ডয়চে ভেলের বিশ্লেষণ
বাংলা মূলত বাংলাভাষী মানুষের ভূখণ্ড। যা গত কয়েক শতাব্দীতে বেশ কয়েকবার বিভক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯০৫ সাল, যখন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন ধর্মীয় ভিত্তিতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন।
চরচা ডেস্ক

ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য পরিচিত দুই বাংলার রাজনীতিতে ধর্মের উত্থান ঘটছে। সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে এবং বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমান্তের দুই প্রান্তের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এখন ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করার চেষ্টা করছেন।
গত ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচন ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাংলাদেশে। সেখানে জামায়াতে ইসলামী দেশব্যাপী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়েছে। যা এ যাবৎকালে জামায়েতের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান।
অন্যদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির ভোট ২০১৬ সালের প্রায় ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে এই বছর প্রায় ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ নির্বাচনী ব্যবস্থার অধীনে, গত মাসে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন দখল করে জয় নিশ্চিত করার জন্য এটিই যথেষ্ট ছিল।
বাংলাদেশি নৃবিজ্ঞানী রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বাংলার এই রাজনৈতিক নেতিবাচক পরিবর্তন সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
রেজওয়ানা করিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “এই অঞ্চলের একসময় একটি ‘অংশীদারত্বমূলক পরিচয়’ ছিল। যা মানুষকে একইসাথে বাঙালি ও হিন্দু অথবা বাঙালি ও মুসলিম হওয়ার সুযোগ করে দিত। কিন্তু সীমান্তের উভয় পাশেই রাজনৈতিক বয়ানগুলো এখন পরিচয়কে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করছে। যা ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে কোণঠাসা করে ফেলছে।”
পুরোনো ফাটলে নতুন রাজনীতি
বাংলা মূলত বাংলাভাষী মানুষের ভূখণ্ড। যা গত কয়েক শতাব্দীতে বেশ কয়েকবার বিভক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯০৫ সাল, যখন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন ধর্মীয় ভিত্তিতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন।
সেই সময়ে বাংলা ছিল ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এই বিভক্তির লক্ষ্য ছিল হিন্দু-প্রধান পশ্চিম অংশের সঙ্গে মুসলিম-প্রধান পূর্ব অংশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বাঙালির ঐক্য ভেঙে দেওয়া। ব্রিটিশরা আশা করেছিল, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠার আগেই এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব হবে।
পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা ১৯০৫ সালের এই বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কারণ এর ফলে এমন একটি অঞ্চল তৈরি হয়েছিল যেখানে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। এর বিপরীতে, অনেক হিন্দু উচ্চবিত্ত শ্রেণি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন। তারা এটিকে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন।
ব্রিটিশদের 'ডিভাইড এন্ড রুল' নীতি
ভারতীয় ইতিহাসবিদ এবং ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক দীপেশ চক্রবর্তী বলেন, “এক শতাব্দীরও বেশি আগে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি আজও এই অঞ্চলকে প্রভাবিত করছে।
দীপেশ চক্রবর্তী ডয়চে ভেলেকে বলেন, “তৎকালীন হিন্দু উচ্চবিত্তরা সেই বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বাংলাভাগ মেনে নিলে হয়তো মুসলমানদের আশ্বস্ত করা যেত যে তারা আধিপত্যের শিকার হচ্ছেন না।”
প্রবল বিরোধিতার মুখে ব্রিটিশরা ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। তবে ভেতরের সেই বিভাজন থেকেই গিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে এই বিভেদ আবার প্রকট হয়ে ওঠে, যখন বাংলা আবারও স্থায়ীভাবে হিন্দু-প্রধান ভারত এবং তৎকালীন মুসলিম-প্রধান পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়।
রাজনীতি বাংলা ভাগ ইতিহাসকে বদলে দিচ্ছে
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে সেই রাষ্ট্রের অংশ ছিল। এর কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালি মুসলমানরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে প্রতিবাদ শুরু করেন।
