সুব্রত শুভ্র

একসময় বাংলাদেশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জেগে ওঠা স্বপ্নগুলোর একটি। দারিদ্র্য হ্রাসে নজিরবিহীন সফলতা, নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতি, পোশাকশিল্পের বিস্তার–সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে অনেকেই উন্নয়ন-অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে দেখাতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই অগ্রগতির উজ্জ্বল পথের ওপর এখন গভীর অন্ধকারের ছায়া–ভয়, হিংসা, অনিশ্চয়তা ও পারস্পরিক ঘৃণার বিষাক্ত বিস্তার। সমাজের ভেতর অদৃশ্য ক্ষত। গত আড়াই দশকে তৈরি হওয়া অস্থিরতা শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের প্রতিটি স্তরকে ধীরে ধীরে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
মানুষের মনে আজ যে ভয়ের জন্ম হয়েছে, তার শিকড় সামাজিক আস্থা ভেঙে পড়ার মধ্যেই রোপিত। দুই প্রতিবেশীর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, মতানৈক্য মানেই শত্রুতা, গণমাধ্যমে অবিশ্বাস–এগুলো এখন সাধারণ আবহ। একসময়ের প্রাণবন্ত সামাজিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে দুটি মেরুতে বিভক্ত, অবিশ্বাসে আক্রান্ত এক সমাজে। ভিন্নমতকে গ্রহণ করার ঐতিহ্য যেখানে ছিল বাঙালির শক্তি, আজ সেখানে মত প্রকাশই হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। দেশজুড়ে হিংসা ও বিচ্ছিন্নতার নতুন বাস্তবতা। বাড়তে থাকা সংঘাত, সামাজিক সহিংসতা, অসহিষ্ণু বক্তব্য এবং বিপরীত মতের মানুষকে শত্রুপক্ষ হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এখন আর হিংসা শুধু রাজনৈতিক নয়; পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এতে তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত। তাদের অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ, সমাজের প্রতি উদাসীন, আর সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ছে। আড়াই দশকে মৌলবাদী প্রবণতা ও ঘৃণার রাজনীতির উত্থান সমাজে নতুন করে ভয়ের বীজ বপন করেছে। ধর্মীয় অনুভূতি ভুলভাবে ব্যবহার, বিভেদ উসকে দেওয়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা–সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি শুধু সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং রাষ্ট্রের উন্নয়নের কাঠামোকেও দুর্বল করে তুলছে।
শিক্ষা ও মেধার সংকট: উদ্বেগজনক ভবিষ্যতের পূর্বাভাস
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে গভীর কাঠামোগত সংকট। শিক্ষাব্যবস্থার স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, মেধা উপেক্ষা করে আনুগত্য-নির্ভর নিয়োগের বিস্তৃতি, তরুণদের বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ব্রেন ড্রেন বা মেধাপাচার–সব মিলিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠছে।
শিক্ষকের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া জ্ঞানচর্চার ওপর চাপের প্রভাব বেড়েছে। ২০২৪ সালে ইউনেস্কো ও বাংলাদেশ শিক্ষাবিষয়ক বোর্ডের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭২ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, তারা ‘শিক্ষার স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে চাপের মুখে’ আছেন।
এই তথ্য প্রমাণ করে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে একটি নীরব সংকট বহুদিন ধরে জমা হচ্ছিল।
এই সংকট কেন বিপজ্জনক? মুক্ত চিন্তা রুদ্ধ হলে শিক্ষা স্বাভাবিক গতিতে এগোতে পারে না। প্রশ্ন, অনুসন্ধান, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ; শিক্ষার এসব মূল ভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতার পরিবর্তে ভয়ভিত্তিক শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়। এতে তারা জ্ঞানের গভীরে যাওয়ার আগ্রহ হারায়। একাডেমিক গবেষণা দুর্বল হয়। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তখন আর বিকশিত হতে পারে না। ফলে একটি পুরো প্রজন্ম স্বাধীনভাবে চিন্তা, প্রশ্ন বা যুক্তি প্রদর্শন করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে–যা একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির জন্য মারাত্মক হুমকি।
অন্যদিকে, শিক্ষিত তরুণদের হতাশা বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রম জরিপে (২০২৫) উল্লেখ করা হয়েছে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৫.৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। মেধাবী ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ তরুণরা ‘ব্রেন ড্রেন’-এর ঢেউয়ে বিদেশমুখী হচ্ছে। ফলে দেশ হারাচ্ছে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ–মানব পুঁজি।
