বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানে তুরস্কের এত আগ্রহ কেন?

বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানে তুরস্কের এত আগ্রহ কেন?
এশিয়ায় নজর দিয়েছে তুরস্ক। ছবি: রয়টার্স

আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র এবং এর পূর্বসূরি অটোমান (উসমানীয়) সাম্রাজ্য—উভয়েরই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কয়েক দশক নীরব থাকার পর এই আগ্রহ আবারও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। তুরস্ক দীর্ঘকাল ধরে নিজেকে এই অঞ্চলের মুসলিম স্বার্থের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোও যুগ যুগ ধরে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এবার তারা আসলে কী চাইছে?

সংবাদমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাট বলছে, গত এক বছরেই ভারতীয় উপমহাদেশে তুরস্কের বর্ধিত ভূমিকার বেশ কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ভারতীয় বিশ্লেষকেরা দাবি করেছেন, দিল্লিতে গত ১০ নভেম্বর লাল কেল্লা বিস্ফোরণে একজন তুর্কি হ্যান্ডলারের ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তান ও তুরস্ক আজারবাইজানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এই তিনটি দেশ মিলে একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা গোষ্ঠী গঠন করেছে, যা ‘থ্রি ব্রাদার্স’ (তিন ভাই) নামে পরিচিত। এ ছাড়া গত মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের সময় তুরস্ক পাকিস্তানকে সামরিক সরঞ্জাম এবং গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিল।

তুরস্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এই যোগসূত্র গত পাঁচ শতাব্দী ধরে আদর্শ এবং ভূ-রাজনীতির সংমিশ্রণের ফলাফল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ভারত দীর্ঘকাল ধরে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য করত। ভারতীয়দের কাছে তুর্কিরা অপরিচিত ছিল না। মধ্য এশিয়ার তুর্কি গোষ্ঠীগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক মুসলিম অঞ্চল শাসন করত। দিল্লির সালতানাত এবং মুঘল সাম্রাজ্যের মতো অনেক প্রধান ভারতীয় মুসলিম রাষ্ট্র তুর্কি রাজবংশ ও বাহিনী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে অটোমান সাম্রাজ্য মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারত মহাসাগরের উপকূলে চলে আসে।

মিশর বিজয়ের পর সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ‘খলিফা’ হিসেবে দাবি করা অটোমান সুলতান মধ্য আফ্রিকা থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিলেন। ধর্মীয় কারণের পাশাপাশি অটোমানদের ভূ-রাজনৈতিক হিসাবও ছিল। এ জন্য তাদের শত্রু পারস্যের সাফাভিদ, রুশ ও বিভিন্ন পশ্চিমা শক্তি; যেমন—পর্তুগিজ ও হাবসবার্গের বিরুদ্ধে লড়তে মিত্রের প্রয়োজন ছিল। ফলে তারা ফ্রান্স, বুখারার উজবেক খানাত, ইন্দোনেশিয়ার আচেহ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে জোট গড়ার চেষ্টা করে।

উপমহাদেশে তুর্কি আগ্রহ ষোড়শ শতাব্দীতে তুঙ্গে ওঠে। অটোমানরা পর্তুগিজ আক্রমণ ঠেকাতে গুজরাট সালতানাতের সাথে জোট বাঁধে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য গঠনে অটোমানরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর অটোমান প্রভাব আবারও বাড়তে থাকে। কারণ, এটিই ছিল একমাত্র বড় মুসলিম সাম্রাজ্য, যা ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত ছিল।

ব্রিটিশ রাজত্বকালেও অটোমান সাম্রাজ্য ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে একটি শক্তিশালী প্রতীকী প্রভাব বজায় রেখেছিল। তারা অটোমান খলিফাকে সমর্থন করতে এবং ব্রিটিশদের অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার প্রতিবাদে ‘খেলাফত আন্দোলন’ (১৯১৯-১৯২২) শুরু করেছিল।

রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। ছবি: রয়টার্স
রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। ছবি: রয়টার্স