সময়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে তোলে। যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। এর মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিশ্ব মানচিত্রে পরিচয় হয়। বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তবে ১৯৭৫ সালে তার হত্যাকাণ্ডের পর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ যুক্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ধীরে ধীরে রাজনৈতিক উচ্চবিত্ত শ্রেণি ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়ে ধর্মীয় বয়ানকে বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করে। নৃবিজ্ঞানী স্নিগ্ধা এই পরিবর্তনকে বর্ণনা করেছেন ‘জনগণকে বিভক্ত ও নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে।
পরিবর্তনের সন্ধানে বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্ম
২০২৪ সালে বাংলাদেশে জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটে। যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। গণতন্ত্রের বিমুখী, দুর্নীতি, বাকস্বাধীনতা রোধ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর কড়াকড়ির বিরুদ্ধে ক্ষোভ এই অভ্যুত্থানে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।
অন্যদিকে অনুরূপ সমালোচনা পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের বিরুদ্ধেও করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো নয়, বরং সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে দলটিকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে।
ভারতীয় বাঙালি লেখক ও বিশ্লেষক অভ্র ঘোষের মতে, বিজেপির বিশাল জয় আদর্শিক হিন্দুত্বের সমর্থনের চেয়ে ভোটারদের অসন্তোষেরই প্রতিফলন বেশি। বিষয়টি নিয়ে অভ্র ঘোষ বলেন, “এটি হিন্দুত্বের পক্ষে ভোটের চেয়ে বরং যেকোনো মূল্যে তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যানের ভোট ছিল।”

একইসঙ্গে অভ্র ঘোষ মনে করেন, বিজেপি যদি ক্ষমতায় টিকে থাকে, তবে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদ প্রচারের প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে শিকড় গেড়ে বসতে পারে। বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যেই এই পরিবর্তনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অধীনে বিজেপি ভারতের জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতায় রয়েছে। এই জাতীয়তাবাদী দলটি এখন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্য শাসন করছে। যার প্রত্যেকটির সংঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে এবং সেখানে বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষী মানুষ বসবাস করেন। অভ্র ঘোষ লক্ষ্য করেছেন, গত মাসে পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পর থেকে বিজেপি নেতারা সাধারণত সরাসরি ঘৃণা ছড়ানো বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো বক্তব্য এড়িয়ে চলছেন।
বাংলাদেশে তোষামোদের রাজনীতির উল্টো ফল
সাবেক হাসিনা সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোকে আংশিক ছাড় দিয়েছিল। যেমন, মাদ্রাসার প্রসার ঘটানো, ইসলামপন্থীদের চাপে পাঠ্যপুস্তক থেকে ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলা এবং শত শত মসজিদ নির্মাণ করা। জামায়াতে ইসলামীর মতো উগ্রপন্থীদের মোকাবিলা করার প্রচেষ্টা হিসেবে সরকার এই মসজিদ নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিল।
ডয়চে ভেলেকে দীপেশ চক্রবর্তী বলেন, “ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের সন্ধান এখনো চলছে।”
সীমান্তের ওপারে, সমালোচকরা তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধেও একই ধরনের কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে হিন্দু ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য দিঘা জগন্নাথ মন্দিরের মতো বড় তীর্থস্থান প্রকল্পে সহায়তা করা, পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন বজায় রাখার জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা।
দীপেশ বলেন, “এই তোষামোদের নীতিগুলো সম্প্রীতি বৃদ্ধির পরিবর্তে বরং কট্টরপন্থী রাজনীতিকেই শক্তিশালী করেছে।”
চাপের মুখে বাঙালি ‘লেজেন্ডদের’ আদর্শ
স্নিগ্ধা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে এই ভারসাম্যপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতা বাঙালি সংস্কৃতির গভীরে রয়েছে। তবে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এটিকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টাগুলো উল্টো ফল বয়ে এনেছে।”
স্নিগ্ধা আরও বলেন, “লালন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো কিংবদন্তি বাঙালি চিন্তাবিদ ও কবিরা ধর্মীয় ঐক্যের জয়গান গেয়েছেন। রাজনীতি ক্রমেই বিভাজিত হয়ে পড়ায় তাদের সেই আদর্শগুলো এখন চাপের মুখে রয়েছে।”
স্নিগ্ধা ডয়চে ভেলেকে বলেন, “ যখন কেউ নিজেকে হিন্দু বা মুসলমানের চেয়ে ‘বাঙালি’ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তখন তা সীমানা ছাড়িয়ে যায় এবং বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বয়ানগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানায়।”

ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য পরিচিত দুই বাংলার রাজনীতিতে ধর্মের উত্থান ঘটছে। সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে এবং বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমান্তের দুই প্রান্তের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এখন ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করার চেষ্টা করছেন।
গত ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচন ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাংলাদেশে। সেখানে জামায়াতে ইসলামী দেশব্যাপী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়েছে। যা এ যাবৎকালে জামায়েতের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান।
অন্যদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির ভোট ২০১৬ সালের প্রায় ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে এই বছর প্রায় ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ নির্বাচনী ব্যবস্থার অধীনে, গত মাসে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন দখল করে জয় নিশ্চিত করার জন্য এটিই যথেষ্ট ছিল।
বাংলাদেশি নৃবিজ্ঞানী রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বাংলার এই রাজনৈতিক নেতিবাচক পরিবর্তন সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
রেজওয়ানা করিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “এই অঞ্চলের একসময় একটি ‘অংশীদারত্বমূলক পরিচয়’ ছিল। যা মানুষকে একইসাথে বাঙালি ও হিন্দু অথবা বাঙালি ও মুসলিম হওয়ার সুযোগ করে দিত। কিন্তু সীমান্তের উভয় পাশেই রাজনৈতিক বয়ানগুলো এখন পরিচয়কে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করছে। যা ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে কোণঠাসা করে ফেলছে।”
পুরোনো ফাটলে নতুন রাজনীতি
বাংলা মূলত বাংলাভাষী মানুষের ভূখণ্ড। যা গত কয়েক শতাব্দীতে বেশ কয়েকবার বিভক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯০৫ সাল, যখন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন ধর্মীয় ভিত্তিতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন।
সেই সময়ে বাংলা ছিল ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এই বিভক্তির লক্ষ্য ছিল হিন্দু-প্রধান পশ্চিম অংশের সঙ্গে মুসলিম-প্রধান পূর্ব অংশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বাঙালির ঐক্য ভেঙে দেওয়া। ব্রিটিশরা আশা করেছিল, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠার আগেই এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব হবে।
পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা ১৯০৫ সালের এই বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কারণ এর ফলে এমন একটি অঞ্চল তৈরি হয়েছিল যেখানে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। এর বিপরীতে, অনেক হিন্দু উচ্চবিত্ত শ্রেণি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন। তারা এটিকে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন।
ব্রিটিশদের 'ডিভাইড এন্ড রুল' নীতি
ভারতীয় ইতিহাসবিদ এবং ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক দীপেশ চক্রবর্তী বলেন, “এক শতাব্দীরও বেশি আগে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি আজও এই অঞ্চলকে প্রভাবিত করছে।
দীপেশ চক্রবর্তী ডয়চে ভেলেকে বলেন, “তৎকালীন হিন্দু উচ্চবিত্তরা সেই বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বাংলাভাগ মেনে নিলে হয়তো মুসলমানদের আশ্বস্ত করা যেত যে তারা আধিপত্যের শিকার হচ্ছেন না।”
প্রবল বিরোধিতার মুখে ব্রিটিশরা ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। তবে ভেতরের সেই বিভাজন থেকেই গিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে এই বিভেদ আবার প্রকট হয়ে ওঠে, যখন বাংলা আবারও স্থায়ীভাবে হিন্দু-প্রধান ভারত এবং তৎকালীন মুসলিম-প্রধান পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়।
রাজনীতি বাংলা ভাগ ইতিহাসকে বদলে দিচ্ছে
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে সেই রাষ্ট্রের অংশ ছিল। এর কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালি মুসলমানরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে প্রতিবাদ শুরু করেন।