রাজনৈতিক আতঙ্ক: ক্ষমতার জোড়া অস্ত্র
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ এখন কেবল একটি তাত্ত্বিক মতাদর্শ নয়। এটি ক্ষমতা রক্ষার কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ক্রমেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ধর্মীয় আবেগ, পরিচয় ও বিশ্বাসকে রাজনৈতিক ভাষ্য ও নির্বাচনী গণিতের সঙ্গে মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ভিন্নমতকে খুব সহজে ‘ধর্মবিরোধী’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা দেওয়া যায়। এই প্রক্রিয়া শুধু জনমতকে বিভ্রান্ত করে না, বরং সমাজে স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও সংঘাত অধ্যয়ন-নির্ভর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও ক্ষমতালোভী বিরোধী অংশ–উভয় পক্ষই বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদী প্রবণতাকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহার করেছে। উদ্দেশ্য একটাই: নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি করে রাজনৈতিক মেরুকরণকে গভীর করা, যাতে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে না ওঠে। ‘সামাজিক ভয় সৃষ্টি’ এখানে একটি সচেতন কৌশল। কারণ ভীত, বিভক্ত ও অনিশ্চিত নাগরিক সমাজকে শাসন করা তুলনামূলকভাবে সহজ।
আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার ব্যবহারও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। যখন দেখা যায়, ধর্মীয় উগ্রবাদ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে এবং একই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা সম্পর্কিত মামলা বা অভিযোগও সমান্তরালভাবে বাড়ছে, তখন স্পষ্ট হয়–আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রটি কেবল জঙ্গিবাদ বা নিরাপত্তা মোকাবিলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং আইনি কাঠামো ও নিরাপত্তা বয়ান ব্যবহার করে বিরোধী মতকে নিয়ন্ত্রণ, ভিন্ন কণ্ঠকে ভয় দেখানো এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্র সংকুচিত করার প্রবণতাও সেখানে অন্তর্ভুক্ত।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, তবু আশা
রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি স্তরে ভয়, ঘৃণা ও অবিশ্বাসের যে চক্র গড়ে উঠেছে, তা ভাঙা নিঃসন্দেহে কঠিন। কারণ, এই চক্র শুধু নীতি বা ক্ষমতার কাঠামোতে নয়, মানুষের মনস্তত্ত্ব, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভেতরে গিয়ে গেঁথে বসে। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসের তুলনামূলক অধ্যয়ন দেখায়, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বেদনা ও রাজনৈতিক অবিচার প্রায়ই একপর্যায়ে গিয়ে নতুন ধরনের গণজাগরণ, দাবি ও পুনর্গঠনের পথ তৈরি করে।
অর্থাৎ, বর্তমান চিত্র যতই অনিশ্চিত হোক, তা স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয়–এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। মৌলবাদ ও আতঙ্ক-নির্ভর ক্ষমতা রাজনীতির বিপরীতে যখন নাগরিক সমাজ, মেধাবী তরুণ প্রজন্ম, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক বলয় ধীরে ধীরে যুক্তিসংগত ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির দাবিতে সংগঠিত হতে শুরু করে, তখনই ভয়-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত নড়তে থাকে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে–ভয় দিয়ে জনতাকে দীর্ঘদিন চুপ রাখা গেলেও বঞ্চিত ও আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের অভিজ্ঞতা একসময় পরিবর্তনের শক্তিতে রূপ নেয়।
বাংলাদেশ আজ এক সতর্ক গোধূলি। তবে আলো এখনো নিভে যায়নি। কিন্তু ছায়া ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মেধা, সৃজনশীলতা ও সাহস যদি আবার একত্র হয়, তাহলে হয়তো এই ভয়ের চক্র ভাঙা সম্ভব। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। তবে এটিই গল্পের শেষ নয়। এই দেশের মানুষ সবসময় প্রতিকূলতা জয় করেছে–স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা–সব ক্ষেত্রেই তারা দেখিয়েছে অদম্য ধৈর্য ও সৃজনশীলতা। সামাজিক আস্থা পুনর্গঠন, সহনশীলতা চর্চা, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও উঠে দাঁড়াতে পারে। অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক, আলোর পথ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়–যদি জাতি আবারও ঐক্য, মানবিকতা ও প্রগতির মশাল জ্বালাতে পারে।
এখন প্রশ্ন–কতটা গভীর ক্ষত হলে জনগণ আবার সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে?
লেখক: মাল্টিডিসিপ্লিনারি আর্টিস্ট, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক
(আগামীকাল পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব: অর্থনীতিতে উন্নয়নের খোলস)

একসময় বাংলাদেশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জেগে ওঠা স্বপ্নগুলোর একটি। দারিদ্র্য হ্রাসে নজিরবিহীন সফলতা, নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতি, পোশাকশিল্পের বিস্তার–সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে অনেকেই উন্নয়ন-অর্থনীতির উদাহরণ হিসেবে দেখাতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই অগ্রগতির উজ্জ্বল পথের ওপর এখন গভীর অন্ধকারের ছায়া–ভয়, হিংসা, অনিশ্চয়তা ও পারস্পরিক ঘৃণার বিষাক্ত বিস্তার। সমাজের ভেতর অদৃশ্য ক্ষত। গত আড়াই দশকে তৈরি হওয়া অস্থিরতা শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের প্রতিটি স্তরকে ধীরে ধীরে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
মানুষের মনে আজ যে ভয়ের জন্ম হয়েছে, তার শিকড় সামাজিক আস্থা ভেঙে পড়ার মধ্যেই রোপিত। দুই প্রতিবেশীর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ, মতানৈক্য মানেই শত্রুতা, গণমাধ্যমে অবিশ্বাস–এগুলো এখন সাধারণ আবহ। একসময়ের প্রাণবন্ত সামাজিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে দুটি মেরুতে বিভক্ত, অবিশ্বাসে আক্রান্ত এক সমাজে। ভিন্নমতকে গ্রহণ করার ঐতিহ্য যেখানে ছিল বাঙালির শক্তি, আজ সেখানে মত প্রকাশই হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। দেশজুড়ে হিংসা ও বিচ্ছিন্নতার নতুন বাস্তবতা। বাড়তে থাকা সংঘাত, সামাজিক সহিংসতা, অসহিষ্ণু বক্তব্য এবং বিপরীত মতের মানুষকে শত্রুপক্ষ হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এখন আর হিংসা শুধু রাজনৈতিক নয়; পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এতে তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত। তাদের অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ, সমাজের প্রতি উদাসীন, আর সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ছে। আড়াই দশকে মৌলবাদী প্রবণতা ও ঘৃণার রাজনীতির উত্থান সমাজে নতুন করে ভয়ের বীজ বপন করেছে। ধর্মীয় অনুভূতি ভুলভাবে ব্যবহার, বিভেদ উসকে দেওয়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা–সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি শুধু সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং রাষ্ট্রের উন্নয়নের কাঠামোকেও দুর্বল করে তুলছে।
শিক্ষা ও মেধার সংকট: উদ্বেগজনক ভবিষ্যতের পূর্বাভাস
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে গভীর কাঠামোগত সংকট। শিক্ষাব্যবস্থার স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, মেধা উপেক্ষা করে আনুগত্য-নির্ভর নিয়োগের বিস্তৃতি, তরুণদের বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ব্রেন ড্রেন বা মেধাপাচার–সব মিলিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠছে।
শিক্ষকের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া জ্ঞানচর্চার ওপর চাপের প্রভাব বেড়েছে। ২০২৪ সালে ইউনেস্কো ও বাংলাদেশ শিক্ষাবিষয়ক বোর্ডের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭২ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, তারা ‘শিক্ষার স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে চাপের মুখে’ আছেন।
এই তথ্য প্রমাণ করে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে একটি নীরব সংকট বহুদিন ধরে জমা হচ্ছিল।
এই সংকট কেন বিপজ্জনক? মুক্ত চিন্তা রুদ্ধ হলে শিক্ষা স্বাভাবিক গতিতে এগোতে পারে না। প্রশ্ন, অনুসন্ধান, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ; শিক্ষার এসব মূল ভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতার পরিবর্তে ভয়ভিত্তিক শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়। এতে তারা জ্ঞানের গভীরে যাওয়ার আগ্রহ হারায়। একাডেমিক গবেষণা দুর্বল হয়। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তখন আর বিকশিত হতে পারে না। ফলে একটি পুরো প্রজন্ম স্বাধীনভাবে চিন্তা, প্রশ্ন বা যুক্তি প্রদর্শন করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে–যা একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির জন্য মারাত্মক হুমকি।
অন্যদিকে, শিক্ষিত তরুণদের হতাশা বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রম জরিপে (২০২৫) উল্লেখ করা হয়েছে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৫.৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। মেধাবী ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ তরুণরা ‘ব্রেন ড্রেন’-এর ঢেউয়ে বিদেশমুখী হচ্ছে। ফলে দেশ হারাচ্ছে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ–মানব পুঁজি।
রাজনৈতিক আতঙ্ক: ক্ষমতার জোড়া অস্ত্র
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ এখন কেবল একটি তাত্ত্বিক মতাদর্শ নয়। এটি ক্ষমতা রক্ষার কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ক্রমেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ধর্মীয় আবেগ, পরিচয় ও বিশ্বাসকে রাজনৈতিক ভাষ্য ও নির্বাচনী গণিতের সঙ্গে মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ভিন্নমতকে খুব সহজে ‘ধর্মবিরোধী’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা দেওয়া যায়। এই প্রক্রিয়া শুধু জনমতকে বিভ্রান্ত করে না, বরং সমাজে স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও সংঘাত অধ্যয়ন-নির্ভর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও ক্ষমতালোভী বিরোধী অংশ–উভয় পক্ষই বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদী প্রবণতাকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহার করেছে। উদ্দেশ্য একটাই: নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি করে রাজনৈতিক মেরুকরণকে গভীর করা, যাতে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে না ওঠে। ‘সামাজিক ভয় সৃষ্টি’ এখানে একটি সচেতন কৌশল। কারণ ভীত, বিভক্ত ও অনিশ্চিত নাগরিক সমাজকে শাসন করা তুলনামূলকভাবে সহজ।
আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার ব্যবহারও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। যখন দেখা যায়, ধর্মীয় উগ্রবাদ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে এবং একই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা সম্পর্কিত মামলা বা অভিযোগও সমান্তরালভাবে বাড়ছে, তখন স্পষ্ট হয়–আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রটি কেবল জঙ্গিবাদ বা নিরাপত্তা মোকাবিলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং আইনি কাঠামো ও নিরাপত্তা বয়ান ব্যবহার করে বিরোধী মতকে নিয়ন্ত্রণ, ভিন্ন কণ্ঠকে ভয় দেখানো এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্র সংকুচিত করার প্রবণতাও সেখানে অন্তর্ভুক্ত।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, তবু আশা
রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি স্তরে ভয়, ঘৃণা ও অবিশ্বাসের যে চক্র গড়ে উঠেছে, তা ভাঙা নিঃসন্দেহে কঠিন। কারণ, এই চক্র শুধু নীতি বা ক্ষমতার কাঠামোতে নয়, মানুষের মনস্তত্ত্ব, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভেতরে গিয়ে গেঁথে বসে। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসের তুলনামূলক অধ্যয়ন দেখায়, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বেদনা ও রাজনৈতিক অবিচার প্রায়ই একপর্যায়ে গিয়ে নতুন ধরনের গণজাগরণ, দাবি ও পুনর্গঠনের পথ তৈরি করে।
অর্থাৎ, বর্তমান চিত্র যতই অনিশ্চিত হোক, তা স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয়–এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। মৌলবাদ ও আতঙ্ক-নির্ভর ক্ষমতা রাজনীতির বিপরীতে যখন নাগরিক সমাজ, মেধাবী তরুণ প্রজন্ম, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক বলয় ধীরে ধীরে যুক্তিসংগত ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির দাবিতে সংগঠিত হতে শুরু করে, তখনই ভয়-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত নড়তে থাকে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে–ভয় দিয়ে জনতাকে দীর্ঘদিন চুপ রাখা গেলেও বঞ্চিত ও আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের অভিজ্ঞতা একসময় পরিবর্তনের শক্তিতে রূপ নেয়।
বাংলাদেশ আজ এক সতর্ক গোধূলি। তবে আলো এখনো নিভে যায়নি। কিন্তু ছায়া ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মেধা, সৃজনশীলতা ও সাহস যদি আবার একত্র হয়, তাহলে হয়তো এই ভয়ের চক্র ভাঙা সম্ভব। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। তবে এটিই গল্পের শেষ নয়। এই দেশের মানুষ সবসময় প্রতিকূলতা জয় করেছে–স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা–সব ক্ষেত্রেই তারা দেখিয়েছে অদম্য ধৈর্য ও সৃজনশীলতা। সামাজিক আস্থা পুনর্গঠন, সহনশীলতা চর্চা, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও উঠে দাঁড়াতে পারে। অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক, আলোর পথ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়–যদি জাতি আবারও ঐক্য, মানবিকতা ও প্রগতির মশাল জ্বালাতে পারে।
এখন প্রশ্ন–কতটা গভীর ক্ষত হলে জনগণ আবার সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে?
লেখক: মাল্টিডিসিপ্লিনারি আর্টিস্ট, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক
(আগামীকাল পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব: অর্থনীতিতে উন্নয়নের খোলস)

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট