সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে প্রকাশিত নিবন্ধ

সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে পারে বিএনপি

সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে পারে বিএনপি
ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল থেকে নেওয়া

১২ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সহিংসতা ও অস্থিরতায় জর্জরিত আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের নির্বাচন ছিল তুলনামূলকভাবে শান্ত। অনিয়মের বিক্ষিপ্ত কিছু অভিযোগ থাকলেও, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণ একে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম স্বচ্ছ নির্বাচন হিসেবে প্রশংসা করেছেন।

প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি হয়েছে এই ভোটে। এতে বোঝা যায়, গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিবর্তনের পক্ষে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ ছিল প্রবল। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। দলটির জোট সংসদে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এই ফলাফল মেনে নিয়েছেন। বিএনপির নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিএনপির এই জয় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। এই নির্বাচনের পাশাপাশি একযোগে অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে প্রধান প্রধান সাংবিধানিক সংস্কারগুলোও অনুমোদিত হয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংস্কারের ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তী এক বছরে গভীরতর সমস্যাগুলোর সমাধান না করে সরকার কেবল সীমিত কিছু সমন্বয় সাধন করেছিল। চলতি বছর স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ হবে বাংলাদেশের।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর সাধারণ মানুষ একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা করেছিল। তবে অন্তর্বর্তী শাসনামলে দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা এবং ক্রমবর্ধমান যুব বেকারত্ব ও ব্যবসায়িক খরচ বৃদ্ধির সাক্ষী হয়েছে।

এসব বিষয় প্রবৃদ্ধি এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারকে বৈধতাহীন এবং জাতীয় সমস্যা মোকাবিলায় অক্ষম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাদের মতে কেবল একটি নির্বাচিত সরকারই স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস

শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করায়, এই নির্বাচনী লড়াইটি বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৪ সালের হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছাত্র প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ছাত্র নেতাদের দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে জনসমর্থন হারিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় বিএনপির কিছু স্পষ্ট সুবিধা ছিল। প্রথমত, পুরোনো রাজনৈতিক শক্তি হওয়ার কারণে তারা অধিকাংশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উচ্চবিত্ত শ্রেণির সমর্থন ধরে রাখতে পেরেছে।

সাম্প্রতিক উত্থান-পতন সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো শহরের ব্যবসায়ী পরিবার এবং গ্রামের প্রভাবশালীরা নিয়ন্ত্রণ করে, যারা প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়।

আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপিও তাদের (এলিট শ্রেণির) স্বার্থ রক্ষা করে, যার ফলে দলটি উচ্চবিত্তদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। এমনকি সাধারণ ভোটাররা, যারা বিএনপির নেতাদের অতীত দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তারাও কোনো ভালো বিকল্প খুঁজে পাননি।

রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি সেনাবাহিনীও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বিএনপিকে সমর্থন করেছে এবং নির্বাচনের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। ভোটের ঠিক আগে যৌথ বাহিনী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উদ্ধার করে, যা দলটির ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বিএনপির বিজয় বাংলাদেশি সমাজের ধর্মনিরপেক্ষ বা উদারপন্থী মনোভাবকে স্পষ্ট করেছে। স্বাধীনতার ঘোষক জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত এই দলটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ঐতিহাসিক এবং আদর্শিক সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত। দলটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। জামায়াত নারীর কাজের সময়সীমা নির্ধারণ, গান ও বিনোদন নিয়ন্ত্রণ এবং সুফিবাদ বা মরমীবাদের বিরোধিতা করে। জামায়াতের জোটে আরও কিছু চরমপন্থী ইসলামি দল রয়েছে যাদের আদর্শ আফগানিস্তানের তালেবানদের কাছাকাছি। এসব চিন্তাধারা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে দলটির থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে অনুষ্ঠিত এবং বিশাল ব্যবধানের এই জয়ের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা বিরোধী দলগুলোর জন্য কঠিন হবে, এমনকি তারা যদি কারচুপির অভিযোগও তোলে। সেনাবাহিনীর সমর্থন থাকায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাতত কিছু সময় স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিএনপি তাদের নিজের ইচ্ছায় একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করবে, যেখানে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্ররা সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। দেশের অভ্যন্তরে বিএনপির ভিশন ২০৩০ ইশতেহারে দুর্নীতি দমন, সামাজিক কল্যাণ এবং জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যদিও এর কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হতে পারে।

বিএনপি সরকার সম্ভবত সেই সব জরুরি সংস্কারকেও ত্বরান্বিত করবে যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা। তারা দুর্নীতি নির্মূল, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুবকদের অসন্তোষ দূর করা এবং সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীকে ভর্তুকি দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। তবে যেহেতু বিএনপি নিজেই পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর একটি অংশ, তাই বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা মূলত অপরিবর্তিত থাকারই সম্ভাবনা বেশি।

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় শাসনকার্যের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার অভাব বিএনপির জন্য তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তাদের সাফল্য নির্ভর করবে দলীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং শৃঙ্খলা জোরদার করার ওপর। বিশেষ করে নীতি-নির্ধারণ এবং ক্ষমতা বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রবীণ নেতা ও তরুণ সদস্যদের মধ্যকার মতপার্থক্য নিরসন করার ওপর। এছাড়া, সাধারণ মানুষের মনে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সম্পর্কে যে সন্ত্রাসী এবং স্বজনপ্রীতির ধারণা রয়েছে, তা দূর করাও হবে একটি বড় পরীক্ষা।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিএনপি সম্ভবত চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল অব্যাহত রাখবে। তবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আমেরিকার সই করা বাণিজ্য চুক্তিটি।

ধারণা করা হচ্ছে, এই চুক্তি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং ডিজিটাল অবকাঠামোকে আমেরিকান প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসবে এবং চীন, রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা সীমিত করবে। এমনকি চুক্তি না মানলে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের ঝুঁকিও রয়েছে। এই চুক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে কি না, এবং বিএনপি এটি কীভাবে মোকাবিলা করে, তা হবে তাদের সরকারের জন্য প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

বিএনপি নেতারা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিএনপির সাবেক নেত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় উপস্থিত ছিলেন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা পৌঁছে দেন। তিনি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন সূচনার আহ্বানও জানান। নয়াদিল্লি আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি বণ্টন এবং শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের মতো বিষয়গুলোতে অর্থবহ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রবল ভারত-বিরোধী জনমতের কারণে নীতিগত বড় কোনো পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।

লেখক: সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের একজন সিনিয়র ফেলো ও পরিচালক

নিবন্ধটি সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত