারের সকলে সবার সমস্যা-সুখ-দুঃখের কথা জানত। ঘরেই একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ ব্যবস্থা চালু ছিল। তখন আস্থার বন্ধনটা খুব স্ট্রং ছিল। দিন দিন একক পরিবার কনসেপ্ট জনপ্রিয় হয়েছে, পরিবারের মানুষের মাঝে যোগাযোগ কমেছে, আস্থাও কমেছে। এখন সে সমস্যা আরও প্রকট করে তুলেছে স্মার্টফোন। মানুষের জীবন যেন তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে আটকে গেছে। আগে আমরা পরিবার নিয়ে খাবার টেবিলে বসে নিজেদের বিষয়ে কথা বলতাম, একে অপরের সঙ্গে অনুভূতি আদান-প্রদান চালু ছিল। এখন খেতে বসেও আমরা একহাতে মোবাইলের স্ক্রিন স্ক্রল করতে থাকি। পাশে বসা মানুষটির দিকে তাকানোর সময়টুকুও নেই।”

ফাতেমা রেজিনা মনে করেন, সামনে হয়তো আবারও যৌথ পরিবারের কনসেপ্ট ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

পারিবারিক আস্থার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ড. ফাতেমা রেজিনা টানলেন গাজীপুরের ঘটনা। নিজের পুরো পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে ফোরকান টেলিফোনে ঘটনা জানিয়েছিলেন তার আপন ভাইকে। বলেছিলেন, সবাইকে তিনি শেষ করে ফেলেছেন। তাকে (ফোরকানকে) যেন তার ভাই এবং পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখোজি না করেন, তিনি পালিয়ে যাচ্ছেন।

এই উদাহরণ টেনে ড. ফাতেমা বলেন, “দেখুন, এই হলো আস্থার জায়গা। হত্যাকারীর সঙ্গে তার ভাই এবং পরিবারের আস্থার জায়গাটা বেশি ছিল বলে তিনি পালানোর আগে তার পরিবারকে জানিয়ে গেছেন, যেন তার খোঁজ না পেলে দুশ্চিন্তা না করে। কিন্তু একই আস্থার তৈরি না হওয়ায় তার সবচেয়ে আপন মানুষ স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করতে দ্বিধা করেনি।”

এসব পারিবারিক সহিংসতার বাড়ার পেছনে সমাজের দায়ও সমানভাবে কাজ করে বলেও মতো দিয়েছেন ঢাবির এই অধ্যাপক। তার মতে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাটাই এখন আত্মকেন্দ্রিক। পাশের বাড়িতে বা ফ্ল্যাটে কারো ঘরে কোনো সংকট তৈরি হলে প্রতিবেশীরা তা নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখান না। আগে কোনো পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ হলে প্রতিবেশীরাই দায়িত্ব নিয়ে তা মিটিয়ে দিতেন। এখন কোনো সংকটে ব্যক্তিগত বিষয় ভেবে নিজেদের দূরে রাখেন প্রতিবেশীরা।

এখানে প্রতিবেশীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ফাতেমা রেজিনা ইকবাল। তিনি বলেন, “পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আপনার অপরিচিত হলেও কোনো সহিংসতার ঘটনা বুঝতে পারলে প্রতিবেশী হিসেবে আপনার দায়িত্ব চুপ থাকা নয়; বরং স্থানীয় থানায় খবর দেওয়া।”

প্রতীকী ছবি। ছবি: চরচা
প্রতীকী ছবি। ছবি: চরচা

গাজীপুরের ঘটনার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, ঘটনার পর প্রতিবেশীরা সাংবাদিকদের জানান, ফোরকান ও তার স্ত্রীর মাঝে প্রায় প্রতিদিনই বিবাদ হতো। ফোরকান তার স্ত্রীর গায়ে নিয়মিত হাত তুলতেন। কিন্তু তাদের প্রতিবেশীদের কেউই কখনো বিষয়টি কাপাসিয়া থানায় অবহিত করেনি।

অন্যদিকে, অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি অপরাধ করতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র যদি নির্দিষ্ট অপরাধের বিপরীতে সাজার উদাহরণ তৈরি না করতে পারে, তখন তা অপরাধীকে আরও উৎসাহিত করে। এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ চরচাকে বলেন, “পারিবারিক সহিংসতা ঘটানো ব্যক্তি একজন অপরাধী। এই অপরাধের জন্য আইন আছে; কিন্তু আইনের দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ নেই। এখন একজন ব্যক্তি যদি জানে স্ত্রীর ওপর হাত তুললে কী ধরনের সাজা তাকে পেতে হবে, তাহলে সে হাত তোলার আগে একবার হলেও ভাববে। এখানে বিচার শুধু করলেই হবে না, এই সাজা কার্যকর হচ্ছে তাও জানাতে হবে।”

এখানে সংবাদমাধ্যমকেও আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক রেজাউল করিম। তিনি বলেন, “মিডিয়ায় পারিবারিক সহিংসতার খবর যেভাবে প্রচার-প্রকাশ হয়, একইভাবে গুরুত্ব দিয়ে এই ধরনের অপরাধীর বিচার কেমন হচ্ছে, সাজা কীভাবে কার্যকর হচ্ছে, এসব বিষয়ও প্রচার করা উচিত। তবে অপরাধীদের কাছে বার্তা পৌঁছাবে।”

সম্পর্কিত