তরুণ চক্রবর্তী

ভারত-বাংলাদেশে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান রসায়ন বোধহয় সৃষ্টিকর্তারও বোধগম্য নয়! এই দুই দেশের কর্তাব্যক্তিরা গলা মেলাচ্ছেন, তো পরক্ষণেই আবার তারা ছুঁড়ছেন গগনভেদী শব্দবাণ। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নায়কেরা যে কী চাইছেন, আমজনতা সেটাই বুঝতে পারছে না। তারা চান বন্ধুত্ব। আত্মীয়তা। নিয়মিত যোগাযোগ। রুটি, কাপড়া আর মাকানের মতো বিষয়গুলো তো আর চাইলেই মেলে না! রাষ্ট্র তো চালান রাষ্ট্রনায়কেরা!
তাই তো কবির সুমন গেয়েছিলেন,
‘রাষ্ট্র মানেই
একলা মানুষ
বেচারা মানুষ
পরবাসী নিজের ঘরেতে।’
দুই দেশের ক্রিকেট পাগলেরা কাঁটাতারের বেড়ার কড়া শাসন উপেক্ষা করে ভদ্রলোকের খেলা দেখতে চাইলেও তাই উপায় নেই। বাইশ গজের বাইরে রাষ্ট্রের খামখেয়ালিপনায় মুস্তিফিজুর রহমান এবং আইসিসি বিতর্কের পানিতে উপচে পড়েছে তিস্তার দুই পার। বাংলাদেশের মাটিতে ভারত ও পাকিস্তানের বড়কর্তারা গলা মেলালেও ছোটদের হাত মেলানোয় জারি হয় বিচিত্র নিষেধাজ্ঞা। হচ্ছে-টা কী! বোঝার উপায় নেই। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এমন টানাটানি অভূতপূর্ব। দুই দেশের দ্বেষ যেভাবে বাড়ছে তার শেষ কোথায় কে জানে! গোটা দুনিয়া এক সময় ভিসামুক্ত দুনিয়ার পক্ষে গর্জে উঠলেও গঙ্গা বা পদ্মাপারে খড়কুটোর মতো ভিসার ফস্কাগেরো আগলে ধরে চলছে নানান রাজনৈতিক ফরমানের জারিজুরি। নার্সারি স্কুলের শিশুদের মতো আড়ি-আড়ি ভাব-ভাব খেলা কিনা বোঝা দুষ্কর।
তাই ‘মন খারাপের বিকেল মানে মেঘ করেছে’। আবার সুমন।
‘রাষ্ট্র মানেই
পাসপোর্ট নিয়ে উমেদারি
রাষ্ট্র মানেই
ম্যাপে বাঁধা আমার দিগন্ত
রাষ্ট্র মানেই
সবকিছু দারুণ সরকারি।’
রাজতন্ত্রের হাত ধরে সরকারি আমলাতন্ত্রের কোপ পড়েছে কলকাতায় বাঙালির মননের উৎসব বইমেলাতেও। ২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি, কলকাতায় বাংলার (মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছাতে পশ্চিমবঙ্গের নাম এখন লোকমুখে বাংলা) বইমেলা, তাও আবার আন্তর্জাতিক! কিন্তু নেই বাংলাদেশ। আর্জেন্টিনা থিম কান্ট্রি। মারাদোনার দেশ ছাড়াও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ, ইউক্রেন থেকে রাশিয়া, এমনকী, চীনও রয়েছে বইমেলায়। ব্রাত্য শুধু বাংলাদেশ। আগরতলা বইমেলাতেও তারা ছিল না। অথচ, দুই জায়গাতেই বছর দুয়েক আগেও বাংলাদেশের স্টলে উপচে পড়ত পাঠকের ভিড়। এখন সেসব অতীত। তবে বাংলাদেশি লেখকদের বই কিন্তু বিক্রি হচ্ছে। অতীতে কলকাতা ও ত্রিপুরার প্রকাশকেরা বাংলাদেশের অনেক লেখকের বই প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশি প্রকাশকদের বহু বই এখনও রয়ে গিয়েছে এপারের প্রকাশকদের কাছে। সেগুলোও বিক্রি হচ্ছে। ত্রিপুরার প্রকাশক অক্ষর এবারও প্রকাশ করেছে দুপারের লেখকদের লেখা নিয়ে বাংলা বই। হাসান অজিজুল হক, সাধন চট্টোপাধ্যায়, দুলাল ঘোষ ও হারুন হাবিব সম্পাদিত ‘অসীমান্তিক’। বইটিতে বাংলাদেশ, উত্তর পূর্ব ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের গল্পকারদের ৫৯টি গল্প স্থান পেয়েছে। কাঁটাতারের শাসন উপেক্ষা করে এরকম বহু উদ্যোগ কিন্তু চলছে। ইন্টারনেটের যুগে বন্দুকের নল আর কাঁটাতার দিয়ে রাষ্ট্র থামাতে পারেনি অসীমান্তিক মননের চর্চা।