সময়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে তোলে। যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। এর মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিশ্ব মানচিত্রে পরিচয় হয়। বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তবে ১৯৭৫ সালে তার হত্যাকাণ্ডের পর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ যুক্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ধীরে ধীরে রাজনৈতিক উচ্চবিত্ত শ্রেণি ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়ে ধর্মীয় বয়ানকে বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করে। নৃবিজ্ঞানী স্নিগ্ধা এই পরিবর্তনকে বর্ণনা করেছেন ‘জনগণকে বিভক্ত ও নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে।
পরিবর্তনের সন্ধানে বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্ম
২০২৪ সালে বাংলাদেশে জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটে। যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। গণতন্ত্রের বিমুখী, দুর্নীতি, বাকস্বাধীনতা রোধ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর কড়াকড়ির বিরুদ্ধে ক্ষোভ এই অভ্যুত্থানে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।
অন্যদিকে অনুরূপ সমালোচনা পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের বিরুদ্ধেও করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো নয়, বরং সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে দলটিকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে।
ভারতীয় বাঙালি লেখক ও বিশ্লেষক অভ্র ঘোষের মতে, বিজেপির বিশাল জয় আদর্শিক হিন্দুত্বের সমর্থনের চেয়ে ভোটারদের অসন্তোষেরই প্রতিফলন বেশি। বিষয়টি নিয়ে অভ্র ঘোষ বলেন, “এটি হিন্দুত্বের পক্ষে ভোটের চেয়ে বরং যেকোনো মূল্যে তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যানের ভোট ছিল।”

একইসঙ্গে অভ্র ঘোষ মনে করেন, বিজেপি যদি ক্ষমতায় টিকে থাকে, তবে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদ প্রচারের প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে শিকড় গেড়ে বসতে পারে। বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যেই এই পরিবর্তনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অধীনে বিজেপি ভারতের জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতায় রয়েছে। এই জাতীয়তাবাদী দলটি এখন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্য শাসন করছে। যার প্রত্যেকটির সংঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে এবং সেখানে বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষী মানুষ বসবাস করেন। অভ্র ঘোষ লক্ষ্য করেছেন, গত মাসে পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পর থেকে বিজেপি নেতারা সাধারণত সরাসরি ঘৃণা ছড়ানো বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো বক্তব্য এড়িয়ে চলছেন।
বাংলাদেশে তোষামোদের রাজনীতির উল্টো ফল
সাবেক হাসিনা সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোকে আংশিক ছাড় দিয়েছিল। যেমন, মাদ্রাসার প্রসার ঘটানো, ইসলামপন্থীদের চাপে পাঠ্যপুস্তক থেকে ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলা এবং শত শত মসজিদ নির্মাণ করা। জামায়াতে ইসলামীর মতো উগ্রপন্থীদের মোকাবিলা করার প্রচেষ্টা হিসেবে সরকার এই মসজিদ নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিল।
ডয়চে ভেলেকে দীপেশ চক্রবর্তী বলেন, “ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের সন্ধান এখনো চলছে।”
সীমান্তের ওপারে, সমালোচকরা তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধেও একই ধরনের কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে হিন্দু ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য দিঘা জগন্নাথ মন্দিরের মতো বড় তীর্থস্থান প্রকল্পে সহায়তা করা, পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন বজায় রাখার জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা।
দীপেশ বলেন, “এই তোষামোদের নীতিগুলো সম্প্রীতি বৃদ্ধির পরিবর্তে বরং কট্টরপন্থী রাজনীতিকেই শক্তিশালী করেছে।”
চাপের মুখে বাঙালি ‘লেজেন্ডদের’ আদর্শ
স্নিগ্ধা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে এই ভারসাম্যপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতা বাঙালি সংস্কৃতির গভীরে রয়েছে। তবে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এটিকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টাগুলো উল্টো ফল বয়ে এনেছে।”
স্নিগ্ধা আরও বলেন, “লালন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো কিংবদন্তি বাঙালি চিন্তাবিদ ও কবিরা ধর্মীয় ঐক্যের জয়গান গেয়েছেন। রাজনীতি ক্রমেই বিভাজিত হয়ে পড়ায় তাদের সেই আদর্শগুলো এখন চাপের মুখে রয়েছে।”
স্নিগ্ধা ডয়চে ভেলেকে বলেন, “ যখন কেউ নিজেকে হিন্দু বা মুসলমানের চেয়ে ‘বাঙালি’ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তখন তা সীমানা ছাড়িয়ে যায় এবং বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বয়ানগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানায়।”