দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান চালনায় বিশ্ববাসী বিস্মিত হয়েছে। বিশেষত একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে রাতের অভিযানে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আরেক দেশ বিচার করতে পারে কিনা, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কিন্তু এটা কি এতটাই বিস্ময়কর? নাকি এ প্রশ্নকেই বিস্ময়কর লাগছে?
একটু খোলাসা করা যাক। এখন যে ‘মনরো ডকট্রিনের’ কথা উঠছে, তা কিন্তু ওঠারই কথা ছিল। প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নড়াচড়াই বলে দিচ্ছিল এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু এত দ্রুত ঘটবে, তা হয়তো ভাবতে পারেনি কেউই।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মনরো ডকট্রিনের ফিরিয়ে আনা এবং একে আরও আগ্রাসী করে তোলার কাজটি করেছেন। যখন সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে নানা প্ল্যাটফর্মে একে ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছিল, তখন তিনিও ‘এত করে যখন বলছো’ ভাব নিয়ে একে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছেন।
মনরো ডকট্রিনের জন্ম হয়েছিল তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপ ভীতি থেকে। ১৮২৩ সালে যখন এর যাত্রা শুরু হয়, তখন স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক খর্বশক্তির। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, রাশিয়া–এই দেশগুলো দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের ঔপনিবেশিক যাত্রা যখন পুনরায় শুরু করছিল, তখন বিপদ বুঝে যুক্তরাষ্ট্র আত্মরক্ষার্থেই এ পদক্ষেপ নেয়। পরে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এতে বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করেন। ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ‘রুজভেল্ট করোলারি’ অনুসারে লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ যদি ‘ভুল পথে’ চালিত হয়, তবে সেই দেশকে শাসনের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে।
রুজভেল্টের এই সময় থেকেই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব না হলেও আশপাশের অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা দৃশ্যমান হতে শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ক্রমক্ষয়। এ দুই মিলিয়ে দুটি বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে একমেবাদ্বিতীয়ম। আর এ ক্ষেত্রে দেশটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বিশ্বায়ন ইত্যাদি ধারণাকে তাদের সেরা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। স্বাধীন দেশগুলোতে অন্য দেশের হস্তক্ষেপ বন্ধে আন্তর্জাতিক যে সমঝোতা, তাকে বিভিন্ন সময় এ দেশটিই লঙ্ঘন করেছে।
বর্তমানে বিশ্বব্যবস্থা এক বদলের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা ক্রমপ্রকাশমান। আর এই প্রকাশের ক্ষেত্রে যে শক্তিগুলো দ্বন্দ্বমুখর, তার অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র। বাকিদের মধ্যে আছে রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিল ইত্যাদি রাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের পর জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার বলছেন, “রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল ও ইউক্রেনে আগ্রাসন ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় বাঁক। কিন্তু এখন আমেরিকার আচরণ সেই বিশ্বব্যবস্থার জন্য আরেকটি ভাঙন তৈরি করছে, যে ব্যবস্থাটি গড়ে তুলতে একসময় ওয়াশিংটনই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।”
স্টেইনমায়ার ভুল বলেননি। কিন্তু তিনি এটা বলতে ভুলে গেছেন যে, এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র এই বিশ্বব্যবস্থার মৌল নীতিগুলোকে লঙ্ঘন করেছে। সেটা ইরাক, আফগানিস্তান হয়ে বহু দূর বিস্তৃত। এখন ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলছে বা বলার চেষ্টা করছে, নয়া ব্যবস্থার পদধ্বনী শোনার কারণে। সেই ব্যবস্থাটি কী? এ প্রশ্নের উত্তর অন্যত্র দেওয়া যাবে। আপাতত এখানে শুরুর প্রশ্নটির দিকে তাকানো যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন বা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে এভাবে অপহরণ কি অনুমিত ছিল না? ছিল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যে মনরো ডকট্রিনের কথা বলছে, যা আজ ডনরো ডকট্রিনের আবরণে বহুল উচ্চারিত, তার নীলনকশাটি অনেক আগেই প্রকাশিত। বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এবারের নির্বাচনের আগে যে প্রোজেক্ট ২০২৫ সামনে এসেছিল, সেখানেই এর ইঙ্গিত ছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি তার নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ ভাষ্যকে সামনে এনেছেন। আর এই আনাকে তিনি কোনো শব্দবন্ধে আবদ্ধ রাখেননি। তিনি এর জন্য শত্রু-মিত্র ইত্যাদির চিহ্নায়নেও মনোযোগী হয়েছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম চোসান-এ এ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন কিম জি-ওন। তিনি সেখানে পরিষ্কার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আসলে পশ্চিম গোলার্ধে তার প্রভাববলয়ের সম্প্রসারণ চায়। পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা নীতি তো বটেই জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন পড়লে সামরিক শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তার কোনো কুণ্ঠা নেই। আর এ জন্য মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা যেমন, তেমনি আর্কটিক অঞ্চলকেও তার চাই।
মনে রাখা ভালো যে, ভেনেজুয়েলার ঘটনার পরপর গ্রিনল্যান্ডের প্রসঙ্গ আবার সামনে এসেছে। আর তা এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্যেই। তিনি কলোম্বিয়াকেও হুমকি দিয়েছেন। কলোম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্টকে হুঁশিয়ার করেছেন।
কথা হলো, কেন প্রয়োজন এ অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের। বলি যে, একটু মানচিত্রের দিকে তাকান। সেখানে ভালো করে তাকালেই দেখা যাবে, পশ্চিম গোলার্ধের নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে উত্তর ও দক্ষিণ উভয় পাশেই নিজের উপস্থিতি প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের। আর এ জন্য ওপরের দিকে গ্রিনল্যান্ড এবং নিচের দিকে প্রয়োজন ভেনেজুয়েলা ও কলোম্বিয়ার মতো দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ। এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দেশটির দক্ষিণ পাশ দিয়ে সকল নৌপথ উন্মুক্ত ও নির্বিঘ্ন হয়ে যাবে।
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আমেরিকা। ছবি: রয়টার্সফলে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় তাদের সফল অভিযান সম্পন্নের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ও কলোম্বিয়ার নাম উচ্চারণ করবেন। তার ভাষ্যমতে, “জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রিনল্যান্ড ভীষণভাবে জরুরি। গ্রিনল্যান্ড রাশিয়া ও চীনের জাহাজ দ্বারা পরিবেষ্টিত।” ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু একটুও বাড়িয়ে বলেননি। কথাটা সত্য। এবং আজকের দিনের ভূরাজনীতির খেলায় আর্কটিক ভীষণভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে শুধু তার গলতে থাকা বরফের কারণে। এ আলোচনা যথাস্থানে করা যাবে। আপাতত, শুধু ভেনেজুয়েলা ও আর্কটিকে মার্কিন আকাঙ্ক্ষার পেছনে একই রসদ কিনা, তা খতিয়ে দেখা যাক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকাকে নিজের করে নিতে চাইছেন। এটা একটা ঔপনিবেশিক আকাঙ্ক্ষা বলা যায়। এ ক্ষেত্রে শুরুতেই তিনি গালফ অব মেক্সিকোকে গালফ অব আমেরিকা বলে নতুন নাম দিতে চাইছেন। আর ভেনেজুয়েলার পর কলোম্বিয়ার প্রসঙ্গটি টেনে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, মানচিত্রের দক্ষিণ দিকের সমুদ্রপথ যুক্তরাষ্ট্র নির্বিঘ্ন করতে চায়। রইল বাকি ওপরের অংশ। হ্যাঁ, সেদিকটাতেই রয়েছে গ্রিনল্যান্ড।
এবার দক্ষিণ আমেরিকার সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদের হিসাবটি মিলিয়ে নিলেই বোঝা হয়ে যায়, এই গোটা অঞ্চল বা ট্রাম্প কথিত ‘পশ্চিম গোলার্ধ’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কেন এত আরাধ্য হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যখন সভ্যতাকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পুনর্মঞ্চায়নের প্রশ্ন আসে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকা হয়ে ওঠার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে পাঠ করাটা সহজ হবে।