সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে যে পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকটি পরিচালনা করছিল, সরকার পতনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সেই বোর্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন চেয়ারম্যানসহ একাধিক পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আবারও চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়েছে। ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন একটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধিত্ব থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের বড় অংশ বদলে গেলে প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্রের মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কতটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে? সোনালী ব্যাংকের গত তিন সরকারের সময়ের পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তনে সেই চিত্রই দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর চরচাকে বলেন, “আওয়ামী লীগ বা বিএনপি হোক, এসব পরিচালনা পর্ষদে পার্টির লোকই নিয়োগ দেওয়া হয় পার্টিকে খুশি করার জন্য। হয়ত এমনটা হয়, উপরে তাদেরকে দেখে মনে হয় না যে সে কোন দলের। মনে হতে পারে সে হয়ত কোনো দল করে না। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। তারা অবশ্যই কোনো দলের হয়ে কাজ করে, কিন্তু সেটা গোপনে। আর এই কারণেই তাকে নিয়োগ দেয় দল। আর দল থেকে যখন তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে তখন সেই দলকেই সার্ভ করবে। এতেই অনিয়ম হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।”
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ের বোর্ড
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। ২০১৯ সালে প্রথমবার তিনি সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান এবং পরবর্তী সময়ে পুনর্নিয়োগও পান।
তার নেতৃত্বাধীন বোর্ডে ছিলেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এ বি এম রুহুল আজাদ, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক দৌলতুন্নাহার খানম, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সাবেক মহাব্যবস্থাপক মোল্লা আব্দুল ওয়াদুদ এবং অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান বসু ব্যানার্জি নাথ অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা অংশীদার গোপাল চন্দ্র ঘোষ।
বোর্ডের সদস্যদের পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে সাবেক আমলা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যাংকিং ও হিসাব পেশার মানুষ ছিলেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য মো. মতিউর রহমানও ছিলেন। ২০২৪ সালের জুনে তাকে বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সরকার নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি আর পর্ষদ সভায় অংশ নেননি।
মতিউর রহমানের ঘটনাটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রত্যক্ষ প্রভাবের একটি উদাহরণ। তিনি ব্যাংকার ছিলেন না, ছিলেন সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে ছিলেন। তার অপসারণের ক্ষেত্রেও ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নয়, সরকারের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়।
সে সময় সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী বলেছিলেন, “মতিউর রহমানকে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে না আসার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আমরা তাকে জানিয়ে দিয়েছি। আসলে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে কোনো পরিচালক নিয়োগ, স্থগিত বা বাতিল করার এখতিয়ার সরকারের আছে।”
২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতেও জিয়াউল হাসান সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন বোর্ডই দায়িত্বে ছিল। ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত একটি পর্ষদ সভায় চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিভিন্ন পরিচালক অংশ নেন। অর্থাৎ ৫ আগস্টের সরকার পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত পুরনো বোর্ডই ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় ছিল।
এরপর আসে বড় পরিবর্তন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০ আগস্ট জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন। মাত্র আট দিনের ব্যবধানে ২৮ আগস্ট সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীকে সোনালী ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার নিয়োগের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন বছর।
অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান বিদায় নেন, নতুন সরকারের সময়ে নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিচালনা পষদও পরিবর্তন হতে শুরু করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বদলে গেল পর্ষদ
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শুধু চেয়ারম্যানই বদলায়নি, সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও একের পর এক নতুন মুখ যুক্ত হয়। গত বছরের ২৮ মে অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ১৮তম বার্ষিক সাধারণ সভার তথ্য অনুযায়ী, তখন চেয়ারম্যান ছিলেন মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তার সঙ্গে বোর্ডে ছিলেন মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, মোল্লা আব্দুল ওয়াদুদ, ড. আসিফ নাইমুর রশিদ, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, মো. মোফাজ্জল হুসাইন, মুহাম্মদ মাসরুরুল ইসলাম, লায়লা বিলকিস আরা ও তারিকুল ইসলাম চৌধুরী।
নতুন বোর্ডের সদস্যদের পেশাগত পরিচয়েও বৈচিত্র্য ছিল। মোফাজ্জেল হুসাইন ছিলেন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব। মোল্লা আব্দুল ওয়াদুদ ছিলেন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সাবেক মহাব্যবস্থাপক। মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, ড. আসিফ নাইমুর রশিদ, মুহাম্মদ মাসরুরুল ইসলাম এবং লায়লা বিলকিস আরা ছিলেন আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের পেশাজীবী।
এই পরিবর্তন খুব দ্রুত হয়নি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও ড. আসিফ নাইমুর রশিদকে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর মোফাজ্জেল হুসাইন ও মুহাম্মদ মাসরুরুল ইসলামকে ১৫ ডিসেম্বর, মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাসকে ২৪ ডিসেম্বর, লায়লা বিলকিস আরাকে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি এবং তারিকুল ইসলামকে ১১ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে মোল্লা আব্দুল ওয়াদুদকে ১০ নভেম্বর নিয়োগ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ধাপে ধাপে পুনর্গঠিত হয়েছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে আগের বোর্ডের বেশ কয়েকজন সদস্যের জায়গায় নতুন সদস্যরা এসেছেন। এর ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ের বোর্ডের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ের বোর্ডের গঠনে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়।
এই সময়ের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ১৯৮৪ সালে বিসিএস অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টস, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স এবং অর্থ বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে তিনি বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) হন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের আর্থিক প্রশাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।
বিএনপি সরকারের সময়ে আবার চেয়ারম্যান পরিবর্তন
তবে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মেয়াদও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গত ২ মার্চ মুসলিম চৌধুরী সোনালি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। তবে তার পদত্যাগের ‘পেছনে চাপের’ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
মুসলিম চৌধুরীর পদত্যাগের পর সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান সাবেক সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তাকে গত বছরের ১০ মার্চ সোনালী ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল তাকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সরকারি তালিকায় বর্তমানে তাকে ‘চেয়ারম্যান, দায়িত্বপ্রাপ্ত’ অর্থাৎ ইনচার্জ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
মাহবুবুর রহমানের পাশাপাশি বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- মোফাজ্জেল হুসাইন, মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, মোল্লা আব্দুল ওয়াদুদ, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, ড. আসিফ নাইমুর রশিদ, তারিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ মাসরুরুল ইসলাম ও লায়লা বিলকিস আরা। অর্থাৎ বর্তমান বোর্ডের বড় একটি অংশই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের মধ্য থেকে এসেছেন। একই সঙ্গে নতুন চেয়ারম্যান যুক্ত হওয়ায় বোর্ডের নেতৃত্বে আবারও পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমান বোর্ডে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে রয়েছেন শওকত আলী খান। তিনি দীর্ঘদিনের পেশাদার ব্যাংকার। সোনালী ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগে তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এমডি ছিলেন। তার আগে রূপালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
ফলে বর্তমান বোর্ডের দিকে তাকালে একটি বিষয় দেখা যায়, সরকারের পরিবর্তনের পর সোনালী ব্যাংকের বোর্ডে একাধিক পর্যায়ে পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু পুরোপুরি নয়। একটি অংশ পরিবর্তিত হয়েছে, অন্য একটি অংশ বহাল থেকেছে এবং নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে। এতে বোর্ড পরিবর্তনের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও নতুন করে সাজানো হচ্ছে।
পরিচালনা পর্ষদ বদলের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচালনা পর্ষদে কোনো সদস্যের পেশাগত বা রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ব্যাংকের পরিচালক একই সঙ্গে কোনো ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের মালিক, পরিচালক বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি হলে তার সঙ্গে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ ধরনের সম্পর্কের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব ব্যাংকের কার্যক্রমের সঙ্গে জনগণের আমানত ও রাষ্ট্রীয় অর্থ সরাসরি জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচালকদের ব্যবসায়ীক পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবে দেখলে হয়। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালনের সময় তাদের মালিকানাধীন বা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো ঋণ, বিনিয়োগ, ঠিকাদারি বা অন্য কোনো ব্যবসায়ীক সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া পরিচালকদের ক্ষেত্রেও একইভাবে তাদের ব্যবসায়ীক স্বার্থ, কোম্পানির মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদে থাকা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকের বড় ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী চরচাকে বলেন, “একটা ব্যাংক পরিচালিত হয় তার পরিচালনা পর্ষদের দক্ষতার উপর ভিত্তি করে। তাই পরিচালনা পর্ষদকে অনেক দক্ষ ও যোগ্য হতে হয়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া পরিচালনা পর্ষদ যোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। তারা যেহেতু রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া সেহেতু তারা রাজনীতিবিদদের স্বার্থ বজায় রেখে কাজ করেন। অনেক সিদ্ধান্ত নেন যেগুলো ব্যাংকিং নীতি-নৈতিকতার সঙ্গে যায় না।”
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তনের বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন- এই বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বোর্ড বদলালে ব্যাংকের ক্ষতি কোথায়
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান দায়িত্ব হলো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার ওপর নজরদারি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণনীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে দিকনির্দেশনা দেওয়া। ফলে পরিচালনা পর্ষদে ঘন ঘন পরিবর্তন হলে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশেষ করে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের বড় অংশ বদলে যায়, তাহলে নতুন পরিচালনা পর্ষদকে আবার ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিও, ঝুঁকি, খেলাপি ঋণ, মূলধন পরিস্থিতি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়ীক পরিকল্পনা বুঝতে সময় দিতে হয়। এতে নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ যদি স্থিতিশীল না থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি ঋণনীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কোনো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা ঋণগ্রহীতার বিষয়ে বোর্ডের ওপর চাপ তৈরি হলে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। সোনালী ব্যাংকও এর বাইরে নয়। অতীতে হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ বড় ঋণ কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকটির নাম এসেছে। ফলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কতটা স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক, সেটি শুধু প্রশাসনিক প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে আমানতকারীর অর্থ ও দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও জড়িত।
মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “আমাদের এই কালচার থেকে বের হতে হবে। যারা যোগ্য তাদেরই পরিচালনা পর্ষদে নিয়ে আসা উচিত। এতে ক্ষমতাসীন দল হয়ত কিছু সমস্যায় পড়তে পারেন। অর্থাৎ তখন রাজনীতিবিদরা অবৈধ সুবিধা আদায় করতে পারবেন না। তবে ধীরে ধীরে এটার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নিতে হবে। এভাবেই ভালো কালচার তৈরি হবে। দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিরা এসব গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসবে।”