আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ইরানের জন্য কি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে চীন-রাশিয়া?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরানের জন্য কি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে চীন-রাশিয়া?
ইরান। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরানের দুই শক্তিশালী কূটনৈতিক অংশীদার হলো রাশিয়া ও চীন। তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে মস্কো ও বেইজিং।

গত শনিবার চালানো ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যাকে ‘মানবিক নীতির সব ধরনের মানদণ্ডের নির্লজ্জ লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সারকে বলেন, “শক্তি প্রয়োগ কখনোই বাস্তবিক অর্থে সমস্যার সমাধান করতে পারে না।” তিনি সব পক্ষকে উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বানও জানান।

এদিকে রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের আবেদন জানিয়েছে।

এই প্রতিক্রিয়া ইরান, রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতিফলন। মস্কো ও বেইজিং ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং যৌথ নৌ-মহড়াসহ সামরিক সমন্বয়ও বাড়িয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তুলে ধরছে।

তবে কঠোর বক্তব্য দিলেও ইরানকে সমর্থন জানাতে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত এখনো দেয়নি রাশিয়া বা চীন।

গত বছরের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষাসহ নানা খাতে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়। পাশাপাশি ইরানের মাধ্যমে রাশিয়াকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার মতো পরিবহন করিডোর প্রকল্পেও সমর্থন দেওয়া হয়।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ভারত মহাসাগরে যৌথ সামরিক মহড়াও পরিচালনা করে দুই দেশ।

তবে যুদ্ধ শুরু হলে মস্কোর সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানানোর বাধ্যবাধকতা ছিল না। কারণ রাশিয়া-ইরান চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার কোনো ধারা নেই। অর্থাৎ এটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে পরিণত হয়নি।

রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের সাবেক মহাপরিচালক এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাংক ভ্যালদাই ডিসকাশন ক্লাবের সদস্য আন্দ্রেই কোরতুনভ আল জাজিরাকে জানান, রাশিয়া ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। ওই চুক্তি অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া কোনো সংঘাতে জড়ালে রাশিয়াকে সেখানে যোগ দিতে বাধ্য থাকতে হবে।

কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে চুক্তিতে শুধু বলা হয়েছে, দুই দেশের কোনো একটি দেশ সংঘাতে জড়ালে অন্য দেশ তার বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে।

ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হওয়ায় ইরানকে সমর্থন দিতে রাশিয়ার সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন কোরতুনভ। তিনি আরও বলেন, মস্কো বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এর আগেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করলেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করেন।

যদিও ইরানের সঙ্গে করা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, রাশিয়া সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য নয়। কোরতুনভ বলেন, তেহরানের মধ্যে ‘এক ধরনের হতাশা’ দেখা গেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বা বহুপাক্ষিক ফোরামে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার বাইরে রাশিয়া হয়তো আরও কিছু করবে।

২০২১ সালে চীন ও ইরান জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে ২৫ বছরের একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। একই সঙ্গে এতে ইরানকে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির পোস্টডক্টরাল ফেলো জোডি ওয়েন আল জাজিরাকে জানান, বেইজিংয়ে এই সম্পর্ককে সাধারণত বাস্তববাদী ও স্থিতিশীল অংশীদারত্ব হিসেবে দেখা হয়।

জোডি জানান, রাজনৈতিক পর্যায়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে তেহরানের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সহযোগিতা গভীর, এবং অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান ইরানে বিনিয়োগ করেছে। তবে সামরিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে চীন বরাবরই স্পষ্ট সীমারেখা টেনে রেখেছে।

জোডি বলেন, “চীনা সরকার সবসময় অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে। আমার মনে হয় না চীন সরকার ইরানে অস্ত্র পাঠাবে।” তার মতে, বেইজিংয়ের ভূমিকা মূলত কূটনীতি ও সংকট ব্যবস্থাপনায় সীমিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয় চীন যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।”

তার মতে, এই সম্পর্কের সীমা ও বাস্তবতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকায় তেহরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের পারস্পরিক আস্থাও তৈরি হয়েছে।

তবে জোডি উল্লেখ করেন, দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণ নয়। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৮৭ শতাংশই যায় চীনে। তবে চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইরান তুলনামূলকভাবে ছোট অংশীদার।

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কর্মসূচির সহযোগী অধ্যাপক ডিলান লো আল জাজিরাকে বলেন, ইরান ইস্যুতে চীনের ভূমিকা এখন ‘প্রতিরক্ষামূলক’ ধরনের হয়ে উঠেছে। তার মতে, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন সম্ভাব্য আঞ্চলিক ধস ঠেকাতে বেইজিং মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা জোরদার করছে।

ডিলান লো বলেন, “রাজনৈতিক ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায় এবং কী ধরনের বিকল্প পথ রয়েছে তা নিয়ে এখন মূল্যায়ন চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় হামলার পর থেকেই মূলত এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।”

সম্পর্কিত