Advertisement Banner

আমাদের কাজ তাইজুলকে কেন করতে হচ্ছে?

আমাদের কাজ তাইজুলকে কেন করতে হচ্ছে?
কন্টেন্ট ক্রিয়েটর তাইজুল ইসলাম।

কুড়িগ্রামে নারায়ণপুরের তাইজুলকে নিয়ে হাসিতামাশা অনেক হয়েছে। অনেকে তাকে পাকিস্তানের সাংবাদিক চাঁদ নবাবের সঙ্গে তুলনা করছেন, ওই যে ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ সিনেমায় যাকে অনুকরণ করেছিলেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী। কিন্তু আমাদের তাইজুলের সঙ্গে করাচির চাঁদ নবাবের তুলনা চলে না। তুলনা করে তাইজুলের বক্তব্যকে আড়াল করা হয়ে যায়, তাকে হাসির পাত্র করে তোলা হয়। আসলে তাইজুল একজন হুইসেলব্লোয়ার।

হুইসেলব্লোয়ার কেন? তাইজুল কি চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিল না মূলধারার গণমাধ্যম প্রান্তিক মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী ঠিকঠাক কাজ করছে না? গণমাধ্যমের কর্মী হিসেবে জানি, আজকাল প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যাগুলো নিয়ে নিউজ প্রায় হয় না বললেই চলে। অনেক সময় খবর আসে, কিন্তু বড় কোনো ঘটনায় সেগুলো চাপা পড়ে যায়। রাস্তা নেই, সেতু নেই, বিদ্যুৎ নেই, স্কুল নেই, সুপেয় পানি নেই…। শহরের ভদ্রলোকরা এসব নিউজ আর খায় না। সুতরাং সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর কথা সেভাবে আর পৌঁছায় না দেশের কেন্দ্রে।

এখানেই তাইজুল একজন হুইসেলব্লোয়ার। তিনি নিজেকে কখনো সাংবাদিক দাবি করেননি। তিনি শুধু তার এলাকার সমস্যাগুলোর কথা সবার সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি যখন দেখলেন, তার এলাকার বিবিধ সমস্যার কথা কেউ তুলে ধরছেন না, তখন তিনিই হাতে তুলে নিলেন মাইক ও মোবাইলফোন ক্যামেরা। পরিপাটি হয়ে ‘অসাংবাদিক’ ভাষায় সমস্যাগুলো সামনে নিয়ে আসতে থাকলেন। আমরা কী করলাম? তার চেষ্টা ও উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললাম, তার উপস্থাপনের ভুলত্রুটি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। একে বলে ‘রেড হেরিং ফ্যালাসি’-মূল ঘটনাকে দাবিয়ে ভিন্ন আলোচনা টেনে আনা।

তাইজুলের মিল বরং পাওয়া যায় রাশিয়ার কারাবাশ প্রাইমারি স্কুলের কর্মচারী পাভেল তালানকিনের সঙ্গে। তিনি স্কুলের হয়ে সবকিছুর ভিডিও ধারণ করতেন। সাংবাদিক ছিলেন না। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে বসলে রাতারাতি তালানকিনের ভূমিকা বদলে যায়। স্কুলগুলোর ওপর সরকারি আদেশ নেমে আসে, স্কুলগুলো হয়ে ওঠে রুশ সরকারের আদর্শিক ফ্রন্টলাইন। তালানকিনকে বলা হয় স্কুলের সব ধরনের ঘটনা যেন গুরুত্বের সঙ্গে ভিডিও করা হয়। তিনি তা মনে না নিলেও, মেনে নিতে বাধ্য হন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের স্কুল পরিদর্শন এবং প্রোপাগান্ডামূলক পাঠদানের নানা চিত্র নথিভুক্ত করতে থাকেন তিনি।

তালানকিন শাপকে বর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ধারণ করলেন, নিয়মিত পড়াশোনার বদলে বাইরের লোকজন এসে শিশুদের গ্রেনেড ছোড়ার কৌশল শেখাচ্ছে, স্কুল শিক্ষার্থীরা সরকারের সামরিক অভিযানের স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে পড়ছে, শিক্ষকরা যুদ্ধ নিয়ে রাষ্ট্র নির্ধারিত রচনা মুখস্থ বলছেন, চাপিয়ে দেওয়া বয়ান শিশু ও শিক্ষকরা বিরক্তি নিয়ে শুনছেন, অন্যদিকে কিছু শিক্ষক অতি-উৎসাহী হয়ে সরকারের নিয়মগুলো মেনে চলছেন। এক সময় এই ভিডিও ফুটেজগুলো দেশের বাইরের সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের হাতে পৌঁছায়।

এসবের সত্যতা যাচাই করে নির্মিত হয় ‘মিস্টার নোবডি অ্যাগেইনস্ট পুতিন’ শিরোনামের একটি অনন্য তথ্যচিত্র, যা ২০২৬ সালে শ্রেষ্ঠ ডকুমেন্টারি ফিচার ফিল্ম বিভাগে অস্কার অর্জন করে। তথ্যচিত্রটি ডেভিড বোরেনস্টেইনের সঙ্গে সহ-পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন তালানকিন। তালানকিনও কিন্তু যা দেখতেন, তাই ক্যামেরাবন্দী করতেন। তার কাজ নিয়েও হয়তো হাসাহাসি হতো। তবুও তিনি দমে যাননি। তার কাজ এখন ইতিহাসের অংশ, তাকে বলা হচ্ছে হুইসেলব্লোয়ার।

দেশের মানুষের যতটা বিরোধিতা তাইজুল পেয়েছেন, তালানকিন সম্ভবত ততটা পাননি। নেটদুনিয়ায় তাইজুলকে বর্ণবৈষম্য ও বডিশেমিংয়েরও শিকার হতে দেখলাম। আচ্ছা, এই বিরোধিতা কি নিছক আমাদের স্বভাবগত, নাকি এর পেছনে রাজনীতিও রয়েছে? তাইজুল তো পরোক্ষভাবে বলছেন, উন্নয়নের দিকে সরকারের নজর নেই এবং সরকারের ব্যর্থতা ধরিয়ে দিতে মূলধারার সাংবাদিকতা ব্যর্থ। আর এ জন্যই কি তাইজুল সহজ শিকারে পরিণত হয়েছেন?

আমরা কি ভুলে গেলাম? গত বেশ কয়েক বছর ধরে কিন্তু বড় বড় ঘটনার খবর আমাদের জানিয়েছেন এই তাইজুলরাই, যাকে আমরা ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বলি। তাইজুলদের সাংবাদিকতার মাপকাঠি দিয়ে পরিমাপ করলে কি হবে? তাকে নানা প্রশ্নের মুখে ফেলে কোনো লাভ আছে? নাকি সময় এসেছে নিজেদের প্রশ্ন করার? আমাদের কাজ তাইজুলকে কেন করতে হচ্ছে? আমরা কেন পারলাম না? সাংবাদিকতা নিয়ে কি আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে?

তথ্যসূত্র: জিআইজেএন, দ্য ইন্ডেপেন্ডেন্ট (ইউকে), এপি নিউজ

সম্পর্কিত