আবু-নওফেল-সাজিদ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার কয়েক দশকের উত্তেজনা বর্তমানে এক বিস্ফোরক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলছে। যদি সত্যিই যুদ্ধ বাধে, তবে দিনশেষে লাভবান হবে কে?
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধে জয়-পরাজয় কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না, বরং এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ হবে অনেক বেশি জটিল।
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ আরও উচ্চমাত্রায় গেলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিত্র ইসরায়েল নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারে। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। যুদ্ধের সুযোগে আমেরিকা যদি ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে সফল হামলা চালাতে পারে, তবে সেটি হবে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিজয়। তবে এর উল্টো পিঠও আছে; হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর রকেট হামলায় ইসরায়েলের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রাশিয়ার অবস্থা
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ‘লাভের গুড়’ সম্ভবত যাচ্ছে চীন ও রাশিয়ার ঘরে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত রাশিয়ার জন্য মূলধারার ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ এক আশীর্বাদ। এতে আমেরিকার মনোযোগ এবং সামরিক রসদ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরে গেছে। এতে ইউক্রেনে রাশিয়ার অবস্থান আরও শক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া তেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়ার অর্থনীতি লাভবান হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়ার চাওয়া হবে–এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হোক।
সংবাদ মাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ সংকট কমানোর জন্য নিয়ম শিথিল করায় ভারতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বিক্রি ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পাশাপাশি কিছু হিসাব অনুযায়ী, মার্চের শেষ নাগাদ মস্কো অতিরিক্ত ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে এবং ২০২২ সালের পর জ্বালানি খাত থেকে সর্বোচ্চ বার্ষিক আয়ের পথে রয়েছে দেশটি।
ফলে আমেরিকা উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিময়ে রাশিয়াকে একটি বিশাল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এর মাধ্যমে আরও অনেকের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
যেহেতু কিছু দেশ কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাই ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় রপ্তানিকারকদের জন্য এটি একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ, এই জ্বালানির দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
চীন কী করছে?
আমেরিকা যখন যুদ্ধে অর্থ ও শক্তি ক্ষয় করছে, চীন তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। আমেরিকান অর্থনীতি যুদ্ধের চাপে দুর্বল হলে বেইজিংয়ের জন্য বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসন দখল করা সহজ হবে।
পাশাপাশি সামরিক লাভও আছে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই জাপানসহ বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে গেছে আমেরিকা। এতে সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে তাইওয়ান। বিবদমান অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা আমেরিকা। কিন্তু সেই অঞ্চলও অরক্ষিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। বিশেষত চীনের আগ্রহের সামনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সহায়তা ছাড়া অঞ্চলটি রীতিমতো অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে।
তবে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে প্রবীণ মার্কিন কূটনীতিক নিকোলাস বার্নস জানান, ইরানকে কার্যকর কূটনৈতিক সমর্থন দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের সময় নীরব থেকে চীন একটি বড় বৈশ্বিক শক্তি হয়ে ওঠার দাবিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সাক্ষাৎকারে বার্নস আরও বলেন, “আমার মনে হয় ইরান এবং ভেনেজুয়েলা–উভয় দেশের কাছেই চীনকে এখন একজন ‘ফিকল ফ্রেন্ড’ বা বিভ্রান্ত বন্ধু বলে মনে হচ্ছে।”
বার্নস জানান, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওপর একটি ‘নির্ণায়ক প্রভাব’ ফেলেছে। এই যুদ্ধের কারণেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তার পরিকল্পিত শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত করতে হয়েছে।
যদিও এই যুদ্ধ এবং তার আগে ৩ জানুয়ারি মার্কিন অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মিত্র এবং শত্রু উভয় পক্ষ থেকেই ট্রাম্পের সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু চীন এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ইরানি তেলের ওপর চীনের বড় নির্ভরতা রয়েছে, যা দৈনিক ১৩ লাখ ব্যারেল। একইভাবে ভেনেজুয়েলাও ছিল তাদের সস্তা অপরিশোধিত তেলের অন্যতম উৎস। তা সত্ত্বেও সংকটের সময় চীনকে পাশে পাওয়া যায়নি।
সেন্টার ফর গ্লোবাল এনার্জি পলিসির তথ্যমতে, চীনের মোট তেল আমদানির মাত্র ১২ শতাংশ আসে ইরান থেকে। ফলে তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি কম। পাশাপাশি চীন ইতোমধ্যেই কয়েক মাসের ব্যবহারোপযোগী তেলের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। যদি প্রয়োজন হয়, চীন সহজেই রাশিয়ার কাছ থেকে বাড়তি তেল আমদানির দিকে ঝুঁকতে পারে।
এটা পশ্চিমা দুষ্টিভঙ্গি নিশ্চিতভাবে। কারণ, মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। চীন ও রাশিয়া–উভয় দেশ সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে দেশ দুটি চোখের কাজ করছে। চোখ বলতে, স্যাটেলাইট ডেটা দিয়ে সুনির্দিষ্ট স্থানে হামলা চালনায় সহায়তা করছে দুই দেশ। একইসঙ্গে তাজিকিস্তান সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর অভিযোগও আছে এ দুই দেশের বিরুদ্ধে। আর অভিযোগটি এসেছে পশ্চিম থেকেই।
যুক্তরাজ্যর অবস্থা
যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য এই হামলার সময়টা মোটেও ভালো ছিল না। সংবাদ মাধ্যম কনভারসেশনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, একটি মিসাইল ছোড়ার আগেই ২০২৬ সালের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির সরকারি পূর্বাভাস কমিয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। অন্যদিকে, মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে বলে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তা এখন অতি-আশাবাদ বলে মনে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ১৯ মার্চ সুদের হার কমানোর যে প্রত্যাশা ছিল, সে সম্ভাবনাও কমে গেছে।
তবে জ্বালানি খাতের ধাক্কাটা ছিল তাৎক্ষণিক। হরমুজ প্রণালীতে ট্যাঙ্কার চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ কাতার অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে খুব কম গ্যাস আমদানি করে। তবুও জ্বালানি বাজার যেহেতু বিশ্বব্যাপী পরস্পর নির্ভরশীল, তাই ব্রিটিশ পরিবারগুলোর বার্ষিক বিলে ৫০০ পাউন্ডের বেশি বাড়তি খরচ যোগ হতে পারে।
কনভারসেশন জানাচ্ছে, জ্বালানি সংকট ছাড়াও যুক্তরাজ্যের শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। পাশাপাশি পাউন্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের ২৩.৬ বিলিয়ন পাউন্ডের (চলমান বিনিময় হার অনুযায়ী ৩১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ‘ফিসকাল হেডরুম’ বা আর্থিক সক্ষমতা দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
তবে প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারের ক্ষেত্রে চিত্রটি আবার ভিন্ন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই লন্ডনের বিএই সিস্টেমসের শেয়ার প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমেরিকার অবস্থা
সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডিজ এক প্রতিবেদনে জানায়, মার্কিন কংগ্রেসে দাখিল করা দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনের ব্যয় হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবটি আগের প্রতিবেদনগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছিল প্রথম কয়েক দিনে যুদ্ধাস্ত্রের ব্যয় ছিল ৫.৬ বিলিয়ন ডলার। তবে এটি যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টার বিষয়ে দেওয়া পূর্ববর্তী বরাদ্দকৃত অর্থকে ছাড়িয়ে গেছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, যুদ্ধাস্ত্রের উচ্চ ব্যবহার সত্ত্বেও বর্তমান সংঘাত পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা দপ্তর তাৎক্ষণিক কোনো মজুত সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে না। তবে, মজুত কমে যাওয়া ঝুঁকি তৈরি করে, বিশেষ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউক্রেনের ক্ষেত্রে।
এর আগে ১০০ ঘণ্টার বরাদ্দকৃত অর্থের ক্ষেত্রে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, এই যুদ্ধের মোট ব্যয় নির্ভর করে কোন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের পর, যুদ্ধকালীন ক্ষতি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংস (প্রথম ছয় দিনে ১.৪ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ের পরবর্তী বৃহত্তম খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোর তুলনায় দৈনিক ব্যয় এখন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র টমাহক মিসাইল ব্যবহার করেছে, যা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিদ্যমান প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের সঙ্গে যুক্ত। এ মিসাইল ব্যবহার যুদ্ধ ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন স্বল্প পাল্লার কম দামি যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিরক্ষা দপ্তর কর্তৃক কংগ্রেসে দেওয়া এই হিসাবে সেভাবে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, এই মোট ব্যয়ের মধ্যে ‘প্রথম হামলার আগে সামরিক সরঞ্জাম এবং জনবল মোতায়েনের’ খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এতে কেবল অভিযানের বাজেট বহির্ভূত খরচগুলোই গণনা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
এরপর পরবর্তী প্রতিবেদনগুলো আরও নির্দেশ করে, ১১.৩ বিলিয়ন ডলারের এই পরিসংখ্যানে স্থাপনা মেরামত বা ক্ষয়ক্ষতি প্রতিস্থাপনের কোনো হিসাব অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
এই বরাদ্দকৃত অর্থ হোয়াইট হাউস দ্বারা পর্যালোচনা বা অনুমোদিত হয়েছে কি না, তাও স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউস এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয়ের বিষয়ে নীরব রয়েছে। ব্যয়ের খাতে কী কী অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে প্রায়ই ‘অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট’-এর সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতভেদ দেখা দেয়। যুদ্ধ এখন পঞ্চম সপ্তাহে রয়েছে এবং যা থেকে আন্দাজ করা যায়, আমেরিকার এই যুদ্ধে মজুতকৃত রসদ এবং অর্থের ওপর বেশ প্রভাব পড়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি এখন ১১৬ ডলার হয়েছে। যা যুদ্ধ শুরুর আগেও ৬০-৬৫ ডলারের কাছাকাছি ছিল। আমেরিকার স্থানীয় বাজারে তেলের দামের এই প্রভাবের চড়া মূল্য দিচ্ছে আমেরিকার নাগরিকেরা। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্ত তার নির্বাচন পূর্বকালীন ইশতেহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পাশাপাশি পশ্চিমা মিত্রদের সাহায্যও আসছে না ইরান যুদ্ধের এই সময়ে।
লাভের গুড় কি তবে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়–যেকোনো বড় যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী হয় গ্লোবাল ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি। লকহিড মার্টিন, বোয়িং বা রেথিয়নের মতো অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম যুদ্ধের ডামাডোলে হু হু করে বাড়ে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই লবিস্টদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। তাই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে লাভের একটি বড় অংশ এই করপোরেট জায়ান্টদের পকেটে যাবে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম দিনের হামলার পর লকহিড মার্টিন, নরথ্রপ গ্রামেন এবং আরটিএক্সের মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম ৪ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মাত্র একদিনেই এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের সম্মিলিত লাভের পরিমাণ ছিল ২৫-৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অপরদিকে, ইসরায়েলে এলবিট সিস্টেমস অল্প সময়ের জন্য দেশটির সবচেয়ে মূল্যবান তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পরিণত হইয়েছিল। জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে যখন এফটিএসই ১০০ সূচকের পতন ঘটছিল, তখন প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারগুলোর দাম উল্টো লাফিয়ে বাড়ছিল।
জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ মানেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা। বিশ্ববাজারের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়। এতে লাভবান হয় তেল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশগুলো (ওপেক প্লাস)। যদিও এবার এর সুযোগ তো দূর, ওপেক প্লাসভুক্ত প্রায় সব দেশ যুদ্ধের সংকটে পড়েছে। আক্রান্ত হওয়ায় তারা নিজেরাও পড়েছে শাঁখের করাতে। এর বাইরে হরমুজের সরাসরি প্রভাব পড়ে ইউরোপ এবং এশিয়ার অর্থনীতিতে। এবারও এর ব্যত্যয় হয়নি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বরাতে ডিপ্লোমেটের প্রতিবেদন জানানো হয়, বিশ্ব ইতোমধ্যেই প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে।
কিন্তু চাহিদা তো কমেনি। ফলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে সোমবার জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। অন্যদিকে আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে সিঙ্গাপুর ডিজেল বেঞ্চমার্কের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী ৯২.৫ ডলার থেকে বেড়ে ১৮০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এই সংকটের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এই অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো আমদানিকৃত হাইড্রোকার্বন, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সামুদ্রিক পথ এবং জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর প্রভাব কেবল ট্যাংকার রুট বা তেলের দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এই প্রভাব পেট্রোল পাম্প, বিদ্যুৎ বিল, পণ্য পরিবহন খরচ, মৎস্য শিল্প, সার এবং খাদ্যের ওপর গিয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংস্থার প্রতিবেদনে জানা গেছে, সারের বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ কেন্দ্রিক এই অস্থিরতা নাইট্রোজেন সারের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি চীন সম্প্রতি সার রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। এভাবেই একটি জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির সংকটে রূপ নেয়।

ডিপ্লোমেটের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সামাল দিতে ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে তাদের বাজেটে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের পথ খুঁজছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে মালয়েশিয়া তাদের পেট্রোল-ভর্তুকি প্রায় ১৭৫ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে।
ফিলিপাইন, যারা তাদের মোট তেলের ৯০ শতাংশেরও বেশি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করে, তারা কর্মসপ্তাহের সময় কমিয়ে এনেছে এবং জ্বালানি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া তারা সাময়িকভাবে পুরনো যানবাহন, জেনারেটর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সামুদ্রিক ব্যবহারের জন্য ‘ইউরো-টু’ জ্বালানি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
পাশাপাশি কম্বোডিয়ার ক্ষুদ্র বাজারগুলো কত দ্রুত স্থবির হয়ে পড়তে পারে, তা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। একটি পর্যায়ে দেশটির ৬ হাজার ৩০০টি পেট্রোল স্টেশনের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে জ্বালানি আসার পর এই হার ৫.৭৭ শতাংশে নেমে আসে।
অবশ্য মার্চের শুরুতে কম্বোডিয়ায় মালয়েশিয়ার রপ্তানি ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ভিয়েতনাম ‘ই-টেন’ গ্যাসোলিনের (এক ধরনের জৈব জ্বালানি) ব্যবহার বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর তাদের মজুত ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের জন্য ৬০ দিনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর মতো জ্বালানি মজুত রাখার নিয়ম। এর মধ্যে অন্তত ৩০ দিনের মজুত প্রকল্প এলাকায় (অন-সাইট) থাকতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে সরকারগুলো বিপদের মাত্রা বুঝতে পেরেছে। তবে এগুলো একই সাথে এটিও প্রকাশ করে যে, এই অঞ্চলটি দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়ে এখনো জরুরি সাময়িক ব্যবস্থার ওপরই বেশি নির্ভরশীল।
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের লাভের গুড় কোনো একক দেশ হয়তো পাবে না। কৌশলগতভাবে রাশিয়া ও চীন কিছুটা লাভবান হলেও মোটাদাগে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। তবে মাঝখান থেকে বলি হবে উন্নয়নশীল ও মধ্যসারির দেশগুলো।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার কয়েক দশকের উত্তেজনা বর্তমানে এক বিস্ফোরক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলছে। যদি সত্যিই যুদ্ধ বাধে, তবে দিনশেষে লাভবান হবে কে?
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধে জয়-পরাজয় কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না, বরং এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ হবে অনেক বেশি জটিল।
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ আরও উচ্চমাত্রায় গেলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিত্র ইসরায়েল নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারে। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। যুদ্ধের সুযোগে আমেরিকা যদি ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে সফল হামলা চালাতে পারে, তবে সেটি হবে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিজয়। তবে এর উল্টো পিঠও আছে; হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর রকেট হামলায় ইসরায়েলের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রাশিয়ার অবস্থা
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ‘লাভের গুড়’ সম্ভবত যাচ্ছে চীন ও রাশিয়ার ঘরে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত রাশিয়ার জন্য মূলধারার ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ এক আশীর্বাদ। এতে আমেরিকার মনোযোগ এবং সামরিক রসদ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরে গেছে। এতে ইউক্রেনে রাশিয়ার অবস্থান আরও শক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া তেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়ার অর্থনীতি লাভবান হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়ার চাওয়া হবে–এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হোক।
সংবাদ মাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ সংকট কমানোর জন্য নিয়ম শিথিল করায় ভারতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বিক্রি ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পাশাপাশি কিছু হিসাব অনুযায়ী, মার্চের শেষ নাগাদ মস্কো অতিরিক্ত ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে এবং ২০২২ সালের পর জ্বালানি খাত থেকে সর্বোচ্চ বার্ষিক আয়ের পথে রয়েছে দেশটি।
ফলে আমেরিকা উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিময়ে রাশিয়াকে একটি বিশাল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এর মাধ্যমে আরও অনেকের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
যেহেতু কিছু দেশ কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাই ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় রপ্তানিকারকদের জন্য এটি একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ, এই জ্বালানির দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
চীন কী করছে?
আমেরিকা যখন যুদ্ধে অর্থ ও শক্তি ক্ষয় করছে, চীন তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। আমেরিকান অর্থনীতি যুদ্ধের চাপে দুর্বল হলে বেইজিংয়ের জন্য বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসন দখল করা সহজ হবে।
পাশাপাশি সামরিক লাভও আছে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই জাপানসহ বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে গেছে আমেরিকা। এতে সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে তাইওয়ান। বিবদমান অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা আমেরিকা। কিন্তু সেই অঞ্চলও অরক্ষিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। বিশেষত চীনের আগ্রহের সামনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সহায়তা ছাড়া অঞ্চলটি রীতিমতো অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে।
তবে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে প্রবীণ মার্কিন কূটনীতিক নিকোলাস বার্নস জানান, ইরানকে কার্যকর কূটনৈতিক সমর্থন দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের সময় নীরব থেকে চীন একটি বড় বৈশ্বিক শক্তি হয়ে ওঠার দাবিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সাক্ষাৎকারে বার্নস আরও বলেন, “আমার মনে হয় ইরান এবং ভেনেজুয়েলা–উভয় দেশের কাছেই চীনকে এখন একজন ‘ফিকল ফ্রেন্ড’ বা বিভ্রান্ত বন্ধু বলে মনে হচ্ছে।”
বার্নস জানান, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওপর একটি ‘নির্ণায়ক প্রভাব’ ফেলেছে। এই যুদ্ধের কারণেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তার পরিকল্পিত শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত করতে হয়েছে।
যদিও এই যুদ্ধ এবং তার আগে ৩ জানুয়ারি মার্কিন অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মিত্র এবং শত্রু উভয় পক্ষ থেকেই ট্রাম্পের সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু চীন এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ইরানি তেলের ওপর চীনের বড় নির্ভরতা রয়েছে, যা দৈনিক ১৩ লাখ ব্যারেল। একইভাবে ভেনেজুয়েলাও ছিল তাদের সস্তা অপরিশোধিত তেলের অন্যতম উৎস। তা সত্ত্বেও সংকটের সময় চীনকে পাশে পাওয়া যায়নি।
সেন্টার ফর গ্লোবাল এনার্জি পলিসির তথ্যমতে, চীনের মোট তেল আমদানির মাত্র ১২ শতাংশ আসে ইরান থেকে। ফলে তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি কম। পাশাপাশি চীন ইতোমধ্যেই কয়েক মাসের ব্যবহারোপযোগী তেলের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। যদি প্রয়োজন হয়, চীন সহজেই রাশিয়ার কাছ থেকে বাড়তি তেল আমদানির দিকে ঝুঁকতে পারে।
এটা পশ্চিমা দুষ্টিভঙ্গি নিশ্চিতভাবে। কারণ, মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। চীন ও রাশিয়া–উভয় দেশ সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে দেশ দুটি চোখের কাজ করছে। চোখ বলতে, স্যাটেলাইট ডেটা দিয়ে সুনির্দিষ্ট স্থানে হামলা চালনায় সহায়তা করছে দুই দেশ। একইসঙ্গে তাজিকিস্তান সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর অভিযোগও আছে এ দুই দেশের বিরুদ্ধে। আর অভিযোগটি এসেছে পশ্চিম থেকেই।
যুক্তরাজ্যর অবস্থা
যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য এই হামলার সময়টা মোটেও ভালো ছিল না। সংবাদ মাধ্যম কনভারসেশনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, একটি মিসাইল ছোড়ার আগেই ২০২৬ সালের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির সরকারি পূর্বাভাস কমিয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। অন্যদিকে, মুদ্রাস্ফীতি কমতে পারে বলে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তা এখন অতি-আশাবাদ বলে মনে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ১৯ মার্চ সুদের হার কমানোর যে প্রত্যাশা ছিল, সে সম্ভাবনাও কমে গেছে।
তবে জ্বালানি খাতের ধাক্কাটা ছিল তাৎক্ষণিক। হরমুজ প্রণালীতে ট্যাঙ্কার চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ কাতার অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে খুব কম গ্যাস আমদানি করে। তবুও জ্বালানি বাজার যেহেতু বিশ্বব্যাপী পরস্পর নির্ভরশীল, তাই ব্রিটিশ পরিবারগুলোর বার্ষিক বিলে ৫০০ পাউন্ডের বেশি বাড়তি খরচ যোগ হতে পারে।
কনভারসেশন জানাচ্ছে, জ্বালানি সংকট ছাড়াও যুক্তরাজ্যের শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। পাশাপাশি পাউন্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের ২৩.৬ বিলিয়ন পাউন্ডের (চলমান বিনিময় হার অনুযায়ী ৩১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ‘ফিসকাল হেডরুম’ বা আর্থিক সক্ষমতা দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
তবে প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারের ক্ষেত্রে চিত্রটি আবার ভিন্ন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই লন্ডনের বিএই সিস্টেমসের শেয়ার প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমেরিকার অবস্থা
সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডিজ এক প্রতিবেদনে জানায়, মার্কিন কংগ্রেসে দাখিল করা দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনের ব্যয় হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবটি আগের প্রতিবেদনগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছিল প্রথম কয়েক দিনে যুদ্ধাস্ত্রের ব্যয় ছিল ৫.৬ বিলিয়ন ডলার। তবে এটি যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টার বিষয়ে দেওয়া পূর্ববর্তী বরাদ্দকৃত অর্থকে ছাড়িয়ে গেছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, যুদ্ধাস্ত্রের উচ্চ ব্যবহার সত্ত্বেও বর্তমান সংঘাত পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা দপ্তর তাৎক্ষণিক কোনো মজুত সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে না। তবে, মজুত কমে যাওয়া ঝুঁকি তৈরি করে, বিশেষ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউক্রেনের ক্ষেত্রে।
এর আগে ১০০ ঘণ্টার বরাদ্দকৃত অর্থের ক্ষেত্রে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, এই যুদ্ধের মোট ব্যয় নির্ভর করে কোন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের পর, যুদ্ধকালীন ক্ষতি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংস (প্রথম ছয় দিনে ১.৪ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ের পরবর্তী বৃহত্তম খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোর তুলনায় দৈনিক ব্যয় এখন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র টমাহক মিসাইল ব্যবহার করেছে, যা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিদ্যমান প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের সঙ্গে যুক্ত। এ মিসাইল ব্যবহার যুদ্ধ ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন স্বল্প পাল্লার কম দামি যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিরক্ষা দপ্তর কর্তৃক কংগ্রেসে দেওয়া এই হিসাবে সেভাবে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, এই মোট ব্যয়ের মধ্যে ‘প্রথম হামলার আগে সামরিক সরঞ্জাম এবং জনবল মোতায়েনের’ খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এতে কেবল অভিযানের বাজেট বহির্ভূত খরচগুলোই গণনা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
এরপর পরবর্তী প্রতিবেদনগুলো আরও নির্দেশ করে, ১১.৩ বিলিয়ন ডলারের এই পরিসংখ্যানে স্থাপনা মেরামত বা ক্ষয়ক্ষতি প্রতিস্থাপনের কোনো হিসাব অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
এই বরাদ্দকৃত অর্থ হোয়াইট হাউস দ্বারা পর্যালোচনা বা অনুমোদিত হয়েছে কি না, তাও স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউস এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয়ের বিষয়ে নীরব রয়েছে। ব্যয়ের খাতে কী কী অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে প্রায়ই ‘অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট’-এর সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতভেদ দেখা দেয়। যুদ্ধ এখন পঞ্চম সপ্তাহে রয়েছে এবং যা থেকে আন্দাজ করা যায়, আমেরিকার এই যুদ্ধে মজুতকৃত রসদ এবং অর্থের ওপর বেশ প্রভাব পড়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি এখন ১১৬ ডলার হয়েছে। যা যুদ্ধ শুরুর আগেও ৬০-৬৫ ডলারের কাছাকাছি ছিল। আমেরিকার স্থানীয় বাজারে তেলের দামের এই প্রভাবের চড়া মূল্য দিচ্ছে আমেরিকার নাগরিকেরা। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্ত তার নির্বাচন পূর্বকালীন ইশতেহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পাশাপাশি পশ্চিমা মিত্রদের সাহায্যও আসছে না ইরান যুদ্ধের এই সময়ে।
লাভের গুড় কি তবে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়–যেকোনো বড় যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী হয় গ্লোবাল ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি। লকহিড মার্টিন, বোয়িং বা রেথিয়নের মতো অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম যুদ্ধের ডামাডোলে হু হু করে বাড়ে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই লবিস্টদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। তাই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে লাভের একটি বড় অংশ এই করপোরেট জায়ান্টদের পকেটে যাবে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম দিনের হামলার পর লকহিড মার্টিন, নরথ্রপ গ্রামেন এবং আরটিএক্সের মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম ৪ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মাত্র একদিনেই এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের সম্মিলিত লাভের পরিমাণ ছিল ২৫-৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অপরদিকে, ইসরায়েলে এলবিট সিস্টেমস অল্প সময়ের জন্য দেশটির সবচেয়ে মূল্যবান তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পরিণত হইয়েছিল। জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে যখন এফটিএসই ১০০ সূচকের পতন ঘটছিল, তখন প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারগুলোর দাম উল্টো লাফিয়ে বাড়ছিল।
জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ মানেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা। বিশ্ববাজারের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়। এতে লাভবান হয় তেল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশগুলো (ওপেক প্লাস)। যদিও এবার এর সুযোগ তো দূর, ওপেক প্লাসভুক্ত প্রায় সব দেশ যুদ্ধের সংকটে পড়েছে। আক্রান্ত হওয়ায় তারা নিজেরাও পড়েছে শাঁখের করাতে। এর বাইরে হরমুজের সরাসরি প্রভাব পড়ে ইউরোপ এবং এশিয়ার অর্থনীতিতে। এবারও এর ব্যত্যয় হয়নি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বরাতে ডিপ্লোমেটের প্রতিবেদন জানানো হয়, বিশ্ব ইতোমধ্যেই প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে।
কিন্তু চাহিদা তো কমেনি। ফলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে সোমবার জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। অন্যদিকে আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে সিঙ্গাপুর ডিজেল বেঞ্চমার্কের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী ৯২.৫ ডলার থেকে বেড়ে ১৮০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এই সংকটের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এই অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো আমদানিকৃত হাইড্রোকার্বন, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সামুদ্রিক পথ এবং জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর প্রভাব কেবল ট্যাংকার রুট বা তেলের দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এই প্রভাব পেট্রোল পাম্প, বিদ্যুৎ বিল, পণ্য পরিবহন খরচ, মৎস্য শিল্প, সার এবং খাদ্যের ওপর গিয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংস্থার প্রতিবেদনে জানা গেছে, সারের বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ কেন্দ্রিক এই অস্থিরতা নাইট্রোজেন সারের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি চীন সম্প্রতি সার রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। এভাবেই একটি জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির সংকটে রূপ নেয়।

ডিপ্লোমেটের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সামাল দিতে ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে তাদের বাজেটে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের পথ খুঁজছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে মালয়েশিয়া তাদের পেট্রোল-ভর্তুকি প্রায় ১৭৫ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে।
ফিলিপাইন, যারা তাদের মোট তেলের ৯০ শতাংশেরও বেশি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করে, তারা কর্মসপ্তাহের সময় কমিয়ে এনেছে এবং জ্বালানি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া তারা সাময়িকভাবে পুরনো যানবাহন, জেনারেটর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সামুদ্রিক ব্যবহারের জন্য ‘ইউরো-টু’ জ্বালানি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
পাশাপাশি কম্বোডিয়ার ক্ষুদ্র বাজারগুলো কত দ্রুত স্থবির হয়ে পড়তে পারে, তা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। একটি পর্যায়ে দেশটির ৬ হাজার ৩০০টি পেট্রোল স্টেশনের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে জ্বালানি আসার পর এই হার ৫.৭৭ শতাংশে নেমে আসে।
অবশ্য মার্চের শুরুতে কম্বোডিয়ায় মালয়েশিয়ার রপ্তানি ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ভিয়েতনাম ‘ই-টেন’ গ্যাসোলিনের (এক ধরনের জৈব জ্বালানি) ব্যবহার বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর তাদের মজুত ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের জন্য ৬০ দিনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর মতো জ্বালানি মজুত রাখার নিয়ম। এর মধ্যে অন্তত ৩০ দিনের মজুত প্রকল্প এলাকায় (অন-সাইট) থাকতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে সরকারগুলো বিপদের মাত্রা বুঝতে পেরেছে। তবে এগুলো একই সাথে এটিও প্রকাশ করে যে, এই অঞ্চলটি দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়ে এখনো জরুরি সাময়িক ব্যবস্থার ওপরই বেশি নির্ভরশীল।
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের লাভের গুড় কোনো একক দেশ হয়তো পাবে না। কৌশলগতভাবে রাশিয়া ও চীন কিছুটা লাভবান হলেও মোটাদাগে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। তবে মাঝখান থেকে বলি হবে উন্নয়নশীল ও মধ্যসারির দেশগুলো।

সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পেট্রোল পাম্পে অযথা ভিড় না করার আহ্বান জানিয়েছেন। সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি এবং সরবরাহও কমানো হয়নি। ফলে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের কোনো যৌক্তিকতা নেই।