হারারে থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরে মাজোয়ে নদী উপত্যকায় গেলেই দেখা যায় সোনার সন্ধানে এক ধরনের উন্মাদনা। পাহাড়ের গাঘেঁষে খননযন্ত্র দিয়ে এমনভাবে খুঁড়ে ফেলা হয়েছে যেন কোনো বাক্স থেকে আইসক্রিম তুলে নেওয়া হয়েছে। পাইপের মাধ্যমে নদীর পানি ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ক্ষুদ্র খনি শ্রমিকদের ওয়াশিং স্টেশনে। পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে নদীটি এখন শুকিয়ে একটি কাদাভর্তি পুকুরে পরিণত হয়েছে।
এই সোনার উন্মাদনার প্রভাব মাজোয়ের বাইরেও দৃশ্যমান। খামার দখল এবং অতি-মুদ্রাস্ফীতির ইতিহাসের কারণে জিম্বাবুয়েকে দীর্ঘকাল একটি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু দেশটি এখন এক বিচিত্র সমৃদ্ধি উপভোগ করছে। সোনা এবং অন্যান্য পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে এর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ উপচে পড়ছে। ফলে কর্তৃপক্ষের পক্ষে টাকা ছাপানো এবং মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ বন্ধ করা সহজ হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি এখন গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আইএমএফ দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বারবার বৃদ্ধি করছে। যা ২০২৫ সালের জন্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আফ্রিকার গড় প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।
তবে জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি বাইরের মানুষের ধারণার চেয়ে ভালো চললেও এর রাজনীতি আগের মতোই কলুষিত রয়েছে। ৮৩ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগওয়া তার পূর্বসূরি রবার্ট মুগাবের পথ অনুসরণ করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করছেন।
সোনার ওপর দাঁড়িয়ে ইতিহাস
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন বলা হয়, সোনা জিম্বাবুয়ের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রিটিশ ব্যবসায়ী সেসিল রোডস এই অঞ্চলটি (একসময় তার নামানুসারে রোডেশিয়া ছিল) দখল করেছিলেন কিংবদন্তি ‘অফির’-এর সন্ধানে। যাকে অনেকে রাজা সলোমনের সোনার উৎস বলে মনে করত। রোডেশীয়রা তেমন কিছু না পেলেও, ১৯৮০ সালে স্বাধীন হওয়া জিম্বাবুয়েতে সোনা এখন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালে দেশটি রেকর্ড ৪৭ টন সোনা উৎপাদন করেছে। যা এক দশক আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। পাচার বিবেচনায় নিলে প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি। বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের অস্থিরতার কারণে সোনার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এর দাম গত পাঁচ বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। যার ফলে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। যা মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেক। খনিতে বিনিয়োগকারী ভিক্টর গাপেরে বলেন, “আমরা কখনও এমন দাম কল্পনা করিনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ।”
তবে এর নেতিবাচক প্রভাবও অনেক। কারিগর খনি শ্রমিকরা পারদ এবং সায়ানাইড ব্যবহার করছে, যা পানীয় এবং সেচের পানিতে মিশছে। সোনার উচ্চমূল্য পাচারকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে, যাদের সাথে বড় রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানগাগওয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রেও তার কথিত সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছে।
নগদ অর্থের প্রবাহ ও কালোবাজার
খনি থেকে আসা আয়ের একটি অংশ সাধারণ জিম্বাবুয়েবাসীদের পকেটে যাচ্ছে যারা কারিগর হিসেবে কাজ করে। তারা মাসে কয়েকশ মার্কিন ডলার আয় করতে পারছে। একজন বিক্রেতা জানান, মোটরসাইকেল, ইলেকট্রনিক্স এবং ওষুধের বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে।
শুধু সোনাই নয়, তামাক চাষেও এবার রেকর্ড হয়েছে। লিথিয়াম, ক্রোম এবং প্লাটিনাম খনিগুলো (যার বেশিরভাগই চীনাদের মালিকানাধীন) উৎপাদন বাড়িয়েছে। এছাড়া বিদেশে থাকা জিম্বাবুয়েবাসীরা গত বছর ২.৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে নগদ অর্থের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।
জিম্বাবুয়ের স্বর্ণের খনি। ছবি: রয়টার্সএই ব্যয়ের বেশিরভাগই হচ্ছে কালোবাজারে, যা ট্যাক্স বা শুল্ক কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে যায়। একজন অর্থদাতা একে জিম্বাবুয়ের ‘কঙ্গো-ফিকেশন’ বা কঙ্গোর মতো পরিস্থিতির সাথে তুলনা করেছেন। রাজধানী হারারেতে বাড়িগুলো রেকর্ড দামে নগদে বিক্রি হচ্ছে। কারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা জমানোর চেয়ে সম্পত্তিতে বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে করছে। ব্যক্তিগত ভল্ট বা সেফটি লকার ব্যবসা এখন জমজমাট। ধারণা করা হয়, প্রায় ২-৪ বিলিয়ন ডলারের সোনা ও নগদ অর্থ এই ভল্টগুলোতে জমা আছে।
রাজনীতি ও ক্ষমতার মোহ
অর্থনৈতিক অবস্থা মুগাবের আমলের চেয়ে কিছুটা সহনীয় হলেও রাজনীতি বদলায়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাসীন জানু-পিএফ দল রাজনীতিবিদদের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে নানগাগওয়ার মেয়াদ ২০২৮ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হবে। যদি তিনি যুক্তি দেখান যে সংশোধিত সংবিধান তাকে আরও দুই মেয়াদে থাকার সুযোগ দেয়, তবে তিনি ১০০ বছর বয়স পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারেন।
এই বিলটি সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পদ্ধতি বাতিল করে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। যা তাকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে। সমালোচক এমপি এবং এনজিওগুলোকে হয় দমানো হয়েছে নয়তো বশ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা মনে মনে এই বিল নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও প্রকাশ্যে সমালোচনা করার সাহস পাচ্ছেন না। অনেকে বলছেন, ভাইস-প্রেসিডেন্ট কনস্ট্যান্টিনো চিওয়েঙ্গা, যিনি ২০১৭ সালে মুগাবেকে হটাতে সাহায্য করেছিলেন, তিনি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করছেন। কারণ তিনি ২০২৮ সালে ক্ষমতা নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যেই তার ডেপুটির ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন।
পাশ্চাত্যের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের আশা থাকলেও, এই ক্ষমতার লিপ্সা সেই সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিচ্ছে। জিম্বাবুয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে বিশ্বব্যাংক ও পশ্চিমা দেশগুলোর ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় কোনো উন্নয়নমূলক অর্থায়ন পাচ্ছে না। ঋণ পুনর্গঠন রাজনৈতিক সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতি নতুন কোনো চুক্তিকে কঠিন করে তুলবে।
স্বর্ণের বার। ছবি: রয়টার্সআমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন কোনো সমঝোতার পথ প্রশস্ত করতে পারেনি। ট্রাম্পের আফ্রিকার খনিজ সম্পদের প্রতি লোভ রয়েছে কিন্তু সেখানকার গণতন্ত্র নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না তিনি। কিছু বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, তার ব্যবসায়িক বা লেনদেনমুখী মনোভাব হয়তো জানু-পিএফ দলের জন্য সুবিধাজনক হবে। দলটি ট্রাম্পপন্থীদের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহই দেখায়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে তারা আমেরিকার একটি সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। যে ফান্ডের মাধ্যমে জিম্বাবুয়ের ১৩ লাখ রোগীর এইচআইভি-প্রতিরোধী ওষুধসহ অন্যান্য চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হতো।
যার যৌক্তিক উপসংহার হলো, জিম্বাবুয়ের অভিজাত শ্রেণি বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে বর্তমানে বৈধ এবং অবৈধ উভয় পথেই প্রচুর টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত জিম্বাবুয়ের আয়া ও মালিরা যতক্ষণ দেশে টাকা পাঠাচ্ছে, ততক্ষণ স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না থাকা লাখ লাখ মানুষের জীবন এই প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর ভিত্তি করেই চলে যাবে। আর যখন চীনের মতো বন্ধু পাশে আছে, তখন পশ্চিমের দরকারই বা কী? শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি উন্মুক্ত করে দেওয়ার অর্থ হলো নিয়ন্ত্রণ হারানো, আর জানু-পিএফ তা মোটেও চায় না।
হারারের একজন ব্যবসায়ী লক্ষ্য করেছেন যে, জিম্বাবুয়েতে অপরাধের হার কতটা কম তা দেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অবাক হয়ে যান। তারপর তিনি একটু থেমে হাসলেন এবং একটি স্থানীয় কৌতুক শোনালেন: “জিম্বাবুয়েতে কোনো অপরাধী গ্যাং না থাকার কারণ হলো, এখানকার সবচেয়ে বড় গ্যাংটি খোদ ক্ষমতাসীন দলই।”