ফরেন পলিসির সম্পাদক রবি আগারওয়াল সম্প্রতি লিখেছেন, কীভাবে ২০২৬ সালের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিশাল উদ্যাপনের মাধ্যমে তার দ্বিতীয় মেয়াদের সূচনা সফলভাবে উদ্যাপন করছিলেন। বিশ্বনেতা থেকে শুরু করে বিলিয়নেয়ারদের সমাগম ঘটেছিল সেখানে।
মার-আ-লাগোর সেই বিলাসবহুল নৈশভোজ থেকে শুরু করে ট্রাম্পের একের পর এক নির্বাহী আদেশ স্বাক্ষর, বিচার বিভাগকে প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করা এবং ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলার নির্দেশ–সবই ছিল তার বিশ্ব রাজনীতিতে একক কর্তৃত্ব প্রকাশের অংশ। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার সরকার প্রধান নিকোলাস মাদুরোকে ধরার জন্য ট্রাম্প পরিচালিত ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ ছিল তার সামরিক শক্তির চূড়ান্ত প্রদর্শন।
আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্ক সত্ত্বেও এই পদক্ষেপ ট্রাম্পকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছিল এবং তিনি ডেনমার্কের মালিকানাধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো বিপজ্জনক হুমকিও দিয়ে বসেন, যা ছিল ন্যাটোর ভিত্তি কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্বের শীর্ষ নির্বাহী ও নেতাদের আলোচনায় কেবল ট্রাম্পের প্রভাব ও তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েই আলোচনা চলছিল।
কিন্তু এই উচ্চাভিলাষ ও ক্ষমতার একক চর্চা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের শেষ দিকে এসে ট্রাম্পের ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে এবং তিনি কার্যত সময়ের আগেই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ হারানো এক ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টে পরিণত হওয়ার দিকে ধাবিত হন।
ক্ষমতার এই দ্রুত অবনতির প্রধান কারণ ছিল–২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বন্দোবস্ত ও অর্থনীতিতে মারাত্মক টান সৃষ্টি করে। ট্রাম্পের একসময়ের অনুগত ক্যাবিনেট সদস্যরাও সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন যে, তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টার বিষয়ে তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিলেন।
এই যুদ্ধ ট্রাম্পের অস্ত্রাগারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতে আমেরিকার কাছে প্রায় ২,৩০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ঘাঁটি ও মিত্রদের রক্ষায় বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে আগস্ট মাসের মধ্যে সেই মজুদ নেমে আসে মাত্র ৮০০–তে। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে এবং যুক্তরাষ্ট্র বছরে মাত্র ৬০০টি এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। এই ক্ষেপণাস্ত্র ঘাটতি ট্রাম্পকে ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিবর্তন বা তাইওয়ানকে চীনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত সামরিক হুমকি দেওয়া থেকে বিরত রাখছে।
তাছাড়া, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি ট্রাম্পকে ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে এবং তার জনপ্রিয়তা এক ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জন্য এক বড় পরাজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সামরিক ক্ষমতার এই দুর্বলতা প্রতিপক্ষ ও মিত্র উভয়ের কাছেই পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমহ্রাসমান সক্ষমতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও তেহরানের বিমান ও নৌবাহিনী মার্কিন হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, তবুও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত অন্তত ১৮টি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে আমেরিকা ও তার মিত্রদের শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি সাধন করেছে। পাশপাশি তেহরান নিজেদের তেলের বিশাল মজুত উন্মুক্ত করে জ্বালানি বাজারে মার্কিন সার্বভৌম ক্ষমতার ওপর আঘাত করেছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার নিজের সমর্থক এবং টাকার কার্লসন ও জো রোগানের মতো প্রভাবশালী পডকাস্টারদের সমালোচনা ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ডেমোক্রেটিক দল পুনরায় তাদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ এখন ট্রাম্প-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ট্রাম্পের অনির্ভরযোগ্যতা ও অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ব রাজনীতির মিত্র দেশগুলোও তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার নতুন রূপরেখা তৈরি করতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এর একটি বড় প্রমাণ; যেখানে একটি দেশের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ওয়াশিংটন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে, মার্কিন ঘাঁটির উপস্থিতি তাদের রক্ষার চেয়ে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশি। অন্যদিকে ইউরোপও আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে অভূতপূর্ব ব্যয় বাড়াতে শুরু করেছে। তারা ১৫০ বিলিয়ন ইউরোর ‘সেফ’ নামক নতুন অস্ত্র সংগ্রহ কার্যক্রম চালু করেছে এবং ডেনমার্ক মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের বদলে ফরাসি-ইতালীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেছে নিয়েছে।
ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মার্কিন ক্লাউড কম্পিউটিং কোম্পানিগুলোর ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তার অনুরোধে ইউরোপিয়ান নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এটি তাদের যুদ্ধ নয়। এমনকি মার্কিন ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজাকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া ১৫ দফার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের একের পর এক সিদ্ধান্তের কারণে কানাডা, ইউরোপ ও ভারতের মতো ভৌগোলিক মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবমূল্যায়ন মূলত চীনের একক আধিপত্য রোখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা ধ্বংস করে দিয়েছে।
ব্যবসা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলো আমেরিকা থেকে ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দুই চুক্তি–দক্ষিণ আমেরিকার মারকোসুর জোট এবং ভারতের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করতে উদ্যোগী হয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের জবাবে চীন যখন তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান ও চুম্বক রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ট্রাম্প এই ক্ষেত্রেও ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিলেন এবং চীনের পাল্টা আঘাতের কাছে নতি স্বীকার করে বেশ কিছু শুল্ক সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। ট্রাম্পের এই পিছু হটার প্রবণতা ‘টাকো’ (TACO – Trump always chickens out) হিসেবে পরিচিত লাভ করে, যা তার আন্তর্জাতিক প্রভাবে প্রথম বড় ধাক্কা হিসেবে কাজ করেছিল।
সামনে ট্রাম্পের ক্ষমতা যতই হ্রাস পাবে, তিনি আরও বেশি করে ঘরোয়া ও আঞ্চলিক বিষয়ে জোর দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। ডলারের আধিপত্য কাজে লাগিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি রাখার ক্ষমতা এখনো আমেরিকার রয়েছে, তবে আন্তর্জাতিকভাবে দেশগুলো এখন ডলার ব্যবস্থার বাইরে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন কোনো দূরবর্তী সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা হারিয়ে ট্রাম্প হয়তো লাতিন আমেরিকার দিকে নজর বাড়াতে পারেন, যার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হতে পারে দুর্বল অর্থনীতি ও নেতৃত্বের দেশ কিউবা।
পাশাপাশি অভিবাসীদের বহিষ্কারের উদ্যোগ বা সেমিকন্ডাক্টর ও ড্রোনের মতো স্পর্শকাতর খাতে জাতীয় নিরাপত্তার নামে শুল্ক বাড়ানোর নীতি তিনি অব্যাহত রাখতে পারেন। তবে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লে এই উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে আসবে। একসময় বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন ট্রাম্প দেখাতেন, তা থেকে মনোযোগ সরিয়ে তিনি এখন কেনেডি সেন্টারে নিজের নাম যুক্ত করার মতো নামমাত্র স্মৃতিচিহ্ন তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠছেন।
ক্ষমতায় আসার সময় ট্রাম্পের মূল কৌশল ছিল, প্রতিদিন একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও আদেশ জারি করে সংবাদমাধ্যম ও প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত রাখা। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকায় প্রথম মেয়াদের আক্রমণাত্মক গতি ধরে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এখন বিশ্বনেতা ও করপোরেট প্রধানরা বুঝতে শুরু করেছেন যে, ট্রাম্পকে উপহার দিয়ে প্রভাবিত করার চেয়ে তাকে কিছুটা দূরত্বে রেখে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোই বেশি লাভজনক।
বিশ্ববাজার ও শেয়ারবাজার ট্রাম্পের হুটহাট নেওয়া অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর বিরুদ্ধে একটি বড় বাধা হয়ে কাজ করছে এবং ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক মনোযোগ ট্রাম্পের ওপর থেকে সরতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের আগ্রাসী ভূমিকা মূলত আমেরিকাকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা পতনের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প যখন জি-২০ সম্মেলন কিংবা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত হবেন, বিশ্বনেতাদের প্রশ্ন আর এটি থাকবে না যে তিনি কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন; বরং মূল প্রশ্ন দাঁড়াবে, ট্রাম্প আদৌ আর বিশ্ব রাজনীতিতে কোনো গুরুত্ব বহন করেন কি না।