দিমিত্রি এভস্তাফিয়েভ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আবার গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রসঙ্গ তোলেন তখন সেটি কথার কথা থাকে না। তবে মাত্র এক মাস আগেও বিষয়টি প্রায় ভুলে যাওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। তখন ইউরোপে এটিকে আর নিছক ‘নাটক’ হিসেবে দেখা হয়নি। আর এখন বিষয়টি শুধু ‘মাদুরো এফেক্ট’-এর সঙ্গেই যুক্ত নয়। ট্রাম্পের উসকানিমূলক বক্তব্যের আড়ালে একটি স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক কৌশল ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। যাকে বলা যেতে পারে ‘নতুন বৈশ্বিকতা’ (new globalism)। এই ধারণাটি প্রচলিত বৈশ্বিয়ানের (যেমন যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক বৈশ্বিয়ান) চেয়েও অনেক বেশি অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়ানো।
ট্রাম্পের ‘নতুন বৈশ্বিকতা’ তিনটি পরস্পর যুক্ত উপাদানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে:
১) মনরো নীতির নতুন ব্যাখ্যা–(এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে–ট্রাম্প কি ফিলিপাইনকেও এই ‘গ্রেটার আমেরিকা’-র অংশ মনে করেন?)
২) যুক্তরাষ্ট্রকে একটি জ্বালানি সুপারপাওয়ারে রূপান্তর করা, যা হাইড্রোকার্বন বাজারে–বিশেষ করে আঞ্চলিক বাণিজ্যের নিয়মগুলো একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।
৩) যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক সুপারপাওয়ার হিসেবে অবস্থান জোরদার করা–যে অবস্থানটি বর্তমানে কেবল নামমাত্র বিদ্যমান।
ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলো আসলে তার হিসেবে বেশ যুক্তিসংগত। নিকোলাস মাদুরোর শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে লাতিন আমেরিকার সম্পদকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উৎসে পরিণত করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটিই ট্রাম্পের ‘নতুন বৈশ্বিকতা’-র জগতে প্রবেশের টিকিট। ভেনেজুয়েলার (এবং ভবিষ্যতে ব্রাজিল ও ইরানের) তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং যত দ্রুত সম্ভব ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নির্মূল না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই জ্বালানি সুপারপাওয়ার হতে পারে না। একইভাবে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর পূর্ণ আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রকৃত আর্কটিক শক্তিতে রূপান্তরের জন্য অপরিহার্য। তা না হলে ২০৩০ সালের পর জ্বালানি সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিকল্প একটা দীর্ঘমেয়াদি পথ ছিল, তা হলো আলাস্কাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কর্মসূচি নেওয়া। কিন্তু এতে বছর নয়, দশক লেগে যেত। তারচেয়ে গ্রিনল্যান্ড দ্রুত একটি নতুন রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থান সুদৃঢ় করার সুযোগ এনে দেয়।
ট্রাম্প পদ্ধতি মেনেই এগোচ্ছেন। তিনি তার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করছেন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা বিবেচনা করে। স্পষ্টতই তার ধারণা, ইউরোপ এখন এতটাই দুর্বল যে ২০২৫ সালের বসন্তে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যেভাবে তাকে পিছু হটতে হয়েছিল, এখন আর তেমনটা সম্ভব না। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ট্রাম্প নিজেই এর ইঙ্গিত দেন। গ্রিনল্যান্ড বা ডেনমার্কের কাছে যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে কি না–এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আপনি জানেন ওদের প্রতিরক্ষা কী? দুটো কুকুরের স্লেজ।” এরপর তিনি যোগ করেন, অথচ রাশিয়া ও চীনের ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিন “চারদিকে (আর্কটিকে) ছড়িয়ে আছে।”
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্প সরাসরি ন্যাটোর অক্ষমতার কথা তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ন্যাটো দ্বীপটিকে বাইরের হুমকি থেকে রক্ষা করতে পারে না। অর্থাৎ ট্রাম্পের বার্তা স্পষ্ট: যেসব ‘সম্পদ’ দুর্বলভাবে সুরক্ষিত, সেগুলো তিনি পুনরুদ্ধার করতে চান।
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ধারণায় ট্রাম্পের এই কথা ইউরোপীয় নেতাদের ব্যর্থতার ফলও হতে পারে। তারা ইউরোপের নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত–এমন দাবি করলেও, সামান্য আকারের একটি ‘ইচ্ছুকদের জোট’ পর্যন্ত গঠন করতে পারেনি। প্রস্তাবিত দু লাখ সেনার বাহিনী ছয় মাসের মধ্যেই নেমে আসে মাত্র ৪০ হাজারে। এবং বাস্তবে ইউরোপীয়রা এমন একটি বাহিনীও গঠন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ফলে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের যেকোনো যৌথ উদ্যোগ ট্রাম্পকে খুব একটা প্রভাবিত করবে না।
নিজেদের সামরিক দুর্বলতা উপলব্ধি করা ইউরোপীয়দের ভীষণভাবে অস্থির করে তুলেছে। ইউরোপের বড় দেশগুলো হয়তো গ্রিনল্যান্ড ছেড়ে দিতেও রাজি হতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প যদি সফল হন, তাহলে এই দেশগুলো কার্যত তার ‘সম্পদে’ পরিণত হবে। তারা ন্যাটোর ভেতরেও নিজেদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হারাবে–যে ন্যাটোকে একসময় ‘সমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জোট’ হিসেবে দেখা হতো। উপরন্তু, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে অভিযান সফল হলে ট্রাম্প ও কানাডার মাঝে আর কোনো বাধাই থাকবে না।
তাহলে ইউরোপ কীভাবে আমেরিকার ‘নতুন বৈশ্বিকতা’-র মোকাবিলা করতে পারে? আগেই বলা হয়েছে, সামরিক বিকল্পগুলো ইউরোপীয় রাজনীতিকদের বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যার লক্ষ্য মূলত ঘরোয়া জনমত গঠন। কিন্তু ব্রিটিশ মিডিয়ায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা দেখাচ্ছে, এই কৌশলও কার্যকারিতা হারাচ্ছে। রাজনৈতিক পথই ইউরোপের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এখানেও বিকল্প খুব সীমিত।
ইউরো-আটলান্টিক সংহতির ওপর বড় আশা রাখা হয়েছিল। ন্যাটোর পরামর্শ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ট্রাম্পকে ‘সংখ্যায় হারিয়ে দেওয়ার’ চিন্তা করা হয়েছিল। যেমনটা ইউক্রেন ইস্যুতে দেখা গেছে। কিন্তু ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি যেকোনো আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেবেন। তবুও ইউরোপীয় নেতারা ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ পড়ার আহ্বান জানাতে পারেন। কিন্তু তারা যদি সে পথে যান, তবে সেটি হবে ন্যাটোর শেষের শুরু। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনা–যা মূলত ন্যাটোর একটি সদস্য রাষ্ট্র, তাও আবার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের, ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্ন–এটাই ন্যাটোর মূল নীতিকেই ভেঙে দেবে। সেই নীতি হলো: বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলার পাশাপাশি জোটের অভ্যন্তরীণ ভূরাজনৈতিক অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং সব অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি দূর করা।
তুলনামূলকভাবে ফলপ্রসূ পথ হতে পারে, যদি গ্রিনল্যান্ডের মর্যাদা নিয়ে ট্রাম্পকে কোনো ‘মধ্যপন্থী’ সমাধানের দিকে ঠেলে দেওয়া। যেমন দ্বীপটির ওপর একটি মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠা। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন যে তিনি কেবল সরাসরি সংযুক্তিতেই আগ্রহী। তবু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই বিকল্প বাস্তবসম্মত হতে পারে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প কীভাবে পরিস্থিতি সামলেছেন, তা দেখলেই বোঝা যায়। ‘সংঘাতের দ্বিতীয় ধাপ’-এর জন্য প্রস্তুতির কথা বলার পর, তিনি দ্রুত সুর বদলান এবং ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে আলোচনায় বসেন, যখন তিনি বুঝতে পারেন যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব এবং শাসনব্যবস্থা আমেরিকাপন্থী ও চীনবিরোধী পথে এগোবে। গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও অনুরূপ দৃশ্যপট তৈরি হতে পারে।
তারপরেও এটি সম্ভব হবে যদি ইউরোপীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে প্রভাবশালী মিত্র খুঁজে পান এবং মার্কিন প্রশাসনের মনোযোগ অন্য সংকটে সরে যায়। ট্রাম্পের একটি বৈশিষ্ট্যও অবহেলা করা উচিত নয়। তিনি সাময়িকভাবে পিছু হটতে পারেন, কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই আবার বিষয়টি সামনে আনতে দ্বিধা করেন না।
দিমিত্রি এভস্তাফিয়েভ: মিডিয়া ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়
(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে।)

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আবার গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রসঙ্গ তোলেন তখন সেটি কথার কথা থাকে না। তবে মাত্র এক মাস আগেও বিষয়টি প্রায় ভুলে যাওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। তখন ইউরোপে এটিকে আর নিছক ‘নাটক’ হিসেবে দেখা হয়নি। আর এখন বিষয়টি শুধু ‘মাদুরো এফেক্ট’-এর সঙ্গেই যুক্ত নয়। ট্রাম্পের উসকানিমূলক বক্তব্যের আড়ালে একটি স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক কৌশল ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। যাকে বলা যেতে পারে ‘নতুন বৈশ্বিকতা’ (new globalism)। এই ধারণাটি প্রচলিত বৈশ্বিয়ানের (যেমন যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক বৈশ্বিয়ান) চেয়েও অনেক বেশি অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়ানো।
ট্রাম্পের ‘নতুন বৈশ্বিকতা’ তিনটি পরস্পর যুক্ত উপাদানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে:
১) মনরো নীতির নতুন ব্যাখ্যা–(এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে–ট্রাম্প কি ফিলিপাইনকেও এই ‘গ্রেটার আমেরিকা’-র অংশ মনে করেন?)
২) যুক্তরাষ্ট্রকে একটি জ্বালানি সুপারপাওয়ারে রূপান্তর করা, যা হাইড্রোকার্বন বাজারে–বিশেষ করে আঞ্চলিক বাণিজ্যের নিয়মগুলো একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।
৩) যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক সুপারপাওয়ার হিসেবে অবস্থান জোরদার করা–যে অবস্থানটি বর্তমানে কেবল নামমাত্র বিদ্যমান।
ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলো আসলে তার হিসেবে বেশ যুক্তিসংগত। নিকোলাস মাদুরোর শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে লাতিন আমেরিকার সম্পদকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উৎসে পরিণত করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটিই ট্রাম্পের ‘নতুন বৈশ্বিকতা’-র জগতে প্রবেশের টিকিট। ভেনেজুয়েলার (এবং ভবিষ্যতে ব্রাজিল ও ইরানের) তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং যত দ্রুত সম্ভব ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নির্মূল না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই জ্বালানি সুপারপাওয়ার হতে পারে না। একইভাবে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর পূর্ণ আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রকৃত আর্কটিক শক্তিতে রূপান্তরের জন্য অপরিহার্য। তা না হলে ২০৩০ সালের পর জ্বালানি সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিকল্প একটা দীর্ঘমেয়াদি পথ ছিল, তা হলো আলাস্কাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কর্মসূচি নেওয়া। কিন্তু এতে বছর নয়, দশক লেগে যেত। তারচেয়ে গ্রিনল্যান্ড দ্রুত একটি নতুন রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থান সুদৃঢ় করার সুযোগ এনে দেয়।
ট্রাম্প পদ্ধতি মেনেই এগোচ্ছেন। তিনি তার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করছেন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা বিবেচনা করে। স্পষ্টতই তার ধারণা, ইউরোপ এখন এতটাই দুর্বল যে ২০২৫ সালের বসন্তে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যেভাবে তাকে পিছু হটতে হয়েছিল, এখন আর তেমনটা সম্ভব না। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ট্রাম্প নিজেই এর ইঙ্গিত দেন। গ্রিনল্যান্ড বা ডেনমার্কের কাছে যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে কি না–এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আপনি জানেন ওদের প্রতিরক্ষা কী? দুটো কুকুরের স্লেজ।” এরপর তিনি যোগ করেন, অথচ রাশিয়া ও চীনের ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিন “চারদিকে (আর্কটিকে) ছড়িয়ে আছে।”
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্প সরাসরি ন্যাটোর অক্ষমতার কথা তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ন্যাটো দ্বীপটিকে বাইরের হুমকি থেকে রক্ষা করতে পারে না। অর্থাৎ ট্রাম্পের বার্তা স্পষ্ট: যেসব ‘সম্পদ’ দুর্বলভাবে সুরক্ষিত, সেগুলো তিনি পুনরুদ্ধার করতে চান।
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ধারণায় ট্রাম্পের এই কথা ইউরোপীয় নেতাদের ব্যর্থতার ফলও হতে পারে। তারা ইউরোপের নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত–এমন দাবি করলেও, সামান্য আকারের একটি ‘ইচ্ছুকদের জোট’ পর্যন্ত গঠন করতে পারেনি। প্রস্তাবিত দু লাখ সেনার বাহিনী ছয় মাসের মধ্যেই নেমে আসে মাত্র ৪০ হাজারে। এবং বাস্তবে ইউরোপীয়রা এমন একটি বাহিনীও গঠন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ফলে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের যেকোনো যৌথ উদ্যোগ ট্রাম্পকে খুব একটা প্রভাবিত করবে না।
নিজেদের সামরিক দুর্বলতা উপলব্ধি করা ইউরোপীয়দের ভীষণভাবে অস্থির করে তুলেছে। ইউরোপের বড় দেশগুলো হয়তো গ্রিনল্যান্ড ছেড়ে দিতেও রাজি হতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প যদি সফল হন, তাহলে এই দেশগুলো কার্যত তার ‘সম্পদে’ পরিণত হবে। তারা ন্যাটোর ভেতরেও নিজেদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হারাবে–যে ন্যাটোকে একসময় ‘সমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জোট’ হিসেবে দেখা হতো। উপরন্তু, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে অভিযান সফল হলে ট্রাম্প ও কানাডার মাঝে আর কোনো বাধাই থাকবে না।
