Advertisement Banner

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ কি শুধুই অসুস্থতা?

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ কি শুধুই অসুস্থতা?
মীর হেলাল ও দীপেন দেওয়ান। ছবি: ফেসবুক

বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার ১০৫ দিনের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক পরিসরে বেশ বিতর্ক তৈরি করেছে। কেন তিনি পদত্যাগ করলেন? শুধুই অসুস্থতা, নাকি অন্য কারণ আছে?

সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান জানিয়েছেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছিল।” বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বাড়াতে তিনি পদ থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন বলে দাবি করেছেন চিঠিতে।

উল্লেখ্য, ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়, সেখানে দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই দায়িত্ব নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি ২০০৫ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতেও জায়গা করে নিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে দীপেন লক্ষাধিক ভোটে জামায়াতের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। সেক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু তিন জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যখন একজন প্রতিমন্ত্রী দেওয়া হয়, তখনই নানা প্রশ্ন উঠেছিল। প্রথমত এটা নজিরবিহীন। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সইয়ের পর সেই এলাকা থেকে একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হতো। বিএনপির আগের সরকারে (২০০১–২০০৬) এই এলাকার জন্য কোনো পূর্ণমন্ত্রী নেওয়া হয়নি। একজন উপমন্ত্রীই মন্ত্রণালয় চালাতেন। এবারে পূর্ণমন্ত্রীর সঙ্গে একজন প্রতিমন্ত্রী নেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।

নির্বাচিত সরকারের চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা অস্বাভাবিক। ঘটনা এমন নয় যে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেছেন। বরং তার পদত্যাগ সরকারপ্রধানকেও বিব্রত করেছে।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেকেই এটাকে সুনজরে দেখেনি। বরং তারা মনে করছেন, মন্ত্রীর ওপর ‘নজরদারি’ করতেই সমতল থেকে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর যখন আওয়ামী লীগ সরকার জনসংহতি সমিতির সঙ্গে চুক্তি সই করে, তখন বিএনপি বিরোধিতা করেছিল। অবশ্য ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে তারা চুক্তি বাতিল করেনি, চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে। একজন পাহাড়ি নেতা বলেছেন, চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো বিএনপি আমলেই বাস্তবায়িত হয়েছে।

দীপেন দেওয়ান ও মীর হেলাল। ছবি: ফেসবুক
দীপেন দেওয়ান ও মীর হেলাল। ছবি: ফেসবুক

দীপেন দেওয়ান অসুস্থতার দোহাই দিয়ে পদত্যাগ করলেও দুদিন আগে মৌলভীবাজারে গিয়েছিলেন একটি কর্মসূচিতে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট সূত্র মন্ত্রীর পদত্যাগের দুটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেছে। একটি হলো, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হওয়া। দ্বিতীয়টি হলো, জেলা পরিষদ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় তার মতামত অগ্রাহ্য করা। এ ছাড়া দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পেছনে স্থানীয় বিএনপির বিরোধও কাজ করতে পারে। দীপেন তালুকদার নামে একজন নেতাও সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তিনি কমিটি থেকে মন্ত্রীর অনুসারীদের বাদ দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ক, খ, গ ও ঘ খণ্ডে ৭২টি ধারা রয়েছে। এর বেশির ভাগই জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠনসংক্রান্ত। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের কথা বলা আছে। ওই ধারায় লেখা আছে, ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ সেই থেকে পাহাড়িদের মধ্য থেকেই মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নেওয়া হতো। এবারই একজন অপাহাড়িকে প্রতিমন্ত্রী পদে বসানো হলো। তিনি সাবেক মন্ত্রী মীর নাসিরের ছেলে মীর হেলাল।

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পেছনে অসুস্থতাই যে মূল কারণ নয়, সেটা নানা প্রতিক্রিয়া থেকেও আঁচ করা যায়। এখানে রাজনৈতিক প্রশ্নটিই প্রধান। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ ছাড়াও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও সরকারের ভেতরে মতভেদ আছে বলে জানা যায়। রাঙামাটিতে দীপেন দেওয়ানের সমর্থকেরা পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। তারা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও স্লোগান দিয়েছে।

নির্বাচিত সরকারের চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা অস্বাভাবিক। ঘটনা এমন নয় যে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেছেন। বরং তার পদত্যাগ সরকারপ্রধানকেও বিব্রত করেছে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা বিষয়ে অস্বস্তি রয়ে গেছে। বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। এই অবস্থায় দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ অশনি সংকেত বলেই মনে করেন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের নেতারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকটি সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমার একটি বৈঠক হওয়ার চেষ্টা ছিল। সেই বৈঠক না হওয়া এবং জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে টানাপোড়েনে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার যাদের নিয়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করেছিল, তাদের অনেকে জেল-জুলুমের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকার যে পরিষদ গঠন করেছে, তাতে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নেই বলে অভিযোগ আছে। এ অবস্থায় দলীয় দৃষ্টিতে না দেখে সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল পরিষদ গঠনই স্থানীয়দের দাবি।

সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেল, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর একক নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রণালয় চলছে। এটা যেমন পার্বত্য চুক্তির পরিপন্থী, তেমনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছে ভুল বার্তা যাবে।

শেষ কথা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো একটি ছোট্ট মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রয়োজন আছে কি না, সেটাও সরকারপ্রধানকে ভাবতে হবে। সরকার যেখানে সবক্ষেত্রে কৃচ্ছ্বতা চাইছে, সেখানে মাথাভারী প্রশাসনের প্রয়োজন কী? আর একটা কথা মাথায় রাখা দরকার যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে একজন মন্ত্রী কিন্তু নেওয়া উচিত পাহাড়িদের মধ্য থেকেই।

সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত