রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত এক বছর ধরে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড, নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, গণগ্রেপ্তার এবং একসময় মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা গোষ্ঠীগুলোর পুনঃপ্রবেশ নিয়ে যে অস্থিরতা চলছে–তা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং আরও অনেক গভীর কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই অস্থিরতা দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক সংঘাতের ভারে যখন প্রতিষ্ঠানগুলো নড়বড়ে হতে শুরু করে, তখন কী ঘটে। যখন ক্ষমতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন কত সহজেই একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা পথ হারাতে পারে সেটাও দৃশ্যমান।
শেখ হাসিনা সরকারের নাটকীয় পতন শুধু এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষ ছিল না। ছিল একটি নির্বাহী ক্ষমতাভিত্তিক শাসনকাঠামোর ভেঙে পড়া। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট শুধু আওয়ামী লীগ এবং তাদের আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও উন্নয়ন নেটওয়ার্কের ওপর থাকা নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে ছিল।
সরকারের সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বলতেন, উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। দুই দলের মতের কিছু অংশ ঠিক হতে পারে, কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এমন একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো হঠাৎ সরিয়ে দিলে কী হয়?
গত কয়েক মাসে আমরা তার উত্তর পেয়েছি। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজে থেকেই ভারসাম্য ফিরে পায় না। তারা নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র খুঁজতে শুরু করে।
এই আকস্মিক শূন্যতা প্রকাশ করল রাজনৈতিক ক্ষেত্র কতটা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্রে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উপস্থিতি হঠাৎ পরিবর্তনের ধাক্কা সামাল দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক কাঠামো ক্রমশ একটি দল ও একক নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। যখন সেই কাঠামো সরে গেল, তখন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী স্থিতিশীলতার অভাব দেখা দিল।
ছবি: সংগৃহীতআমলাতন্ত্রের শাখাগুলো, যারা একসময় স্পষ্ট কর্তৃত্বের সঙ্গে নিজেদের এক ভাবত, তারা নতুন রাজনৈতিক কেন্দ্র খুঁজতে শুরু করল। সিভিল সোসাইটির পরিসর আগে সংকুচিত ছিল, তারা বড় পরিসর পেল কিন্তু স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পেল না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–প্রভাবশালী দলের অনুপস্থিতি সেই শক্তিগুলোর জন্য দ্বার খুলে দিল, যারা ধৈর্য ধরে দূরে বসে ছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্যুতি এবং কট্টর মতের উত্থান
শূন্যতার সুযোগ নিয়ে এমন কিছু শক্তি সামনে এসেছে, যারা এতদিন জাতীয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান হলো জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রভাব বিস্তার।
চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেটে শিবিরের মিছিলগুলো ঘন ঘন হচ্ছে। আগে যা ছিল বিচ্ছিন্ন, এখন তা অনেক বেশি শক্তিশালী। শিবির নিজেদের ‘ইসলামী শৃঙ্খলার রক্ষক’ ও ‘নৈতিক ন্যায়বিচারের বাহক” হিসেবে উপস্থাপন করছে।
কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো ঠিক এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতার সময়েই বিকশিত হয়। তারা প্রচলিত দলগুলোর চেয়ে দ্রুত সংগঠিত হয় এবং নিজেদের বয়ান আরও তীব্রভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে তারা মসজিদভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এগিয়ে যায়।
দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য, অর্থনৈতিক অসন্তোষ কিংবা ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করেই হোক বা না হোক তাদের সাম্প্রতিক জনসমাবেশগুলো জনাকীর্ণ ছিল। এর কারণ শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতের প্রতিফলন নয়, বরং বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আর নেই বলে।
মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে নির্বাচন ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ফেরার বার্তা। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ায় নির্বাচনী ক্ষেত্র প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন এক প্রকার ভিত্তিহীন প্রতিযোগিতা। ছোট কিন্তু অত্যন্ত সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো বয়ান নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ধরনের নির্বাচন প্রক্রিয়াগতভাবে বৈধ হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রতীকী অনুশীলনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
এই অস্থিতিশীল পরিবেশে মতাদর্শিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক শক্তিগুলো অস্বাভাবিক প্রভাব অর্জন করছে। জামায়াত ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলো তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধ অফিস খুলে ফেলেছে। ছাত্রশিবির ক্যাম্পাস ইউনিটগুলো ফের সক্রিয় করছে; ছোট ইসলামি দলগুলো নির্বাচনের আগে জোট নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং কেন্দ্রচ্যুত হয়ে পড়া একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষণ।
ছবি: সংগৃহীতগণতন্ত্র পুনর্গঠন মানে শুধু নির্বাচন নয়
এগুলোর কোনোটিই আগের সরকারকে দায়মুক্তি দেয় না। ছাত্র আন্দোলনের ওপর দমন-পীড়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকোচন, এবং বিরোধী মতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার-এ সবই দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর গভীরভাবে আঘাত করেছে।
কিন্তু বর্তমান সংকট দেখায়, অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের প্রতিকার কখনোই আকস্মিক অপসারণ হতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন স্থিতিশীল হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকে। আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করেছে, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।
বাংলাদেশের এখনকার চ্যালেঞ্জ শুধু একটি সরকারকে অন্য সরকার দিয়ে প্রতিস্থাপন করার নয়। এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বৈধতা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। প্রক্রিয়াগতভাবে সঠিক, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ফাঁপা নির্বাচন বিভাজনকে আরও গভীর করবে। যেখানে মূলধারার রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে না, মতভেদ আদর্শগত চরমপন্থার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষর বদলে প্রতিক্রিয়াশীল মনে হয়–সেই ব্যবস্থা স্থায়ী হতে পারে না।
এই প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র পুনর্গঠনে কেবল প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। এটি দাবি করে যে, গণতন্ত্রের স্থিতিস্থাপকতা পূর্বানুমানযোগ্যতার ভিত্তিতেই হবে। দেশের মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে, রাজনৈতিক হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম পরিবর্তিত হয় না। দলগুলোকে আস্থা রাখতে হবে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। আর রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে বুঝতে হবে যে, তাদের ভূমিকা হলো ব্যবস্থার হয়ে কাজ করা, ক্ষমতাসীনদের হয়ে নয়।
বাংলাদেশের সংকট দেখাচ্ছে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মের বদলে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে, তখন কী ঘটে। যখন ব্যক্তি বিদায় নেয়, তখন মাঠের দখল নেয় অনিশ্চয়তা। শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী স্তম্ভ–আদালত, তদারকি সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী বাহিনী স্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়া দিকনির্দেশনা হারায়। তাই বর্তমান সময়কে একইসঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ এবং কাঠামোগতভাবে ভঙ্গুর মনে হচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীতআজ বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আগামী সিদ্ধান্তগুলো সামনের প্রজন্মের রাজনীতি গড়ে দেবে। চ্যালেঞ্জ শুধু নির্বাচন নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক ক্ষেত্রের পুনর্নির্মাণ, যেখানে বড়-ছোট সব দল প্রতিযোগিতা করতে পারে; কট্টরপন্থা নিয়ম-কানুন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক সুবিধাবাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে না। গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনকারী এই রাষ্ট্রের জন্য প্রতিষ্ঠানগত বিচ্যুতির ঝুঁকি উপেক্ষা করার মতো নয়।
** এশিয়া টাইমসের নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে প্রকাশিত **
[তরুণ আগরওয়াল নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড গভর্ন্যান্স-এ অ্যাসোসিয়েট ফেলো। যেখানে তিনি জলবায়ু-সংঘাত বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কূটনীতি ও নিরস্ত্রীকরণ বিভাগে তার পিএইচডি থিসিস জমা দিয়েছেন।]