আধুনিক যুগ ও ‘নব্য-অটোমান’ নীতি

মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে খিলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর, হায়দ্রাবাদের নিজাম খিলাফত পুনরুজ্জীবিত করার একটি পরিকল্পনা করেছিলেন। তার ছেলেদের সাথে অটোমান রাজকন্যাদের বিয়ে হয়েছিল। ঐতিহাসিক স্যাম ডালরিম্পলের মতে, ১৯৩১ সালে নিজাম শেষ খলিফার কাছ থেকে একটি দলিল সংগ্রহ করেছিলেন, যেখানে তাদের যৌথ নাতি-নাতনিদের পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালে হায়দ্রাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

ভারতীয় থিংকট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বলছে, বর্তমানে তুরস্ক আবারও দক্ষিণ এশিয়ায় শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে, যা মূলত তাদের ‘নব্য-অটোমান’ পররাষ্ট্রনীতির অংশ। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান অটোমান এবং মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে একটি ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেন, যা সংশোধন করা প্রয়োজন। এই চিন্তা পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে আদর্শিক সম্পর্ককে জোরদার করেছে। কারণ, পাকিস্তান নিজেকে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মনে করে।

তুরস্কের মূলনীতি কী?

দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল মুসলিম জনসংখ্যার সাথে সম্পর্ক তুরস্ককে মুসলিম বিশ্বে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া পাকিস্তানে তুর্কি সংস্কৃতি বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক তুরস্ককে তাদের অস্ত্রের সক্ষমতা প্রদর্শনে, আরব দেশগুলোর প্রভাবের সাথে প্রতিযোগিতা করতে এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

তুরস্কের এই সম্পর্কগুলো মূলত তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, ভারতের প্রতি সরাসরি শত্রুতা থেকে নয়। তবে পাকিস্তানের জন্য তুরস্ক একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। কারণ, সৌদি আরব বা ইরানের মতো দেশগুলো ভারতের সাথে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে পাকিস্তানের পক্ষে সব সময় অবস্থান নিতে পারে না। অন্যদিকে, তুরস্ক ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য খুব একটা শক্তিশালী নয় এবং কাশ্মীর ইস্যু থেকে শুরু করে ভারতের গ্রিস ও আর্মেনিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠতা—তুরস্ক ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনার একাধিক কারণ তৈরি করেছে।

তুরস্কের প্রতিনিধির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: ফেসবুক
তুরস্কের প্রতিনিধির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: ফেসবুক

বাংলাদেশ নিয়ে ভাবনা

বিশ্লেষণমূলক সংবাদমাধ্যম পলিটিকস টুডে বলছে, বাংলাদেশ বর্তমানে তুরস্কের ‘এশিয়া অ্যানিউ’ বা এশিয়া পুনর্দৃষ্টি নীতির একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তুরস্কের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে: প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা, ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।

তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হতে চাইছে। বাংলাদেশ তাদের জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক বাজার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য তুরস্ক বড় অংশীদার হয়ে উঠেছে এবং বাংলাদেশ সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে সমরাস্ত্র কিনছে।

তুরস্ক কেবল অস্ত্র বিক্রি নয়, বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির প্রযুক্তি হস্তান্তরেরও আশ্বাস দিয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান তুরস্ককে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, যেখানে বাংলাদেশের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমস বলছে, ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একটি উদীয়মান শক্তি। বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠতা তুরস্ককে এই অঞ্চলে একটি শক্ত অবস্থান দেয়। রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্ক বাংলাদেশের হয়ে সরব ভূমিকা পালন করে, যা দুই দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ও আবেগীয় বন্ধন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, যা তুরস্কের ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুযোগ। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা দ্রুত ২ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, যোগাযোগ অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে তুরস্কের বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করতে অত্যন্ত আগ্রহী।

তুরস্কের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিস ও আর্মেনিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দিন দিন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এর পাল্টা কৌশল হিসেবে তুরস্কও দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর (যেমন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) সাথে সম্পর্ক গভীর করছে, যাতে একটি আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় থাকে। তুরস্ক বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে দেখে, যার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখলে একদিকে যেমন তাদের বাণিজ্য বাড়বে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাবও শক্তিশালী হবে।

সম্পর্কিত