তাহলে ইউরোপ কীভাবে আমেরিকার ‘নতুন বৈশ্বিকতা’-র মোকাবিলা করতে পারে? আগেই বলা হয়েছে, সামরিক বিকল্পগুলো ইউরোপীয় রাজনীতিকদের বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যার লক্ষ্য মূলত ঘরোয়া জনমত গঠন। কিন্তু ব্রিটিশ মিডিয়ায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা দেখাচ্ছে, এই কৌশলও কার্যকারিতা হারাচ্ছে। রাজনৈতিক পথই ইউরোপের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এখানেও বিকল্প খুব সীমিত।
ইউরো-আটলান্টিক সংহতির ওপর বড় আশা রাখা হয়েছিল। ন্যাটোর পরামর্শ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ট্রাম্পকে ‘সংখ্যায় হারিয়ে দেওয়ার’ চিন্তা করা হয়েছিল। যেমনটা ইউক্রেন ইস্যুতে দেখা গেছে। কিন্তু ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি যেকোনো আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেবেন। তবুও ইউরোপীয় নেতারা ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ পড়ার আহ্বান জানাতে পারেন। কিন্তু তারা যদি সে পথে যান, তবে সেটি হবে ন্যাটোর শেষের শুরু। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনা–যা মূলত ন্যাটোর একটি সদস্য রাষ্ট্র, তাও আবার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের, ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্ন–এটাই ন্যাটোর মূল নীতিকেই ভেঙে দেবে। সেই নীতি হলো: বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলার পাশাপাশি জোটের অভ্যন্তরীণ ভূরাজনৈতিক অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং সব অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি দূর করা।
তুলনামূলকভাবে ফলপ্রসূ পথ হতে পারে, যদি গ্রিনল্যান্ডের মর্যাদা নিয়ে ট্রাম্পকে কোনো ‘মধ্যপন্থী’ সমাধানের দিকে ঠেলে দেওয়া। যেমন দ্বীপটির ওপর একটি মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠা। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন যে তিনি কেবল সরাসরি সংযুক্তিতেই আগ্রহী। তবু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই বিকল্প বাস্তবসম্মত হতে পারে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প কীভাবে পরিস্থিতি সামলেছেন, তা দেখলেই বোঝা যায়। ‘সংঘাতের দ্বিতীয় ধাপ’-এর জন্য প্রস্তুতির কথা বলার পর, তিনি দ্রুত সুর বদলান এবং ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে আলোচনায় বসেন, যখন তিনি বুঝতে পারেন যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব এবং শাসনব্যবস্থা আমেরিকাপন্থী ও চীনবিরোধী পথে এগোবে। গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও অনুরূপ দৃশ্যপট তৈরি হতে পারে।
তারপরেও এটি সম্ভব হবে যদি ইউরোপীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে প্রভাবশালী মিত্র খুঁজে পান এবং মার্কিন প্রশাসনের মনোযোগ অন্য সংকটে সরে যায়। ট্রাম্পের একটি বৈশিষ্ট্যও অবহেলা করা উচিত নয়। তিনি সাময়িকভাবে পিছু হটতে পারেন, কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই আবার বিষয়টি সামনে আনতে দ্বিধা করেন না।
দিমিত্রি এভস্তাফিয়েভ: মিডিয়া ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়
(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে।)

‘উইন্টার ইজ কামিং’–কী পরিচিত লাগছে? ‘গেম অব থ্রোনস’-এর ভক্তকূল নিশ্চয় চিনতে পারছেন? অনেক দৃশ্য নিশ্চয় মনে আসছে? আসাটাই স্বাভাবিক। উইন্টারফলের সবচেয়ে উচ্চারিত সতর্কবার্তা এটি। তারপর তো কত জল গড়াল। সত্যি সত্যি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যখন তুঙ্গে উঠল দর্শকদের কাছে ধীরে স্পষ্ট হলো–শীতের আগমন বার্তা কেন সতর্ক সং