কলকাতা বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে ভারতের প্রথিতযশা সাংবাদিক সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় এবং কিংবদন্তি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কথায় ‘শীর্ষেন্দু আনপ্লাগড’। বইটিতে দুই বাংলার সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন তারা। অকপটে উঠে এসেছে দুই পারের সাহিত্যচর্চার নানা দিক। সেখানেও কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি নিয়ে তাদের অসন্তোষ ধরা পড়ে।
পাঠকদের সুবিধার্থে কলকাতা বইমেলা নিয়ে ‘শীর্ষেন্দু আনপ্লাগড’ বইতে সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আলাপতারিতার কিছু অংশ:
সৌম্য: এক যুগ ধরে নিয়মিত বাংলাদেশে যাচ্ছি। বড় ভালোবেসে ফেলেছি এই দেশটাকে। ওই দেশটাও আমাকে আপন করে নিয়েছে। অথচ আমার বাবা বা মা কেউই ওপার বাংলার নন। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, দুই বাংলার শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতির আদান-প্রদান পুরোপুরি বাধাহীনভাবে হয় না কেন। সেটাই তো হওয়া দরকার। তা হলে এখনও যেটুকু আড়ষ্টতা রয়েছে, দূরত্ব রয়েছে তা কেটে যাবে। সাহিত্যও সমৃদ্ধ হবে।
শীর্ষেন্দু: অবশ্যই। বইপত্র সেভাবে আদান-প্রদান হয় না বলে পড়াও হয় না। বিপণনেরও অসুবিধে আছে। বইমেলায় বছর কয়েক ধরে বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন হচ্ছিল। কিন্তু বছরভর বইবাজার না থাকায় পাঠক বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশের বই কেনাবেচার আউটলেট নেই বললেই চলে।
ইদানীং তো হাল আরও খারাপ। দুই বাংলার মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে সেতুটা ছিল, কী যে হল, সেখানেও ঝাঁপ পড়ে গেল! বইমেলায় বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। তাদের প্রকাশকেরা স্টল দিতে পারছেন না। ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের সিনেমা আসতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের লেখা বই, সিনেমা, শিল্পীদেরও হয়তো একই হাল হতে চলেছে। এতে পাঠকই তো অভুক্ত থাকবে! শিল্প, সাহিত্য, সংগীতের মধ্যে দিয়েই তো হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিল হয়।

কাগজ পড়ে যা ধারণা হচ্ছে, তাতে আশার ঝলকানি খুব শিগগির দেখব বলেও মনে হচ্ছে না। দুই দেশই কেমন যেন অনড়, আড়ষ্ট হয়ে রয়েছে। গোঁ ধরে বসে আছে। মুখের কথার সঙ্গে কাজের দিল পাচ্ছি না। আমাকে এই অবস্থা বেদনা দেয়। এতে ক্ষতি হচ্ছে সাহিত্যের। ওই বাংলাতেই তো আমি জন্মেছি।
সৌম্য: অবশ্যই। বহু বছর পর সবকিছু আদান-প্রদানে একটা গতি এসেছিল। বইমেলায় বাংলাদেশের স্টলে উপচে পড়ত ভিড়। লেখা ও লেখকের সঙ্গে মানুষ পরিচিত হতো। সাহিত্য চর্চাসহ লেখালিখির ট্রেন্ড জানা যেত। সেখানেও ঝাঁপ পড়ে গেল।
শীর্ষেন্দু: হ্যাঁ। আজকাল আর এভাবে আগল দিয়ে সবকিছু আটকানো যায় না। ভালো বা মন্দ, সবকিছুই নানা সামাজিক মাধ্যমে গোচরে আসে। কারও কারও কাছে শুনি ওই দেশে এক ঝাঁক তরুণ লেখক ভালো লিখছে। এবং তারা বেশ পপুলার। ওখানে তো বটেই, এখানেও তাদের নাম অনেকে শুনেছে। কিছুদিন আগে আমার বউমা আমাকে একটা বই এনে দিল। নামটা ইন্টারেস্টিং, 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি'। থ্রিলার। বইটা পড়লাম। লেখাটা খারাপ নয়। ভালোই।
সৌম্য: হ্যাঁ, বইটার লেখক মোহম্মদ নাজিম উদ্দিন।
শীর্ষেন্দু: নাম মনে নেই, তবে বেশ ঝরঝরে লেখা। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো। আমি পড়লামও। মাঝে মাঝে যদিও একটু আনকন্ট্রোল্ড মনে হয়েছে।
সৌম্য: বাংলাদেশের যে সাহিত্যিকের লেখা সবাই এক নিঃশ্বাসে পড়েন, এখনও, তিনি কিন্তু প্রবাদপ্রতিম হুমায়ূন আহমেদ।
শীর্ষেন্দু: সে যা বলেছিস। হুমায়ূন অসম্ভব পপুলার। ও ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শিষ্যের মতো। ওর জনপ্রিয় চরিত্র ‘হিমু’ সে তো সুনীলের, মানে নীললোহিতের ‘নীলু’র আদলে গড়া। আমাকেও ও খুবই পছন্দ করত। আমার লেখারও খুব ভক্ত ছিল। হুমায়ূন দারুণ ভালো ভালো লেখা লিখেছে। কিন্তু কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে, ওর লেখায় একটু যেন পাঠকতোষণ আছে। পাঠক যা চায়, পছন্দ করে, সেইভাবে লেখা। ওই কিছুটা ইচ্ছাপূরণ বলতে পারিস। কোনও কোনও লেখা কিছুটা লঘুও মনে হয়েছে। তবে হুমায়ূন আহমেদের কৃতিত্ব হচ্ছে সায়েন্স ফিকশন।
বইটিতে এই নিছক আড্ডায় ধরা পড়েছে বাংলাদেশের প্রতি প্রবীণ সাংবাদিক ও সাহিত্যিকের ভালোবাসার কথা। উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্যের কিছু কালজয়ী বই এবং তার রচয়িতাদের কথাও। সমালোচনার কষ্ঠিপাথরে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, হরিশংকর জলদাস, হাসান আজিজুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, সেলিনা হোসেন, তসলিমা নাসরিন, আনিসুল হক থেকে শুরু করে সকলের সাহিত্যকর্ম নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন।
সেই আলোচনাতেও সমালোচিত হয় সীমান্তের সরকারি বিধিনিষেধ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

ভারত-বাংলাদেশে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান রসায়ন বোধহয় সৃষ্টিকর্তারও বোধগম্য নয়! এই দুই দেশের কর্তাব্যক্তিরা গলা মেলাচ্ছেন, তো পরক্ষণেই আবার তারা ছুঁড়ছেন গগনভেদী শব্দবাণ। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নায়কেরা যে কী চাইছেন, আমজনতা সেটাই বুঝতে পারছে না। তারা চান বন্ধুত্ব। আত্মীয়তা। নিয়মিত যোগাযোগ। রুটি, কাপড়া আর মাকানের মতো বিষয়গুলো তো আর চাইলেই মেলে না! রাষ্ট্র তো চালান রাষ্ট্রনায়কেরা!
তাই তো কবির সুমন গেয়েছিলেন,
‘রাষ্ট্র মানেই
একলা মানুষ
বেচারা মানুষ
পরবাসী নিজের ঘরেতে।’
দুই দেশের ক্রিকেট পাগলেরা কাঁটাতারের বেড়ার কড়া শাসন উপেক্ষা করে ভদ্রলোকের খেলা দেখতে চাইলেও তাই উপায় নেই। বাইশ গজের বাইরে রাষ্ট্রের খামখেয়ালিপনায় মুস্তিফিজুর রহমান এবং আইসিসি বিতর্কের পানিতে উপচে পড়েছে তিস্তার দুই পার। বাংলাদেশের মাটিতে ভারত ও পাকিস্তানের বড়কর্তারা গলা মেলালেও ছোটদের হাত মেলানোয় জারি হয় বিচিত্র নিষেধাজ্ঞা। হচ্ছে-টা কী! বোঝার উপায় নেই। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এমন টানাটানি অভূতপূর্ব। দুই দেশের দ্বেষ যেভাবে বাড়ছে তার শেষ কোথায় কে জানে! গোটা দুনিয়া এক সময় ভিসামুক্ত দুনিয়ার পক্ষে গর্জে উঠলেও গঙ্গা বা পদ্মাপারে খড়কুটোর মতো ভিসার ফস্কাগেরো আগলে ধরে চলছে নানান রাজনৈতিক ফরমানের জারিজুরি। নার্সারি স্কুলের শিশুদের মতো আড়ি-আড়ি ভাব-ভাব খেলা কিনা বোঝা দুষ্কর।
তাই ‘মন খারাপের বিকেল মানে মেঘ করেছে’। আবার সুমন।
‘রাষ্ট্র মানেই
পাসপোর্ট নিয়ে উমেদারি
রাষ্ট্র মানেই
ম্যাপে বাঁধা আমার দিগন্ত
রাষ্ট্র মানেই
সবকিছু দারুণ সরকারি।’
রাজতন্ত্রের হাত ধরে সরকারি আমলাতন্ত্রের কোপ পড়েছে কলকাতায় বাঙালির মননের উৎসব বইমেলাতেও। ২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি, কলকাতায় বাংলার (মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ইচ্ছাতে পশ্চিমবঙ্গের নাম এখন লোকমুখে বাংলা) বইমেলা, তাও আবার আন্তর্জাতিক! কিন্তু নেই বাংলাদেশ। আর্জেন্টিনা থিম কান্ট্রি। মারাদোনার দেশ ছাড়াও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ, ইউক্রেন থেকে রাশিয়া, এমনকী, চীনও রয়েছে বইমেলায়। ব্রাত্য শুধু বাংলাদেশ। আগরতলা বইমেলাতেও তারা ছিল না। অথচ, দুই জায়গাতেই বছর দুয়েক আগেও বাংলাদেশের স্টলে উপচে পড়ত পাঠকের ভিড়। এখন সেসব অতীত। তবে বাংলাদেশি লেখকদের বই কিন্তু বিক্রি হচ্ছে। অতীতে কলকাতা ও ত্রিপুরার প্রকাশকেরা বাংলাদেশের অনেক লেখকের বই প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশি প্রকাশকদের বহু বই এখনও রয়ে গিয়েছে এপারের প্রকাশকদের কাছে। সেগুলোও বিক্রি হচ্ছে। ত্রিপুরার প্রকাশক অক্ষর এবারও প্রকাশ করেছে দুপারের লেখকদের লেখা নিয়ে বাংলা বই। হাসান অজিজুল হক, সাধন চট্টোপাধ্যায়, দুলাল ঘোষ ও হারুন হাবিব সম্পাদিত ‘অসীমান্তিক’। বইটিতে বাংলাদেশ, উত্তর পূর্ব ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের গল্পকারদের ৫৯টি গল্প স্থান পেয়েছে। কাঁটাতারের শাসন উপেক্ষা করে এরকম বহু উদ্যোগ কিন্তু চলছে। ইন্টারনেটের যুগে বন্দুকের নল আর কাঁটাতার দিয়ে রাষ্ট্র থামাতে পারেনি অসীমান্তিক মননের চর্চা।

কলকাতা বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে ভারতের প্রথিতযশা সাংবাদিক সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় এবং কিংবদন্তি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কথায় ‘শীর্ষেন্দু আনপ্লাগড’। বইটিতে দুই বাংলার সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন তারা। অকপটে উঠে এসেছে দুই পারের সাহিত্যচর্চার নানা দিক। সেখানেও কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি নিয়ে তাদের অসন্তোষ ধরা পড়ে।
পাঠকদের সুবিধার্থে কলকাতা বইমেলা নিয়ে ‘শীর্ষেন্দু আনপ্লাগড’ বইতে সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আলাপতারিতার কিছু অংশ:
সৌম্য: এক যুগ ধরে নিয়মিত বাংলাদেশে যাচ্ছি। বড় ভালোবেসে ফেলেছি এই দেশটাকে। ওই দেশটাও আমাকে আপন করে নিয়েছে। অথচ আমার বাবা বা মা কেউই ওপার বাংলার নন। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, দুই বাংলার শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতির আদান-প্রদান পুরোপুরি বাধাহীনভাবে হয় না কেন। সেটাই তো হওয়া দরকার। তা হলে এখনও যেটুকু আড়ষ্টতা রয়েছে, দূরত্ব রয়েছে তা কেটে যাবে। সাহিত্যও সমৃদ্ধ হবে।
শীর্ষেন্দু: অবশ্যই। বইপত্র সেভাবে আদান-প্রদান হয় না বলে পড়াও হয় না। বিপণনেরও অসুবিধে আছে। বইমেলায় বছর কয়েক ধরে বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন হচ্ছিল। কিন্তু বছরভর বইবাজার না থাকায় পাঠক বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশের বই কেনাবেচার আউটলেট নেই বললেই চলে।
ইদানীং তো হাল আরও খারাপ। দুই বাংলার মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে সেতুটা ছিল, কী যে হল, সেখানেও ঝাঁপ পড়ে গেল! বইমেলায় বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। তাদের প্রকাশকেরা স্টল দিতে পারছেন না। ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের সিনেমা আসতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের লেখা বই, সিনেমা, শিল্পীদেরও হয়তো একই হাল হতে চলেছে। এতে পাঠকই তো অভুক্ত থাকবে! শিল্প, সাহিত্য, সংগীতের মধ্যে দিয়েই তো হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিল হয়।

কাগজ পড়ে যা ধারণা হচ্ছে, তাতে আশার ঝলকানি খুব শিগগির দেখব বলেও মনে হচ্ছে না। দুই দেশই কেমন যেন অনড়, আড়ষ্ট হয়ে রয়েছে। গোঁ ধরে বসে আছে। মুখের কথার সঙ্গে কাজের দিল পাচ্ছি না। আমাকে এই অবস্থা বেদনা দেয়। এতে ক্ষতি হচ্ছে সাহিত্যের। ওই বাংলাতেই তো আমি জন্মেছি।
সৌম্য: অবশ্যই। বহু বছর পর সবকিছু আদান-প্রদানে একটা গতি এসেছিল। বইমেলায় বাংলাদেশের স্টলে উপচে পড়ত ভিড়। লেখা ও লেখকের সঙ্গে মানুষ পরিচিত হতো। সাহিত্য চর্চাসহ লেখালিখির ট্রেন্ড জানা যেত। সেখানেও ঝাঁপ পড়ে গেল।
শীর্ষেন্দু: হ্যাঁ। আজকাল আর এভাবে আগল দিয়ে সবকিছু আটকানো যায় না। ভালো বা মন্দ, সবকিছুই নানা সামাজিক মাধ্যমে গোচরে আসে। কারও কারও কাছে শুনি ওই দেশে এক ঝাঁক তরুণ লেখক ভালো লিখছে। এবং তারা বেশ পপুলার। ওখানে তো বটেই, এখানেও তাদের নাম অনেকে শুনেছে। কিছুদিন আগে আমার বউমা আমাকে একটা বই এনে দিল। নামটা ইন্টারেস্টিং, 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি'। থ্রিলার। বইটা পড়লাম। লেখাটা খারাপ নয়। ভালোই।
সৌম্য: হ্যাঁ, বইটার লেখক মোহম্মদ নাজিম উদ্দিন।
শীর্ষেন্দু: নাম মনে নেই, তবে বেশ ঝরঝরে লেখা। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো। আমি পড়লামও। মাঝে মাঝে যদিও একটু আনকন্ট্রোল্ড মনে হয়েছে।
সৌম্য: বাংলাদেশের যে সাহিত্যিকের লেখা সবাই এক নিঃশ্বাসে পড়েন, এখনও, তিনি কিন্তু প্রবাদপ্রতিম হুমায়ূন আহমেদ।
শীর্ষেন্দু: সে যা বলেছিস। হুমায়ূন অসম্ভব পপুলার। ও ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শিষ্যের মতো। ওর জনপ্রিয় চরিত্র ‘হিমু’ সে তো সুনীলের, মানে নীললোহিতের ‘নীলু’র আদলে গড়া। আমাকেও ও খুবই পছন্দ করত। আমার লেখারও খুব ভক্ত ছিল। হুমায়ূন দারুণ ভালো ভালো লেখা লিখেছে। কিন্তু কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে, ওর লেখায় একটু যেন পাঠকতোষণ আছে। পাঠক যা চায়, পছন্দ করে, সেইভাবে লেখা। ওই কিছুটা ইচ্ছাপূরণ বলতে পারিস। কোনও কোনও লেখা কিছুটা লঘুও মনে হয়েছে। তবে হুমায়ূন আহমেদের কৃতিত্ব হচ্ছে সায়েন্স ফিকশন।
বইটিতে এই নিছক আড্ডায় ধরা পড়েছে বাংলাদেশের প্রতি প্রবীণ সাংবাদিক ও সাহিত্যিকের ভালোবাসার কথা। উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্যের কিছু কালজয়ী বই এবং তার রচয়িতাদের কথাও। সমালোচনার কষ্ঠিপাথরে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, হরিশংকর জলদাস, হাসান আজিজুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, সেলিনা হোসেন, তসলিমা নাসরিন, আনিসুল হক থেকে শুরু করে সকলের সাহিত্যকর্ম নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন।
সেই আলোচনাতেও সমালোচিত হয় সীমান্তের সরকারি বিধিনিষেধ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট